সামরিক আদালতে প্রদত্ত তাহেরের জবানবন্দি (PART 02)

সামরিক আদালতে প্রদত্ত তাহেরের জবানবন্দি (PART 01)


সামরিক আদালতে প্রদত্ত তাহেরের জবানবন্দি (PART 01)

সুবেদার আফতাব আমাকে জানালো, সে রৌমারি থানার এক বিস্তীর্ণ এলাকা মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছে। ষোলই ডিসেম্বর পর্যন্ত এই এলাকাগুলো মুক্তাঞ্চল ছিল। যুদ্ধ চলাকালীন পুরো সময়টাই সে ভারতের অভ্যন্তরে ঘাঁটি স্থাপন করতে অস্বীকার করে আসছিল। সে রাত আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলে কাটিয়ে দিলাম। দেখলাম সে খুব সহজেই মানুষের নেতৃত্বের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিতে পেরেছে। তার সামনে নিজেকে বড়ো ছোট লাগলো।
সুবেদার বললো সে যে কোন কিছু করার জন্য প্রস্তুত আছে। ওদের অবস্থানের কিছু দূরে এক চরে পাকিস্তানিদের এক ঘাঁটি ছিল। আমি তখন তাদের তাড়িয়ে দেয়ার জন্য একটা আক্রমণের প্রস্তাব দিলাম। দুই শিবিরের মধ্যে একটা নদী। পাকিস্তানিরা যে চরে অবস্থান নিয়েছিল তা একটা খালের মাধ্যমে দু ভাগে ভাগ হয়ে আছে। আমি আর সুবেদার একটা নৌকায় করে চরে পৌঁছলাম। দেখি পাকিস্তানিরা চরের অন্য প্রান্তে। এই চর ছিল ঘন কাশবনে ঢাকা। আমি পরিকল্পনা করলাম একদল যোদ্ধা রাতে নদী পার হয়ে খালের পাশের কাশবনে অবস্থান নেবে। পরদিন ভোরে একটা ছোট দল বের হবে পাকিস্তানিদের হাতে তাড়া খাবার জন্য।চারদিনের মধ্যেই সুবেদার আফতাব পরিকল্পনা মাফিক অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।
যা আশা করেছিলাম তাই হলো, পাকিস্তানিরা ভোরবেলার দলটাকে পিছু ধাওয়া করলো। এভাবে ওদের মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যু ফাঁদের আওতার ভেতরে নিয়ে আসা হলো। প্রথম দফা আক্রমণেই পাকিস্তানিদের বেশ বড়োসড়ো ক্ষতি হলো। ওরা দু’বার আক্রমণ করলো, দু’বারই আক্রমণ প্রতিহত হওয়ায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তারা পালিয়ে গেল। এভাবেই রৌমারি থানা সহ বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা আমাদের দখলে আসে।
এরপর আমরা চিলমারীর ওপর নজর দেই। চিলমারী যুদ্ধ এক পরিচিত সংঘর্ষ। আমি এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। তখন মাঝ সেপ্টেম্বর। একরাতে বারো শ’ মুক্তিযোদ্ধা ব্রহ্মপুত্র নদী পাড়ি দিল। আমাদের লক্ষ্যস্থল পাহারায় ছিল দুই কোম্পানি পাকিস্তানি নিয়মিত সৈন্য। এছাড়া অজস্র রাজাকার তো ছিলই। আমরা ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত চিলমারী বন্দরকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলাম। আর প্রচুর গোলাবারুদ ও যুদ্ধবন্দি নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। এটা ছিল এক দুঃসাহসিক আক্রমণ। এমন নজির যুদ্ধের ইতিহাসে কমই আছে।
সেপ্টেম্বর মাস থেকেই রেডিওতে প্রচারিত স্বাধীনতা যুদ্ধ সংক্রান্ত সংবাদের বেশীর ভাগেই থাকতো আমাদের সেক্টরের খবর। এমনকি বিখ্যাত আমেরিকান সাংবাদিক জ্যাক অ্যান্ডারসনও আমাদের এলাকার অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এই বলে- কামালপুরের ঘাঁটি পতনের মানেই হচ্ছে পাকিস্তানিরা এই যুদ্ধে হেরে গেছে।কামালপুরে যুদ্ধ পরিচালনার সময় আমার একটা পা হারাই। আমার সেক্টরের ছেলেরাই সবার আগে ঢাকা পৌঁছেছিল।
স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা বলতে যেয়ে অবশ্যই আমাদের মুক্তিসেনাদের দেশপ্রেম, বীরত্ব ও আনুগত্যের উল্লেখ করতে হয়। এরাই জাতির সেরা সন্তান। এছাড়াও গ্রামের সব গরীব গ্রামবাসীদের কথাও বলতে হয়। এরা আমাদের দিয়েছে খাদ্য ও আশ্রয়। শত্রু-সনার অবস্থান সম্পর্কে তারা আমাদের সব সময় খবর দিয়েছে। এরা ছিল আমাদের সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণার উৎস। আমার হাতে তো তাও একটা অস্ত্র ছিল। এদের কাছে কিছুই ছিল না।আমাদের সাহায্য করতে যেয়ে এরা পাকিস্তানি বুলেটের শিকার হয়েছে। তাদের ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, তাদের স্ত্রী-মা-বোনদের সম্মানহানি করা হয়েছে। এরাই ছিল আসলে সবচেয়ে বেশী সাহসী। এদের কথা আমি সব সময় মনে রাখবো।
ষোলই ডিসেম্বরের মধ্যেই বাংলাদেশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে চলে যায়। এতে আশ্চর্যের কিছুই ছিল না।আমাদের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের অসাবধানী, অযোগ্য ও দেউলিয়া আচরণের জন্যই প্রবাসী সরকার সম্পূর্ণভাবে অকেজো হয়ে পড়েছিল। এর ফলে ভারতীয় হস্তক্ষেপের একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়। ঘাঁটিগুলো ভারতে থাকায় ও ভারতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে আমাদের নিয়মিত সৈন্যরা ছিল মানসিকভাবে দুর্বল ও হীনমন্য। বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে পা দেয়া মাত্রই ভারতীয় সৈন্যরা বিজিত সম্পদের ওপর বিজয়ী বাহিনীর মতোই হাত বসালো।
জনাব চেয়ারম্যান ও ট্রাইব্যুনালের সদস্যবৃন্দ, আমি এখানে গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করতে চাই একজনের কথা।ভারতীয় সৈন্যদের লুট-পাটে বাধা দেওয়ার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন এই কমান্ডিং অফিসার। তিনি মেজর এম. এ. জলিল; নয় নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক। তিনিও এই মামলায় একজন সহ-অভিযুক্ত। জলিলকে এর জন্য যথেষ্ট খেসারত দিতে হয়েছিল। দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে তাঁকে দীর্ঘদিন করা প্রাচীরের অন্তরালে কাটাতে হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাবার পর মেজর জলিল আরেকটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। তরুণ বিপ্লবীদের প্রতিনিধি আ.স.ম.আব্দুর রব (যিনি এ মামলায় একজন সহ-অভিযুক্ত)-এর সহযোগিতায় মেজর জলিল বাংলাদেশের প্রথম বিরোধী দল জাসদ গঠন করেন। এখানে উল্লেখ্য আ.স.ম.আব্দুর রব সেই ব্যক্তি যিনি প্রথম ঐতিহাসিক বটতলা সমাবেশে একাত্তরের দোসরা মে তারিখে আমাদের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে উল্লেখ করছি, মেজর জলিলকে যে ট্রাইব্যুনালে বিচার করে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল আমি ছিলাম সেই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান।
এ মামলায় অভিযুক্ত আমার ভাইদের সম্পর্কে আমি এখন দু’একটি কথা বলতে চাই। মনে হয় ইচ্ছা করে আমাদের পুরো পরিবারটাকে ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে আমার বড় ভাই ফ্লাইট সার্জেন্ট আবু ইউসুফ খান সৌদি আরবে; সৌদি বিমান বাহিনীতে ডেপুটেশনে ছিলেন। যুদ্ধ বাঁধলে পালিয়ে এসে তিনি আমাদের সেক্টরে যোগ দেন। এখন শুনতে যে রকম লাগুক না কেন এটাতো ঠিক যে ঐ ঘাঁটিতে তখন আরো অনেক বাঙালি অফিসার ছিলেন, তারা কেউই পালিয়ে এসে যুদ্ধে যোগ দেন নি। বরং এরা পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান ও পরে তিয়াত্তর সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। জামালপুরের যুদ্ধে অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য তাকে ‘বীর বিক্রম’ পদকে ভূষিত করা হয়। তিনিই প্রথম পাকিস্তানি কমান্ড হেডকোয়ার্টারে পৌঁছান ও জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণ প্রত্যক্ষ করেন। তিনি জেনারেল নিয়াজীর গাড়ীর পতাকার গর্বিত মালিক।আমার বিশ্বাস পৃথিবীতে এমন ভালো লোকের সংখ্যা খুব কম।
আমার ভাই আনোয়ারও এই মামলায় অভিযুক্ত। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক (বর্তমানে অধ্যাপক)-সম্পাদক। যুদ্ধের সময় সে আমার সেক্টরের একজন স্টাফ অফিসার ছিল। সে এমন লোক.একজন মুক্তিযোদ্ধা কিংবা কোন শরণার্থীর প্রয়োজন হতে পারে এই ভেবে সে নিজে দ্বিতীয় কোন শার্ট পর্যন্ত ব্যবহার করতো না। আমার ভাই বাহারের কথাও উল্লেখ করতে হয়। এই সরকারের বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই কিছুদিন আগে আরও তিনজন বীর যুবকের সঙ্গে তাঁকে আমরা হারিয়েছি। সে যুদ্ধ চলাকালে প্রায় দু’শ মুক্তিযোদ্ধার একটি কোম্পানি পরিচালনা করতো। নভেম্বরের মধ্যেই সে নেত্রকোনা মহকুমার (বর্তমানে জেলা) বেশীর ভাগ এলাকা মুক্ত করেছিল। অসাধারণ বীরত্বের জন্য তাকে দু’দুবার বীর প্রতীক পদকে ভূষিত করা হয়। সে-ও এদেশের এক জাতীয় বীর। আমার সর্বকনিষ্ঠ ভাই বেলাল। সেও এই সরকারের ঘৃণ্য চক্রান্তের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। তাঁকেও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাঁকেও দু’বার ‘বীর প্রতীক’ পদকে ভূষিত করা হয়েছে।
আমরা ছয় ভাই ও দুই বোন স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলাম। যুদ্ধে অবদানের জন্য আমাকে’বীর উত্তম’ পদক দেয়া হয়। আমাদের মধ্যে চার জনকে তাদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সামরিক সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল। এসবই ইতিহাসের অংশ। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আমাদের গ্রাম লুণ্ঠিত হয়।আমার বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ও তাঁর ওপর অত্যাচার করা হয়। আমি এখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার কাদেরের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। তাঁর পদক্ষেপে আমার বাবা ছাড়া পেয়েছিলেন।
শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর বাংলাদেশ ত্যাগের পর সবাই আশা করেছিল যে জাতীয় পুনর্গঠনের কাজকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়া হবে, শুরু হবে একটা সুষ্ঠু ও ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ। আমাদের আশা ছিল একটা সমৃদ্ধ স্বনির্ভর বাংলাদেশের, যে দেশে দুর্নীতি ও মানুষে মানুষে শোষণের কোন সুযোগ থাকবে না। যেদেশে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেশরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের সম্পর্ক হবে আন্তরিক। এই সেনাবাহিনী হবে আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই আশা এই স্বপ্ন নিয়েই আমাদের জাতি বারবার এত কঠোর সংগ্রামে নেমেছে। এই আশায় বারবার উচ্চারিত হয়েছে আমাদের আদর্শ ও মূল্যবোধ। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। কেউ বুঝে ওঠার আগেই অধঃপতনের ধারা শুরু হয়ে যায়।
বাহাত্তরের এপ্রিলে পা-এ অস্ত্রোপচারের পর অন্যান্য আনুষঙ্গিক চিকিৎসা শেষে আমি দেশে ফিরে আসি। স্বদেশে ফিরেই আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটান্ট জেনারেল পদে যোগ দেই। আমি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনি, তখন এই কাজ ছিল দুঃসাধ্য। এই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিজেই জানেন কিভাবে আমি অবৈধ কাজ-কর্মের দায়ে ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত ও মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর মতো আরো কিছু উচ্চপদস্থ অফিসারের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেই। অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল এরা অবৈধভাবে টাকা-পয়সা ও সম্পদ কুক্ষিগত করেছেন। পরিস্থিতি তখন ছিল খুবই নাজুক। আমার বিশ্বাস ছিল অফিসারদের অবৈধ উপায়ে অর্জিত যে কোন সম্পত্তি ফেরত দিতে হবে। কেবল তখনই তারা বুক ফুলিয়ে সাহসের সঙ্গে খাঁটি সৈনিকের মতো দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এসে দাঁড়াতে পারবে।
আমি কখনোই এ নীতির প্রশ্নে আপোষ করিনি। কয়েক মাসের মধ্যেই আমাকে কুমিল্লায় অবস্থিত ৪৪তম ব্রিগেডের নতুন অধিনায়ক নিয়োগ করা হয়। কুমিল্লা ব্রিগেডের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর পরই আমার অধীনস্থ অফিসারদের নির্দেশ দেই মুক্তিযুদ্ধের আগে বা পরে অবৈধ উপায়ে যা কিছু অর্জিত হয়েছে তার সব ফিরিয়ে দিতে হবে। এরা আমার নির্দেশ পালন করেছিলেন। আমার হাতে ছিল একদল অফিসার যাদের ছিল একটা স্বচ্ছ ও পরিপূর্ণ নীতিবোধ।এটাকেই আমি নেতৃত্বের স্বরূপ মনে করেছি। আমি সব সময় মানুষের ভালো দিকটা জাগিয়ে তুলতে চেয়েছি,কোন মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেয়াকে আমি ঘৃণা করতাম ও এড়িয়ে চলতাম।
স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং ঢাকা ও কুমিল্লা সেনানিবাসে অর্জিত অভিজ্ঞতা আমাকে উৎপাদন-বিমুখ স্থায়ী সেনাবাহিনীকে একটা বিপ্লবী গণবাহিনীতে পরিণত করতে উদ্বুদ্ধ করে। আমার সৈনিক জীবনে লক্ষ্য করেছি,উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে একটা স্থায়ী সেনাবাহিনী জাতীয় অর্থনীতির ওপর একটি বোঝা স্বরূপ। এ ধরনের সেনাবাহিনী সমাজ প্রগতির পক্ষে একটা বিরাট বাধা। জাতীয় উৎপাদনে এদের কোন অবদানই থাকে না।স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যে নিষ্ঠা, আনুগত্য ও ত্যাগের মনোভাব লক্ষ্য করেছিলাম, তাতে স্বাধীনতা উত্তরকালে একটা উৎপাদন-মুখী বিপ্লবী গণবাহিনী (আর পি এ) গঠন করা অসম্ভব বলে আমার মনে হয়নি। আর এতে আমি সবচেয়ে বেশী উদ্বুদ্ধ হয়েছি।
সামরিক বাহিনীর অনেকেরই এটা জানার কথা যে আমি কুমিল্লা ব্রিগেডকে একটা ‘গণবাহিনী’র মতো করে গড়ো তুলতে চেষ্টা করেছিলাম। মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণকারী সেনাদের নিয়ে একটা শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করতে আমি সব সময় চেষ্টা করেছি। আমার সামরিক সংগঠন প্রক্রিয়ার মূল নীতি ছিল ‘উৎপাদন-মুখী সেনাবাহিনী’।
এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের অফিসার ও সৈনিকরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শ্রমিক-কৃষকের সঙ্গে উৎপাদনে অংশ নেয়। আমরা নিজেরা জমিতে হাল ধরেছি, নিজেদের খাবার উৎপাদন করে নিয়েছি। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে গ্রামের মানুষের বাড়ী গিয়েছি। এটাই ছিল স্বনির্ভর হওয়ার একমাত্র পথ। আমি যথেষ্ট আনন্দের সঙ্গে স্মরণ করছি কুমিল্লা ব্রিগেডের অফিসারদের কথা, তারা আমার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন ভালোভাবেই। এঁরা আমাদের ইউনিটকে কিছু দিনের মধ্যেই একটা উৎপাদন-মুখী শক্তিতে পরিণত করেন।
কিন্তু বিরোধ দেখা দিল অল্প দিনের মধ্যেই। মুজিব সরকার সেনাবাহিনী গঠনের ব্যাপারটা উপেক্ষা করে কুখ্যাত আধা-সামরিক শক্তি রক্ষীবাহিনী গড়ে তোলায় মন দেয়। ভারতীয় উপদেষ্টা ও অফিসারেরা এই রক্ষীবাহিনী গঠনে সরাসরি জড়িত ছিল। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ ব্যাপারে আমার পূর্ণ বিরোধিতার কথা জানালাম। যুদ্ধের সময় ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত গোপন চুক্তির ব্যাপারেও আমি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিবাদ জানাই।
সেনা সদর দপ্তরে খুঁজলেই আমার প্রতিবাদের দলিল পাওয়া যাবে। এই দুই কারণে আর তাছাড়া বর্তমান প্রচলিত উপনিবেশিক কাঠামোর সেনাবাহিনী থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে আসার ব্যাপারে আমার ঐকান্তিক ইচ্ছার কারণে সরকারের সঙ্গেও সরকারের মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। কিছু দিনের মধ্যেই লে: কর্নেল জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে সরকারের মত বিরোধ দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীতে থেকে সরে আসাটাই প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ালো। বাহাত্তরের নভেম্বর লে: কর্নেল জিয়াউদ্দিন ও আমি সেনাবাহিনী থেকে সরে আসলাম। আমরা দু’জন নিজেদের পথে এগিয়ে গেলাম, পছন্দমত রাজনীতি বেছে নিলাম। যখনই সম্ভব হতো আমরা পরস্পরের খোঁজ-খবর নিতাম আর ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে একে অন্যকে অবহিত করতাম।
১৯৭৩ সালে আমি বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ড্রেজার সংস্থার পরিচালকের পদে একটা চাকুরী নেই। আমি যে সময় দায়িত্ব নেই তখন এই সংস্থা ইতোমধ্যেই আমরা একে কর্মক্ষম করে তুলি। ১৯৫২ সালে সংস্থার জন্ম লগ্নের সময় থেকে আর কখনোই এর আয় অত বেশী ছিল না। সংস্থার একজন পাহারাদার থেকে শুরু করে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পর্যন্ত সবাইকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন আমি কিভাবে এই সংস্থা চালিয়েছি।
(তাহের তাঁর বক্তব্যের এই পর্যায়ে আবার বাধা পেলে বলেন- ‘জনাব চেয়ারম্যান ও মামলার সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, আমাকে সবকিছু বলতেই হবে। তাহলে আপনারা আমাকে আরো কাছ থেকে বুঝতে পারবেন…)
১৯৭৫ সালের পনেরই আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার কি ভূমিকা পালন করেছে তা দেশবাসী সবারই জানা। কিভাবে একের পর এক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছিল ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছিল তার এখন দলিলের বিষয়। এক কথায় বলা যায়, আমাদের লালিত সব স্বপ্ন, আদর্শ ও মূল্যবোধগুলো এক এক করে ধ্বংস করা হচ্ছিল। গণতন্ত্রের অসম্মানজনক কবর শয্যা রচিত হয়েছিল। মানুষের অধিকার মাটি চাপা পড়েছিল। আর সারা জাতির ওপর চেপে বসেছিল এক ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র।
ফ্যাসিবাদী নির্যাতনের গর্ভে ধীরে ধীরে জন্ম নিলো ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণ প্রতিরোধ আন্দোলন। এটা খুবই দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক যে এ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের অন্যতম প্রধান পুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান শেষ পর্যন্ত একনায়কে পরিণত হয়েছিলেন। অথচ মুজিব তাঁর সংঘাতময় রাজনৈতিক জীবনে কখনো স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে আপোষ করেন নি। তিনি ছিলেন এককালে আমাদের গণতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক। অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও তিনিই ছিলেন একমাত্র নেতা যিনি জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন, জনগণের মধ্যে তাঁর ব্যাপক ভিত্তি ছিল। প্রতিদানে জনগণ তাঁকে তাদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছিল।জনগণই মুজিবকে স্থান এনে দিয়েছিল, বহুগুণ করে তাঁকে নায়কের প্রতিমূর্তি দিয়েছিল। আসলে জনগণ তাদের নেতা হিসেবে মুজিবকে তাঁদের মন মতো করে গড়ে নিয়েছিল। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘মুজিব’ নামটি ছিল রণহুংকার। মুজিব ছিলেন জনগণের নেতা। এক কথা অস্বীকার করার অর্থ সত্যকে অস্বীকার করা। তাই চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ করার অধিকার শুধু জনগণেরই ছিল। সে মুজিব জনগণকে প্রতারিত করে একনায়ক হয়ে উঠেছিলেন তাকে জনগণের শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করাটাই হতো সব থেকে ভালো। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যে জনতা মুজিবকে নেতার আসনে বসিয়েছিল, সেই জনতাই একদিন একনায়ক মুজিবকে উৎখাত করতো। ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত করার অধিকার জনতা কাউকে দেয় নি।

১৯৭৫ সালের পনেরই আগস্ট। একদল সামরিক অফিসর আর সেনাবাহিনীর একটা অংশবিশেষ শেখ মুজিবকে হত্যা করে। সেদিন সকালে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারির এক অফিসার আমাকে টেলিফোন করেন। তিনি বলেন,মেজর রশীদের পক্ষ থেকে তিনি আমাকে টেলিফোন করেন। তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশ বেতার’ ভবনে যেতে বললেন। তিনি আমাকে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের খবরও দিয়েছিলেন। আমাকে জানানো হয় যে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী খন্দকার মোশতাক আহমেদ এই অফিসারদের নেতৃত্বে রয়েছেন।
আমি তখন রেডিও চালিয়ে দেই। জানতে পেলাম শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে আর খন্দকার মোশতাক ক্ষমতা দখল করেছেন। এই খবর শুনে আমি যথেষ্ট আঘাত পাই। আমার মনে হলো এতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে। এমনকি জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। এর মধ্যে আমার কাছে অনেকগুলো টেলিফোন আসতে থাকলো। সবার অনুরোধ ছিল আমি যেন ‘বাংলাদেশ বেতার’ ভবনে যাই।আমি ভাবলাম, যেয়ে দেখা উচিত পরিস্থিতি কি দাঁড়িয়েছে।
সকাল নটায় বেতার ভবনে গেলাম। মেজর রশীদ আমাকে একটা কক্ষে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমি খন্দকার মোশতাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, মেজর ডালিম আর মেজর জেনারেল এম. খলিলুর রহমানকে দেখতে পাই।খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে আমি কিছুক্ষণ আলোচনা করলাম। আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম যে এই মুহূর্তে জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা করাটাই সবচেয়ে জরুরী। মেজর রশীদ আমাকে আরেকটা কক্ষে নিয়ে গেল ও জানতে চাইল আমি মন্ত্রীসভায় যোগ দিতে উৎসাহী কিনা। আমি তাকে পরামর্শ দিলাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে অবস্থা পর্যালোচনা করে এটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে। মেজর রশীদ জোর দিয়ে বললো আমি আর লে: কর্নেল জিয়াউদ্দিন-ই এ অবস্থা সামাল দিতে সক্ষম। সে বললো অন্য কোন বাহিনী প্রধানদের ওপর কিংবা কোন রাজনীতিবিদের ওপর তার কোন আস্থা নেই। আমি তার প্রস্তাব নাকচ করে দিলাম। আমি তাকে পরামর্শ দিলাম বাকশালকে বাদ দিয়ে অন্য সব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে যেন একটা সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হয়।
খন্দকার মোশতাকের সামনে বিবেচনার জন্য আমি বেশ কয়েকটা প্রস্তাব রেখেছিলাম।
(১) অবিলম্বে সংবিধান স্থগিত করণ,
২) দেশব্যাপী সামরিক শাসন ঘোষণা ও তার প্রবর্তন,
৩) দলমত নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি দান,
৪) বাকশালকে বাদ দিয়ে একটা সর্বদলীয় গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন করা,
৫) জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটা জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।
খন্দকার মোশতাক আমার সব কথা মন দিয়ে শুনলেন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেন। রশীদ বারবার জোর দিয়ে বলতে থাকল যে আমি যেন বঙ্গভবনে খন্দকার মোশতাকের শপথ গ্রহণের সময় উপস্থিত থাকি। সকাল সাড়ে এগারোটায় আমি বেতার ভবন ত্যাগ করি গভীর উদ্বেগ নিয়ে। আমার মনে হচ্ছিল মোশতাক তার কথা রাখবেন না, বরং উল্টাপথে এগুবেন। আমার আরো মনে হচ্ছিল এটা শুধু মোশতাক আর সেই অফিসারদের দলের ব্যাপার নয়। এর পেছনে অন্য কিছু বা অন্য কারো হাত রয়েছে। তারাই আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছে।
আমার ধারণাই সত্যে পরিণত হলো। জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে খন্দকার মোশতাক আমার সঙ্গে আলোচিত একটা কথাও উল্লেখ করেন নি। দুপুর বেলায় আমি যখন বঙ্গভবনে পৌঁছলাম ততক্ষণে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষ। সেদিন সন্ধ্যাবেলায় আমি হত্যাকাণ্ডে জড়িত অফিসারদের সঙ্গে আলোচনায় বসি। এদের নেতা ছিল মেজর রশীদ। সেদিন সকালে মোশতাকের কাছে আমি যে প্রস্তাবগুলো রেখেছিলাম এদের কাছেও সেগুলো পেশ করি। সুনির্দিষ্ট কোন পদক্ষেপ নেয়ার আগেই যাতে জরুরি ভিত্তিতে সব রাজবন্দীদের মুক্তি দেয়া হয় সে ব্যাপার আমি বেশ জোর দিয়েছিলাম।
আমাদের আলোচনার শেষের দিকে আলোচনায় যোগ দেয়ার জন্য জেনারেল জিয়াকে ডেকে আনলাম। আমার প্রস্তাবগুলো সবাই সমর্থন করলেন। এ ব্যাপারে সবাই একমত হয়েছিলেন যে সে মুহূর্তে সেটাই ছিল একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। পরদিন মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ ও মেজর জেনারেল এম. খলিলুর রহমানের সঙ্গে আমার অনেকক্ষণ আলাপ হয়। তাঁরাও আমার প্রস্তাবগুলো সঠিক ও গ্রহণীয় মনে করেন।
কিন্তু ষোলই আগস্ট আমি বুঝতে পারলাম মেজর রশিদ ও মেজর ফারুক শুধু আমার নামটাই ব্যবহার করছে, যাতে তাদের নেতৃত্বাধীন সিপাহিরা এই ধারণা পায় যে আমি তাদের সঙ্গে রয়েছি। পরদিন ১৭ আগস্ট এটা পরিઋকার হয়ে গেল যে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান এই ঘটনার নেপথ্য নায়ক। আমি আরো বুঝতে পারলাম যে এর পেছনে খন্দকার মোশতাকসহ আওয়ামী লীগের উপরের তলার একটা অংশও সরাসরি জড়িত। এই চক্র অনেক আগেই যে তাদের কর্মপন্থা ঠিক করে নিয়েছিল সেটাও আর গোপন রইল না। সেদিন থেকেই আমি বঙ্গভবনে যাওয়া বন্ধ করে ও এই চক্রের সঙ্গে সব যোগাযোগ ছিন্ন করি।
জেনারেল ওসমানীকে খন্দকার মোশতাকের সামরিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছিল। তিনি আমর সঙ্গে সব সময়ই যোগাযোগ রক্ষা করতেন, তাঁর সঙ্গে প্রায়ই আমাকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। তিনি সব সময় লে: কর্নেল জিয়াউদ্দিনের খোঁজ খবর জানতে চাইতেন ও তার সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করতেন।মজিব সরকার জিয়াউদ্দিনের ওপর মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছিল। আমি তাঁকে বলেছিলাম, আগে এই পরোয়ানা উঠিয়ে নিয়ে তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দিতে হবে। তাহলেই শুধুমাত্র জিয়াউদ্দিন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারেন।
সেপ্টেম্বরের শেষে দিকে মেজর রশীদ রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটা প্রস্তাব আনলেন। আমি আর লে: কর্নেল জিয়াউদ্দিন একটা রাজনৈতিক দল গঠন করবো; আনুষঙ্গিক সব খরচ বহন করবেন তিনি। আমি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করি। তাকে জানিয়ে দেই যে সব রাজনৈতিক বন্দিদের অবশ্যই মুক্তি দিতে হবে। এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে মোশতাকের কোন রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল না।সেনাবাহিনীতে একটা ছোট অংশ বাদে অন্য কোথাও তার কোন সমর্থন ছিল না, সাধারণ মানুষের মধ্যেও তার সমর্থন ছিল না।
আসুন, আমরা মোশতাক সরকারের কথায় ফিরে আসি। মোশতাক সরকার জনগণকে মুজিব সরকারের চাইতে কোন ভাল বিকল্প উপহার দিতে পারে নি। পরিবর্তন হয়েছিল শুধু এই, রুশ-ভারতের প্রভাব বলয় থেকে মুক্তি হয়ে দেশ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষপুটে ঝুঁকে পড়েছিল। এ ছাড়া দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ছিল আগের মতোই।সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কোন কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হয় নি। অন্যদিকে রাজনৈতিক নিপীড়ন আগের থেকেও বেড়ে গিয়েছিল। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অত্যাচারের প্রবৃত্তি যেন দিন দিন বেড়েই চলছিল।জনগণের দুর্ভোগ ও হয়রানি আগের মতোই চলতে থাকে, রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেফতার অব্যাহত থাকে।সত্যিকার অর্থে দেশ তখন একটা বেসামরিক একনায়কতন্ত্র থেকে সামরিক আমলাতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের কবলে পড়ে গিয়েছিল।
মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে। তারা এই অবস্থা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। রুশ-ভারতের চর। জনতার কাছে অগ্রহণযোগ্য অসামাজিক শক্তিগুলো পরিস্থিতির সুযোগ নেয়ার জন্য ওঁৎ পেতে ছিল। মোশতাক সরকারের ব্যর্থতার সুযোগ আমাদের জাতীয় স্বার্থকে বিপন্ন করার জন্য একটা ষড়যন্ত্র গড়ে ওঠে। এই চক্রান্তের নায়ক ছিলেন উচ্চাভিলাষী ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। প্রতিবিপ্লবী ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পঁচাত্তরের তেসরা নভেম্বর খালেদ মোশাররফ ক্ষমতায় আসেন।
সেদিন আমি অসুস্থ, আমার নারায়ণগঞ্জের বাসায় বিছানায় পড়ে ছিলাম। ভোর চারটার দিকে টেলিফোন বেজে উঠল। ওপারে ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। আমার সাহায্য তার খুব দরকার। কিন্তু কথা শেষ হলো না, লাইন কেটে গেল। সেদিন বেশ কিছু সিপাহি, এন.সি.ও. ও জে.সি.ও. আমার নারায়ণগঞ্জের বাসায় এসে হাজির হন। তাদের সবার সঙ্গে কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না, কেবল তাদের কয়েকজনের সঙ্গে আমার শোবার ঘরে কথা বলেছিলাম। তারা আমাকে জানালো যে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পেছনে ভারতীয়দের হাত রয়েছে। বাকশাল ও তাদের সহযোগীরা ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে নেমেছে। তারা আমাকে আরো জানালো যে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও অন্যান্য কোরের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোন মুহূর্তে গোলাগুলি শুরু হতে পারে।
আমি তাদেরকে শান্ত থাকতে ও সৈন্যদের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করে পরিস্থিতি সম্পর্কে সবার মতামত জানার জন্য পরামর্শ দেই। এ ছাড়া আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব বিপন্নকারী যে কোন ধরনের তৎপরতার বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে বলে দেই। আমি তাদেরকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলাম, সশস্ত্র বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের কর্তব্য হলো সীমান্ত এবং প্রজাতন্ত্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা। আমাদের মতো সমাজে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে নাক গলানো সশস্ত্র বাহিনীর কর্তব্য নয়। অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মূলে রয়েছে উচ্চাভিলাষী অফিসারদের ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্ব। এসব অফিসার তাদের নিজ স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। আর তাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তারা সাধারণ সৈন্যদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। দেশ কিভাবে পরিচালিত হবে তার চূড়ান্ত রায় দেবার মালিক হচ্ছে জনসাধারণ। আমি সৈন্যদের আরো বললাম কোন অবস্থাতেই যেন তারা নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি শুরু না করে। আমি তাদের বরং ব্যারাকে ফিরে যেতে বললাম। বললাম যে জনমানুষের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের প্রয়োজনে যে কোন মুহূর্তে একসঙ্গে আঘাত হানাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ক্ষমতা লোভী সামরিক ব্যক্তিদের উচ্চাভিলাষ গুড়িয়ে দেবার এটাই ছিল একমাত্র পথ।
তেসরা নভেম্বরের পর কি ভয়ার্ত নৈরাজ্য জনক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে এ জাতির জীবন অতিবাহিত হচ্ছিল তা সবারই জানা। কিভাবে আমাদের জাতীয় আত্মসম্মানবোধ লঙ্ঘন করা হচ্ছিল তার নিশ্চয় বিস্তারিত বিবরণের দরকার পড়ে না। এটা সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে খালেদ মোশাররফের পেছনে ভারতীয়দের হাত রয়েছে। একদিকে যখন দেশের এই সার্বভৌমত্ব-সংকট অন্যদিকে ঠিক তখনই রিয়ার-অ্যাডমিরাল এম এইচ খান আর এয়ার ভাইস-মার্শাল এম জি তাওয়াব খালেদ মোশারফকে মেজর জেনারেলের ব্যাজ পরিয়ে দিচ্ছিলেন। সে ছিল এক করুণ দৃশ্য। এসব নীচ লোকদের আমি করুণা করি। এই কাপুরুষগুলো যখন হাঁটু গেড়ে জীবন ভিক্ষা করছিল তখন আমাকে জাতির উদ্যম ও মনোবল সমুন্নত রাখতে কাজে নামতে হয়েছিল।আর জিয়াউর রহমান? সে তখন খালেদের হাতে বন্দি, অসহায়ভাবে ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছিল। তাওয়াব ও খানেরা তখন কোথায় ছিল? তারা তখন তাদের নতুন দেবতার বুট লেহনে ব্যস্ত। এই সব কাপুরুষদের এদেশের সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত রাখা আমাদের শোভা পায় না।চৌঠা নভেম্বর বিকেলে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে আমার কাছে খবর পাঠানো। জিয়ার অনুরোধ ছিল আমি যেন সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে আমার প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তাকে মুক্ত করি ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করি। আমি তাকে শান্ত থাকতো ও মনে সাহস রাখতে বলেছিলাম। আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে ও সব ধরনের অপকর্মের অবসান ঘটানো হবে। এদিকে সেনাবাহিনীর সজাগ অফিসার ও সৈন্যরা আমাকে বিশ্বাসঘাতক খালেদ মোশাররফ চক্রকে উৎখাত করার জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিতে অনুরোধ করে আসছিল। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী তাগিদ এসেছিল সিপাহীদের বিশেষ করে এন. সি.ও. আর জে. সি. ও’দের কাছ থেকেই।
সৈন্যদের মধ্যে ব্যাপক যোগাযোগ, আলোচনা ও মত বিনিময়ের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়। ছয় নভেম্বর আমি সৈনিকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে রাখলাম। ঢাকা সেনানিবাসের সব ইউনিট প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সবাইকে সজাগ থাকতে ও পরবর্তী নির্দেশের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলে দেয়া হলো।ছয়ই নভেম্বর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সবাইকে সতর্ক করে দেয়া হয়। সাতই নভেম্বর ভোর রাত একটায় সিপাহি অভ্যুত্থান শুরু হবে। আমাদের সিদ্ধান্তগুলো ছিল-
১) খালেদ মোশাররফ চক্রকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা,
২) বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা,
৩) একটা বিপ্লবী সামরিক কমান্ড কাউন্সিল গঠন করা,
৪) দলমত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি দান,
৫) রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহার,
৬) বাকশালকে বাদ দিয়ে একটা সর্বদলীয় গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন করা,
৭) বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার বারো দফা দাবি মেনে নেয়া ও তার বাস্তবায়ন করা।
সব কিছুই পরিকল্পনা মাফিক হয়। বেতার, টি.ভি. টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, পোস্ট অফিস, বিমানবন্দর ও অন্যান্য সব গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো প্রথম আঘাতেই দখল করা হয়। ভোর রাত্রে জিয়াকে মুক্ত করে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার বড় ভাই ফ্লাইট সার্জেন্ট আবু ইউসুফ খানের সঙ্গে আমি ভোর তিনটার দিকে সেনানিবাসে যাই। সঙ্গে ছিল ট্রাক ভর্তি সেনাদল।
জিয়াকে আমি তার নৈশ পোশাকে পেলাম। সেখানে ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত সহ আরো ক’জন অফিসার ও সৈনিক ছিল। জিয়া আমাকে আর আমার ভাইকে গভীরভাবে আলিঙ্গনাবদ্ধ করলেন। পানি ভর্তি চোখে তিনি আমাদের তার জীবন বাঁচানোর জন্য কৃতজ্ঞতা জানালেন। তার জীবন রক্ষার জন্য জাসদ যা করেছে তার জন্য জিয়া আমার প্রতি ও জাসদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বললেন আমরা যা বলবো তিনি তাই করবেন। আমরা তখন পরবর্তী করণীয় কাজ নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা করি। তখন ভোর চারটা। আমরা একসঙ্গে বেতার ভবনে পৌঁছাই। পথে আমরা তাৎক্ষণিক কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করি।
[এই পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান তাহেরকে বাধা দেন। বিচার কক্ষে বাক.বিতণ্ডা শুরু হয়ে যায়। কর্নেল তাহের বলেন- ‘আমার যা বলা দরকার, তা আপনাদের শুনতেই হবে। নয় আমি আর কোন কথা বলবো না।ফাঁসি দিন… এখনি ফাঁসি দিন… আমি ভয় পাই না। কিন্তু আমাকে বিরক্ত করবেন না। … কি যেন বলছিলাম শরীফ?’ (শরীফ চাকলাদার বিবাদী পক্ষের একজন সহকারী কৌশলী) এই বলে তাহের আবার শুরু করলেন।]

২১ thoughts on “সামরিক আদালতে প্রদত্ত তাহেরের জবানবন্দি (PART 02)

  1. তাহেরের জবান বন্দী সম্পূর্ণ
    তাহেরের জবান বন্দী সম্পূর্ণ টাই গুরুত্বপূর্ণ সেখানে এভাবে কিছু অংশ বোল্ড করে দিলেন কেন ভাই।
    এই ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান হচ্ছে সেই বাস্টার্ড যে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে জার্মানিতে তে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে ছিলো। রায়ান ভাই আপনি ভাল করেই জানেন জেনারেল জিয়া এই বাস্টার্ড কে নিয়োগ দিয়েছিলো।

    1. কিরণ ভাই, আমাকে মাফ করবেন।
      কিরণ ভাই, আমাকে মাফ করবেন। আমি এখানে কোন প্রপাগান্ডা চালাতে আসিনি। পুরোটা একবারে দিতে পারলে জিয়াউর রহমান কি করেছিল সেটাও তুলে দিতে পারতাম।
      যদিও আমি ব্যাক্তিগত ভাবে আওয়ামী লীগ পছন্দ করি না কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে আমি শ্রদ্ধা করি মন থেকেই। তার অশ্রদ্ধা করা আমার উদ্দেশ্য না।
      ওই অংশটুকু অনেকদিন পর পড়ে একটু কৌতূহলী হলাম আমার বন্ধু তারিক লিংকন এই সম্পর্কে কি বলে জানার আশায়। আর কিছু না।
      আর তাছাড়া ইস্টিশন কেমন যেন ঝিমিয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। সম্ভবত ভিলেনের অভাবে। দেখা যাক ভিলেন হিসেবে আমি কতদুর যেতে পারি। :চশমুদ্দিন:

      1. ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে সামরিক
        ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে সামরিক আদালতে বিচারে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়া হয়। এর বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে করা রিট মামলায় হাইকোর্ট ওই রায় বাতিল করে এ রায় দেন ২০ মে সোমবার ২০১৩ তে…

        মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহেরের সামরিক আদালতে গোপন বিচার বাতিল করে দিয়ে হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে ওই বিচারকে একটি ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে আদালত কর্নেল তাহেরকে শহীদের মর্যাদা দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

        এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান বলেন, ‘সামরিক আদালতে বিচারের ঘটনা এবং এর প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখার জন্য আদালত সরকারকে একটি তদন্ত কমিটি গঠনেরও নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ করেছেন আদালত।’
        ‘শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গেও জিয়াউর রহমান যুক্ত ছিলেন এমন পর্যবেক্ষণও উঠে এসেছে আদালতের এ রায়ে।’

        তাছাড়া হাইকোর্ট ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ বলে রায় দেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বিচারপতি এবিএম খায়রম্নল হক ও বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। সে দিনই রায় স্থগিতের আবেদন জানায় তৎকালীন বিএনপি সরকার।
        হাইকোর্টের রায়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম এবং জিয়াউর রহমানের শাসনকে বে-আইনী ঘোষণা করা হয়। হাইকোর্ট আলোচিত ঐ রায়ে বলেছিল, সামরিক আইন সামগ্রিকভাবে অবৈধ ও অসাংবিধানিক এবং সামরিক আইনের অধীনে করা সব কার্যক্রম আইন এবং বিধিও অবৈধ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যনত্ম সরকার পরিবর্তন সাংবিধানিকভাবে হয়নি বলে হাইকোর্টের ওই রায়ে অভিমতে বলা হয়। রায়ের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিএনপি সরকার আপীল করলেও বর্তমান সরকার ঐ আবেদন প্রত্যাহারের আবেদন করে।

        তোর জন্য হুদাই ৩০ মিনিট নষ্ট করলাম!! কোনভাবেই জিয়ার মত ছদ্ম খুনি কে বাঁচাতে পারবি না। সত্যের জয় অনিবার্য… ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬, ২১ বছর অনেক ইতিহাস ঘোলা করেছে বিএনপি-জামাত, এখন সেই ঘোলা জল খাওয়ার সময় হয়েছে!! ভিলেন হওয়ার মতও অবস্থান তোদের নেই রে রায়ান, ইতিহাস প্রস্তুত বদলা নেয়ার বা দেনা শোধ করার জন্য… শুধু দেখে যা জয় বাঙলা বলে বাংলাদেশ সকল মিথ্যা পিছনে ফেলে কীভাবে সামনে এগিয়ে যায়!!!
        ভাল থাকিস… শুভ কামনা রইল…

        1. আশ্চর্য ব্যাপার! জিয়াউর রহমান
          আশ্চর্য ব্যাপার! জিয়াউর রহমান কর্নেল তাহেরকে সরিয়ে দেয়ার জন্যই এই কাজ করেছে কারণ এছাড়া জিয়াউর রহমানের কাছে আর কোন উপায় ছিল না। এটাতো আমি তো আগেই ঝানতাম!এটা বলার জন্য তোর আধা ঘন্টা লাগলো?
          :হাসি: :হাসি: :হাসি:

          প্রসেসরের স্পিড বাড়া আর নতুন কিছু থাকলে বল। উপরে দ্যাখ কর্নেল তাহেরের কিছু কথা বোল্ড করে দিয়েছি…

          আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যে জনতা মুজিবকে নেতার আসনে বসিয়েছিল, সেই জনতাই একদিন একনায়ক মুজিবকে উৎখাত করতো।

          হি হি! কেমন লাগলো এবার?
          জাতি তোর কাছ থেকে জবাব চায়

          1. আবার ত্যানা পেঁচাচ্ছিস!! জনগণ
            আবার ত্যানা পেঁচাচ্ছিস!! জনগণ উৎখাত করা হচ্ছে ১৯৯১ এর টার মত বা ১৯৯৬ অথবা ২০০৬ এর মত, ১৯৭৫ এর মত না!
            বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তরুণ বয়সে ইনুও বাজে কথা বলেছে!! গতকাল সেক্টর-১ এর মুক্তিযুদ্ধা এবং ১৯৭২-৭৫ বাংলাদেশ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক জাসদ ছাত্রলীগের জিএস তাহের-ইনুদের গুণমুগ্ধ সহযুদ্ধা আমার জেঠাত ভাই (বাবার জেঠাত ভাইয়ের ছেলে…) যাকে আমি আমার জন্মের পর ২য় বার দেখলাম তিনি নিজ মুখেই স্বীকার করেছেন তৎকালীন সময়ের তাদের ইমেচিউরড আচরণ জিয়াকে সুযোগ করে দিয়েছে!! কেননা তিনি নিজেও রক্ষীবাহিনীর হাতে ১৯ দিন নির্যাতিত ছিলেন, তিনি ১৯৭৯-এ তিনি কানাডায় চলে যান স্কলারশিপ নিয়ে… তিনি আমার গতকাল সত্য জানার তীব্র আকাঙ্খার মুখে ৩ বারই বলেছেন আমরা বঙ্গবন্ধুকে যথেষ্ট সময় দেই নাই এবং তিনি এও বলেছেন যে বাকশাল ১৯৭১ থেকেই শুরু করা উচিৎ ছিল আরেকটা বিষয় যোগ করেছেন যে বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং বঙ্গবন্ধুর আশেপাশের দক্ষলোকের শূন্যতা আর বিপথগামী সেনাকর্মকর্তাদের ক্ষমতা লোভ দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে…

            তোর জন্য ডার্ক নাইট থেকে একটা কোটঃ
            “I just did what I do best. I took your little plan and I turned it on itself. Look what I did to this city with a few drums of gas and a couple of bullets. Hmmm? You know… You know what I’ve noticed? Nobody panics when things go “according to plan.” Even if the plan is horrifying! If, tomorrow, I tell the press that, like, a gang banger will get shot, or a truckload of soldiers will be blown up, nobody panics, because it’s all “part of the plan”. But when I say that one little old mayor will die, well then everyone loses their minds!”Joker of ‘Dark Knight (2008)’

            জিয়া হচ্ছে বাঙলার নিকৃষ্টতম ভিলেন…
            এখন জামাত-বিএনপি যা করছে তাও ডার্ক নাইটের আদলে বা কথোপকথনে ব্যাখ্যা কর যায়…

            ‘Introduce a little anarchy. Upset the established order, and everything becomes chaos. I’m an agent of chaos. Oh, and you know the thing about chaos? It’s fair!’Joker of ‘Dark Knight (2008)’

          2. বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তরুণ বয়সে

            বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তরুণ বয়সে ইনুও বাজে কথা বলেছে!

            কথাগুলো যে বাজে কথা ছিল এটা তো আপনার দৃষ্টিভঙ্গি। আমার কাছে বাজে নাও লাগতে পারে। ইনু কি এখনও কোন দিন বলেছেন যে তখন তিনি কম বয়েসের ছিলেন দেখে ভুল বলেছিলেন? প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে এখন কেন ইনু আওয়ামীলীগের সাথে? হ্যাঁ, সেক্ষত্রে উত্তরটা এমন যে, ২০০১-২০০৬ এর বিএনপি-জামাত শাসনামলে জঙ্গিবাদ যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল, যে হুমকি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিল, তখন এটা খুবই জরুরী ছিল যে যে কোন মূল্যে ঐ অপশক্তিতে রাস্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে রাখা। নাহলে কি হতে পারতো নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারেন। এটাই ছিল ইনু ও তার ক্ষুদ্র দলের ঐ ২০০৫-০৬ সালে সারা দেশব্যাপী “ঐক্য নিরাপদ, অনৈক্যে বিপদ”, ঐক্য ঐক্য ঐক্য চাই, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বৃহত্তর ঐক্য চাই” শ্লোগান দিয়ে বেড়ানোর পিছনে মূল কারণ। এবং এখনও বাংলাদেশে সেই শঙ্কা থেকে মুক্ত নয়। তাই প্রয়োজন আরও একবারের জন্য ক্ষমতায় আলীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের থাকা। এটা সম্ভব হলে, ৪২ বছরের লজ্জা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করতে পারলে, হয়তো দেখবেন ইনু আবারও ৭২ সালের ভাষায় কথা বলছেন।

            আপানাকে আর একটা কথা বলি, যারা এক সময় জাসদ রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন দলের জন্য, তারা যখন দলীয় রাজনীটির বাইরে চলে আসেন, তখন তাদের কথাগুলো আপনার আপনার জ্যাঠাতো ভাইয়ের মতোই হয়। আমি কাউকে ছোট করছি না। করলে নিজের বাবা চাচাকেই ছোট করা হবে। কারণ ওইভাবে আমার বাড়িতেই আমি শুনে আসছি অনেক দিন থেকে। আব্বা মারা গেছেন ১৯৯৮ সালে। দুই চাচা এখনও জীবিত আছেন। আব্বা ছিলেন আমার জেলার (বৃহত্তর জেলা) জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, চাচা উত্তরবঙ্গ গণবাহিনীর ডেপুটি কম্যান্ডার আণ্ডার দা কম্যান্ড অফ মার্শাল মণি, ছোট চাচা ঢাকা মহানগর গণবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের সদস্য, যেখানে অন্য সদস্যরা ছিলেন কর্নেল তাহেরের তিন ভাইসহ আরও অনেকে। তো এই তিন ভাইই মুজিব বাহিনীর প্রথম ট্রেনিং প্রাপ্ত ১৯২ জনের তিনজন। আমি তাদের কাছে অনেক অনেক বার এমন শুনেছি। এবং বিশ্বাস করি তারা ভুল বলছেন না। ধন্যবাদ।

          3. ইনু যা বলেছে তা গতকয়েকদিন
            ইনু যা বলেছে তা গতকয়েকদিন আগের ৭১ টিভির টকশোতে সরাসরি রিজভি ইনুকে বলেছিল। তার ওই উচ্চারিত শব্দ যদি সত্য হয়ে থাকে অবশ্যই তা শিষ্টাচার বহির্ভূত এবং বাজে কথা। সদ্য কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা বুয়েটের এক মেধাবী ছাত্রের শিষ্টাচার বহির্ভূত হাশপাশ।। আপনি বলেন তো ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর জাসদ বা বিপ্লবী জাসদ যা যা করেছে তা কোন মেচুওরড দেশে করা কোন মেচিউরড রাজনৈতিক দলের কার্যকলাপ ছিল কিনা? আমিও ১৯৭৩ এর রাজনৈতিক পরিস্থিতি ফিরে আসুক। যেখানে সরকারী এবং বিরোধীদলে থাকবে জাসদ, ন্যাফ (সংযুক্ত), আওয়ামীলীগ এবং সেই দলগুলো যাদের রাজনৈতিক একটি আদর্শিক পরিচয় আছে। এখন ১৯৭২ এর সংবিধানের পক্ষের সকল শক্তিকে এক হতে হবে, এই আদর্শ বিশ্বাসীদের মধ্যে দেশকে এগিয়ে নেয়ার পদ্ধতিতে আদর্শগত মতভেদ থাকতেই পারে কিন্তু সকলেই অসাম্প্রদায়িক-ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র (অর্থনৈতিক মুক্তির অর্থে…) এবং বাঙালী আদর্শে বিশ্বাসীদের আজ এক হতে হবে না হয় ইতিহাসের দেনা শোধ করা সম্ভব হবে না। তৈলাক্ত বাঁশ গাছে চড়ার মত করে ২ কদম এগিয়ে আগামী জামাত-বিএনপি-হেফাজতিতে আগ্রাসী উল্লাসে ৩ কদম পিছাতে হবে।
            একই আদর্শে রাষ্ট্র গড়ার জন্য যারা একমত তাদের সহবস্থান গ্রহণযোগ্য, কিন্তু কোন অবস্থাতেই ভিন্ন আদর্শে বিশ্বাসীদের নিয়ে রাজনৈতিক সহবস্থান কেবলই অরাজকতাপূর্ণ এবং নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। আমার ধারণা এইসব বুঝেই আজ ইনু-মেনন আজ বড় আওয়ামীলীগার (;) ) ।

          4. ৭২-৭৫ এ জাসদের ভূমিকা তো শুধু
            ৭২-৭৫ এ জাসদের ভূমিকা তো শুধু আবেগ দিয়ে বিশ্লেষণ করলে চলবে না। স্বাভাবিক ভাবেই এটা চূড়ান্ত সত্য যে একটা যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের জন্যও প্রয়োজনীয় সময় দরকার। যারা জাসদের এতো দ্রুত বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে ইমম্যাচিওর বা হঠকারী বলে থাকেন, তারা কিন্তু কেন জাসদকে এই পথে যেতে হলো সেই আলোচনায় যেতে চান না। একটা কথা মনে রাখা উচিৎ জাসদ তাদের নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যারা স্বাধীনতার দশ বছর আগে থেকেই একমাত্র স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কখনও গোপনে কখনও প্রকাশ্যে, কখনও ছাত্রলীগের আড়ালে, শ্রমিক লীগ বা আওয়ামীলীগের আড়ালে থেকে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী উত্থানের প্রধান কারিগর ছিলেন। যারা আসলে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ। এখন কেউ যদি এই লোকগুলোর দেশ প্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাহলে কিছু বলার নাই। আর যদি তাদের দেশ প্রেমিক মনে করেন তাহলে তাহলে তাদের উদ্যোগটাও পজেভিটই ছিল মনে করে নিয়ে তৎকালীন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করুন অনেক কিছু সহজ হয়ে যাবে। এখন কথা হচ্ছে কেন জাসদের জন্ম হলো !!

            ১) মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে এবং মুক্তিযুদ্ধ করেছেন দেশের সকল দল মতের মানুষ মিশেই। অস্থায়ী সরকার গঠনের কয়েকমাস পরে মাওলানা ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, মণি সিংহ সাহেবদের মতো প্রবীণ রাজনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছিল তা তো জানেনই। কিন্তু স্বাধীনতার পরে কি হলো? স্বাধীন বাংলাদেশ ভাসানী, মোজাফ্ফর বা মণি সিংদের ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আওয়ামীলীগের সরকারই কন্টিনিউ করতে চাইলো। ওয়াজ ইট রাইট? স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টারা প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা থাকলেন কিন্তু স্বাধীন দেশের মাটিতে এসে তারা অপাংক্তেয় হলেন। তাহলে অস্থায়ী সরকারের উপদেষ্টা কেন বানানো হয়েছিল? তেহাত্তরে নির্বাচন হয়। তার আগে পর্যন্ত কি একটা সর্ব দলীয় জাতীয় সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী সকল দল মতের সমন্বয় সাধন করে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিলে সেটা কি আরও গ্রহণ যোগ্য ও সহজ হতো না? ভাসানী, মোজাফ্ফর, মণি সিং, দুই ছাত্র ইউনিয়নের কি কোনই ভূমিকা ছিলনা মুক্তিযুদ্ধে? নাকি রণাঙ্গনে শুধু আলীগই ছিল? এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামীলীগের সবচাইতে অগ্রসর চিন্তাভাবনার অধিকারী যুব সমাজ এবং ছাত্রলীগের (বৃহত্তর অংশ, শেখ মণি বাদে) পক্ষ থেকে সর্ব দলীয় জাতীয় সরকার গঠনের দাবী উত্থাপন করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য সেটা করা হয়নি বা বঙ্গবন্ধুকে করতে দেয়া হয়নি ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষ থেকে। আর এখান থেকেই শুরু জাসদের জন্ম প্রক্রিয়া। এবং তা জাতীয় প্রয়োজনেই। কিন্তু কি করা হলো? যখন সমাজের প্রতিটা সেক্টরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি চরম আকার ধারণা করলো তখন ১৯৭৪ এর ডিসেম্বরে জরুরী আইন জারী করা হলো। পরের মাসেই বাকশাল গঠন করে সকলের কণ্ঠ রোধ করে দেয়ার চেষ্টা করা হলো। সেই অবস্থায় জাসদের তো আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে গণবাহিনীকেই মূল শক্তি হিসেবে ব্যবহার ছাড়া কোন পথ ছিল না।

            ইনু আসলেই কি বলেছেন আমি জানিনা। আর একটা কথা এখানে আমি ইনুর পক্ষে কথা বলছি না। আমার ব্যক্তি পরিচয় যাই হোক, এখানে আমি উত্তরবাংলা। ইষ্টিশনের একজন নবীন ব্লগার। ইনু ভুল করলে আমি কখনও ছেঁড়ে কথা বলি কি না তাও দেখবেন এমন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। জাই হোক, ইনু কি বলেছেন যেহেতু জানিনা তাই সেদিকে যাবো না। কিন্তু যেহেতু ইনুর শিষ্টাচার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন, তাই তার চাইতেও অনেক বড় নেতা ইনফ্যাক্ট তুলনাহীন নেতা বঙ্গবন্ধুর জাতীয় সংসদের মতো পবিত্র স্থানে তাচ্ছিল্য করে “কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? লাল ঘোড়া দাবড়ায়ে দিছি” এর মতো বক্তব্য কতোটা শালীন ছিল? তখন নির্বাচনে আওয়ামীলীগারদের পক্ষ থেকে, “তোমার আমার ঠিকানা, মতিয়া চৌধুরীর বিছানা” শ্লোগান কিন্তু অহরহই দেয়া হয়েছে। সেই মতিয়া চৌধুরীও কম যাননি, তাই বলে কি তিনি আজ আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতা হতে পারেননি? আমি কিন্তু আগের মন্তব্যেই বলেছি আগামীতে হয়তো আবারও ইনু ৭২ এর মতো সুরে কথা বলতে পারে। রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। থাকলে ইনু এরশাদের সাথে ঐক্য করতেন না।

            দেখি সময় করে ঐ সাড়ে তিন বছরে আওয়ামীলীগ পার্টি কর্মীদের লুটপাট, হত্যা, চোরাচালান এই সব বিষয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করবো। তখন হয়তো এমনও হতে পারে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। ভাবতে শুরু করবেন নাহ, নবীন দেশ গড়ার কাছে প্রাথমিক এবং প্রধান বাঁধাটা এসেছিল সরকার দলীয় পার্টিজান সুবিধাবাদীদের জন্যই। ধন্যবাদ ভাই।

            আলোচনা চলবে। ইষ্টিশন হোক, গঠনমূলক আলোচনা সমালোচনা এবং পরমত সহিষ্ণুতার এক মুক্ত মঞ্চ।

            :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

          5. বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্ম
            বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্ম কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল গুলোর এত প্রসারের অন্যতম বড় কারণ জাসদের মত সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর ব্যর্থতা। তাদের অসময়ের বিপ্লব, দ্বিধান্বিত রাজনৈতিক মতভেদ সুযোগ করে দিয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকে। ব্যর্থতা শুধু আওয়ামীলীগ এর একার না। ছোট হোক বা বড় হোক সবারই দায়বদ্ধতা আছে। সেটা বড় দল হিসাবে শুধু আওয়ামীলীগের একার কেন হবে?

      2. বাহ বেশ মজা তো!! তার মানে
        বাহ বেশ মজা তো!! তার মানে আপনি উল্লিখিত বোল্ড করা অংশটা দিয়েছেন অন্য কারও প্রতিক্রিয়া জানার আশায়! আচ্ছা, আপনি নিজে কি মনে করেন ঐ বক্তব্য সম্পর্কে? কথাগুলো ভুল না সঠিক? নাকি আধা সত্য আধা প্রপাগন্ডা?

        হ্যাঁ রায়ান, আমিও আপনার মতোই। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এক সূতায় বাঁধা, এই চিরন্তন সত্য যে স্বীকার করবে না, তার নিজের অতীত সম্পর্কেই আমি সন্দিহান। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে আমি সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানিয়ে যাবো আমৃত্যু। কিন্তু কথা আছে। আমি শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত ভূমিকার জন্যই বঙ্গবন্ধুকে আমৃত্যু সম্মান জানিয়ে যাবো। কিন্তু যদি মন্তব্য করতে বলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাড়ে তিন বছরের বঙ্গবন্ধুর শাসনামল নিয়ে, তাহলে আমার উত্তর ঐ বোল্ড করা অংশের সাথে অল মোস্ট মিলে যাবে। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু এবং শাসক বঙ্গবন্ধুর মধ্যে ফারাকটা আসমান জমিনের মতো। শাসক বঙ্গবন্ধুর জন্য কষ্ট হতে পারে, কিন্তু শ্রদ্ধাবোধ কখনই নয়।

        একটা ছোট্ট উদাহারন দেই। বরাবর সিরাজুল আলম খান – কাজী আরেফ গ্রুপের প্রস্তাবিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র থিওরী নিয়ে অনেক সমালোচনা করা হয়। বলা হয়ে থাকে ছাত্রলীগের ভাঙ্গন, জাসদের জন্ম এবং বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বিশৃঙ্খলা এবং সর্বশেষ বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পিছনে মূল অনুঘটক ছিল ঐ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র থিওরী। হতে পারে। ধরে নিলাম সেটাই সঠিক। কিন্তু যারা এই অভিযোগ করেন তাদের কাছে আমার ছোট্ট একটা প্রশ্ন। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধু নিজেই তো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেছেন। প্রমাণ ছবিতে, যা ১৯৭২ সালের ১১ মে তারিখের ছাত্রলীগের সভার।

        ১৯৮৯ সালে প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন বাকশালের সেক্রেটারী। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরে অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে রাজ্জাক, মহিউদ্দিন আহমেদ ও আর একজনকে (নাম মনে পড়ছে না) লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে ওনারা আওয়ামীলীগ থেকে বেড়িয়ে বাকশাল গঠন করেন ১৯৮১-৮২ সালে। যেই বাকশাল ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ-সিপিবি-ন্যাপ (মোজাফ্ফর) এর সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে যায় এবং রাজ্জাক সাহেব দুই আসন সহ মোট পাঁচ আসনে জয়ী হয়। একানব্বইয়েও তাই। সেবারেও জয়ী হন রাজ্জাক সাহেব দুই সীটসহ মোট পাঁচ আসন। তারপরেই কিন্তু রাজ্জাক সাহেবরা বাকশালকে আওয়ামীলীগের সাথে একীভূত করে মূল ধারায় ফেরেন। তো সেই ৮৯ সালে রাজ্জাক সাহেব সাংবাদিক মাসুদুল হককে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রদান করেন যা অডিও রেকর্ড করা সাক্ষাৎকার। কথাটা একারণেই বললাম যে সেটা অবিশ্বাস করার কোন উপায় নেই কারণ টেপ করা সাক্ষাৎকার। সেই সাক্ষাৎকারে রাজ্জাক সাহেব অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, যখন মুজিব বাহিনীর মণি গ্রুপ অস্ত্র জমা দেয়া শুরু করে তখন বঙ্গবন্ধুই রাজ্জাককে বলেছিলেন, “সব অস্ত্র জমা দিও না। কিছু অস্ত্র রেখো, সমাজ বিপ্লবের সময় কাজে লাগতে পারে”! এটা একটা পত্রিকার পরে গ্রন্থ আকারেও প্রকাশিত হয়। কিন্তু আব্দুর রাজ্জাক কোন দিন এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেননি। তাহলে?

        উপরের দুই ঘটনাই এটা প্রমাণ করে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু নিজেই তখন দোদুল্যমান অবস্থায় ছিলেন। একবার পক্ষে বলছেন, শ্রেণী সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা। আবার শেখ মণির প্রবর্তিত “বিশ্বে এলো নতুন বাদ, মুজিব বাদ মুজিব বাদ” শ্লোগানেও সমর্থন দিচ্ছেন! এবং আল্টিমেট পর্যায়ে তিনি মুজিববাদকেই গ্রহণ করলেন। অথচ, সেই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র অর্থাৎ কোন পন্থী বা বিদেশ থেকে আমদানী করা সমাজতন্ত্রের থিওরী অনুযায়ী সমাজতন্ত্র না, দেশজ পারিপার্শ্বিকতার ভিত্তিতে বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে, বাস্তবতার নিরিখে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথেই ফিরে গেলেন জানুয়ারী ২৫, ১৯৭৫ সালে, বাকশালের মাধ্যমে। যাকে তিনি দ্বিতীয় বিপ্লব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপায়ন্তর না পেয়েই তিনি সমাজতন্ত্রের পক্ষে ঝুঁকেছিলেন বাকশালের মাধ্যমে।

        এটা অনেক বড় বিষয়, ব্যাপক আলোচনার দরকার। আলোচনা হতেই পারে এবং হলে সব্বাইই লাভবান বই লস করবো না। কিন্তু আলোচনাটা হতে হবে আবেগ বিবর্জিত। বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, আমাদের স্থপতি, অনেক অনেক বড় মাপের মানুষ আমাদের তুলনায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি কোন ভুল করতে পারেন না।

  2. অসাধারণ। এইটাও প্রিয়তে গেল।
    অসাধারণ। এইটাও প্রিয়তে গেল। আওয়ামীলীগের অনুসারিদের একটা সমস্যা হচ্ছে তাঁরা আওয়ামীলীগের ভুলগুলো স্বীকার করতে চান না। গায়ের জোরে দলবাজি করা যেতে পারে কিতু কোন মতামত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। আর জিয়াউর রহমান যে মীর জাফরের পর বাংলার সবথেকে বড় বেঈমান ছিল সেটা স্পষ্ট হচ্ছে।

    1. ভুল গুলো স্বীকার করে এই ভুল
      ভুল গুলো স্বীকার করে এই ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারলে আওয়ামীলীগ আগামী একশ বছর এই দেশের শাসন ক্ষমতায় থাকতো। জামাতের মতো ঘৃণ্য দলের পক্ষ নেয়ার পরেও যে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিচ্ছে এইটা কিন্তু আলীগের ব্যর্থতা। শুধু মাত্র এই অভিযোগের কারণেই তো আগামী পঞ্চাশ বছর বিএনপির রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে পাশে ভেরার কোন সুযোগ ছিল না। কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারলাম কই? তাও আবার সরকারে থেকে।

    2. ভুল কথাটা বলা খুব সহজ। যে দেশ
      ভুল কথাটা বলা খুব সহজ। যে দেশ বিগত ২২৫ বছর শোষিত হয়েছে। লুট হয়েছে তার সম্পদ। তার যুদ্ধের কারণে রাস্তা ঘাট বা সকল প্রকার স্থাপনা ধ্বংস প্রাপ্ত। তখন বিশ্বে খাদ্য উৎপাদন কি পরিমাণ হত তা আপনার জানা আছে। এর মাঝে নয় মাস দেশে কোন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়নাই। কল কারখানা যা ছিল তাও বন্ধ ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্য পীড়িত দেশ অদক্ষ জনবল। হেরে যাওয়ার কারণে শত্রু পক্ষের চক্রান্ত। দেশ সমাজতান্ত্রিক না ধনত্রান্ত্রিক কোন ভাবে পরিচালিত হবে সেটা নিয়ে বাইরের বিশ্বের টানাটানি।
      এইরকম একটা দেশকে চালানো বলা যতটা সহজ কাজে ততটায় কঠিন। সমালোচনা করা যাবে না তা নয় কিন্তু করার আগে এই বিষয় ভাবার আছে।

    1. প্রিয়তে রেখে লাভ নেই। পড়েন
      প্রিয়তে রেখে লাভ নেই। পড়েন পড়েন পড়েন। অনেক কিছু শেখার আছে এই মহান মানুষের কাছ থেকে।
      আর আমি কষ্ট টস্ট কিছু করিনি। কপি পেস্ট করেছি মাত্র।

      1. পড়েছি এবং তথ্যগুলো যেকোন সময়
        পড়েছি এবং তথ্যগুলো যেকোন সময় প্রয়োজন পরতে পারে সেজন্য সহজে খুজে পেতে প্রিয়তেও রেখেছি। 😀

        অনেক কিছু শেখার আছে এই মহান মানুষের কাছ থেকে।

        উনি আমার আইডলদের মধ্যে একজন। :salute: :salute:

  3. আমরা ছয় ভাই ও দুই বোন

    আমরা ছয় ভাই ও দুই বোন স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলাম।

    বাংলাদেশে এমন পরিবার আছে কিনা আমার জানা নেই। স্যালুট তাহেরের পরিবারকে।
    ধন্যবাদ লেখককে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *