গনতন্ত্রের গনতন্ত্রায়ন

গত ৪ নভেম্বর ভোর ছয়টা থেকে বিএনপি+১৮ দলের ডাকা ৬০ ঘন্টার হরতাল পালিত হল। ১৮ দলীয় জোট গত সপ্তাহেও ৬০ ঘন্টা হরতাল পালন করেছে। এই সপ্তাহের হরতালে দেখলাম গত সপ্তাহের ডাকা হরতালের তুলনায় ঢাকা শহরে অধিকতর যানবাহন চলাচল করছে। সরকারী ও ব্যক্তি-মালিকাধীন দপ্তরসমুহ, ব্যাংক ও অন্যান্য কল-কারখানায় প্রায় স্বাভাবিক কাজ চলছে। এমনকি বিদেশী অথিতিদের হেঁটে বা রিক্সায় চলাফেরাসহ, বিদেশী দূতাবাসের কূটনীতিকদেরও পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে গাড়ীতে করে আসা যাওয়ার মাঝে তাদের স্বাভাবিক চলাফেরায় তেমন উদ্বেগ পরিলক্ষিত হতে দেখা যায় নাই। শুনছি, আগামী সপ্তাহেও এই ধরণের হরতাল অথবা অবরোধের মত কর্মসুচী অচিরেই ঘোষিত হতে যাচ্ছে।

গনতন্ত্রের গনতন্ত্রায়ন
————–
আবু এম ইউসুফ

গত ৪ নভেম্বর ভোর ছয়টা থেকে বিএনপি+১৮ দলের ডাকা ৬০ ঘন্টার হরতাল পালিত হল। ১৮ দলীয় জোট গত সপ্তাহেও ৬০ ঘন্টা হরতাল পালন করেছে। এই সপ্তাহের হরতালে দেখলাম গত সপ্তাহের ডাকা হরতালের তুলনায় ঢাকা শহরে অধিকতর যানবাহন চলাচল করছে। সরকারী ও ব্যক্তি-মালিকাধীন দপ্তরসমুহ, ব্যাংক ও অন্যান্য কল-কারখানায় প্রায় স্বাভাবিক কাজ চলছে। এমনকি বিদেশী অথিতিদের হেঁটে বা রিক্সায় চলাফেরাসহ, বিদেশী দূতাবাসের কূটনীতিকদেরও পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে গাড়ীতে করে আসা যাওয়ার মাঝে তাদের স্বাভাবিক চলাফেরায় তেমন উদ্বেগ পরিলক্ষিত হতে দেখা যায় নাই। শুনছি, আগামী সপ্তাহেও এই ধরণের হরতাল অথবা অবরোধের মত কর্মসুচী অচিরেই ঘোষিত হতে যাচ্ছে।

এইসব হরতালের সময় সারাদেশের সাধারণ চিত্র হচ্ছে; বিরোধীদল হরতাল ডাকবে, কিছু গাড়ী ভাংচুর হবে, পুলিশের সাথে পিকেটারদের সঙ্ঘর্ষে কিছু মানুষ আহত অথবা নিহত হবে, এগুলোর পাশাপাশি সীমিত যনবাহন ব্যাবহার করে সাধারন জনমানুষের পক্ষে যথাসম্ভব স্বাভাবিক কাজকর্ম চলবে, এসব যেন মানুষের সহ্যের মধ্যে ধীরে ধীরে স্থান করে নিচ্ছে। রাজনৈতিক দলের হরতালের কর্মসুচীতে প্রতিদিন কত ধরণের ক্ষতি হয়। এই সপ্তাহের হরতালে ক্ষতি হল প্রায় ৬৩ লক্ষ জেএসসি পরিক্ষার্থীদের। আন্তঃজেলা পরিবহন বন্ধ থাকা এবং শহর ও গ্রামে সীমিত পরিবহন চালু থাকার কারনে আর্থিক ক্ষতির পরিমান দিনে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার উপরে।

কিন্তু, সবসময়য় বিরোধীদলেরা অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও সঙ্ঘর্ষের মাধ্যমে ভীতির সঞ্চার করে ডাকা এই সব হরতালের মধ্যে পতিত সকল্প্রকার ক্ষতিকে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে স্বীকার করে নেয়ার জন্যই তারা জনগণকে পরামর্শ দিয়ে আসছে। এটা কতদুর ন্যায্য অনুরোধ, সেই প্রশ্নে জনগনের মতামতের বিচারে না গিয়ে অনেকটা জোর করেই যেন তাদের উপর এসব হরতালের কর্মসুচী চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে সরকার কিছুটা চাপের মধ্যে থাকলেও, এইসব কর্মসুচীর মাধ্যমে বিরোধীদলের দাবীর প্রতি গনমানুষের সমর্থন কতটুকু প্রতিফলিত হয় সেটা কখনই স্পষ্ট হয় না। সাধারনভাবে যেটা দেখি, মানুষ হরতাল চায় না, কিন্তু হয়তো বিরোধীদলের দাবীর প্রতি জনগনের একাংশের সমর্থন রয়েছে। কেন এই হরতাল ও লাগাতার রাজপথের আন্দোলন? প্রতিদিন কিছু আহত অথবা নিহতের খবর পাওয়া যায়। কেন এসব প্রাণহানী? কেন সাধারন নিরীহ মানুষ এই হরতালের সহিংসতায় অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে এইসব হরতালের দিনে প্রতিদিন ভর্তি হচ্ছে এক একটি নির্দোষ দগ্ধ নারী, শিশু, কিশোর, তরুণ অথবা বৃদ্ধ।

সামনেই জাতীয় নির্বাচন। সকলেরই চাওয়া যেন এই নির্বাচনটি “অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ” হয়। এই অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে, সরকারী দল এবং বিরোধীদলের চলমান বিতর্ক এবং রাজপথে বিরোধীদলের সহিংস আন্দোলন, মুলতঃ এই নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়েই।

সরকারী দল প্রস্তাব রেখেছে যে, ‘সকল দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠন করা। কিন্তু, বিরোধীদল এর বিপরীতে প্রস্তাবটি হচ্ছে, ‘১৯৯৬ ও ২০০১ সনের নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের সদস্যদের থেকে সরকারী দল কর্তৃক মনোনীত ৫ জন এবং বিরোধীদল কর্তৃক মনোনীত ৫ জন অর্থাৎ মোট ১০ জন নির্দলীয় ব্যাক্তিদের নিয়ে একটি নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠন করা এবং যার প্রধান হবেন এমন একজন ‘সম্মানিত নির্দলীয়’ ব্যাক্তি যিনি দুই পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে মনোনীত হবেন। কিন্তু, বিরোধীদলের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের উপযোগী হয়ে উঠতে পারেনি। কেননা ১৯৯৬ ও ২০০১ সনের নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের সদস্যদের মধ্যে মৃত্যু, উপযুক্ত বয়স অর্থাৎ ৭২ বছরের কম বয়সী হওয়া এবং অন্যান্যদের সম্মতির অভাবে সেই দশজন সদস্য সরকার গঠনের জন্য পাওয়া যায় নাই। একই কারনে তাদের মধ্য থেকে সম্মত একজনকে “প্রধান উপদেষ্টা” হওয়ার বাস্তবতাও আর থাকে নাই।

কিন্তু, তারপরও উপযোগী ও কার্যকর কোন সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ছাড়াই বিরোধীদল তাদের দাবীর প্রতি অনঢ় থেকে, সংবিধানে সেই সুযোগ উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও “নির্দলীয়” ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের দাবীতে রাস্তায় একের পর আন্দোলন ও হরতালের কর্মসুচী দিয়ে যাচ্ছে। কেননা, তারা যেটা মনে করছে এবং জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, যে “নির্দলীয়” ব্যক্তিরা “নিরপেক্ষ” এবং তাই জাতীয় নির্বাচনের সময় একমাত্র তারাই একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের লক্ষ্যে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগীতার সমান সুযোগের একটি সমতল ক্ষেত্র নিশ্চিত করতে পারে।

এখানে বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানে দুই পক্ষের ‘নিরপেক্ষতা’ শব্দটির বোধগম্যতা ও ব্যাখ্যার মধ্যেই বিস্তর ফারাক লক্ষণীয়। গনতন্ত্রের ধারনায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং জনগনের কাছে তাদের কার্যকলাপ ও কর্মকান্ডের জন্য সেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার প্রশ্নটি ওতোতপ্রতভাবেই জড়িত। কিন্তু “নির্দলীয়” ব্যক্তিদের জাতীয় নির্বাচনের মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যদিও অর্পণ করা যায় কিন্ত তাদের কর্মকান্ডের জন্য কোনরূপ জবাবদিহিতার আওতায় আনার কোন বিধি-বিধান নেই, অথবা সেই বিধি-বিধান করার কোন প্রস্তাবও কোন পক্ষের থেকে দেয়া হয়নি। সেই কারনে, প্রস্তাবিত “নির্দলীয়” ব্যক্তিদের নিয়ে সরকার গঠন গনতন্ত্রের মূল চেতনার সাথে সাঙ্ঘর্ষিক।

কিন্তু, গত ১৯৯৬ সনের জাতীয় নির্বাচনের সময় আজকের সরকারী দল ঐ “নির্দলীয় তত্ব্বাবধায়ক সরকার’এর অধীনেই জাতীয় নির্বাচনের দাবী করেছিল এবং বর্তমান বিরোধীদলকে একরকম বাধ্য করেছিল ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ব্যবস্থা সংবিধানে সংযোজন করে সংসদে আইন পাশ করতে। সরকারী দল এটা দাবী করেন যে, উক্ত বিগত সময়ে কয়েকটি উপ-নির্বাচন এতই একতরফা ও অগ্রহনযোগ্য হয়েছিল যে, সেই পরিস্থিতিতে তারা “নির্দলীয়” সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েছিল এবং তখন এই দাবীর পক্ষে একধরণের জাতীয় ঐক্যমত সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু, এখন ২০০৯ পরবর্তী এই সরকারের আমলে যেহেতু, সকল উপ-নির্বাচন অথবা কয়েক হাজার স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, তাই সরকারীদল দাবী করছে যে, সেই “নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকার” পদ্ধতির আর প্রয়োজন নাই। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং “সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন” সরকারের অধীনে স্বাধীনভাবেই একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে সক্ষম।

১৯৪৭-৭১ সন, এই ২৩ বছর পাকিস্তান আমলের শাসনে আমরা দেখেছি যে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র কোন সময়ই ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিরঙ্কুশভাবে দেশের শাসন পরিচালনা করতে দেয় নাই। বার বার সংবিধানে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে এবং সাধারন মানুষের ভোটের অধিকার অস্ত্রের জোরে কেড়ে নেয়া হয়েছে। ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা এবং সামরিকতন্ত্র এই তিনের মিলিত ষড়যন্ত্রে দেশে গনতন্ত্র বিকশিত হওয়ার কোন সুযোগ দেয়া হয়নি।

যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানী শাসকের সশস্ত্র আক্রমনের মুখে পরে বিদ্রোহী হয়ে একসময় জনগনের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরে। যেই যুদ্ধে শহীদ হয় তিরিশ লক্ষ প্রাণ এবং হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী এবং তাদের দোসরদের হাতে নিগৃহীত হয় প্রায় আড়াই লক্ষ নারী। বাংলাদেশের জনগনের এই আত্মদান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কারন এটাই এবং যে কারনে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রণীত ১৯৭২ সনের সংবিধানের মৌলভিত্তি এটাই যে, (১) প্রজাতন্ত্রের সকল মালিক হবে জনগন, এবং (২) জনগনের এই সার্বভৌম ক্ষমতা কেবলমাত্র জনগণ দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিনের মাধ্যমে পরিচালিত হব, এবং (৩) স্বাধীন বাংলাদেশে সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার থাকবে।

১৯৭৫ সনের পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে পুনরায় সামরিক শাসন, মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িকতার পুনরুত্থান এবং পাকিস্তানী জেনেরাল আইয়ুব খানের আদলে পাকিস্তানী কায়দায় বেসামরিক চেহারা নিয়ে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত নেপথ্যের শাসকগোষ্ঠির অনির্বাচিত অথবা প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সামরিক আমলাদের শাসনের মাধ্যমে জনগনের রক্তে ভেজা সংবিধানের ঐ মৌলভিত্তিকে পদদলিত হতে দেখেছি।

৯০’এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ২১ বছরের ব্যবধানে দেশের শাসনভার গ্রহন করার সুযোগ গ্রহন করার ফলে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট মুক্তিযুদ্ধের সেই কাঙ্খিত মৌলভিত্তি সংবিধানে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় উজানের সকল প্রতিকুল শক্তিকে ঠেলতে ঠেলতে ক্রমে ক্রমে অগ্রসর হয়ে আজ আমরা যেই সময়ে এসে দাড়িয়েছি সেই সময়ে আমাদের অর্জন এই যে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট সংবিধানের মৌলভিত্তির ন্যায্য ব্যাখ্যার আলোকে একে একে অনির্বাচিত সরকারের বৈধতাকারী সংযোজনসমুহ অর্থাৎ সংবিধানের ৫ম, ৮ম এবং ১৩তম সংশোধনী বাতিল করেছে। এতদসঙ্ক্রান্ত রায়ে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা সুপ্রীম কোর্টের মাননীয় বিচারপতিগন দিয়েছেন। এটা অনুধাবন করার বিষয় এই যে, এইসকল রায়ের আকাঙ্খ্যার সাথে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন লক্ষ শহীদের আত্মদান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও দীর্ঘ সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশিত পথ থেকে বিচ্যুত পথ অতিক্রান্তের পর গনতন্ত্রের সম্মুখযাত্রার জরুরী প্রশ্নটি এই নির্বাচন কালীন সরকার নিয়ে বিতর্কের যুক্তি ও পাল্টাযুক্তির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন তাহলে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদানকারী দল আওয়ামী লীগই বিগত ১৯৯৬ সনে কেন সেই অসাংবিধানিক “নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকার’এর দাবী তুলেছিল এবং সেই দাবীতে তীব্র গণআন্দোলন করেছিল? এবং যার ফলে গত ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৯ সনে ঐ নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির অধীনেই তিনটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল। কিন্তু, আজ কেন সুপ্রীম কোর্টের রায়ের দোহাই দিয়ে, যেখানে সুপ্রীম কোর্ট তাদের রায়ে আরো দুইবার ঐ একই পদ্ধতিতে নির্বাচন করার ব্যাপারে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে আপত্তি করেনি অথচ সেই অনাপত্তি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে এতদসংক্রান্ত সম্পূর্ণ আইনটিকেই সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করলো? তারাই কি তাহলে আজ এই রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করার জন্য দায়ী নয়?

এটা ঠিক, বর্তমান সরকারী দলের উদ্যোগে যে পঞ্চদশ সংশোধনী সংবিধানে আনা হয়েছে তার অনেক কিছুই আছে যা কিনা, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মৌল চেতনার সাথে সাঙ্ঘর্ষিক। সেই সংশোধনীসমুহ বাতিলের সংগ্রাম অব্যাহত রাখার মধ্য দিয়েই আমাদের অগ্রসর হওয়া ন্যায্য এবং যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু, সেটা কি ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পক্ষের যুক্তিকে নাকচ করে? আমি সবচেয়ে বেশী আহত হই যখন পঞ্চদশ সংশোধনীকে সমালোচনা করতে গিয়ে তার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক অংশকে যথার্থভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ না করেই যখন কেউ ঢালাওভাবে সামগ্রিকভাবেই এই পঞ্চদশ সংশোধনীকে উদ্দেশ্যমূলক সরকারীদলের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একটি প্রচেষ্টার মধ্যে তাদের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণকে গুলিয়ে ফেলেন।

তারা অনেকেই যুক্তি দেখান যে, বাংলাদেশের প্রশাসণে রাজনৈতিক মেরুকরণ এই পর্যায়ে বিদ্যমান যে, একটি “নির্দলীয়” নির্বাচনকালীন তত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন কমিশনের পক্ষে একটি “অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু” নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়। কিন্তু, আমার প্রশ্ন তাদের কাছে এই যে, বিগত তিনটি “নির্দলীয়” নির্বাচনকালীন সরকারের ভূমিকা কি প্রশ্নাতীত?

দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে যেমন “নির্দলীয়” নির্বাচনকালীন সরকারসমুহ সমালোচিত হয়েছে, একইভাবে এইসব “নির্দলীয়” নির্বাচনকালীন সরকারের তরফ থেকে সংবিধান ও আইন অমান্য করে এমন সব “উচ্চাভিলাষী” কর্মকান্ড করা হয়েছে যা কিনা গনতন্ত্রের জন্য ছিল ক্ষতিকর ও হূমকিস্বরূপ। দুই একজন “উপদেষ্টা’এর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও কোন কোন ক্ষেত্রে উল্লেখিত হয়েছে। কিন্তু, এইসকল “নির্দলীয়” ব্যক্তিদের কখনই কোনরূপ জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা যায় নি, কেননা আইন ও সংবিধান সেইরূপ কোন জবাবদিহিতার বিধান অথবা প্রতিবিধান করতে সক্ষম নয়।

যে বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের অগ্রগতি একমাত্র কোন একটি রাজনৈতিক দলের কাছে অথবা কোন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকা না থাকার মধ্য দিয়ে নির্ভর করে না। দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সংস্কৃতিক অগ্রগতি নির্ভর করে দেশের সাংবিধানিক শাসনপদ্ধতির সাথে জনগনের সার্বক্ষনিক চলমান গনতান্ত্রিক অংশগ্রহন এবং জবাবদিহিতার চর্চা। আমি মনে করি না, যদি আগামী নির্বাচন “সর্বদলীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি’এর মাধ্যমে গঠিত সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় তবে নির্বাচন অথবা নির্বাচনের ফলাফল বিতর্কের উর্দ্ধে থাকবে। অতীতে যেমন ‘নির্দলীয় অনির্বাচিত জবাবদিহিহীন” সরকারের অধীনে নির্বাচনও বিতর্কের উর্দ্ধে থাকেনি।

কিন্তু, এই বিতর্কের মাঝেও “সর্বদলীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি’ দের নিয়ে গঠিত সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সেই নির্বাচনের গুনাগুন নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হতে পারে। তাই, এই যুক্তি একেবারে পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না যে, জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে গনতন্ত্রের এতটুকু গনতান্ত্রায়ণ প্রকৃতপক্ষে জাতীয় নির্বাচন’এর পদ্ধতিগত প্রশ্ন নিয়ে যে ইতিবাচক প্রক্রিয়ার সুচনা ঘটাবে সেই চলমান প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবং দলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও সুদুরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে সহায়তা করতে পারে। সবসময়য় “নির্দলীয়” তত্ব হাজির করে প্রকৃতপক্ষে আমরা গনতন্ত্রের গনতান্ত্রায়ণের এই প্রক্রিয়ার সুচনালাভের পথেই অন্যায্যভাবেই বাধা সৃষ্টি করে চলেছি। গনতন্ত্রের গন্তন্ত্রায়ণের প্রক্রিয়ার সুচনা ঘটানোর পথে বাধা সৃষ্টি না করে এই প্রক্রিয়ার সুচনা ঘটনোর অপরিসীম মূল্য বোঝার চেষ্টা আমাদের দেশের সমাজ সচেতন নাগরিকেরা অনুধাবন করার চেষ্টা করবেন বলে আমি আশা রাখছি।

৭ thoughts on “গনতন্ত্রের গনতন্ত্রায়ন

  1. ভাল ও যৌক্তিক বিশ্লেষন
    ভাল ও যৌক্তিক বিশ্লেষন ।

    //বিগত তিনটি “নির্দলীয়” নির্বাচনকালীন সরকারের ভূমিকা কি প্রশ্নাতীত?//
    – এই প্রশ্নটা আমার ও ।

    যেহেতু নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার স্থায়ী কোন ব্যবস্থা নয় এবং আগামী নির্বাচনগুলিতেও ব্যবহার অযোগ্য(আদালতের নির্দেশনা হেতু) সেহেতু গণতন্ত্রের প্রকৃত গণতন্ত্রায়নের জন্য আজ হোক কাল হোক তত্ত্বাবধায়কের বিকল্প ব্যবহার করতেই হবে, যে কেউ একজনকে তো শুরু করতেই হবে ।সুতরাং এই বিকল্প ব্যবহারটি যত তাড়াতাড়ি শুরু করা যাবে ততই দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গল ।

    1. আপনি যে কষ্ট করে সময় নিয়ে
      আপনি যে কষ্ট করে সময় নিয়ে নিবন্ধটি মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন এবং সুন্দর মন্তব্য করেছেন, এজন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা !

  2. ইউসুফ ভাই,
    অসাধারণ

    ইউসুফ ভাই,
    অসাধারণ বিশ্লেষণধর্মী লিখা। আপনার কাছে আরও লিখা চাই… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: আমাদের প্রজন্মের কাছে আপনাদের দেয়ার মত অনেক তথ্যই আছে, আশাকরি সব শেয়ার করবেন।
    ইস্টিশনে স্বাগতম… :গোলাপ: :গোলাপ: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :ফুল: যদিও আপনি ইস্টিশনে আছেন ৩২ মাস ধরে তবুও এইটা আপনার ৩য় পোস্ট বলে স্বাগতম জানালাম। আশাকরি নিয়মিত হবেন!! :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি:

    এইবার পোস্ট নিয়ে কিছু বলি। আপনি পয়েন্টত্রয় আলাদা করে বুলেট আকারে দিলে আরও সুখপাঠ্য হত পোস্টটি তাছাড়া প্যারার সংখ্যা কম হওয়ায় বড় লিখা পড়তে অনেকেই অধৈর্য হয়ে পারবে।

    আর আমার মনে হয় হরতালের জন্য এখন সরকারের কিছু আচরণবিধি করে দেয়া উচিৎ। কি কি করা যাবে আর কি কি করা যাবে না অথবা কীভাবে আন্দোলন করতে হবে প্রয়োজনে তাও নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে। কিছুদিন আগে আমরা যখন গণজাগরণ মঞ্চ থেকে হরতাল পালন করেছি তখন দেখা গেছে সকল ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে গীটার-বাদ্যযন্ত্র নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনকারীরা কোন প্রকার সহিংসতা ছাড়ায় হরতাল সফল করেছে। আন্দোলনের ভাষা কখনও এই সভ্য সমাজে অসভ্যের মত হতে পারে না।

    অন্যদিকে নির্বাচন করা নিয়ে আমাদের রাজনৈতিকরা কখন বিদেশ থেকে পরামর্শক নিয়োগ করে বড় বড় ব্রিজ নির্মাণের মত তাই দেখার অপেক্ষায় আছি…

    1. অনেক ধন্যবাদ। চেষ্টা করবো
      অনেক ধন্যবাদ। চেষ্টা করবো ইষ্টিশনে নিয়মিত হতে। লেখা সম্পর্কে আপনার পরামর্শ এবং মন্তব্য যথার্থ। চেষ্টা করবো লেখা পাঠের সুবিধার্থে প্যারাগুলোর মাঝে স্পেস দিয়ে দিয়ে পয়েন্টগুলোকে হাইলাইট করে লেখার। শুভেচ্ছা রইল।

  3. চোরে কি আর ধর্মের কাহিনী
    চোরে কি আর ধর্মের কাহিনী শুনবে? এদের কানে যতোই ধর্মের গীত গাইবেন, কোন লাভই হবে না। খামাখা…

    ভীষণ বিরক্ত। :দেখুমনা:

    1. চোর যখন ধর্মের কাহিনী শোনে না
      চোর যখন ধর্মের কাহিনী শোনে না তখন যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হয়। গনতন্ত্রে জবাব চাওয়ার যেমন ব্যবস্থা রয়েছে, জবাব দেয়ারও ব্যবস্থা করে নিতে হয়। শুভেচ্ছা !

  4. লিংকন ভাইর এই অংশটির
    লিংকন ভাইর এই অংশটির //হরতালের জন্য এখন সরকারের কিছু আচরণবিধি করে দেয়া উচিৎ। কি কি করা যাবে আর কি কি করা যাবে না অথবা কীভাবে আন্দোলন করতে হবে প্রয়োজনে তাও নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে।//
    সাথে সহমত পোষণ করলাম ।যেহেতু গণতান্ত্রিক অধিকারের বলে হরতাল নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয় সেহেতু ইহা পালনে কিছু নীতিমালা বেধে দেয়া যেতে পারে ।বিশেষ করে হরতালের সময় মানুষ হত্যা, ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নসংযোগ, সম্পদহানি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে ।এ ক্ষেত্রে উক্ত অপরাধের অপরাধী হিসেবে হরতাল আহবানকারী দল বা ব্যাক্তিকে ফৌজদারী আইনে অভিযুক্ত করা যেতে পারে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *