পঙ্খীরাজ

খুব বাথরুম পেয়েছে। ছোটটা। তলপেট ফেটে যাওয়ার জোগাড়। কিন্তু উপায় নেই। তেজগাঁ থেকে র‌্যাংগসের ওভারপাসটা পার হয়ে প্রায় দশ মিনিট ধরে সিগন্যালে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গোলাম হোসেন। পেছনের সিটে একটা খালি মামের বোতল গড়াগড়ি খাচ্ছে। সায়মন ফেলে গেছে। ইচ্ছে হচ্ছে গাড়িতে বসেই হালকার উপর বোতলে কাজটা সেরে ফেলতে, এমন অবস্থা। কিন্তু উপায় নেই। পনের-বিশ সেকেন্ড পর পর জানালার কাঁচে ফকিরের খট খট। জ্যামটা আর কতক্ষন থাকবে জানলে নেমে কাজটা সেরে আসে। কপাল খুব ভাল থাকলে জ্যাম ছুটার পর ১০ থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে ধানমণ্ডি ৬ নম্বরে পৌছতে পারবে। তাওতো আরও ১০-১২ মিনিট। এতক্ষন চেপে রাখতে পারলে হয়। এসব ভাবতে ভাবতেই সিগন্যালটা ছেড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাজেরোটা এমন বেমাক্কা চাপ দিয়ে টান দিল, সে সাথে সাথে ডানে না সরলে বামের সাইড ভিউ মিররটা চুরমার হয়ে যেত। “হেই হারামীর বাচ্চা” গালি দিয়ে সেও দিল টান। পাজেরোটাকে ধরার জন্য না, অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্যারের অফিসে রওনা দেয়ার সময় প্রায় হয়ে গেছে। তবে এক হিসাবে গোলাম হোসেনের উচিৎ পাজেরো ওয়ালাকে ধন্যবাদ দেয়া। মুহুর্তের উত্তেজনার ফলে সে তার প্রস্রাবের চাপের কথা ভুলে গেছে। সাড়ে আটটার মধ্যে পৌঁছাতেই হবে। ১০ মিনিট একদিক-ওদিক হলে তার চৌদ্দ গুষ্টিকে কবরস্থ হতে হবে অন্তত তিনবার। নতুন চাকরি। মাত্র দেড় মাস হয় ঢুকেছে। তাই ভয় আরো বেশী।

পৌঁছুতে পাঁচ মিনিট লেট হয়েই গেল। কোনমতে পার্কিং এ গাড়িটা ঢুকিয়ে স্যারকে মিস কল মেরে ফেরার খবর দিয়ে দৌড় দিল হালকা হবার জন্য। কিন্তু যে পরিমান চাপ দিচ্ছিল, সে তুলনায় ডেলিভারি হল সামান্য। সেকারনে মেজাজটাও খারাপ হল একটু। টয়লেট থেকে বের হয়েই দেখলো স্যার এর মধ্যেই গাড়িতে চরে বসে আছেন। কপাল খারাপ। ভয়ে ভয়ে সীটে বসে স্টার্ট দিল। নাহ, কপাল খারাপ না। কোন ঝারি-ঝুরি না মেরে সাহেব বসে পেপার পড়ছেন। এবার যাত্রা মতিঝিলের পথে। গলির মাথায় এসে মিরপুর রোডে উঠে ইউটার্ন নিয়ে গাড়ি নিউ মার্কেটের দিকে ঘুরিয়ে দিল। পুরোটা রাস্তা পাথরের মত জ্যাম। সাইন্স ল্যাবরেটরি পার করতেই খবর হয়ে যাবে। এর মধ্যে টের পেল ক্ষিদেটা জানান দিচ্ছে বেশ। প্রতিদিন এসময়ই জানান দেয় রুটিন মত। ভোর পাঁচটায় খাওয়া এক কাপ চা আর একটা টোস্ট বিস্কুট রণে ভঙ্গ দিয়েছে বেশ কিছুক্ষন আগে। সেই সকাল পৌনে ছ’টা থেকে ডিউটি শুরু। এসেই গাড়িটা-ধোয়া মোছা কর ভাল মত। এটা অবশ্য গোলাম হোসেনের বদ বা ভাল অভ্যাস। নোংরা অপছন্দ তার। আরেকটা কারণও আছে। তবে সেটা তার একান্ত গোপনীয় এবং তার নিজের হিসেবেই কিছুটা হাস্যকর। সে মনে করে এই গাড়িটাই তার অফিস, তার চেম্বার। স্যারের অফিসের চেম্বারটা যেমন কাঁচ ঘেরা, তারটাও তেমনি। অফিসে স্যারের জন্য আলাদা চেয়ার, তার জন্যেও গাড়িতে আলাদা সিট। স্যারের অফিস চালানোর জন্য নানা অফিসার, পিওন, দারোয়ান কত কিছু। তার গাড়ি চালানোর জন্য স্টিয়ারিং, গিয়ার, ব্রেক, হর্ণ কত কিছু। ভাবতে বেশ লাগে।

স্যারকে নামিয়ে দিয়ে অফিসের পাশের বল্টুর দোকানে ঢুকে ডিম পরোটা আর এক কাপ চা দিয়ে নাস্তাটা সেরে ফেলে। তারপর আয়েশ করে একটা সিগারেট ধরায়। আহ, ভরপেট খাওয়ার পর সিগারেটের ফিলিংসটাই অন্য রকম। নিজেকে মনে হয় রাজা-বাদশা। ভোর বেলার দৌড় শুরুর পর থেকে এই নাস্তা খাওয়া আর সিগারেট শেষ করা পর্যন্ত পনের-বিশ মিনিট সময় তার নিজের। তার আগের সময়টা যেন কুকুরের দৌড়। স্যারের ছেলে সায়মনকে নিয়ে রওনা দাও পৌনে সাতটায়। নিকেতনে তার টিউটরের বাসা। ও লেভেল না কি জানি কিসে পড়ে। ঠিক মতো মোচটাও উঠে নাই, কিন্তু এর মধ্যে পেকে ঝুনে এক শেষ। শালা আবার নয়া মজনু। জিনিয়া নামের এক লাইলি জোগাড় করেছে। টিউটরের বাসায় যাওয়ার সময় দুনিয়া ঘুরে সেই মহাখালী ডি.ও.এইচ.এস এর পার্কের সামনে থেকে লাইলিটাকে তুলতে হয়। সেই বেটির কাপড় চোপড়ের কি অবস্থা, ইয়া মাবুদ। এই মেয়ের মা-বাপ কি বেঁচে আছে নাকি বিষ খেয়ে মরে গেছে কে জানে। না তো মেয়ে মানুষের কাপড় চোপড়ের এই অবস্থা হয়? তারপর সারা রাস্তা ধরে পেছনের সিটে বসে চলে রাধা কৃষ্ণের লীলা খেলা। স্যামি প্লিজ, ইয়ু নটি বয়, স্টপ ইট, মাই জিনি জাস্ট ওয়ান্স মোর, আরো কি কি সব ইংরেজি চটর-পটর, সাথে হা হা, হি হি খালি শুনতে পায় গোলাম হোসেন গাড়ি চালাতে চালাতে। রিয়ার ভিউ মিররে তাকাতে ভয় হয়। কি দেখতে কি দেখে ফেলে। বেতমিজ বেশরমের দল। মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করে “পিছনের সিটে কুস্তাকুস্তি বাদ দিয়া গাড়ি ধোয়ার গামছাটা রাস্তার মোড়ে পাইতা শুইয়া পরলেই তো হয়”। সিগারেট টানার সাথে সাথে আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে সে।

দুপুর সাড়ে তিনটা। গুলশান দুই নম্বর মোড়ের কাছে রাস্তার সাইডে গাড়ী পার্ক করা। গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে গোলাম হোসেন। সেই একটার সময় ম্যাডামকে নিয়ে এসেছে। কি নাকি মহিলা সমিতির মিটিং আছে ওনার এখানে। গরমে গা চিটচিট করছে। একফোঁটা বাতাস নেই। একলা একটা সবুজ গাছের ছায়া দূর করতে পারছে না ঢাকা শহরের গরমের দাপট। অথচ গ্রামে যত গরমই হোক, দুপুরে গাছের তলায় মাদুর পেতে শুয়ে পরলেই কাহিনী শেষ। আরামে দুই মিনিটে ঘুম চলে আসে। ছোটবেলার গ্রামের জীবনের কথা মনে পরে যায়। স্কুল শেষে ঘন্টার পর ঘন্টা সরলা নদীতে সব ছেলেরা মিলে দাপাদাপি করে কাটিয়েছে কত গ্রীষ্মের দুপুর। এসব যেন অন্য কোন জন্মের কথা। প্রিয় সরলা নদীই রাক্ষসী হয়ে একদিন খেয়ে নিয়েছে তাদের ভিটে-মাটি। তারপরেও কোন এক অদ্ভুত কারনে তার সুখ স্মৃতির একটা বড় অংশ জুড়ে আছে এই রাক্ষসীটা।

এর মধ্যে দুপুরের ভাতের ক্ষিদেটাও বেশ চাগাড় দিয়ে উঠেছে। অন্যান্য দিন ঘরে গিয়েই খায়। এই চাকরিরটা এটা একটা বড় সুবিধা। স্যারের বাসা থেকে তার ঝিগাতলার বস্তিটা এক হিসাবে কাছেই। দুটো পয়সাও বাঁচে। কিন্তু আজ সে হবার নয়। এদিকে কোন সস্তা হোটেলও নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোতে একবেলা খেতেই নাকি তার আধা মাসের বেতনের সমান পয়সা লাগে। একটা বাদামওয়ালা পেয়ে দশ টাকার বাদাম কেনে। এই বাদাম জিনিসটা বেশ ভালো। পেটও ভরে, পয়সাও বাঁচে। প্রথম বাদামটা খোসা ভেঙ্গে মুখে দিতেই ফোনটা বেজে ওঠে। বউয়ের ফোন।

: আপ্নে কই?

: গুলশানে, কেন?

: মাইয়াডা কয় পেডে নাহি ব্যাতা। শরিলডাও গরম ঠেহে। ইস্কুলে পাডাই নাই।

: প্যাডে ব্যাতা? প্যাডের কুন জায়গায় ব্যাতা? কাইল কি উল্ডা-পাল্ডা কিছু খাওয়াইসিলা? পায়খানা হইসে? কয়বার?

: উল্ডা-পাল্ডা কি খাওয়ামু। রোজদিন যা খায় তাই খাইসে। কয়তো নাভির জাগাত ব্যাতা। পাতলা পায়খানাও হইসে তিনবার মত। কানতাসে। কি করতাম?

: আইচ্চা, অহন আর কি করুম। মতি ভাইয়ের ফার্মেসি থেইকা স্যালাইন আইনা খাওয়াও। দেহ কি হয়।

: আইচ্চা।

ফোন রেখে মনটা খারাপ হয়ে যায় গোলাম হোসেনের। সপ্তাহ দু-এক আগে জ্বর থেকে উঠেছে মেয়েটা। এখনও দূর্বল। তার মধ্যে আবার শরীর খারাপ করলো। মাসেরও শেষ দিকে। টাকা পয়সারও টানাটানি। দশ হাজার টাকা বেতনে ঢাকা শহরে সংসার চালানো বড় দায়। কিন্তু দু’নম্বরি করার কথা ভাবতেও পারে না সে। অনেক ড্রাইভার আছে তেলের পয়সা চুরি করে, কারনে অকারনে গাড়ী ওয়ার্কশপে নিয়ে উল্টা-পাল্টা বিল বানায়। কেউ কেউ আবার ফাঁকতালে ড্রাইভিং শেখায়। তার দ্বারা এসব হয় না। রিজিকের সাথে বেইমানী করার কথা চিন্তাও করতে পারে না। হাজার হোক তার বাবা ছিল গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের হেড মাস্টার। তার লাঠিপেটা খেয়ে নাকি অনেক গাধা-ঘোড়া জজ ব্যারিস্টার হয়েছে। কিন্তু নিজে অকালে মরে গিয়ে ছেলে-পিলেদের ফেলে গেছেন বিপাকে। আর সম্পদ হিসেবে রেখে গেছেন বিবেক আর আদর্শের ভূত। অভাবের ঠেলায় নিজে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ে পেটের দায়ে নেমে পরেছিল রাস্তায়। সাত ঘাটের জল খেয়ে আজ ঢাকা শহরের ড্রাইভার। শুক্রবার বন্ধের দিন করে মোহাম্মদপুর-গুলশান রুটের লেগুনা গাড়ী চালায়। তাতে মাসে হাজার দেড়েক টাকা অতিরিক্ত আসে। কিন্তু কোন শুক্রবারে স্যারের ডিউটি থাকলে তাও বাদ যায়। সবার ছুটি থাকে। তার ছুটি নেই। এই শালার পেট বড়ই হারামী চিজ।

সন্ধ্যা ছ’টা। মতিঝিলে অফিসের সামনে অপেক্ষা করছে গোলাম হোসেন। দেরী হচ্ছে দেখে তাকে চারটায় ছেড়ে দিয়েছেন ম্যাডাম। তিনি বান্ধবীর গাড়ীতে ফিরবেন। সায়মনকে গুলশান থেকে তুলে ধানমন্ডি নামিয়ে সোজা অফিস। অবশ্য ভায়া মহাখালী ডি.ও.এইচ.এস। সেই বেশরম লাইলিকে নামানোর জন্য। এই বেটি সারাদিন সায়মনের সাথে ছিল, তবুও চুলকানি কমে নাই বেহায়াদুটোর। যতক্ষন গাড়ীতে ছিল, সারক্ষনই খুটিনাটি বেলাল্লাপনা চলছিলই।

এর মধ্যে বেশ করেকবার ফোন এসেছে বউয়ের। আসিয়ার ব্যাথা বেড়েছে। খুব কষ্ট পাচ্ছে বুঝি মেয়েটা। স্যালাইনে পায়খানা বন্ধ হয় নাই। বমি হয়েছে, গায় গায় জ্বর। মতি ভাইয়ের ফার্মেসির ডাক্তার রাত সাড়ে ৮টার আগে বসে না। তারও কিছু করার নেই। ছুটি পাওয়া যাবে না। অফিসে আসার পর একবার স্যারকে বলেছিল বাচ্চার পেটে ব্যাথার কথা। তিনি জবাব দিলেন “হজমের সমস্যা হয়তো। তোমার বউকে বল পাড়ার কোন ডাক্তার দেখিয়ে নিতে। আজ বিদেশী ডেলিগেটের সাথে র‌্যাডিসনে ডিনার কাম মিটিং। ছুটি হবে না।“ ডিনার কাম মিটিং এর কথা শুনেই মুখ শুকিয়ে যায় তার। এর মানে রাত ১১টা -১২টার আগে রেহাই নেই।

কোনরকমে গাড়ী বাসার গ্যারেজে পার্ক করে চাবি জমা দিয়ে ঘরের দিকে ছুটতে থাকে গোলাম হোসেন। রাত ১২টা। একটা রিক্সাও পাচ্ছে না। শেষমেষ প্রায় অর্ধেক রাস্তা ছুটে চলার পর একটা রিক্সা পেল। হোটেলের সামনে বসে থাকতে থাকতেই অন্তত ৬-৭ বার ফোন করেছে বউ। মতি ভাইয়ের ফার্মেসির ডাক্তার সাহেব আজ আসতে পারেন নাই, শরীর নাকি খারাপ। খুঁজে পেতে অন্য ডাক্তার দেখাতে হয়েছে। রাত সাড়ে দশটায় ডাক্তারের সিরিয়াল পেয়েছে। ডাক্তার বলেছে এপেনডিস না ক্যাপেন্ডিস কিসের ব্যাথা। হাসপাতালে জরুরি ভর্তি করতে হবে। অপারেশন নাকি লাগবে। বউয়ের সেই সাহস বা বুদ্ধি নেই তাকে ছাড়া হাসপাতালে নেয়ার। চিন্তায় অস্থির হলেও গোলাম হোসেনের সাহস হয় নি হোটেলের ভেতরে মিটিঙে ব্যস্ত স্যারকে ফোন দেয়ার। সীমাহীন অস্থিরতার মাঝে নিজের কপালকে গালি দিতে দিতে শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করেছে স্যার যাতে একটু জলদি বের হয়। ঘরে ফিরে দেখে আট বছরের ছোট্ট মেয়েটা কাটা মুরগির মত ছটফট করছে আর চিৎকার করছে। ফার্মেসির মতি ভাই সহ আরো দু-চারজন আশেপাশের পরশী আছে ঘরে। কিন্তু গোলাম হোসেন না থাকাতে কিনা কে জানে, সাহস পাচ্ছিল না হয়ত। সবাই অপেক্ষা করছিল। মতি নিয়ে এসেছে দুই হাজার টাকা। কোনমতে ঘর হাতড়ে যা টাকা-কড়ি পেল কুড়িয়ে নিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে ছুটলো সে। শ্যামলী শিশু হাসপাতালে নিতে হবে। ছুটতে ছুটতে রাস্তার মাথায় আসে সে সি.এন.জি ট্যাক্সির খোঁজে। পেছনে মতি ভাই। কিচ্ছু নেই। না রিক্সা, না সি.এন.জি। হাসপাতাল মনে হচ্ছিল বহু দূর। সময় বয়ে যাচ্ছে। বাচচাটার বুঝি আর কাঁদার শক্তিও নেই। বাপের বুকে মাথা এলিয়ে পরে আছে আর গোঙ্গাচ্ছে। একটাই আশা, বাবা চলে এসেছে। সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু গোলাম হোসেনের মাথা ঠিক নেই। জানে না কিভাবে হাসপাতালে নেবে মেয়েকে। হঠাৎ কি মনে হলো, মেয়েকে মতি ভাইয়ের কোলে তুলে দিয়ে সে ফোনটা বের করে স্যারের নাম্বারে ফোন করলো। বেশ কিছু সময় রিং হওয়ার পর তার স্যার ফোন ধরলেন ঘুম জড়ানো কন্ঠে।

: স্যার আমি গোলাম হোসেন।

: বুঝতে পারছি, কি ব্যাপার এত রাতে? কি সমস্যা?

: স্যার আমার মেয়েটার অবস্থা খুবই খারাপ। হাসপাতালে নিতে হইবো। এপেন্ডিস হইসে। খুব জরুরী। গাড়িটা যদি দিতেন। রাইতে কিচ্ছু পাই না।

অপর প্রান্তে কিছুক্ষন নিরবতা।

: স্যার, স্যার?

: এয়ে, ইয়ে, হোসেন, মানে…… এই এত রাতে তো খুব রিস্কি। গাড়ী ছিনতাই মিনতাই হয়। বুঝই তো। খুব রিস্ক। মানে…এই তুমি এক কাজ কর, একটা সি.এন.জি ফি.এন.জি কিছু পাও নাকি দেখ, হ্যাঁ? অসুবিধা নেই, ভাড়া সকালে আমার কাছ থেকে নিয়ে নিও, কেমন? আর হ্যাঁ, আমাকে জানিও কি অবস্থা। খুব টেনশন হচ্ছে তোমার বাচ্চাকে নিয়ে। দরকার হলে কালকে কিছু এডভান্স নিয়ে নিও, ঠিক আছে? রাখি।

স্যার লাইন কেটে দিলেন। কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা। গালিটা কাকে দিল কে জানে। নিজের নিয়তিকে নাকি মালিককে। ঠিক সে সময় ঘ্যাঁচ করে পাশে এসে দাড়ালো একটা রিক্সা। সুরুজ আলি। ফুল টাইম রিক্সাচালক আর শুক্রবারে গোলাম হোসেনের পার্ট টাইম লেগুনা হেল্পার। সারাদিন রিক্সা চালিয়ে ফিরছে। নিজের রিক্সা।

: বেডির কি হইসে হোসেন বাই?

: এপেন্ডিস হইসে বাই, ব্যাতায় আমার বেডি মইরা যায় বাই। শিশু হাসপাতাল যামু। কিচ্ছু পাই না। স্যাররে কইসিলাম, গাড়িডা দ্যান। হারামজাদা আমারে সি.এন.জি ভাড়া সাদে। আমার মাইয়াডারে বাচাও বাই।

: কি কও, বাঁচামু মানে। গরিবের ভরসা আল্লাহ্‌। ওই মতিবাই রিক্সাত উড। আল্লাহ্‌র উপ্রে তওয়াক্কল রাখো। আমার পঙ্খীরাজে উড়ায়া লয়া যামু চক্ষের পলকে। বাইচ্চারে লইয়া শক্ত কইরা বইসো কইলাম।

ইয়াআআ আলিইইই বলে রিক্সা টান দেয় সুরজ আলি। গভীর রাতের পীচঢালা পথে ঝড় তুলবে আজ তার পঙ্খীরাজ।

১৭ thoughts on “পঙ্খীরাজ

  1. মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করে

    মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করে “পিছনের সিটে কুস্তাকুস্তি বাদ দিয়া গাড়ি ধোয়ার গামছাটা রাস্তার মোড়ে পাইতা শুইয়া পরলেই তো হয়”।

    চড়টা খুব শক্ত ছিল ইকরাম ভাই… :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:

    খুব স্পষ্টভাবে সত্যকথনের জন্য আপনাকে গোলাপ… :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :মাথানষ্ট: :ধইন্যাপাতা: :থাম্বসআপ: :বুখেআয়বাবুল:

  2. খুব ভালো লাগলো,কল্পনায় কিছু
    খুব ভালো লাগলো,কল্পনায় কিছু চরিত্র একেঁ ফেলেছিলাম নিজের অজান্তে। :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

  3. দারুণ! খুব সূক্ষ্মভাবে একটা
    দারুণ! খুব সূক্ষ্মভাবে একটা ম্যাসেজ দিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হল যাদেরকে খোঁচাটা দিয়েছেন এরা এতোই মূর্খ আর আত্মকেন্দ্রিক যে হয়তো এরা আপনার লেখার মানেই ধরতে পারবে না।
    লেখককে অভিনন্দন।

  4. গল্পের নির্মান ভালো হয়েছে।আমি
    গল্পের নির্মান ভালো হয়েছে।আমি আমার কথা বলতে পারি,বড় গল্প আমি লিখতে পারিনা।খেই হারিয়ে ফেলি।আপনার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি।আরো আরো ভালো গল্প চাই।

  5. ভালো লাগলো স্যার। তাছাড়া
    ভালো লাগলো স্যার। তাছাড়া গোলাম হোসেনের অভিজ্ঞতা অবস্থার ফেরে আমাদেরও হয়। শুধু উক্ত হয় না, উহ্য রাখি বলে। উহ্য অসহায়ত্বের স্বাদ দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *