কেন আওয়ামী লীগকে ভোট দেব

নির্বাচন আসন্ন। কিন্ত উন্নত গনতান্ত্রিক দেশের মত আমাদের দেশেও এই সময় হিসাব নিকাশের পালা শুরু হওয়ার কথা ছিল। আমি হতাশ এই কারনে যে, সাধারণ জনতাকে নির্বাচনের আগে তুলনামুলক পর্যালোচনায় যেতে দেখছিনা, কিংবা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে যে জনমত জরিপ দেখছি তাতে তুলনামুলক পর্যালোচনার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিনা। ক্ষমতার দাবীদার দলগুলোর মধ্যে আওয়ামীলীগ ছাড়া বিএনপি’ই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল। ১৯৯০ এর পর থেকে নতুন গনতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এই দলটাও তিনবার পুর্ণমেয়াদে ক্ষমতায় ছিল। কিন্ত এই দল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চাওয়া ছাড়া নিজেদের প্রোফাইল তুলে ধরছেন না। একবার শুধু বেগম খালেদা জিয়া ‘নতুন ধারা’র রাজনীতির কথা বলেছেন, কিন্ত বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেননি। কিন্ত, দেখা যাচ্ছে, অনেকেই বিএনপিকে আওয়ামী লীগের চাইতে এগিয়ে রাখছেন শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের ব্যর্থতাগুলোর বিচারে। কিন্ত, নেগেটিভ রাজনীতির অবসান হওয়া দরকার বলে আমি মনে করি।

গত পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগের অনেক সাফল্যের সাথে কিছু ব্যর্থতাও আছে। আবার বিএনপির অনেক ব্যর্থতার মধ্যে কিছু সাফল্যও আছে। আমার কথাতেই পরিষ্কার যে, আমার ব্যক্তিগত অভিমত হল, তুলনামুলক পর্যালোচনায় সরকার পরিচালনায়, আওয়ামী লীগের সাফল্য বিএনপির চাইতে অনেক বেশী। তাহলে কেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচালিত জনমত জরীপে বিএনপি এগিয়ে আছে? এ ব্যাপারে আমার এক মুরব্বীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি তাঁর চকচকে টাকে বেশ কিছু চুল লাগিয়েছেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই আপনি চুল যখন লাগালেনই তাহলে মাথা ভরে লাগালেন না কেন? এখনও আপনাকে মানুষ টেকো বলবে। তিনি বললেন, বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিশক্তি এতই দুর্বল যে, তারা এরই মধ্যে ভুলে গেছে যে আমার মাথায় একটা চুলও ছিলনা! সেদিন এক মিটিংএ আমার এক দীর্ঘ দিনের কলিগ বললো, ‘ করিম ভাই (বানানো নাম) আপনার মাথার সব চুল তো চলে যাচ্ছে! আমাদের রাজনীতি-অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই স্মৃতি শক্তির উপর ভরসা করেই যুদ্ধাপরাধীরা এদেশের রাজনীতিতে জাকিয়ে বসেছিল।

বিএনপি একটা নির্বাচনমুখী দল, কিন্ত এই দল তার অতীত সাফল্য নিয়ে কোন কথা বলছেনা। আপাতদৃষ্টিতে, বেশীরভাগ শিক্ষিত ভোটার (যেহেতু তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে, তারা শুধু শিক্ষিতই না সুশিক্ষিত) দুই দলের মধ্যে তুলনায় না গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ব্যররথতাগুলোকেই বড় করে দেখছে। অনেকেই বলছে, আমরা জানি, বিএনপি এলে এর চাইতে খারাপ ছাড়া ভাল হবেনা। এটাকে, নৈরাশ্যবাদীতা না হতাশা বলবো বুঝতে পারছিনা।

আমি নিজে শেয়ারবাজারে ধরা খাওয়া একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, তাই আমার মনে আমার এই ক্ষতি বেশী বেদনার। কিন্ত আমার কাছেও মনে হয়, আওয়ামী শাষণ আমল তুলনামুলক ভাবে ভাল। পদ্মাসেতু না হওয়া আমার অভ্যস্থতায় কোন বাধ সাধেনি, কারণ পদ্মাসেতু এখনও আমার ব্যবহার করা হয়নি যেহেতু সেতুটা এখনও নির্মিত হয় নি। সোনালী ব্যাংকের ‘হল মার্স কেলেঙ্কারী’ আমাকে ক্ষোভে পোড়ালেও চামড়া পোড়ায়নি, কারণ আমার দেয়া চেক অর্থের অভাবে ফির‍্যে দেয়া হয়নি। ডেসটিনি, ইউনিপের লুটপাট ভুক্তভোগীদের নিঃস্ব করেছে। এগুলো এই সরকারের ব্যর্থতা, কোন সন্দেহ নেই।

কিন্ত এই সরকারের কিছু নীতিগত সিদ্বান্ত আমাদের সুদুরপ্রসারী সাফল্য এনে দিয়েছে, যার ফলাফল আমরা পাচ্ছি এবং পেতে থাকবো। আমি কিছু আলাপ করছি, যেগুলো সচরাচর আলোচিত হয় না। প্রথমটি হল, ব্যপক জনসাধারণকে সুক্ষভাবে আয়কর জালে জড়িয়ে আনা যেটা একটা রাষ্ট্রের উন্নতির প্রধান শর্ত। প্লট, ফ্ল্যাট যা কিছুই কিনতে যান, কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য যাই করতে চান, ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার থাকা এবং আগের বছরের আয়কর সার্টিফিকেট দাখিল করা এখন বেশীরভাগ ক্ষেত্রে বাধ্যতামুলক। এই জন্য ব্যবসায়ী-চাকরীজীবিরা এখন আয়কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। আমাদের দেশে সম্ভবত মাত্র দশ লক্ষ লোক আয়কর প্রদান করে; এই সংখ্যা পঞ্চাশ লাখেও যদি উন্নীত করা যায় তবে পদ্মা সেতুর মত বড় বড় প্রজেক্ট করতে আর বিশ্বব্যাঙ্কের কাছে ধরণা দিতে হবেনা।

দ্বিতীয়তঃ বিদ্যুত উতপাদনে মনোনিবেশ করা। রেন্টাল প্রজেক্টের মাধ্যমে বিদ্যুত উতপাদন নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্ত এ-খাতে তেল আমদানী নিয়ে অত্যধিক ব্যয় নিয়ে যত কথা হয়েছে, তাঁর চাইতেও অনেক বেশি উতপাদন, তথা রপ্তানী বাংলাদেশের হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রমাগত ৬ ভাগ প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি এই বিদ্যুত উতপাদন, তা যে ভাবেই আসুক না কেন। এরই মধ্য ভারত থেকে আর রুপপুর পারমানবিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত এসে পড়লে রেন্টালের উপর নির্ভরশীলতা অনেক কমে যাবে। পাকিস্থানে প্রকাশিত বিভিন্ন ওয়েভ পোর্টাল্ গুলো ভিসিট করলে দেখতে পাবেন তারা বাংলাদেশের থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য তাদের সরকারকে তাগিদ জানাচ্ছে। রেন্টালের বিরুদ্ধে আরেকটা যুক্তি ছিল এটা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে, কিন্ত বাস্তবতা হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ, তথা ষোল বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, এজন্য আবশ্যই বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের ধন্যবাদ দিতে হবে আর দিতে হবে আমাদের গার্মেন্টসের উদ্যোক্তা আর শ্রমিকদের এবং দিতে হবে সরকারকে যারা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সংযোগ দিয়ে আর শ্রমিকের অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে।

তৃতীয়তঃ সমুদ্রসীমা চিহ্নিতকরণ। লক্ষনীয় যে, সমুদ্র জয় বলে আমি উচ্ছাস সৃষ্টি করে পুরোনো বিতর্ক নতুনভাবে উস্কে দিতে চাই না। বিএনপি আমলে এই অচিহ্নিত সমুদ্র অর্বাচীনের মত ব্লক হিসেবে বিদেশীদের বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। যখন কোন কোন তেল গ্যাস কোম্পানী এই ব্লকগুলোতে তেল অনুসন্ধানে যায় তখন তারা প্রতিবেশী মায়ানমারের যুদ্ধজাহাজের কামানের মুখে পড়ে; ফলতঃ ভেস্তে যায় তেল গ্যাস অনুসন্ধান কাজ। কিন্ত আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে, এর প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা রক্ষা করে যে প্রজ্ঞা আর দেশ প্রেমের পরিচয় দিয়েছে তাঁর প্রশংসা আমি অবশ্যিই করবো। তিস্তা নদী আর সীমান্ত চুক্তি ভারত সরকারের সাথে করে সরকার দেশকে একটা দীর্ঘমেয়াদী মুক্তি দিতে যাচ্ছে। দিতে যাচ্ছে বলা এই কারনে যে, ভারতের অভ্যন্তরীণ বাঁধার কারণে এই চুক্তিগুলো এখনো পুর্ণতা পায়নি। তবে, যেহেতু ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই চুক্তিগুলো করেছে, চুক্তির পুর্ণতা দেয়া তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। মজার ব্যাপার হল, বিরোধী দলীয় নেত্রীও এই চুক্তি বাস্তবায়নের দাবী জানিয়েছেন, অথচ এই চুক্তিগুলো যখন স্বাক্ষরিত হয় তখন তিনি এগূলো দেশ বিরোধী বলে বাতিলের দাবী জানিয়েছিলেন। মমতা ব্যানার্জী যখন চুক্তিগুলোকে ভারত-বিরোধী বলে প্রচন্ড বিরোধিতায় নামলেন তখন তিনি বুঝতে পারলেন, সরকার এই চুক্তিগূলো জনস্বার্থেই করেছিলেন, যদিও মুখে তিনি তা কখনও বলেন নি।

খাদ্য উতপাদনে স্বয়ংসম্পুর্ণতার প্রথম দাবী অবশ্যই কৃষকের, যারা মাথার ঘাম বাস্তবিক অর্থেই পায়ে ফেলে খাদ্য উতপাদন করেছে। তবে, সরকার কৃষকের জন্য বিদ্যুত, সেচের পানি, ন্যয্যমুল্যে সার পৌছে দিয়ে এবং খাদ্য আমদানী নিরুতসাহিত করে এই বাম্পার ফলনে কৃষককে সাহায্য করেছে। যারা এই জন্য সরকারকে কৃতিত্ব দিতে চান না, তাদের কাছে প্রশ্ন হবে, সরকারী নীতি ও অন্যান্য সহযোগীতার যদি দরকার না-ই হবে তাহলে বিএনপি আমলে বাংলাদেশ ব্যপক খাদ্য ঘাটতির দেশে পরিণত হয় কেন? শহুরে আমদানী ব্যবসায়ীদের কম দামে চাল আমদানী করতে দিয়ে দেশী কৃষককে নিজের উতপাদিত ধানে আগুন ধরিয়ে দিতে দেখেছি ইতিপুর্বে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে কলঙ্কমুক্ত করেছে। বেনজীর ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তাঁর পিতার হত্যার বিচার না করে একে অমীমাংসিত রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লুতার চেষ্টা করেছে। কিন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির জনককে স্বপরিবারে হত্যার বিচার সুসম্পন্ন করেছেন। বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করতে পারেননি। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা চাট্টিখানি কথা ছিল না, বিশেষতঃ যেখানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধীরা জাকিয়ে বসেছিল এবং মন্ত্রী পদে আসীন হয়েছিল। এই বিচারের দীর্ঘমেয়াদী সুফল যে আমরা পাবো তাতে কোন সন্দেহ নেই।

আমার কাছে সবচাইতে যে ব্যাপারটা প্রশংসনীয় মনে হয়েছে তা হচ্ছে জাতি হিসেবে আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন। ডঃ ইউনুসকে তাঁর মেয়াদান্তে গ্রামীন ব্যাংক থেকে আইনানুযায়ী সরে দাঁড়াতে হয়েছে, যদিও যাওয়ার ইচ্ছা তাঁর ছিলনা। ইউনুস সাহেব যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর সর্বোচ্চ লবি ব্যবহার করে গ্রামীন ব্যাংকে আজীবন থাকতে চেয়েছিলেন এবং এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন বাংলাদেশকে চাপ প্রয়োগ করেন, এমনকি সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার হুমকী প্রদান করেন; কিন্ত সে হুমকীতে কোন কাজ হয়নি, এবং আমরা মাথা উঁচু করেই টিকে আছি। যুদ্ধাপরাধী বিচারে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ বাধা দিয়েছিল এবং শোনা যায় আমাদের শ্রমিকদের পাঠিয়ে দেয়ার হুমকী দিয়েছিল। কিন্ত কেউ যুদ্ধাপরাধীর বিচার ঠেকাতে পারেনি। এসবই আমাদের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির সক্ষমতার প্রতীক, এবং তা নিশ্চয়ই এমনি এমনি আসেনি।

টেলিকম সেক্টরে তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে এই সরকারের আমলে। তৃতীয় প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন, ফাইবার দ্বিতীয় ফাইবার অপ্টিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া, বাংলাদেশের সমস্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ওয়াই ফাই দিয়ে ইন্টারনেটের সাথে ছাত্রদের বিনামুল্যে সনযুক্ত করা তৃতীয় বিশ্বে বিরল। নুন্যতম মুল্যে (৩৩০০০ টাকা) শ্রমিক অভিবাসনের ব্যবস্থা করে, মধ্যসত্বভোগীদের খপ্পর থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণকারী শ্রমিকদের শোষণের হাত থেকে রক্ষা করেছে বর্তমান সরকার।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মাথাপিছু আয় এখন ১১০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে যেখানে বিএনপি আমলে এটা ছিল যথাক্রমে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ৩৭৯ মার্কিন ডলার।

এত কিছুর তুলনামুলক বিচারের পরেও কেন আমি আওয়ামী লীগকে ভোট দেবনা তা আমি বুঝতে পারছিনা; কারণ আমার ভাল যদি আমি না বুঝি তাহলে কে বুঝবে?!!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *