রামপাল বিতর্ক ও আমাদের করণীয়- তৃতীয় [সামগ্রিক পরিবেশ বিপর্যয়ে বিশ্ব]

সামগ্রিক পরিবেশ বিপর্যয়ে বিশ্ব

রামপাল বিতর্ক নিয়ে একটা ধারাবাহিক শুরু করেছিলাম বেশ কিছুদিন হল,ইতিমধ্যে দুটি পর্ব শেষও করেছি কিন্তু ৩য় পর্ব লিখতে অনেক বেশী দেরী হয়ে গেল। সবার কাছে তাই আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। তৃতীয় পর্বের আলাদা একটা শিরোনাম দিয়েছি যার প্রাসঙ্গিকতা পুরো পোস্ট পড়লেই বুঝতে পারবেন। এই পোস্ট শেষ করতে প্রচুর পড়াশুনা আর খাটা-খাটনি হয়েছে, অবশেষে কাজটি শেষ করতে পেরে ভাল লাগছে। এই পর্বে পরিবেশ বিপর্যয়ের ধরণ এবং তার কারণ নিয়ে সাধারণ আলোকপাত করতে চাই।

পরিবেশ বিপর্যয়ের মূল কারণসমূহঃ


সামগ্রিক পরিবেশ বিপর্যয়ে বিশ্ব

রামপাল বিতর্ক নিয়ে একটা ধারাবাহিক শুরু করেছিলাম বেশ কিছুদিন হল,ইতিমধ্যে দুটি পর্ব শেষও করেছি কিন্তু ৩য় পর্ব লিখতে অনেক বেশী দেরী হয়ে গেল। সবার কাছে তাই আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। তৃতীয় পর্বের আলাদা একটা শিরোনাম দিয়েছি যার প্রাসঙ্গিকতা পুরো পোস্ট পড়লেই বুঝতে পারবেন। এই পোস্ট শেষ করতে প্রচুর পড়াশুনা আর খাটা-খাটনি হয়েছে, অবশেষে কাজটি শেষ করতে পেরে ভাল লাগছে। এই পর্বে পরিবেশ বিপর্যয়ের ধরণ এবং তার কারণ নিয়ে সাধারণ আলোকপাত করতে চাই।

পরিবেশ বিপর্যয়ের মূল কারণসমূহঃ

নাসার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের গ্লোবাল ক্লাইমেট চেঞ্জ বিভাগের ‘A blanket around the Earth’ শিরোনামের গুরুত্বপূর্ণ একটি আর্টিকেলে বিশ্বের আবহাওয়া পরিবর্তনের মানবসৃষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছে-
The Intergovernmental Panel of NASA on Climate Change, a group of 1,300 independent scientific experts from countries all over the world under the auspices of the United Nations, concluded there’s a more than 90 percent probability that human activities over the past 250 years have warmed our planet.
The industrial activities that our modern civilization depends upon have raised atmospheric carbon dioxide levels from 280 parts per million to 379 parts per million in the last 150 years. The panel also concluded there’s a better than 90 percent probability that human-produced greenhouse gases such as carbon dioxide, methane and nitrous oxide have caused much of the observed increase in Earth’s temperatures over the past 50 years.
They said the rate of increase in global warming due to these gases is very likely to be unprecedented within the past 10,000 years or more. সম্পূর্ণ রিপোর্ট পেতে এইখানে ক্লিক করুণ।

নাসার রিপোর্ট অনুযায়ী গ্রিন হাউজ ইফেক্টের জন্য দায়ী গ্যাসগুলো হচ্ছে- জলীয় বাষ্প (Water vapor), কার্বন-ডাই-অক্সাইড (Carbon dioxide (CO2), মিথেন (Methane),নাইট্রাস অক্সাইড (Nitrous oxide) এবং ক্লোরো-ফ্লোরো-কার্বনস বা সিএসসি(Chlorofluorocarbons (CFCs). এদিকে শিল্পায়ন গত ১৫০ বছরে বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড (Carbon dioxide (CO2) এর পরিমাণ ২৮০ পিপিএম থেকে ৩৭৯ পিপিএমে নিয়ে যায়। তারা আরও যোগ করেন যে গত ১০,০০০ বছরের ইতিহাসে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার বর্তমানে নজিরবিহীন।

A blanket around the Earth শিরোনামের নাসার প্রবন্ধের প্রচ্ছদ

এখন সঙ্গত কারণে গত ২৫০ বছরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির মাইলফলক সহকারে কিছু তথ্য তুলে ধরতে চাইঃ

 ১৭৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ০.৭ বিলিয়ন বা ৭০ কোটি
[এইখানে উল্লেখ্য শিল্প বিপ্লবের আরম্ভ ১৭৬০ সালে-চিত্রে দেখানো হয়েছে…]
 ১৮০৪ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি
 ১৯২৭ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ২ বিলিয়ন বা ২০০ কোটি
 ১৯৬০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি
 ১৯৭৪ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি
 ১৯৮৭ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ৫ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি
 ১৯৯৯ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ৬ বিলিয়ন বা ৬০০ কোটি
 ২০১১ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ৭ বিলিয়ন বা ৭০০ কোটি
 আজ ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসের জনসংখ্যা প্রায় ৭.২ বিলিয়ন বা ৭২০ কোটি।

নাসার স্বতন্ত্র ১,৩০০ জন পরিবেশবিজ্ঞানী এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে গত ২৫০ বছরের মানুষের কার্যকলাপই বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য ৯০% এর বেশী দায়ী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে অর্থাৎ গত ২৫০ বছরের জনসংখ্যার এই ক্রম গণবিস্ফোরণই দায়ী এবং তাতে কোন সন্দেহ থাকে না নিচের চার্টটির দিকে একটু লক্ষ্য করলেই বোধগম্য হবে বিষয়টি। ১৭৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ৭০ কোটি সেখানে আজ কেবল ভারত বর্ষেই প্রায় তার দ্বিগুণ মানুষের বসবাস। ১৭৬০ সালের শিল্পবিপ্লবের পর থেকে মাত্র ২৫৩ বছরে আজ দুনিয়ার অবস্থা এই, শিল্পবিপ্লবের নামে কি শৈল্পিকভাবেই না প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে বিপর্যস্ত করেছে এই মানব জাতি তা একটু ভাবলেই আঁতকে উঠতে হয়। তারপরও আলাদা আলাদাভাবে একটু দেখার চেষ্টা করব কীভাবে সামুদ্রিক জীব বৈচিত্র্য এবং বনভূমি আজ হুমকির মুখে এবং মানুষের কোন কোন কার্যকলাপ এর পিছনে মূল দায়ী।


চার্টঃ বিশ্ব জনসংখ্যার অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ বিস্তারিত জানতে চার্টটি বড় করে দেখুন (ক্লিক করে…)

সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বিপর্যয়ের কারণসমূহঃ

সামুদ্রিক প্রাণীদের জীবন যাপনের পরিবেশ বিপর্যস্ত হলে স্বাভাবিকভাবেই সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বিপর্যয়ের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বর্তমানে সভ্যতার নামে পরিবেশ ও প্রকৃতির উপর মানব শিল্পায়নের নগ্ন আগ্রাসনে তাবৎ দুনিয়ার সমুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন। অপরদিকে অতিঘনবসতির জনগোষ্ঠী ঘনিষ্ঠ উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহে মানবসৃষ্ট দূষণের তীব্রতা এবং চাপের কারণে বিপর্যয় ত্বরান্বিত হতে দেখা যায়। এইভাবেই সামুদ্রিক প্রাণীর বাসস্থানের ক্ষতি সমগ্র দুনিয়াজুড়ে মহাসাগরের জীব বৈচিত্র্যের উপর প্রভাব ফেলছে। সামুদ্রিক জীবন বিপর্যয়ের কারণ প্রধানত দু’রকম প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট।

প্রাকৃতিক কারণে প্রধানত বিপর্যয় দেখা দেয় সেগুলো হারিকেন, টাইফুন, ঝড়, ভূকম্পন, ভূমিধ্বস, সুনামি ইত্যাদি সামুদ্রিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

কিন্তু মানুষসৃষ্ট কারণগুলোই প্রধান, যেমন- জলাভূমি ড্রেজিং এবং ভরাট করে শহর, শিল্প, কৃষি উন্নয়ন করা হয়। তাছাড়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এবং শিল্পকারখানার নির্গত বর্জ্য সামুদ্রিক জীবনের (প্রাণী এবং উদ্ভিদ জীবনের) সামগ্রিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে।

 ভূ-আভ্যন্তরীন বাঁধ স্বাভাবিক প্রাকৃতিক সমুদ্র প্রবাহ বিঘ্ন করে, মাছ চলাচল পথ বন্ধ করে, এবং স্বাদু পানি প্রবাহ বন্ধ করে উপকূলীয় পানির লবনাক্ততার পরিমান বৃদ্ধি করে। তীর থেকে দূরবর্তী জায়গায় বনায়ন উজাড় মাটি ক্ষয় সৃষ্টি করে যার ফলে পলি পরিবহন বেড়ে যায়। যার দরূন অগভীর জলের রিফগুলো পলির নীচে চলে যায় এবং জীব বৈচিত্র্য বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে।

 ক্ষতিকর মাছ ধরার কৌশল যেমন সমুদ্র বা জলাশয়ের গভীর হতে ছেঁকে মাছ ধরা, ডিনামাইট ব্যবহার, বিষ প্রয়োগ উপকূল এবং গভীর উভয় জায়গাতেই সামুদ্রিক জীবনের ক্ষতি করে।

 ট্যুরিজমের নৌকা, ডুবুরী, স্কুবা ডাইভার ইত্যাদিকে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের খুব সন্নিকটে নিয়ে এসেছে। কনটেইনার জাহাজ ও ট্যাঙ্কারের নোঙ্গর ও বর্জ্য জীব বৈচিত্র্য হুমকির অন্যতম কারন।

 অশোধিত তেল ও অন্যান্য পদার্থ উপচে পাখি এবং মাছ হাজারে হাজারে মারা যায় এবং কয়েক বছরের জন্য একটি ক্ষতিকর পরিবেশ রেখে যায়।

 জলবায়ু পরিবর্তন একটি অন্যতম বড় কারণ সামুদ্রিক জীবন বিপর্যয়ের। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃ্দ্ধির সাথে সাথে সমুদ্রও কিছু তাপমাত্রা শোষণ করে। এমনকি অল্প তাপমাত্রা বৃ্দ্ধিও কোরাল থেকে তিমির জীবন চক্রে প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃ্দ্ধি মেরুর (Polar) আইস ক্যাপ, গ্লেসিয়ার গলিয়ে উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে দিতে পারে।

 জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো উচ্চ মাত্রার কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) সমুদ্র দ্বারা শোষিত হয় এবং বিক্রিয়ার মাধ্যমে কার্বনিক এসিড গঠন করে। এই উঁচু অম্লতা মহাসাগরের প্ল্যাঙ্কটন সহ সামুদ্রিক প্রানীর জীবন ধারন এবং শেল তৈরি ব্যাহত করে, যা মহাসাগরের খাদ্য চক্রে ব্যাপক হারে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। [তথ্যসূত্রঃ NatGeo অনলাইন]


পানি দূষণের কারণসমূহের খাতওয়ারী দূষণের হার

অন্যদিকে গ্রিনিং প্ল্যানেট ডট কম পানি দূষণ নিয়ে একটা বিশাল রিপোর্টে অতিগুরুত্বপূর্ণ এবং সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে আলোকপাত করেছেঃ

পানি দূষণের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ দায়ী, যাদেরকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে পয়েন্ট সোর্স এবং নন-পয়েন্ট সোর্স বাঙলায় করলে যা দাড়ায় প্রত্যক্ষ্য এবং পরোক্ষ উৎস। পয়েন্ট সোর্স- এইসব দূষণে ক্ষতিকারক উপাদানসমূহ সরাসরি পানির সাথে মিশে যায়, যেমন- চাষাবাদের জন্য ব্যবহৃত সার বৃষ্টির পানিতে মিশে পানির ব্যাপক দূষণ করে। দূষণের পয়েন্ট সোর্সগুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সফল কার্যকারিতায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব অন্যদিকে নন-পয়েন্ট সোর্স ব্যাপক এবং অতিবিধ্বংসী হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য। সাধারণত নন-পয়েন্ট সোর্স হচ্ছে পানি দূষণের এমনসব উৎস যেসব পরোক্ষভাবে পরিবেশগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পানি দূষণ করে থাকে। নিচে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ তালিকা আকারে দেয়া হল-

১) Pesticides বা কীটনাশক
২) Fertilizers / Nutrient Pollution বা সার / পুষ্টিগত দূষণ
৩) Oil, Gasoline and Additives বা তেল, পেট্রোলজাত দ্রব্য এবং এদের বিশেষ সংযোজনের বস্তু
৪) Mining বা খনিজ দ্রব্যের ব্যপক ব্যবহার এবং উত্তোলন [এইখানে একটা প্রাসঙ্গিক তথ্য না দিলেই নয়; ১৯৬৩ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া The Iron Mountain mine in California, USA খনিজ উত্তোলন ক্ষেত্রটি আগামী ৩০০০ বছর নদীতে pH -3 মাত্রার এসিডিক বর্জ্য নির্গমন করবে যা কিনা সাধারণ ব্যাটারির এসিড থেকেও ১০,০০০ গুন বেশী এসিডিক।]
৫) Sediment বা ক্ষয়িষ্ণু পলি মাটি


চিত্রে দেখা যাচ্ছে মানব সৃষ্ট কি কি কারণ পানি দূষণের জন্য প্রত্যক্ষ্যভাবে দায়ী।

৬) Chemical and Industrial Processes বা রাসায়নিক এবং শিল্প প্রক্রিয়ার দূষণ
৭) Plastics and other plastic-like substances বা প্লাস্টিক এবং অন্যান্য পলিমার
৮) Personal Care Products, Household Cleaning Products, and Pharmaceuticals
৯) Sewage বা নর্দমা অথবা ড্রেনের ময়লা
১০) Air Pollution বা বায়ু দূষণ
১১) Carbon Dioxide বা অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন
১২) Heat বা অতিরিক্ত তাপ নির্গমন
১৩) Noise বা শব্দদূষণ।

এই তালিকা আর নাসার ১,৩০০ স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিকের রিপোর্ট সমন্বয় করলে তথাকথিত শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মানুষের ক্রমবৃদ্ধি এবং উপরোক্ত ১৩ রকম প্রত্যক্ষ্য এবং পরোক্ষ উৎস কীভাবে দুনিয়ার পানি দূষণের কাজ করছে তা স্পষ্ট হয়। এইসকল কারণের সবকটিই জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বৃদ্ধি পায় এবং অস্বাভাবিক হারে পরিবেশ দূষণে ঋণাত্মক ভূমিকা রাখে। এদিকে মানুষের মৃত্যুও পানি দূষণের জন্য দায়ী বলে আর্টিকেলটিতে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রত্যেকটি পয়েন্ট সম্পর্কে বিস্তারিত পড়তে এই সাইট ভিজিট করুণ

ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউটের একটি বিষদ হিসেবে দেখাচ্ছে ২০০৫ সালে দুনিয়াজুড়ে নির্গত ৪৪,১৫৩ মেগা টন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের (CO2) সমপরিমাণ গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনে মানুষের নানাবিধ খাত কীভাবে অবদান রাখছে তা স্পষ্ট হয় নিম্নের অসামান্য এই চার্টটি দেখলে-

গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনে খাতওয়ারী হিসেব

এই চার্টের কিছু তথ্য আলাদা করে না বললেই নয়, তাহল- ইলেক্ট্রিসিটি এবং তাপের কারণে গ্রিনহাউজ গ্যাস ২৪.৯% (যেখানে সকল ধরণের জ্বালানীর ব্যবহার সন্নিবেশিত), অন্যভাবে দেখলে Unalocated বা অব্যবহৃত জ্বালানী পুড়ে হয় ৩.৬% এবং কয়লা উত্তোলনে হয় ১.৩%, আবার ভূমির ব্যাপক ব্যবহার পরিবর্তন (১২.২%) কৃষিখাত (১৩.৮%), যোগাযোগ ব্যবস্থা (১৪.৩%) সর্বমোট ৩০.৬% গ্রিন হাইউজ গ্যাস সৃষ্টির জন্য দায়ী। অনেক তথ্য আর উপাত্ত দিয়ে পাঠকদের বিরক্ত করব না। আমাদের আসলে জেনে রাখা ভাল আমাদের কোন কোন কার্যকলাপ বিশ্ব পরিবেশের এমন সর্বগ্রাসী দূষণ করছে। চার্টটিতে ক্লিক করে বড় করে দেখলেই অনেক ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে যাবে।

বনভূমি উজ়াড়ের কারণ সমূহঃ

লিভ সাইয়েন্স (livescience) ডট কমের বন উজ়াড়ের কারণ সমূহ নির্ধারণ করতে গিয়ে তাদের ‘Deforestation: Facts, Causes & Effects’ শিরোনামের প্রবন্ধটির শুরুর বাক্যে বলছে- ‘Deforestation is the permanent destruction of forests in order to make the land available for other uses.’ প্রতি বছর পানামার সমপরিমান বা ১৮ মিলিয়ন একর বনভুমি উজাড় হয় বসবাস এবং অন্যান্য কাজের জন্য বনভূমি ধ্বংস করে সমভূমি প্রস্তুত করার লক্ষ্যে বলছে জাতিসংঘের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অরগানাজেশন FAO, Food and Agriculture Organization of the United Nations. এমন আরও তিনটি প্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়েছে প্রবন্ধটির ভূমিকায়-

ক) ইতিমধ্যে বিশ্বের প্রায় অর্ধেকের বেশি ট্রপিক্যাল বা ক্রান্তীয় বনাঞ্চল উজাড় হয়েছে বলছে ইউএন-এর ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অরগানাজেশন FAO.

খ) পৃথিবীর মোট স্থলভাগের মাত্র ৩০% যায়গায় বর্তমানে বিদ্যমান কিন্তু প্রতি বছর পানামার সমপরিমান বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার ধারা বজায় থাকলে আগামী ১০০ বছরের মাঝেই বিশ্ব বনহীন হয়ে পরবে বলছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
গ) বর্তমান বিশ্বের মোট নিঃসরিত গ্রিন হাইউজ গ্যাসের ১২-১৭% এর জন্য দায়ী এই সর্বগ্রাসী বনভূমি উজাড়। এই তথ্য দিচ্ছে World Resources Institute, WRI.

বনভূমি উজাড়ের প্রধান কারণগুলো livescience.com ঠিক এইভাবেই তালিকাভুক্ত করেছে- বসবাসের জন্য জমির প্রয়োজনীয়তা, নগরায়ন এবং শহরায়ণ, কাঠ সংগ্রহ, চাষাবাদের জমির প্রয়োজনীয়তা, সয়া এবং পাম ওয়েলের জন্য জমি অধিগ্রহণ, গোচারণভূমির সৃষ্টি এবং শিল্পায়ন। Natural Resources Defense Council এর একজন বন বিশেষজ্ঞ এই নির্বিচারে বনভূমি ধংসের প্রক্রিয়াকে বলছে এটি একটি পরিবেশগত মানসিক আঘাত যা ভয়ংকর কোন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাত ছাড়া প্রকৃতিতে দেখা যায় না।

মানবজাতির সভ্যতার হলিখেলা এতটাই আত্মবিধ্বংসী যে আমরা নিজেরাই বুঝতে পারছি না আমাদের সবুজ পৃথিবীটির ভবিষ্যতকে আমরা কতটা অনিশ্চিত করে দিচ্ছি। এইসব নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গেলেই সবসময় রেনেসাঁর ‘আজ যে শিশু’ গানটির কথা মনে পরে যায়। আর শেষতক একটাই পরিসমাপ্তি টানতে হয় তাহল ‘দিনশেষে সব মানুষই চরমভাবে স্বার্থপর, এতটাই স্বার্থপর যে মানবজাতি তার অনাগত প্রজন্মের কথা না ভেবে বর্তমানের উল্লাসে মত্ত’

এই পোস্টটি লিখতে গিয়ে এমন উপলব্ধিই বারবার হয়েছে যে ১৭৬০ সালের পর যে হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে তা শুধু বনভূমিই উজাড় করার জন্য প্রধান দায়ী না গোটা দুনিয়ার তাবৎ জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে চরম নির্লজ্জতায়। আর যেখানে সকল এক্সপার্টেরা একযুগে বলছে এই শতাব্দীর শেষভাগে (২০৬৫-৭৫) ছাড়া বিশ্বের জনসংখ্যায় স্থিতি আসবে না সেখানে বিশ্বনেতারা স্বেচ্ছাচারী যুদ্ধের দামামায় মত্ত।

এদিকে ২১০০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা হবে ১০ বিলিয়নেরও বেশী। মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে এইপর্যন্ত মোট জন্ম নেয়া মানুষের সংখ্যা ৯০ থেকে ১১০ বিলিয়নের মধ্যে, পপুলেশন রেফারেন্স ব্যুরোর মতে এই পরিমাণ প্রায় ১০৬ বিলিয়নের কাছাকাছি। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০,০০০ থেকে এই ৫২,০০০ বছরের ইতিহাসে গত ৫০০ বছরেই মোট পরিমাণের অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ বিলিয়ন মানুষ পৃথিবীর সম্পদ ভোগ করেছে। আমরাই কাকতালীয়ভাবে বোধহয় সবচে খারাপ সময়ে দুনিয়ায় আসছি অন্যদিকে আবার সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞানের একদম স্বর্ণযুগেই আমাদের পদচিহ্ন এই দুনিয়ার বুকে (হতাশ হওয়ার কিছু নেই…)। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক তাদের প্রবন্ধের শেষে বর্তমান সময়ের মানুষের বনায়ন নিয়ে স্বভাবগত, বিধিবৎ বা নিয়মমাফিক আশার বানী শুনালেও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বনেতাদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কোন বিকল্প দেখি না। প্রবলভাবে এবং কঠোরভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনই মানব জাতির অনাগত ভবিষ্যতের উত্তরণের একমাত্র পথ।

তথ্যসূত্রঃ

ক) ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক অনলাইন।
খ) নাসার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।
গ) লিভ সাইন্স ডট কম।
ঘ) World Resources Institute, WRI.এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।
ঙ) পপুলেশন রেফারেন্স ব্যুরোর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।
চ) ওয়ার্ল্ড মিটারস ডট ইনফো
ছ) ইউএন-এর ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অরগানাজেশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।
জ) গ্রিনিং প্ল্যানেট ডট কম।

পূর্বের প্রাসঙ্গিক পোস্টদ্বয়ঃ
ক) রামপাল বিতর্ক ও আমাদের করণীয়- প্রথম পর্ব
খ) রামপাল বিতর্ক ও আমাদের করণীয়- দ্বিতীয় পর্ব

৩০ thoughts on “রামপাল বিতর্ক ও আমাদের করণীয়- তৃতীয় [সামগ্রিক পরিবেশ বিপর্যয়ে বিশ্ব]

  1. ভাল লাগল ; প্রিয়তে রাখলাম।
    এর

    ভাল লাগল ; প্রিয়তে রাখলাম।
    এর আগে এই টপিক নিয়ে কল্লোল মুস্তফার (EIA Report) ও পিনাকী ভট্টাচার্যের লেখা পড়েছিলাম;
    আপনার লেখায় বেশ কিছু নতুন তথ্য পেলাম।
    =============================

  2. প্রিয়তে নিয়ে রাখলাম…
    প্রিয়তে নিয়ে রাখলাম… :মাথানষ্ট: :থাম্বসআপ: চমৎকার লাগলো তথ্যসমৃদ্ধ এই পোস্টটা :ভালাপাইছি: :ভালাপাইছি: … আগের পোস্টগুলোর ধারাবাহিকতায় পুরো বিষয়টা ক্রমান্বয়ে পরিস্কার হতে শুরু করেছে :তালিয়া: :তালিয়া: :থাম্বসআপ: … আশা করছি পুরো সিরিজ শেষ হবার পর ব্যাপারটার সুফল-কুফল সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারনা পাব :ফুল: :ফুল: :ফুল: … চালিয়ে যান ভাই… :বুখেআয়বাবুল: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ:

    1. ধন্যবাদ ভাই…
      ধন্যবাদ ভাই… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ: :ফুল:

      আশাকরি আগামী কয়েকদিনের মাঝেই শেষ করে দিব সিরিজটি!!

  3. আপনার আলোচনায় অনেক অজানা তথ্য
    আপনার আলোচনায় অনেক অজানা তথ্য উঠে এসেছে ।আশা করি আপনার সিরিজটি থেকে রামপালের সুফল-কুফল সম্পর্কে একটা পুর্ণাঙ্গ ধারনা পাওয়া যাবে ।

    1. দেখি আর লম্বা করার ইচ্ছা
      দেখি আর লম্বা করার ইচ্ছা নাই… কিছু ভাল ব্যাপার লক্ষ্য করেছি দেখি এই সপ্তাহেই শেষ করে দিব!! ধন্যবাদ শাহিন ভাই :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ: :গোলাপ: :ফুল:

  4. প্রিয়তে নিলাম।ধারাবাহিক একটি
    প্রিয়তে নিলাম।ধারাবাহিক একটি পরিশ্রমিক ও তথ্য সমৃদ্ধ লেখা যা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব শেষ করে তৃতীয় পর্বে আরো গঠন মূলক আলোচনা করা হয়েছে।বিশ্বের সামগ্রিক পরিবেশ বিপর্যই এই পর্বে ফুটে উঠেছে।আপনার সাথে আমিও একমত-

    ‘দিনশেষে সব মানুষই চরমভাবে স্বার্থপর, এতটাই স্বার্থপর যে মানবজাতি তার অনাগত প্রজন্মের কথা না ভেবে বর্তমানের উল্লাসে মত্ত’।

    :bow: :bow: :bow: :bow: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

    1. অনেক অনেক ধন্যবাদ শঙ্খনীল
      অনেক অনেক ধন্যবাদ শঙ্খনীল ভাই… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ: :গোলাপ:
      দ্রুতই শেষ করার ইচ্ছা আছে!!

        1. অফুরন্ত ধইন্যা!! সর‍্যি ভাই
          অফুরন্ত ধইন্যা!! সর‍্যি ভাই ব্যস্ততার কারণে শেষ করেও শেষ করতে পারি নি… আশাকরি বিজয়দিবসের আগেই শেষ করব!! ধন্যবাদ পাশে থাকার জন্য… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল:

    1. খোঁচা মারলেন না উৎসাহ দিলেন
      খোঁচা মারলেন না উৎসাহ দিলেন বুঝলাম না… পড়ার জন্য ধন্যবাদ দুলাল ভাই!!
      :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ: 😀

  5. এই কথাগুলো কিন্তু আমরা সবাই
    এই কথাগুলো কিন্তু আমরা সবাই জানি , স্কুলে কলেজে আমরা পরিবেশ বাচাতে গাছ , সমুদ্র বাচাতে হবে । মানুষ কমাইতে হবে পড়ে আসচ্ছি , কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হল — বড় হবার পর আর স্কুলে শেখা বিষয়গুলো মনে রাখি না । একজন তিন চারটা বাচ্চা নিয়ে বসে থাকি ( অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে বাংলাদেশে ) বাইরের দেশে আরও খারাপ । ইন্ডিয়া চীন তো একটা মেশিন , সাথে আমরা আছি ।

    আশার কথা তো বলতে পারি না । আমরা হয়তো ভালোই ভালোই মরে যাবো , চিন্তা আমাদের পরের দুই প্রজন্ম কি করবে , কি টানবে ? সিসার গুলতি নাকি সবুজ পাতার বাতাস !!

    তারিক ভাই , লেখা প্রিয়তে

    1. । আমরা হয়তো ভালোই ভালোই মরে

      । আমরা হয়তো ভালোই ভালোই মরে যাবো , চিন্তা আমাদের পরের দুই প্রজন্ম কি করবে , কি টানবে ? সিসার গুলতি নাকি সবুজ পাতার বাতাস !

      :দেখুমনা: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :চিন্তায়আছি: :মনখারাপ:

    2. আমরা হয়তো ভালোই ভালোই মরে

      আমরা হয়তো ভালোই ভালোই মরে যাবো , চিন্তা আমাদের পরের দুই প্রজন্ম কি করবে , কি টানবে ? সিসার গুলতি নাকি সবুজ পাতার বাতাস !!

      :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :গোলাপ: :গোলাপ: :ফুল: :ফুল:

  6. পরিবেশ বিপর্যয় বিষয়ক
    পরিবেশ বিপর্যয় বিষয়ক তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। আর এইজন্যই বিশ্বের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কোন বিকল্প নাই। সাথে রামপালের মতো প্রকল্প তৈরির আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সবাইকেই সরে আসতে হবে। উহারা একে অপরের পরিপূরক। আপনি যেমন শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশ বিপর্যয় ঠ্যাকাতে পারবেন না, তেমনি জনসংখ্যা অনিয়ন্ত্রিত রেখে শুধু পরিবেশ পরিবেশ বলে চিল্লায়া গলা ফাটায়েও লাভ নাই।

    1. আতিক ভাই আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে
      আতিক ভাই আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আগাচ্ছি না আরও জেনে নিই তারপরই না হয় সিদ্ধান্ত নিলাম!
      ধন্যবাদ :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ:

  7. আরেজকটা বিষয় পোস্টটা স্টিকি
    আরেজকটা বিষয় পোস্টটা স্টিকি হচ্ছে না কেন ? বর্তমান প্রেক্ষাপটে এইটা গুরুত্বপূর্ণ । পক্ষে বিপক্ষে আলোচনার পথ খুলবে

  8. পেটের দাঁয়ে রামপালের কাছাকাছি
    পেটের দাঁয়ে রামপালের কাছাকাছি এখন অবস্থান করছি। আশাওরি এবার এলাকাটা একটু ঘুরে দেখতে পারব। যাই বুঝি না একটা লেখাও দিমুনে। আর আভি আপনার পোস্ট পড়ে কমেন্ট করব। 😀

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *