‘ন’ তে নিজামী ; তুই রাজাকার, তুই রাজাকার …



মুক্তিযুদ্ধের সময়
পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতাকারী,
বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত
অভিযোগে অভিযুক্ত ঘৃন্য ঘাতক ,যুদ্ধাপরাধী ,নরপশু
মইত্যা রাজাকার নামে সর্বাধিক পরিচিত মতিউর
রহমান নিজামীর রায় যেকোন দিন। আসুন, আজ একটু ফ্লাশব্যাকে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই নরপশুর ঘৃণ্য কৃতকর্মগুলো দেখি।

৩১শে মার্চ ১৯৪৩ইং পাবনার সাথিয়া উপজেলার
মনমথপুর গ্রামে জন্মা।মৃত খন্দকার লুৎফর রহমানের
ছেলে মতিউর রহমান নিজামী ,১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ
চলাকালে নিজামী আল বদর বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়।
পাকিস্তানী বাহিনীর হত্যাকাণ্ডে আল-বদর
সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করে,এবং ১৪ই ডিসেম্বরের
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখে।
৭১ সালে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা, নারী ধর্ষন, লুটতরাজ,
অগ্নিসংযোগ সহ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাঙালি হত্যা,
অগ্নিসংযোগ, লুটপাট,
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা, রাজাকার বাহিনীর
নেতৃত্ব দান সহ নানা অপকর্ম চালানোর সুনির্দিষ্ট
প্রমাণ রয়েছে রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এএসএম সামছুল আরেফিন তার ‘মুক্তিযুদ্ধের
প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান’ বইয়ে লিখেছেন,
নিজামী মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান আলবদর
বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন (পৃ-৪২৭)। ‘একাত্তরের
ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে জাতীয়
গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট’-এ (সংক্ষিপ্ত ভাষ্য)
বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালে এ জামায়াত নেতা বাংলাদেশের
স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার যাবতীয়
কর্মতৎপরতা পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়
তিনি জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র
সংঘের সভাপতি ছিলেন। তার প্রত্যক্ষ
তত্ত্বাবধানে মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিহত এং মুক্তিযোদ্ধাদের
নির্মূল করার জন্য আলবদর বাহিনী গঠন করা হয়।
মতিউর রহমান নিজামী এই আলবদর বাহিনীর প্রধান
ছিলেন। … আলবদরের নেতারা বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল
নকশা প্রণয়ন করেন এবং তাদের নির্দেশে ডিসেম্বর
মাসে ঢাকাসহ সারাদেশে শত শত বরেণ্য
বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়।’

নিজামী যে স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন
বহু দলিল থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন ১৯৭১
সালের ১৪ নভেম্বর দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক
নিবন্ধে নিজামী বলেন, ‘আমাদের পরম সৌভাগ্যই
বলতে হবে, পাকবাহিনীর সহযোগিতায় এ দেশের
ইসলামপ্রিয় তরুণ সমাজ বদর যুদ্ধের
প্রস্তুতিকে সামনে রেখে আলবদর বাহিনী গঠন করেছে।
সেদিন আর খুব দূরে নয়, যেদিন আলবদরের তরুণ
যুবকরা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর
পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হিন্দু বাহিনীকে (শত্রুবাহিনী)
পর্যুদস্ত করে হিন্দুস্তানের অস্তিত্বকে খতম
করে সারা বিশ্বে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন
করবে।’ (সূত্র : গণতদন্ত কমিশন রিপোর্ট)।

জাতীয় গণতদন্ত কমিশন রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে,
‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করেছে তাদের ধ্বংস
করার আহ্বান সংবলিত নিজামীর ভাষণ ও বিবৃতির বহু
বিবরণ একাত্তরের জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র দৈনিক
সংগ্রামে ছাপা হয়েছে। যশোর রাজাকার সদর
দফতরে সমবেত রাজাকারদের উদ্দেশ্য করে নিজামী বলেন,
জাতির এ সংকটজনক মুহহৃর্তে প্রত্যেক রাজাকারের উচিত
ঈমানদারির সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত এ জাতীয়
কর্তব্য পালন করা এবং ওইসব ব্যক্তিকে খতম
করতে হবে যারা সশস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তান ও ইসলামের
বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে’ (পৃ ৫-৬)।

নিজামীর এলাকার লোকজনও নিজামীর
বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হত্যা, লুটতরাজ ও
নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ করেন। যেমন ১৯৭১-
এ ৭ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কুদ্দুস
গণতদন্ত কমিশনকে জানিয়েছেন, তিনি আলবদর
বাহিনীর একটি সমাবেশ ও গোপন বৈঠকে উপস্থিত
ছিলেন। বৈঠকে মতিউর রহমান নিজামীও উপস্থিত
ছিলেন। বৈঠকে কোথায় কোথায় মুক্তিবাহিনীর
ঘাঁটি এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের
বাড়ি আছে তা চিহ্নিত করা হয়।
বৈঠকে নিজামী মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, ঘাঁটি ধ্বংস
এবং আওয়ামী লীগারদের শেষ করার নির্দেশ দেন।
বৈঠকের পরদিন রাজাকার বাহিনীর সহযোগিতায়
বৃশলিকা গ্রাম ঘিরে ফেলে গোলাগুলি, নির্যাতন ও
লুটতরাজ করে এবং বাড়িঘর আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়
আলবদররা। নিজামীর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ
এনে সাঁথিয়ার মিয়াপুর গ্রামের মোঃ শাহজাহান
আলী গণকমিশনকে জানান, যুদ্ধের সময়
তিনি রাজাকারদের হাতে ধরা পড়লে আরো কয়েকজন আটক
মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তার গলায়ও
ছুরি চালানো হয়েছিল। অন্যদের জবাই করা হলেও
শাহজাহান আলী ঘটনাচক্রে বেঁচে যান। গলায় কাটা দাগ
নিয়ে তিনি এখন পঙ্গু জীবনযাপন করছেন (জাতীয়
গণতদন্ত কমিশন রিপোর্ট, সংক্ষিপ্ত ভাষ্য পৃ.-৬)।

সাঁথিয়ার শোলাবাড়িয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল
কুদ্দুস বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্ভর নিজামীর
নির্দেশে এবং রাজাকার সাত্তারের নেতৃত্বে আলবদর
ক্যাডাররা ধুলাউড়ি গ্রামে গণহত্যা চালায় এবং ৩০ জন
মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে। বেড়া উপজেলার
বৃশালিকা গ্রামের সোহরাব আলীকে মাওলানা নিজামীর
নির্দেশে গুলি করে হত্যা করে রাজাকার বাহিনী।
এছাড়া একই এলাকার প্রফুল্ল প্রামাণিক এবং তার
ছেলে ষষ্টি প্রামাণিককে রাজাকার বাহিনীর
সদস্যরা হত্যা করে এবং তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।’
ওই ঘটনার কয়েকজন সাক্ষী রয়েছেন
বলে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কুদ্দুস জানান।

সাঁথিয়ার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিজামীর
নির্দেশে করমজা গ্রামে গণহত্যা চালায় জামায়াত
নেতা সিরাজ ডাক্তারের ছেলে রফিকুন্নবী। এ
ব্যাপারে ডা. সিরাজ ও রফিন্নবীকে আসামি করে ১৯৭২
সালে একটি মামলা হলেও পরে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।

সাঁথিয়ার মিয়াপুর গ্রামের জামাল উদ্দিনের
ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান বলেন, ‘নিজামীর প্রত্যক্ষ
মদদে মুক্তিযোদ্ধা বটেশ্বর, চাঁদ, দারা, শাহজাহান,
মোসলেম ও আখতারকে আলবদররা হত্যা করে।
তারা মুক্তিযোদ্ধা কবিরের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন
ধরিয়ে দেয়।’ সাঁথিয়ার লোকজন জানান,
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর ঘনিষ্ঠ
সহযোগী হিসেবে কাজ করায় এলাকার লোকজন মতিউর
রহমান নিজামীকে ‘মইত্যা রাজাকার’ বলেও ডাকেন।

বুদ্ধিজীবী হত্যার পর ১৯৭১ সালের
ডিসেম্বরে নিজামী মাওলানা সুবহান ও
মাওলানা ইসহাকসহ পাকিস্তান হয়ে সৌদি আরব যান।
সেখান
থেকে তারা বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালাতে থাকেন।
১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর
মাওলানা নিজামী পাকিস্তান হয়ে ব্রিটিশ
এয়ারওয়েজযোগে ঢাকায় আসেন
এবং মগবাজারে একটি ভাড়া বাসায় ওঠে।

এক নজরে ৭১ সালে মতিউর রহমান
নিজামী যা যা বলেছিল:

৩রা আগষ্ট দৈনিক সংগ্রাম ‘পাকিস্তান টিকে থাকবেই’
শীর্ষক সম্পাদকীয়তে “পাক সেনারা আমাদের ভাই” বলায়
মইত্যা রাজাকার ওরফে মতিউর রহমান নিজামীর
মন্তব্যের প্রশংসা করে (দৈনিক সংগ্রাম ৩রা আগস্ট,
১৯৭১)।

চট্টগ্রাম শহর ইসলামী ছাএসংঘে- এর
উদ্যোগে স্থানীয় মুসলিম ইন্সটিটিউট হলে আয়োজিত
জনাকির্ণ এক রাজাকার সমাবেশে ভাষণ প্রদান করার
সময় মাথায় বীয্য উঠেগেলে প্রখ্যাত
ছাত্রনেতা নিজামী বলে “দুনিয়ার কোন
শক্তি পাকিস্তানকে নিশ্চিণ্হ করতে পারবেনা”,
বেচারা হারামখোর আরও বলে “পাকিস্তান টিকে থাকলেই
কেবলমাত্র এখানকার
মুসলমানেরা টিকে থাকতে পারবে” (দৈনিক সংগ্রাম ৫ই
আগস্ট, ১৯৭১)।

“মতিউর রহমান নিজামী- দুস্কৃতিকারীদের এর পরিণাম
ফল ভোগ করতে হবে” (দৈনিক সংগ্রাম ১২ই আগস্ট,
১৯৭১)

মতিউর রহমান নিজামী –
“পাকিস্তানকে যারা বিচ্ছিন্ন করতে চায়-
তারা ইসলামকেই উৎখাত করতে চায়” (দৈনিক সংগ্রাম,
২৩শে আগষ্ট, ১৯৭১)।

৪ঠা সেপ্টেম্বর দৈনিক সংগ্রাম-এ ‘মিনহাজের পিতার
নিকট ছাত্র সংঘ প্রধানের তারবার্তা’ শীর্ষক
শিরোনামে প্রকাশিত এক সংবাদে মতিউর রহমান
নিজামী বলে ‘ভারতিয় এজেন্ট(বীরশ্রেষ্ঠ)মতিয়ূর
রহমান’-এর মোকাবেলায় মিনহাজের
আত্মত্যাগে পকিস্তানী ছাত্র সমাজ অত্যন্ত গর্বিত
(দৈনিক সংগ্রাম, ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১)।

ছাত্রসংঘনেতা মতিউর রহমান নিজামীর আরো বক্তব্য (দৈনিক
সংগ্রাম – ১৫ই সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

২৯ জুন, ২০১০ তারিখে রমনা থানা পুলিশ প্রেসক্লাবের
সামনে থেকে মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেপ্তার করে ,
ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও
অনুভূতিতে আঘাত করেছে, এমন অভিযোগে। সাম্প্রতিক
একাত্তরে মানবতার অপরাধের মামলায়
জামায়াতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান
নিজামী,গ্রেফতার দেখিয়েছে আনত্মর্জাতিক অপরাধ
ট্রাইব্যুনাল।

১৯৭১ সালে এই রাজাকার আলবদর আর
আলশামস ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছিল। সাড়ে চার
লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছে। আজ তাদের বিচার হচ্ছে।
স্বাভাবিকভাবেই যারা ভুক্তভোগী তাদের পরিবার
পরিজন এই বিচারের দিকে তাকিয়ে আছে।আমরা সকল
যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই।

তথ্য সূত্র:-

#মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান’ -এএসএম
সামছুল আরেফিন ।

#মুক্তিযুদ্ধে দৈনিক সংগ্রামের ভূমিকা – -আলী আকবর
টাবী ।

#একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের
সম্পর্কে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট এবং নেট
থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন সালের বিভিন্ন নিউস
পেপার ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বই ।

৮ thoughts on “‘ন’ তে নিজামী ; তুই রাজাকার, তুই রাজাকার …

  1. চমৎকার তহ্যবহুল পোস্ট!!
    চমৎকার তহ্যবহুল পোস্ট!! প্রিয়তে রাখার মতই লিখা…
    ঘাতক মইত্যা রাজাকারের ফাঁসি চাই, ফাসি ছাড়া কথা নাই।

  2. দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় অলরেডী
    দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় অলরেডী নিজামীর
    ফাসিঁর রায় হয়ে আছে।
    তাই সরকার আগামীকাল নিজামীর
    ফাসিঁ দিয়ে হয়তো জামাতকে ক্ষেপাতে চাইবে না।
    তাছাড়া নিজামীর বয়স ও অনেক।

    দেখি কাল কি হয়……

    তবে ফাঁসি কিন্তু শুধু একটা শাস্তি নয় মাত্র। এটা অপরাধের স্বীকৃতি এবং মাত্রারও একটা পরিমাপ।
    আর মইত্যা রাজাকারের যে অপরাধের মাত্রা তাতে ওকে ৩০ লক্ষ বার ফাঁসি দেয়া উচিত ………

    একটাই দাবি……
    মইত্যা রাজাকারের ফাঁসি…
    ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি… … …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *