দাঁড় কাকের গল্প ( আকাশঃ পর্ব-১)

জীবন সবসময় অনেক বেশি সুন্দর ছিল। অনেকটা মেধাবী ছাত্রের ট্যাগ লাগিয়েই এসএসসি পরীক্ষা শেষ করলাম। আর স্কুলেও অনেক বেশি সুনাম ছিল। কলেজে এসে ঘটতে থাকে একের পর এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা। ঢাকা সিটি তে পড়াকালিন সময় এত কিছুর মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি, ফলাফল টেস্ট পরীক্ষার আগে কলেজ থেকে বের হয়ে যেতে হল। ভতি’ হয়েছিলাম ঢাকা কলেজে এক লক্ষ টাকার ডনেশনের বিনিময়। এই কলেজে কোন দিনও ক্লাস করিনি।যাই হোক ওইসব বাধা শেষ করে কলেজের গন্ডি পেরেয়ে এলাম। সবাই যখন ভতি’ পরীক্ষা নিয়ে ভয়াবহ ব্যস্ত তখন আমার সময় কাটত ফেইসবুক আর জামা’নীতে পড়াশুনা করার সপ্ন নিয়ে। বাবার অত টাকা পয়শা ছিল না যে ইউরোপ অথবা আমেরিকায় সেলফ ফান্ডিং এ পড়াতে পারবে। তাই ভাবলাম নাজির দেশ থেকে একটা ভাল ডিগ্রি নিয়ে আসলে দেশে ভাল কিছু করা যাবে। পরে যখন ওখানের প্রতিকুলতার কথা শুনলাম বাদ দিলাম পুরো প্রক্রিয়া।
একে এক পাবলিক ইউনি তে পরীক্ষা দিলাম, ঢাকা ইউনি এবং চিটাগাং ইউনিতে চান্সও পেলাম। ভতি’ হই নি। ইচ্ছা ছিল ইঞ্জিনিয়ারিংই পরব আরো অনেক কারন যেগুলোতে পরে আসা যাবে। সবকিছু বিবেচনা করে নথ’ সাউথে ভতি’ হব বলে ঘোসণা দিলাম। কিন্তু এর মাঝে দিয়ে এমন কিছু ঘটে যে নিজের জীবনটা পুরোপুরি বদলে যায়। কখনো ভাবি নি কারো মোহে পরবো। আমার এক ফ্রেন্ড একটা মেয়ে কে পছন্দ করত। আমি দেখে যখন থেকে কথা বলা শুরু করলাম তখন থেকে ওই ফ্রেন্ডটা আর ওই মেয়েটার দিকে নজর দেয় নি। নিজেকে তেমন কিছুই ভাবি না কিন্তু কোন মেয়ের প্রতি কোন সময় মোহ ছিল না। যা ছিল আসবে আর চলে যাওয়ার মত ছাড়া আর কিছু না। কিন্তু পরিশেষে মাহেয়া জেসিন নামে তার প্রেমে পড়ে যাই যাকে মোহ বলতেই বেশি সাচ্চন্দ্যবোধ করি। এখনকার দিনের রিলেশন শীপের মতই শুরু হলো। অনেকটা ফিল্মি স্টাইলে প্রপোজ করবো বলেই প্লান করি। আরো দুইজন ফ্রেন্ড ছিল তাদের সাথে শেয়ার করেই প্লান করতে থাকি। এর মাঝে দিয়ে আবার ব্রাকের দিকে মুভ করি। পরীক্ষা দিয়ে ভতি’ও হয়ে যাই। একদিন রাতে মাহেয়া আচঁ করতে পারে যে আমার মনে তাকে নিয়ে লুতু পুতু চলছে। সে ওইদিন রাতেই জিজ্ঞাসা করে, এবং সবকিছু পজিটিভলিই নিল। ওইদিন থেকে বেশ অনেক দিনই আজকাল রোমান্সের মতই চলতে থাকে, রাতের বেলায় ফোনালাপ। এপ্রিলের মাঝামাঝি নববষে’র ঠিক আগের দিন ফোনালাপের সময় হঠাত কোন এক পরপুরুষ ফোনের মাঝে কল দিতে থাকে। তখন আমিই বলিলাম সেই পরপুরুষ টিকে চুপ করিয়ে দিতে আর শান্তিমত কথা বলতে চাই। ওইদিন রাতে তার জন্য আর কথা হল না। এর পরের থেকেই শুরু উত্তর দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাওয়া। হঠাত করেই কেন যানি হাওয়া বদল হতে লাগলো। কিন্তু পরে ঠিক হয়ে যাবে বলে আসা করতে থাকি। এভাবে এপ্রিলের শেষের দিকে পরিস্থিতি একদম ভয়াবহ পযায় আমি, ঝুলন্ত অবস্থায়ও রই নি আর নিচে পড়েও যাই নি। মাঝামাঝি এক স্থান থেকেই অক্সজেন নিচ্ছিলাম, এভাবে মাস চলে যায়। মে মাসের মাঝামাঝি , ইউনি এর জীবন শুরু হয়ে যায়। আমার যাওয়ার কথা ছিল জামা’নী সব কিছু বাদ দিয়ে ব্রাকে চলে আসি তার জন্য। চাইলেই তখন জামা’নী চলে যেতে পারতাম। ইন্টারভিউ তে গিয়ে আমিই বলে দিয়ে আসি আমার ভিসা লাগবে না (যেটা আজই প্রথম শেয়ার করলাম) ওরিয়েন্টেশনের শুরুর দিন মাহেয়া এর সাথে যেভাবে ছিলাম তা মনে হচ্ছিল সপ্নের মত। ওই সময় থেকে মনে হয়েছিল ও হয়তোবা ফিরে আসবে, অথবা সে ফিরে আসবেই। এভাবেই চলতে থাকে দিনকাল। ক্লাস শুরু হয়ে যায়। মে মাসের শেষের দিকেই মাহেয়া আমাকে জানিয়ে দেয় সে সেই পরপুরুষ কে মনে হয় লাভ করে। আমি এখানে বলে রাখি, তাকে নিয়ে কিছু চিন্তা করার ৩ মাস আগে থেকে শুধুমাত্র এই প্রশ্নটাই জিজ্ঞাসা করতে থাকি ‘’কাউকে কি পছন্দ করে নাকি’’’ বার বার মনে হয় হাজার বার। এর পর থেকে সে আমাকে শুধু ফ্রেন্ড হিসেবেই নেয়, তাও মেনে নিলাম। জুন মাসের শুরুর দিকে তারিখটা ছিল ১৫ই জুন, ওইদিন মাহেয়া এর সাথে অনেক কথাই হয়, আমাকে এমন অনেক কিছুই শুনায় যা শুনে আর থাকা যায় নি, সিদ্ধান্ত নিলাম আত্তাহুতির। কিন্তু মা বাবার কথা চিন্তা করে তার বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ ছাড়ার প্লান করি। সবসময় এর মত উদ্ভট আর উলটা পালটা কাজ থেকে নিজেকে বের করতে পারি নি। পরবতী’ দশ দিনের মধ্যে ফাইল সহ সবকিছু রেডি হয়ে যায় সায়মন সেন্টারে জমা দেওয়ার জন্য। ইউনিভাসি’টি অব বাফেলোতে আগে এপ্পলাই করেছিলাম, পড়ে আই-২০ তে টিউশন ফিস দেখে আর ফুল স্কোলারশীপ না থাকার কারনে আর অগ্রসর হই নি, তাই উইশিতা দিয়েই অগ্রসর হই। ১০ই জুলাই এম্বাসিতে ডেট পরে। ৯ জুলাই পয’ন্ত তার সামনে পিছে দিয়ে ঘুরেছি বুঝানোর জন্য ‘SOMETHING WILL GO WRONG SOON’ PLEASE RESPOND. সে আর রিস্পোন্ড করলো না। ১০ই জুলাই এম্বাসিতে যাওয়ার আগেও তাকে একবার ফোন দিয়েছিলাম, ধরলো না। এম্বাসিতে গেলাম ভিসা দিয়ে দিল তেমন কিছু জিজ্ঞাসা না করেই। আর সাথে সাথে বিদায়ের ঘন্টা বাজতে থাকে। ১৬ তারিখ মাহেয়া কে বলি যে আমি চলে যাচ্ছি। ২১-২৩ তারিখ মাহেয়া এর আচরন দেখে মনে হচ্ছিল, সে ফিরে আসবে। হয়তোবা আসবে। আমার সিদ্ধান্তটা ভুল হয় নি। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। আমাকে চলে যেতে হবে বাংলাদেশ ছেড়ে ২৪ শে জুলাই। সব কিছু ঠিক হয়ে গেছে। অনেক বাধা অতিক্রম করে ২২ এবং ২৩ শে জুলাই নিজের ফ্যামিলিকে সময় না দিয়ে মাহেয়া কে সময় দিলাম, কাউকে বিদায় জানাতে পারি নি, এমনকি সেতু কেউ ২২ তারিখ তাড়াতাড়ি বিদায় দিয়ে দি, যে কিনা আমার বেস্টফ্রেন্ড আরো ছিল, নোমানি,সারওয়ার,নীহার সহ আরো অনেকে। আসার সময় এয়ারপোটে’ নিজের মায়ের কান্না দেখে ক্ষনিকের জন্য এবং প্রথম বারের জন্য নিজের ফ্যামিলির জন্য চোখে জল চলে এল। এবং নিজের এইসব সিদ্ধান্তের জন্য নিজেকে ধুসতে থাকলাম। এর পর ইমিগ্রেশন পার হয়ে চলে এলাম SV-803 তে ফ্লাইট নাম্বার।

চলবে………

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *