ফার্মগেটের ছোট পার্ক, মানুষের ভিড়ে মাদক

অনেক সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে হল থেকে হেঁটে হেঁটে ফার্মগেট চলে গেলাম। লক্ষ্য তেমন গুরতর কিছু না। শুধুই হাঁটাহাঁটি। তো হাঁটতে হাঁটতে ফার্মগেটের ছোট্ট পার্কটার ভিতর গেলাম। পার্কের অবস্থা খুবই খারাপ। যে যার মতন পরিবেশ নষ্ট করে যাচ্ছে। চোখ বুলালেই শুধু প্রস্রাব আর তার গন্ধ। মাঝে মাঝে হাগুও দেখা যায়।অবস্থা এমন, ফার্মগেট এসে কারও প্রস্রাব চাপলেই,এই কর্ম সম্পাদানের সরকারি জায়গা এই পার্কের গাছের তলা, ঝোপঝাড়। যাই হোক,হেঁটে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে একটা বেঞ্চের উপরে বসলাম। বেঞ্চে আমি একাই। আশে পাশের মানুষ দেখছি। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাম্প্রতিক পারফরমেন্সে দেশবাসীর সব ক্রিকেটার হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এই ছোট পার্কের সব টুকু জুড়ে শুধু পিচ্চি,তরুণ, যুবক,বুইড়া ক্রিকেটারে ভরা। মাথায় চিন্তা আসল গুনে দেখি কয় সেট ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। গুনে দেখলাম ২৩ সেট ক্রিকেট খেলা চলছে এতটুকু জায়গায়। কোন জন যে কোন দলের ফিল্ডার আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব না।যে যেখান দিয়ে পারে খেলে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ ব্যাট বল নিয়ে জায়গা খুঁজছে।সবচেয়ে মজার জিনিস হল স্ট্যাম্প। কারও স্ট্যাম্প আসলেই স্ট্যাম্প, কারওটা ব্যাট, কারও টা পার্কের বেঞ্চ, কারও পার্কের গাছ আবার কারও দুই জুতা। আমি আবার ফিরে আসলাম যেই বেঞ্চ এ বসেছিলাম সেখানে। সামনেই এক জোড়া প্রেমিক প্রেমিকা।যাবার আগেও দেখে গেলাম, হাত ধরে বসে আছে। এসে দেখি দুজনই দাড়িয়ে। মেয়ে যেন চিৎকার করে কি বলে যাচ্ছে। সাথে ছেলেও চিৎকার করছে। খানিক পর মেয়েটা ছেলের হাত থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল। নিশ্চিত ব্রেক আপ।তাদের ব্রেক আপে আমার কিছু যায় আসে না। আমার যায় আসে আমার নখ বড় থাকলে। আমি ব্যাগ থেকে নেল কাটার বের করে হাতের নখ কাটা শুরু করলাম। ডান হাতের ২ টা কালই কেটেছি। আজ বাকিটা। একটু পরেই আমার পাশে এসে ২ জন লোক বসল। পার্কে বোধহয় আর জায়গা নেই তাই।তাদের কথা বার্তায় বোঝা গেল, একজন এখানে নিয়মিত আসে। অন্যজন নতুন। হরতালের দিন। একটু পর পর র‍্যাবের গাড়ি যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। তাদের নজর গাড়ির দিকে না। গাড়ির মহিলা র‍্যাবের দিকে। তাদের বিশাল টেনশন এই মহিলা হরতালে দৌড়ায় কি করে। এই ব্যাপারে কিছুক্ষণ আলোচনার পরই আলোচনা চলে গেল মহিলা পুলিশে। মহিলা পুলিশের শরীরের নানা রকম বর্ণনা দিয়ে লোকটা বললেন, মহিলা পুলিশ নাকি সারাদিন সরকারি টাকায় ফোনে কথা বলে। তাই তার মনে খুব ইচ্ছা একটা মহিলা পুলিশের সাথে প্রেম করা। কিন্তু কারণটা আমি ঠিক বুঝতে পারি নায় , কেন তার এতো শখ, মহিলা পুলিশের সাথে প্রেম করার। যাই হোক, আমার তা জেনে লাভ নেই, আমি নখ কাটায় মনযোগী।একটু পর তাদের একজন, এক পাগল ধাঁচের লোককে ডাক দিল,
– পাগলা, ঐ পাগলা এইদিকে।

পাগলা আসল। নতুন লোকটাকে পাগলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হল। বলা হল,তোমার কুষ্টিয়া চুয়াডাঙ্গার লোক।
পাগলায় আবার জিজ্ঞেস করল, বাড়ি কই?নতুন লোক একটু ভয়ে ভয়ে বলল, আলমডাঙ্গা। ব্রিজের পাড়ে।
– ও , চিনি আমি। গেছি অনেক।

পাগলাকে জিজ্ঞেস করা হল, পাগলা কেমন আছে। পাগলা বলে, এই তো বাবা খেয়ে আছে আর কি। বাবা মানে ইয়াবা। এরা যতটা সম্ভব বাবাই বলে একে। সব নেশার বাবা বলে এমন হতে পারে।
পাগলাকে জিজ্ঞেস করা হল, সাথে কিছু আছে কিনা।
পাগলা বলল ১৫০ টাকার তামাক আর গাঞ্জা আছে। বাবাও আছে অল্প। লোকটা মানিব্যাগ বের করে ৪০ টাকা দিয়ে বলল, ভাল দেখে ৪০ টাকার তামাক দাও। পাগলা একটা পলিব্যাগ থেকে তামাক বের করল। গুণে গুণে কয়েকটা কি যেন দিল। হয়ত এগুলাই তামাক। লোকটা বলল, ভাল দেখে দিও।পাগলা বলে, তুমি আমার দেশি মানুষ, তোমারে বেশিই দিমু।
তামাক দেবার পর , আর এক লোক এসে পাগলাকে বলল, আছে নাকি?
– হ, কয়টা দিমু।
– ২ টা দাও।

পাগলা একটা গোল্ডলিফ সিগারেটের প্যাকেট বের করল। সিগারেটের ভিতর নাকি গাঁজা ঢুকানো, পাশের লোকের কথায় বুঝলাম। পাগলা দেশীকেও ২ টা গাঁজা ভরা সিগারেট দিল। বাবা দেখার সৌভাগ্য আমার হয় নি। আমার ওসব দেখলে হয় না। আমার নখ কাটা জরুরি। আমি নখ কাটতে লাগলাম। মানুষে গিজ গিজ এই ছোট পার্ক। তরুণ খেলোয়াড়, কোচিং শেষ করা ছেলে মেয়ে, চাকরি খোঁজা যুবক, ফেরিওয়ালা, কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমান কিছু মহিলা, কিছু প্রেমিক প্রেমিকা, কিছু পেপার পড়া বৃদ্ধ,আরও নানা রকম লোক,আর সাথে ঘেউ ঘেউ করা কিছু কুকুর।এতো লোকের মাঝেও এই কাজ চলে যাচ্ছে। কিছু বলার নেই, ধ্বংস হচ্ছে আমার সমাজের মানুষ, আমাদের যুবক শ্রেণি, আমাদের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া তরুণ সমাজ।কয়েক টানের সিগারেট থেকে, হেরোইন ,মদ ,গাঁজা ,বাবা( ইয়াবা)। মাঝে মাঝেই দেখি ছোট ছোট ছেলেরা মুখে সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চলে যায়। সেদিন দেখলাম সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে এক মেয়ে সমানে সিগারেট টানছে ছেলে বন্ধুদের সাথে। আমরা মুখ বুজে তা দেখতে পারি কিছু বলতে পারি না। তাদের কাজ তারা করছে, নিজেদের জীবন নিজেরা নষ্ট করছে, তাদের কিছু বলতে গেলে এই কথা শুনতে হয়। সিগারেট খাবার কথা মানা করলে হাসির পাত্র হতে হয়। সিগারেটে কিছুই হয় না এটা তাদের ধারণা। কিন্তু সিগারেটে অনেক কিছুই হয়, সিগারেট থেকে বাবা, হেরোইন পর্যন্ত যায়। আর এই এসব নেশাগ্রস্থ মানুষরাই একটার পর একটা অপরাধ করে যায়। ঢাকা শহরে এখন একটা সহজ চিত্র রাতের বেলা প্রাইভেট কারের জানালা থেকে হাত বাড়িয়ে, রিকশা বা হেঁটে যাওয়া পথচারির ব্যাগ বা পার্স চুরি করা। প্রাইভেট কারে চোর থাকে না। এরা বখে যাওয়া উচ্চবিত্ত বাবা মায়ের সন্তান। নেশা খোর সন্তান।এদের অভ্যাস এমন ভাত ছাড়া থাকতে পারবে , নেশা ছাড়া না, সিগারেট ছাড়া না, গাঁজা ছাড়া না। যারা সিগারেট খাচ্ছে তাদের খুব সহজে ফিরে আসা সম্ভব, আমি তাই আমার সিগারেট খাওয়া বন্ধুদের প্রায়ই বলি এটা বাদ দে। এরা উল্টা আমাকে কথা শুনায়। যাই হোক, যে মানুষ বখে যায়, সে মানুষের মনটাও বখে যায়।নেশা করা ভাল কিছু না। শরীরের ক্ষতি ছাড়া কিছু না।বাবা মায়ের চোখে খারাপ হওয়া ছাড়া কিছু না। কষ্ট কখনও নেশা ভুলাতে পারে না।বরং বাড়াতে পারে। পরিবারের কষ্ট, নিজের কষ্ট।ছোট্ট একটা জিনিস বাদ দিলে যদি পরিবারের মুখে হাসি ফুটে, লোকে ভাল বলে, আড় চোখে , ঘৃণার চোখে না টাকায় বাদ দিতে সমস্যা কি? ভেবে দেখা উচিৎ, যারা এভাবে নিজেদের শেষ করছে। আমি নখ কাটতে কাটতে হাঁটতে লাগলাম। দল বেঁধে মানুষ পার্কের ভিতর প্রস্রাব করছে, পরিবেশ নষ্ট করছে। আর ঐ দিকে ঐ বেঞ্চটার ওখানে প্রতি টানে টানে মানুষগুলো নিজের ভিতরটা নষ্ট করছে। দিন দিন ঐ ঘেউ ঘেউ করা কুকুর গুলোর সমতুল্য হচ্ছে।

৫ thoughts on “ফার্মগেটের ছোট পার্ক, মানুষের ভিড়ে মাদক

  1. বিড়ি বুড়ি খাওয়া নিয়েও দেখি
    বিড়ি বুড়ি খাওয়া নিয়েও দেখি আপনার আপত্তি !!! বিড়ি থেকে নাকি গাঞ্জা, বাবা, হেরুইন পর্যন্ত চলে যায় পুলাপাইন !!! আমার বাপ তো এক জীবন বিড়ি খাইয়া পার কইরা দিলো, কোনদিনও তারে উৎপাটং মার্কা কিছু খাইতে দেখি নাই। বহু মানুষ চিনি আমি এই রকম। পুলাপাইনের বিড়ি খাওয়া নিয়ে আপনার এতকাল মনে হয় আপত্তি আসিলো না, যেই দেখসেন মাইয়া হয়া বিড়িতে টান দিসে, অমনি আপনার দেশের ভবিষ্যতের কথা ভাইবা দিল কাইন্দা উঠলো !!! আরে ভাই, বিড়ি যে খায়, সে অবশ্যই বেকুব না। বিড়ির ক্ষতির দিক সে ও জানে। খায়া মরতে চাইলে কার কি?
    শুরু করসিলেন পার্কের হাগা মুতা দিয়া। নিজেও কিন্তু পার্কে বইসা নখ কাটসেন। আপাত দৃষ্টিতে সেইটা কিছুই না, কিন্তু সিভিক সেন্সের হিসাবে খুবই নোংরা কাজ করে আসছেন। খুব খিয়াল কৈরা…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *