সামরিক আদালতে প্রদত্ত তাহেরের জবানবন্দি (PART 03)

[এই পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান তাহেরকে বাধা দেন। বিচার কক্ষে বাক.বিতণ্ডা শুরু হয়ে যায়। কর্নেল তাহের বলেন- ‘আমার যা বলা দরকার, তা আপনাদের শুনতেই হবে। নয় আমি আর কোন কথা বলবো না।ফাঁসি দিন… এখনি ফাঁসি দিন… আমি ভয় পাই না। কিন্তু আমাকে বিরক্ত করবেন না। … কি যেন বলছিলাম শরীফ?’



[এই পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান তাহেরকে বাধা দেন। বিচার কক্ষে বাক.বিতণ্ডা শুরু হয়ে যায়। কর্নেল তাহের বলেন- ‘আমার যা বলা দরকার, তা আপনাদের শুনতেই হবে। নয় আমি আর কোন কথা বলবো না।ফাঁসি দিন… এখনি ফাঁসি দিন… আমি ভয় পাই না। কিন্তু আমাকে বিরক্ত করবেন না। … কি যেন বলছিলাম শরীফ?’ (শরীফ চাকলাদার বিবাদী পক্ষের একজন সহকারী কৌশলী) এই বলে তাহের আবার শুরু করলেন।]
এর মধ্যে বেতার থেকে সিপাহি অভ্যুত্থানের ঘোষণা করা হয়েছে। জিয়াকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বেতার ভবনে যাবার পথে জিয়া শহীদ মিনারে একটা জনসমাবেশে ভাষণ দিতে রাজ হয়েছিলেন। তাই কথামতো আমি সিপাহিদের নির্দেশ দিয়েছিলাম শহীদ মিনারে সমবেত হতে। সেখানে আমি ও জিয়া সমাবেশে ভাষণ দেবো। তাহলে তাদের অফিসারদের ছাড়াই যেই বিপ্লবী সৈনিকরা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে সেই সৈনিকদের কাছে দেয়া অঙ্গীকার থেকে কেউই পিছু হটতে পারবে না।
উৎফুল্ল মনে সৈনিকরা শহরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। একসঙ্গে এদের জড়ো করতে কিছুটা সময় দরকার। শহীদ মিনারে সমাবেশের সময় তাই ঠিক করি সকাল দশটায়। হাজারো মানুষ খুশী মনে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তারা বিপ্লবী সৈনিকদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে শ্লোগান তুলেছিল। চারিদিকে শুধু ফুল আর ফুল। মানুষের আনন্দ আর উল্লাসের মাঝে পুরো শহরটা যেন উৎসবের আনন্দে রঙিন হয়ে উঠেছিল।
সকাল সাড়ে আটটায় সৈনিকরা আমাকে জানালো যে খন্দকার মোশতাক আহমেদ বেতার ভবনে ঢুকে পড়েছেন ও একটা ভাষণ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমি তখন বেতার কেন্দ্রে গেলাম। মোশতাককে আমি খুব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলাম যে চক্রান্তের রাজনীতির দিন শেষ; তাকে এখনই বেতার কেন্দ্র ছেড়ে যেতে হবে। তিনি আমার কথা মতো বেতার কেন্দ্র ছেড়ে চলে গেলেন। এরপর আমি সমাবেশে ভাষণ দেয়ার জন্য জিয়াকে নিয়ে আনতে সেনানিবাসে গেলাম। সেখানে পৌঁছে দেখি পরিস্থিতি বদলে গেছে। জিয়া দাড়ি কামিয়ে সামরিক পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে নিয়েছেন। তাকে দেখে মনে হলো তিনি বন্দিদশার আঘাত কাটিয়ে উঠেছেন। শহীদ মিনারে যাবার কথা তুললে জিয়া সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানালেন। বিনয়ের সঙ্গে জিয়া যুক্তি দেখালেন যে তিনি একজন সৈনিক, তার গণ জমায়েতে বক্তৃতা দেয়া সাজে না। তিনি আমাকে শহীদ মিনারে যেয়ে সেনাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিতে বললেন। আমি বরং সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরে আসার জন্য শহীদ মিনারে নির্দেশ পাঠালাম।
এগারোটার দিকে আমরা সেনা সদর দপ্তরে একটা আলোচনায় বসি। একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ব্যাপারে আমরা নীতিগতভাবে একমত হই। সেই আলোচনায় উপস্থিত ছিলাম আমি, জিয়া, তাওয়াব, এম.এইচ.খান,খলিলুর রহমান, ওসমানী ও মুখ্য সচিব মাহবুব আলম চাষী। সরকারের ধারাবাহিকতার প্রশ্নে একটা আইনগত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। সবাই চাচ্ছিলেন বিচারপতি সায়েম দেশের রাষ্ট্রপতি হবেন। (সায়েমকে খালেদ মোশাররফ পাঁচ নভেম্বর নিয়োগ করেছিলেন।) আমি তা মেনে নিলাম কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম জিয়া হবেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হতে জিয়ার আপত্তির কারণে কিছুক্ষণ আলোচনার পর ঠিক হলো জিয়া, তাওয়াব আর এম.এইচ. খান প্রত্যেকেই উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হবেন। এদের ওপর কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। ঠিক হলো বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে তিন উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকদের নিয়ে একটা উপদেষ্টা কাউন্সিল গঠন করবেন। সেদিনের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তা হচ্ছে সব রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেয়া হবে।
রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালু করতে দেয়া হবে ও মোশতাক সরকার ঘোষিত সাধারণ নির্বাচনের নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সায়েম শুধু এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চালাবেন। আমি এই সভাতে সাতই নভেম্বরের বিপ্লবের অনুক্রমকে স্বীকৃতি দিতে বললাম।
বিকালের দিকে আমি বেতার কেন্দ্রে যাই। বিপ্লবী সৈন্যরা জিয়াউর রহমানের কাছে বারো দফা দাবি পেশের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা চাচ্ছিল তাদের দাবি পেশ করার সময় আমি সেখানে উপস্থিত থাকি। বেতার কেন্দ্র থেকে আমি জিয়াউর রহমানকে টেলিফোন করি ও সৈন্যদের প্রস্তাবের কথা তাকে জানাই। তখন সৈন্যরা প্রচন্ডভাবে উত্তেজিত। বেতার কেন্দ্রের ভেতরে তারা কাউকে ঢুকতে দিচ্ছিল না। পৌনে আটটার দিকে জিয়ার সঙ্গে মোশতাক ও সায়েমকে বেতার কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেয়া হয়। বিপ্লবী সৈন্যদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পেশ করা বারো দফা দাবির দলিলে জিয়ার সম্মতিসূচক স্বাক্ষরের পরই এদের বেতার কেন্দ্রে প্রবেশাধিকার দেয়া হয়।
খন্দকার মোশতাক ও বিচারপতি সায়েম জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। আমি আর জিয়া তখন বেতার ভবনের টেলিভিশন কক্ষে, এক সঙ্গে ভাষণ শুনছি। সায়েম তার ভাষণে আমাদের আলোচনায় নেয়া সিদ্ধান্তগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতেই পরদিন আট নভেম্বর মেজর জলিল ও আ.স.ম. আব্দুর রবকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। সেদিন আমি জেনারেল জিয়াকে টেলিফোন করে এর জন্য ধন্যবাদ জানাই আর মতিন,অহিদুর সহ অন্যান্য বন্দিদেরও সেই সঙ্গে মুক্তি দিতে অনুরোধ করি।
আট তারিখে সন্ধ্যায় জিয়া আমাকে জানালেন যে, কয়েকটা ঘটনায় কিছু অফিসার মারা গেছেন। আমি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সম্ভাব্য সব ধরনের সাহায্য করার প্রস্তাব দেই। আমি তখনি সেনানিবাসে আসার প্রস্তাব করি। জিয়াকে আমি আরো জানাই যে বিপ্লবী সৈন্যদের ওপর আমার কড়া নির্দেশ ছিল যাতে কোন অফিসারের ওপর এভাবে আক্রমণ করা না হয়। এগার তারিখ পর্যন্ত জিয়া আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করেন। কিন্তু বার তারিখের পর তাকে আর পাওয়া যাচ্ছিল না। সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তার সঙ্গে আমি যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেই জিয়া আমাকে এড়িয়ে যেতেন।
তেইশে নভেম্বর পুলিশের একটা বড়ো দল আমার বড় ভাই ফ্লাইট সার্জেন্ট আবু ইউসুফ খানের বাড়ী ঘেরাও করে ও তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে নিয়ে যায়। এই ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে আমি মেজর জেনারেল জিয়াকে টেলিফোন করি। অন্য প্রান্ত থেকে আমাকে জানানো হয় মেজর জেনারেল জিয়াকে পাওয়া যাচ্ছে না। তার পরিবর্তে সেনাবাহিনীর উপ.প্রধান মেজর জেনারেল এরশাদ আমার সঙ্গে কথা বলবেন। এরশাদ আমার কথা শুনে বলেন যে আমার ভাইয়ের গ্রেফতারের ব্যাপারে সেনাবাহিনী কিছুই জানে না। ওটা হচ্ছে একটা সাধারণ পুলিশী তৎপরতা। আমি তখনও জানতাম না আমার ভাইকে যখন পুলিশ গ্রেফতার করে তখন একই সময়ে মেজর জলিল ও আ.স.ম. আব্দুর রব সহ অন্যান্য অনেক জাসদ নেতা ও কর্মীকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। এসব জানার পর আমার বুঝতে আর অসুবিধা হলো না যাদের আমরা সাত নভেম্বর ক্ষমতায় বসিয়েছিলাম তারা আবার এক নতুন ষড়যন্ত্রের খেলায় মেতেছে।
২৪শে নভেম্বর এক বিরাট পুলিশ বাহিনী আমাকে ঘিরে ফেলে। কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার আমাকে জানালেন জিয়ার সঙ্গে কথা বলার জন্য তাদের সঙ্গে যাওয়া দরকার। আমি অবাক হয়ে বললাম জিয়ার কাছে যাওয়ার জন্য এত পুলিশ প্রহরার কি দরকার? এরা আমাকে একটা জিপে তুলে সোজা এই জেলে নিয়ে আসে। এভাবেই যাদের প্রাণ বাঁচিয়ে আমাকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলাম সেই সব বিশ্বাসঘাতকের দল আমাকে জেলে অন্তরীণ করলো।
জিয়া শুধু আমার সঙ্গেই নয়, বিপ্লবী সেনাদের সঙ্গে, সাত নভেম্বরের পবিত্র অঙ্গীকারের সঙ্গে, এক কথায় গোটা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমাদের পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। খালেদ মোশাররফের সঙ্গে তুলনায় জিয়া মুদ্রার অন্য পিঠ বলেই প্রমাণিত হয়েছে।
আমাদের জাতির ইতিহাসে আর একটাই মাত্র এরকম বিশ্বাসঘাতকতার নজীর রয়েছে, তা’ হচ্ছে মীর জাফরের।বাঙালি জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে সে গোটা উপমহাদেশকে দু’শ বছরের গোলামীর পথে ঠেলে দিয়েছিল।ভাগ্য ভালো যে এটা সতের শ’ সাতান্ন সাল নয়। উনিশ শ’ ছিয়াত্তর। আমাদের আছে বিপ্লবী সিপাহি জনতা,তারা জিয়াউর রহমানের মতো বিশ্বাসঘাতকদের চক্রান্তকে নির্মূল করবে।

(এই পর্যায়ে কর্নেল তাহেরকে আবার বাধা দেয়া হয়। কোর্টে বাক-বিতণ্ডার তোড়ে কাজ কর্ম বন্ধ হয়ে যায়।তাহের তখন বলেন- ‘ কোন অধিকারে আমাকে ফাঁসি দেবেন? আমাকে মুক্তি দেয়ার কিংবা সাজা দেয়ার কোন ক্ষমতাই আপনাদের নেই।’)
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কয়েকদিন রাখার পর আমাকে হেলিকপ্টারে করে রাজশাহী জেলে নিয়ে যাওয়া হয়।সেখানে আমাকে একটা নির্জন প্রকোষ্ঠে রাখা হয়। আজ পর্যন্ত আমার পরিবারের কোন সদস্য আমার সঙ্গে দেখা করারা অনুমতি পায়নি। কিন্তু জেলে থাকলেও দেশের নাড়ী আমি ঠিকই উপলব্ধি করতে পারি। দেশের জন্য এখন এক চরম সংকটের সময়। আমাদের সামনে এখন দুটো জরুরি সমস্যা। একদিকে একটা রাজনৈতিক দলের কিছু সদস্য ভারতে পালিয়ে যেয়ে সীমান্ত সশস্ত্র সংঘর্ষের অবতারণা করছে। অন্যদিকে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারত গঙ্গার পানির বন্ধ করে দিয়েছে। দুটো সমস্যাই এদেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক বুনিয়াদের মূলে সরাসরি হুমকির নামান্তর। নির্জনে কারারুদ্ধ অবস্থায় উপর্যুপরি লাঞ্ছনার মুখেও এই হুমকির প্রতিবাদ জানাতে আমার দেরী হয়নি। ১৯৭৬ সালের দশ মে আমি রাষ্ট্রপতির কাছে একটা চিঠি পাঠাই সেই চিঠি আমি এখানে পড়ে শোনাতে চাই।
(আদালত তাহেরকে এই চিঠি পড়তে দেয় নি। ট্রাইব্যুনাল আরো জানায় যে বক্তব্য সংক্ষেপ করার আশ্বাস না দিলে তাঁকে এমনকি বক্তব্য পেশ করতেও দেয়া হবে না। এরপর বিবাদী পক্ষের প্রধান আইনজীবীদের হস্তক্ষেপের পর তাহেরকে কথা বলার অনুমতি দেয়া হয়। তাহেরের আইনজীবী আদালতে বলেন- ‘অনুগ্রহ করে তাঁকে (বক্তব্য দেয়ার) অনুমতি দিন। এ ট্রাইব্যুনালের অবশ্যই অধিকার আছে (তাঁকে) সেই সুযোগ না দেয়ার,কিন্তু তিনি প্রধান বিবাদী; যত বড়োই হোক না কেন বক্তব্য উপস্থাপন করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ তাঁকে দিতেই হবে।’)
জনাব চেয়ারম্যান ও মামলার সম্মানিত সদস্যবৃন্দ। রাষ্ট্রপতির কাছে লেখা চিঠিতে আমার ইচ্ছার প্রকাশ হয়েছে। এ ইচ্ছা নিজ দেশকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একজন সাধারণ নাগরিকের দৃঢ় সংকল্পের দলিল। আমি একজন মুক্ত মানুষ। নিজের যোগ্যতা দিয়ে আমি এই স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এই জেলের উঁচু দেয়াল, এই নির্জন কারাবাস, এই হাতকড়া কিছুই সেই স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে না।
বাইশে মে আমাকে রাজশাহী থেকে হেলিকপ্টারে করে এই জেলে আনা হয় এবং সরাসরি একটা নির্জন সেলে আটকে রাখা হয়। গোটা জেলখানাই যেন ছিল এক রহস্য ঘেরা নীরবতায় ভরা। এখানে আসার পর থেকেই আমাকে আর অন্যান্যদের বিচার করার কথা শুনতে পাচ্ছিলাম; জেলের ভেতরে এক বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে। ইতোমধ্যেই নাকি বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল আইনও জারি করা হয়েছে। পনের জুন ট্রাইব্যুনালের বর্তমান চেয়ারম্যান আমার সঙ্গে জেলের ভেতরে দেখা করেন। আমি ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হতে অস্বীকৃতি জানাই। জেলের ভেতর সামরিক ট্রাইব্যুনাল বিচারের নামে সরকারী প্রহসন ছাড়া আর কি হতে পারে। একুশে জুন চারজন আইনজীবী আমার সঙ্গে জেলের ভেতরে দেখা করেন। তাঁরা আমাকে আশ্বাস দেন যে ন্যায় বিচার করা হবে; সরকারী কোন রকম হস্তক্ষেপ ছাড়াই ট্রাইব্যুনাল তার কাজ করবে। শুধু মাত্র এই আশ্বাসের পরই আমি আদালতের সামনে হাজির হতে রাজি হই।
এখানে আমি একটা কথা বলতে চাই। যেই অধ্যাদেশের আওতায় এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে তার সম্পূর্ণ অবৈধ। এই অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল উনিশ শ’ ছিয়াত্তরের পনের জুন। অথচ পনের জুন ট্রাইব্যুনাল কারাগার পরিদর্শন করে। তাহলে ট্রাইব্যুনাল নিশ্চয় আরো আগে গঠিত হয়েছে। নাহলে পনের তারিখে কাজ করে কিভাবে? এছাড়া জেলের ভেতরে আদালত গঠনের জন্য তো সেই জুনের বারো তারিখ থেকেই প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল।
আর এই তো আমি। আমাকে আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ দেয়া হয়নি। এমনকি চার্জশীট দেখার কোন সুযোগও আমার হয় নি। আমার পরিবারের কাউকে আমার সঙ্গে দেখা করতে পর্যন্ত দেয় নি। আর যেভাবে এ বিচার অনুষ্ঠিত হয়েছে তার সম্পর্কে যতো কম বলা যায় ততই ভাল। পুরো ব্যাপারটা কর্তৃপক্ষ সন্তন্ত্র ভঙ্গিতে তাড়াহুড়া করে করেছে যে তা জানলে যে কেউ অবাক হবেন।
আমার এবং কিছু বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে ১৯৭৪ সালের জুলাই থেকে আমরা আইনসিদ্ধ বৈধ সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছিলাম। আমি সশস্ত্র বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা ও বিরোধ সৃষ্টি করেছি বলেও অভিযোগ আনা হয়েছে। উনিশ শ’ পঁচাত্তর এর সাতই নভেম্বর একটা সরকারকে উৎখাত করেছি বলে আমাকে অভিযুক্ত করা হয়। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে আমি একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক নই। জনাব চেয়ারম্যান ও ট্রাইব্যুনালের সদস্যবৃন্দ, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটুকু রয়েছে সে সম্পর্কে আমি কিছুই বলতে চাই না। অভিযোগগুলো এতই মিথ্যা বানোয়াট যে, সে সম্পর্কে কিছু বলার কোন ইচ্ছই আমার নেই। যারা আওয়ামী লীগ সবকারের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন তাদের স্পষ্ট মনে আছে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে দেশের কি অবস্থা হয়েছিল। গণ নিপীড়ন, আমলাতান্ত্রিক অর্থনীতি,অরাজকতা আর গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকার লঙ্ঘন ছিল প্রতিদিনকার ঘটনা। আইন শৃঙ্খলার কোন বালাই ছিল না। এরকম প্রতিকুল রাজনৈতিক পরিবেশে জাসদ ও অন্যান্য গণসংগঠন গুলো একটা ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। দেশপ্রেমের নায়ক.রাজারা তখন কোথায় ছিলেন? কোথায় ছিল জিয়াউর রহমান? কোথায় ছিল মোশাররফ খান আর এম.জি. তাওয়াব? কি করছিল তারা?
আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমি বৈধভাবে ক্ষমতা লাভকারী সরকারকে উৎখাত করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছি।কিন্তু মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করেছিল কারা? কারা সেই সরকারকে উৎখাত করেছিল? মুজিবের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কে ক্ষমতায় এসেছিল? মুজিবের পতনের পর সেনাবাহিনী প্রধান কে হয়েছিল? এখানে অভিযুক্তদের কেউ কি এসব ঘটিয়েছিল? নাকি এখানে উপবিষ্ট আপনারা এবং তারা- যাদের আজ্ঞা আপনি পালন করে যাচ্ছেন, তারাই কি মুজিব হত্যার মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন নি?
সেনাবাহিনীতে বিরোধ এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়েছে আমার বিরুদ্ধে। কিন্তু পনেরই আগস্ট এবং তেসরা নভেম্বর সেনাবাহিনীতে কি ঘটেছিল? তারা কোন মেজররা যারা সিনিয়র অফিসারদের হুকুম দিয়ে বেড়াতো? তিন নভেম্বরের পর কারা সেনাবাহিনীর কমান্ডের সমস্ত নিয়ম কানুনকে ভেঙ্গে দিয়েছিল? বন্দি জিয়া কার কাছে প্রাণ রক্ষার জন্য খবর পাঠিয়েছিল? হ্যাঁ, অবশ্যই আমার নির্দেশে এক সিপাহি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াকে মুক্ত করা হয়। আমাদের প্রধান কর্তব্য ছিল জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সংহত করা।এর জন্য সৈনিকদের সংগঠিত করে তাদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তুলতে হয়েছিল। আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমি এই কাজে সফল হয়েছিলাম। এই জাতি ও সশস্ত্র বাহিনীকে আমরা এক মহাদুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করেছি।
আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমি একটা বৈধ সরকারকে উৎখাত করেছি। হ্যাঁ, এটা সত্য। সাতই নভেম্বরের আগে কে ক্ষমতায় এসেছিল? খালেদ মোশাররফ কাদের প্রতিনিধিত্ব করছিল? কে জিয়াকে গ্রেফতার করেছিল? ভয়ার্ত জনতা কার উৎখাত কামনা করেছিল? জাতীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ও জাতিকে একটা নতুন পথের দিশা দিতে আমরা বিপ্লবী সিপাহি জনতার সঙ্গে মিলে বিশ্বাসঘাতক খালেদ মোশাররফ চক্রকে উৎখাত করেছিলাম।আমি একজন অনুগত নাগরিক নই বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একজন মানুষ যে তার রক্ত ঝরিয়েছে, নিজের দেহের একটা অঙ্গ পর্যন্ত হারিয়েছে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য তার কাছ থেকে আর কি আনুগত্য তোমরা চাও? আর কোনভাবে এদেশের প্রতি আমার আনুগত্য প্রকাশ করব? আমাদের সীমান্তকে মুক্ত রাখতে, সশস্ত্র বাহিনীর স্থান আর জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখবার ইচ্ছায় ঐতিহাসিক সিপাহি অভ্যুত্থান পরিচালনা করতে যে পঙ্গু লোকটি নিজের জীবনকে বিপন্ন করেছিল তার কাছ থেকে আর কি বিশেষ আনুগত্য তোমাদের পাওনা?
এ জন্যই আমি ট্রাইব্যুনালকে অনুরোধ করেছিলাম মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, রিয়ার.অ্যাডমিরাল এম.এইচ. খান, এয়ার ভাইস.মার্শাল এম. জি. তাওয়াব, জেনারেল এম.এ.জি. ওসমানী ও বিচারপতি এ.এস.এম. সায়েমকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করার জন্য। তারা যদি এখানে আসতেন, ট্রাইব্যুনালের যদি ক্ষমতা থাকতো এখানে আনার তাহলে আমি নিশ্চিন্ত যে তারা এমন মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগের সামনে দাঁড়াতে সাহস পেত না। কিন্তু এই ট্রাইব্যুনাল তার দায়িত্ব পালন করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দেশ ও জাতির মঙ্গলের লক্ষ্যে পরিচালিত নয় যে আইন সে আইন কোন আইন-ই নয়। ছিয়াত্তরে পনের জুন যে অধ্যাদেশের জারি হয়েছে তা একটা কালো আইন। শুধু মাত্র সরকারের খেয়াল-খুশীর প্রয়োজন মেটাতেই এই অধ্যাদেশ জারিকৃত হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি অধ্যাদেশ। এই ট্রাইব্যুনালের তাই আমাকে বিচার করার কোন আইন সমস্ত বা নীতিগত ভিত্তি নেই।
একুশে জুনের পর থেকে এই বিচার শুরু হওয়ার দিন পর্যন্ত যে সব ঘটনা ঘটেছে আমি এখন সেগুলো বলতে চাই।
(তাহেরকে তাঁর বক্তব্যের এই অংশ রাখতে দেয়া হয়নি। তাহের বলেন, তিনি কখনোই এই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মতো এমন নীচ চরিত্রের লোক দেখে নি।
সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত একনিষ্ঠ অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মানব সভ্যতা ভালো যা কিছু অর্জন করেছে এই ট্রাইব্যুনালের কীর্তিকলাপ তার সব মলিন করে দিয়েছে।)
শেষ করার আগে বলতে চাই ছয় ও সাতই নভেম্বরের মাঝের রাত্রিতে ও সাত তারিখ দিনে যা হয়েছে তার সবই আমি বিস্তারিতভাবে বলেছি। এখন হয়তো ট্রাইব্যুনাল বুঝতে পারবেন কেন আমি সায়েম, জিয়া, এম.এইচ. খান, তাওয়াব আর ওসমানীকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করতে বলেছিলাম। তারা এখানে এসে বলুন আমি যা বলেছি তার কোথাও একবর্ণ মিথ্যা আছে কিনা।
আমার সঙ্গে এ মামলায় অভিযুক্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সম্বন্ধে আমার কিছু বলবার আছে। তাদের প্রতি আমার একটা দায়িত্ব রয়েছে। যদি তারা কোন অপরাধ করে থাকে তাহলে এদের বিচার করা উচিত ছিল সশস্ত্র বাহিনীর আইন অনুযায়ী এবং সার্ভিস রুলসের আওতায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শুরুর দিকে আমি তার একজন অন্যতম উচ্চপদস্থ অফিসার ছিলাম। বড়ো দুঃখ হয়। এই সামরিক জান্তা আর তাদের জঘন্য উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে যেয়ে এভাবে সেনাবাহিনী পঙ্গু হয়ে যাবে। এইসব যুবকেরা সত্যিকারের বীর। তাঁদের নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি।
সাড়ে সাত কোটি মানুষের এই জাতি মরতে পারে না। বাংলাদেশ বীরের জাতি। সাতই নভেম্বরের অভ্যুত্থান থেকে তাঁরা যেই শিক্ষা ও দিক নির্দেশনা পেয়েছে তা ভবিষ্যতে তাঁদের সব কাজে পথ দেখাবে। জাতি আজ এক অদম্য প্রেরণায় উদ্ভাসিত। যা করে থাকি না কেন তার জন্য আমি গর্বিত। আমি ভীত নই। জনাব চেয়ারম্যান, শেষে শুধু বলবো, আমি আমার দেশ ও জাতিকে ভালবাসি। এ জাতির প্রাণে আমি মিশে রয়েছি।কার সাহস আছে আমাদের আলাদা করবে। নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর কোন বড় সম্পদ নেই। আমি তার অধিকারী। আমি আমার জাতিকে তা অর্জন করতে ডাক দিতে যাই।
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হউক!
দীর্ঘজীবী হউক স্বদেশ!

আরও জানতেঃ

১)সামরিক আদালতে প্রদত্ত তাহেরের জবানবন্দি (PART 01)
২)সামরিক আদালতে প্রদত্ত তাহেরের জবানবন্দি (PART 02)
৩)উত্তর বাংলা এর ব্লগ ৭ নভেম্বর ‘সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থান’ ও কর্নেল তাহের হত্যাকাণ্ড
৪)উত্তর বাংলা এর ব্লগ ৭ নভেম্বর ‘সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থান’ ও কর্নেল তাহের হত্যাকাণ্ড (শেষ পর্ব)

১১ thoughts on “সামরিক আদালতে প্রদত্ত তাহেরের জবানবন্দি (PART 03)

    1. আপনাকেও ধন্যবাদ আতিক ভাই। সময়
      আপনাকেও ধন্যবাদ আতিক ভাই। সময় করতে পারছি না বলে বেশী আগাতে পারলাম না। একটা আফসোস রয়ে গেল।

  1. অসাধারণ রায়ান ভাই। গাঁয়ের লোম
    অসাধারণ রায়ান ভাই। গাঁয়ের লোম খাঁড়া হয়ে যাচ্ছে এমন একজন বীরের জবানবন্দী শুনে। একটা জাতি কত হতভাগা হলে তাঁর বীর সৈনিকদের এইভাবে বিসর্জন দিতে পারে।

    1. ভাই, আমি কর্নেল তাহের
      ভাই, আমি কর্নেল তাহের সম্পর্কে আরও অনেক কিছু পড়েছিলাম। ঠিক মতো সংরক্ষণ করে রাখতে পারিনি বলে শেয়ার করতে পারলাম না। পড়ার জন্য ধন্য বাদ।

  2. রায়ান ভাই এমন ধারাবাহিক
    রায়ান ভাই এমন ধারাবাহিক গুরুত্বপূর্ণ পোস্টের পোস্টের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না। অসাধারণ কাজ হইছে।

  3. জিয়া শুধু আমার সঙ্গেই নয়,

    জিয়া শুধু আমার সঙ্গেই নয়, বিপ্লবী সেনাদের সঙ্গে, সাত নভেম্বরের পবিত্র অঙ্গীকারের সঙ্গে, এক কথায় গোটা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে

  4. অনেক তথ্যসম্বলিত পোষ্ট; অনেক
    অনেক তথ্যসম্বলিত পোষ্ট; অনেক কিছু জানতে পারলাম । ধন্যবাদ….. আর প্রিয়তে নিয়ে নিলাম!

Leave a Reply to অন্ধকারের যাত্রী Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *