নিয়মী

“লেখা আছে ‘নকল হইতে সাবধান’, কিন্তু আমি নিশ্চিত প্রোডাক্টটা একশত ভাগ নকল।” খান সাহেব খুব ধীরস্থির ভাবে দোকানের মালিককে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললেন। দোকানের মালিক চুপ থাকলেও ফাজিল সেলস্ ম্যান একগাল হেসে বলল, ‘আরে আপনি বুঝতে পারছেন না? এটা আসলেই নকল, সুতরাং এটা হতে সাবধান। সাবধান করার পরও যদি আপনি জিনিসটা কেনেন, তাহলে আমাদের কি করার আছে বলেন? ফেরত হবে না।’ খান সাহেব তর্কে না গিয়ে ফিরে এলেন। স্মরণকালের মধ্যে এই প্রথম ঠকা হল। তবে ঠকে গিয়েও মনে মনে তিনি ভীষণ খুশী। যাক, নিয়মভঙ্গের প্রথম দিনেই বেশ একটি অনিয়ম করা হল!

“লেখা আছে ‘নকল হইতে সাবধান’, কিন্তু আমি নিশ্চিত প্রোডাক্টটা একশত ভাগ নকল।” খান সাহেব খুব ধীরস্থির ভাবে দোকানের মালিককে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললেন। দোকানের মালিক চুপ থাকলেও ফাজিল সেলস্ ম্যান একগাল হেসে বলল, ‘আরে আপনি বুঝতে পারছেন না? এটা আসলেই নকল, সুতরাং এটা হতে সাবধান। সাবধান করার পরও যদি আপনি জিনিসটা কেনেন, তাহলে আমাদের কি করার আছে বলেন? ফেরত হবে না।’ খান সাহেব তর্কে না গিয়ে ফিরে এলেন। স্মরণকালের মধ্যে এই প্রথম ঠকা হল। তবে ঠকে গিয়েও মনে মনে তিনি ভীষণ খুশী। যাক, নিয়মভঙ্গের প্রথম দিনেই বেশ একটি অনিয়ম করা হল!

বউমা-ই তাঁকে আসল-নকলের ভুলটা ধরিয়ে দিয়েছিল। বউমাটি ভারী লক্ষী, আবার বুদ্ধিমতিও বটে। রেশমা এবাড়ীতে এসেছে মাস ছয়েক হল। এই ছ’মাসে বাড়ীর চেহারায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ বিশ বছর পর এবাড়ীতে একজন স্থায়ী নারীর পা পড়ল। স্ত্রী মারা যাবার পর খান সাহেব আর বিয়ে থা করেন নি। তিন ছেলেকে নিয়ে কঠোর নিয়ম নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি সংসারটাকে এই পর্যন্ত টেনে এনেছেন। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ তিনি নিজ হাতে করতেন। শুধু কাপড় চোপড় যারটা সে সে ধূতো।

মায়াবতী স্ত্রীর মৃত্যুর পর মাস খানেক তিনি উদভ্রান্তের মত ছিলেন। কিছুদিন যেতে না যেতে আত্মীয় স্বজনরা যখন মনে করছিলেন – শোক বুঝি এবার কিছুটা কমে এলো, তখুনি তারা খান সাহেবের সামনে নতুন বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন। এবং প্রায় প্রত্যেকেই খান সাহেবের চিরকালের শত্রু বনে যান। প্রস্তাবকারীদের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে তিনি গা ঝারা দিয়ে ওঠেন। না, এভাবে হয় না। মারুফা কিছু স্মৃতি রেখে গেছে, তাদেরকে মানুষ করতে হবে। খান সাহেবের একটি বাড়তি পাওনা ছিল এই, তাঁকে রুটি রুজির জন্য ভাবতে হত না। তাঁর বাবা তাঁর জন্য অঢেল রেখে গেছেন। ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে তিন ছেলে, তাদের স্কুল কলেজ আর এই বিশাল বাড়ীর চৌহদ্দির ভিতর গুটিয়ে নিলেন। স্ত্রী বর্তমান থাকতে তিনি ঘরমুখো ছিলেন না। ছিলেন উড়নচণ্ডী আর আড্ডাবাজ। বন্ধুদের নিয়ে হুল্লোরে মেতে থাকতেন প্রায়।

নিজেকে এবং ছেলেদেরকে কঠোর এবং জটিল নিয়মতান্ত্রিকতার বেড়াজালে জড়িয়ে রাখার কারণে আত্মীয়স্বজন-বন্ধুরা তাঁকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে। এতে সমাজের মধ্যে এই পরিবারটি প্রায় একঘরে হয়ে যায়। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে ঘুমুতে যাওয়া পর্যন্ত সব রুটিন মাফিক হওয়া চাই। একটুও এদিক সেদিক করা চলবে না। এমনকি নিম্নে চাপ বোধ না করলেও, চেপেচুপে সকালের নির্দিষ্ট সময়ে পেট খালি করা চাই। এমনি অনেক অনেক নিয়ম কানুনে ভর্তি ডাইনিং রুমের দেয়ালে টাঙ্গানো দৈনিক কার্য তালিকাটি, যেখানে দিন শুরু হয় ভোর পাঁচাটায়, আর শেষ হয় রাত এগারটায়।

ছেলেরা ছেলেবেলায় টু শব্দটি না করলেও বড় হওয়ার পর থেকে দিন দিন বিদ্রোহী হয়ে উঠতে লাগল। ছোট ছেলেটা বেশী একরোখা, এখন অনার্স পড়ছে। এই ছেলেটির মধ্যে মারুফার ছায়া আছে বেশ। খান সাহেবের বড় ভাল লাগে। কিন্তু তাই বলে নিয়ম মানবে না – তা তো হতে পারে না। মারুফার এই জীবন্ত স্মৃতিগুলো ছাড়া তাঁর তো আর কিছু নেই। ইদানীং দুঃচিন্তা হয় খুব, এরাই যদি তাঁর সাথে বিপ্লব শুরু করে তাহলে তিনি যাবেন কোথায়? তবে অবশেষে শেষ রক্ষা হয়েছিল। চূড়ান্ত বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে এই সংসারে রেশমার আগমন ঘটে।

মেয়েটি অল্পদিনেই শ্বশুরের মন জয় করে ফেলে। তবে খানিক ঘাড়ত্যাড়া, নিয়ম কানুন তেমন একটা মানতে চায় না। কিন্তু অবাক ব্যাপার, রেশমার অনিয়মগুলো খান সাহেবের চোখে ধরাও পড়ে না। বউমা আর শ্বশুরের সখ্যতা লক্ষ্য করে ছেলে আর নিকট আত্মীয়রা রেশমাকে ধরে বসে, ‘তুমিই পারবে এই শক্ত মানুষটাকে নরম করতে।’ তারপর থেকে বউমা শ্বশুর মশাইকে বোঝাতে শুরু করে; যাদের জন্য তাঁর এতকিছু, সেই তারাই যদি দূরে সরে যায়, তাহলে তাঁর এতদিনের লড়াই বৃথা হয়ে যাবে না? খান সাহেব আকাশ থেকে পড়লেন। দূরে সরে যাবার কথা উঠছে কেন? বউমা বোঝালেন, এত এত বিধি নিষেধ কার ভাল লাগে? রাতে কলা খাওয়া ঠিক না, জিন্সের সাথে পাঞ্জাবী মানায় না, বাসীমুখে চা খাওয়া মোটেই উচিত নয়, কম্পিউটারের সামনে বেশীক্ষণ বসে থাকলে চোখের সমস্যা হবে, দিন-রাত মোবাইলে এত্ত গুঁতাগুঁতি কিসের, ইত্যাদি-ইত্যাদি-ইত্যাদি।

খান সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন। মারুফার স্মৃতিরা তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যাবে? না না, এ কিছুতেই হতে পারে না। বউমা হয়তো ঠিকই বলছে, জীবন একটাই – একবারই মাত্র বেঁচে থাকা। সবসময় অত নিয়ম মেনে না চললেও চলে। হ্যাঁ, এটা ঠিক- ক্ষতি হতে পারে, হলেই বা। কতদিকেই তো কত ক্ষতি হচ্ছে, মাঝে সাঝে একটু অনিয়ম করলে আর কতটুকুই বা ক্ষতি হবে? তাঁর এত শ্রম, এত পরিশ্রম কাদের জন্যে? নিয়ম মেনে আবাদ করেও ফসল পাওয়া না গেলে সেই নিয়মের মূল্য কী? না, এ হতে পারে না। তিনি অবশ্যই এখন থেকে এক আধটু অনিয়ম করা শুরু করবেন। না না, এক আধটু কেন? অনেকদিন তো নিয়ম করলেন, এবার না হয় ভাল ভাবেই অনিয়ম করা শুরু করবেন। তাছাড়া বউমা তো রয়েছেই। সে নিশ্চয় তাঁকে সাহায্য করবে। তবে হ্যাঁ, একটা কথা মনে রাখতে হবে, অনিয়মের মধ্যেও কিছুটা শৃঙ্খলা থাকা চাই।

খান সাহেব সেদিন রাতেই ড্রইংরুমের তালিকাটা নামিয়ে ফেললেন। ছেলের বউ আর ছেলেরা ভ্রু কোঁচকালো। সেখানে নতুন তালিকা উঠেছে। পর্যায়ক্রমিক কর্মসূচী গুলোর এক নম্বরে লেখা রয়েছে, ‘সকাল এগার ঘটিকায় শয্যা ত্যাগ।’

১২ thoughts on “নিয়মী

  1. হা হা হা… দারুন লাগলো নাসির
    হা হা হা… দারুন লাগলো নাসির ভাই। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  2. ভাল লাগলো বললে ভুল হবে সত্যি
    😀 ভাল লাগলো বললে ভুল হবে সত্যি দারুণ দক্ষতার পরিচয় আছে আপনার লিখাতে …… :বুখেআয়বাবুল: :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *