মায়ের পাঠশালা

সকালে বাবার মসজিদে যাবার আগে “বাবা ওঠ, সকাল হয়ে গেছে। নামাজ পড়ে পড়তে বস” এ কোন কাজ হতো না। বাবা মসজিদ থেকে ফিরলে দ্বিতীয় দফায় “ও এখনও ওঠেনি” তে চোখ কচলাতে কচলাতে ওঠার চেষ্টা এবং তৃতীয় দফা শুরু হবার আগেই হুড়মুড় করে উঠে বারান্দার চালায় পঁচা খড়ের ভেতর গুজে রাখা মেসওয়াক নামক সরু এক মাথা থেতলানো নিমের ছোট পুরানো ডালটি হাতে নিয়ে চোখ বিড়বিড় করে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে পুকুর পাড়ে চলে যেতাম। খাঁজ কাটা কাটা কোনাকোনিভাবে বসানো নারিকেল গাছে নির্মিত ঘাটের উপরিভাগে পুটলীর মত জড়সড় হয়ে বসে পরম আন্তরিকতার সাথে চিবোতে থাকতাম দাঁত পরিষ্কার করার ঐতিহাসিক ভাবে ভালো বলে স্বীকৃত নিম ডালখানের থেতলানো প্রান্তটি। সাথে সাথে মুখের দুর্গন্ধ আর দাঁতের উপর লেপ্টে থাকা লালচে প্রলেপ দূর করতে শুরু হত চরম ঘসাঘসি। মুখের ভেতর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাষ্ঠখন্ডের সাথে লালার মিশ্রনে উৎপন্ন বিশেষ তরল মিশ্রন ‘থু’ বলে ছুড়ে দিতাম পানির উপরিভাগে হা করে থাকা তেলাপিয়ার মুখের উপর, আর ওরা পালিয়ে যেত। আবার মুখের ভেতর তরল মিশ্রন জমা করে অপেক্ষা করতাম ওদের ফিরে আসার জন্যে। এ খেলা ভালো ভাবে জমতে না জমতেই থামিয়ে দিতে হতো বাড়ির ভেতরের “এতক্ষন ধরে দাঁত মাজলে আর লেখাপড়া করা লাগবে না” তে।

বাবা সামনের দরজা দিয়ে বের হলে আমি পেছনের দরজা দিয়ে গিয়ে বাড়িতে পড়াশোনা করার জন্য নির্ধারিত হোগলা পাতার পাটিটি নিয়ে বসে পড়তাম বারান্দার কোনায় যেখানে পেয়ারা গাছের ভেতর দিয়ে সকালের মিষ্টি রোদ এসে পড়ে বইয়ে, খাতায়, পেন্সিলে, পাটিতে, আমার গায়ে। বাবা পুনরায় বাড়িতে প্রবেশ করার আগেই শুরু হয়ে যেত- মনে করি যেন বিদেশ ঘুরে, মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে, তুমি যাচ্ছ পাল্কিতে মা চড়ে, আমি যাচ্ছি রাঙ্গা ঘোড়ার পরে, টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে। মায়ের “সকালে খালি পেটে পড়তে বসতে নেই” তে টগবগিয়ে চলা ঘোড়ার গতি ধীরে ধীরে কমে আসলে দেখা যেত একটা প্লাস্টিকের বাটিতে কিছু মুড়ির মধ্যে এক টুকরা খেজুরের পাটালী আর এক মগ পানি রাখা হয়েছে। মা চলে গেলে এক মুঠো মুড়ি মুখে পুরে দিয়ে একটু একটু করে পাটালী গুড় দাঁতে ভেঙ্গে নিতেই চোখ চলে যেত উঠানের কোনায় বুড়ো পেয়ারা গাছটির ডালে,আমার পাঠযুদ্ধ দেখে আনন্দে লেজ উচিয়ে নেচে বেড়ানো কাঠবিড়ালীটির দিকে। মনে হতো “আমার মত সকালে উঠে পড়া লাগলে আর এমন লাফানো আসত না”। বাটির মুড়ি শেষ হবার আগেই ঘোড়ার পাগুলো স্থির হয়ে যেত, আর পাটিতে পড়ে থাকা শেষ দুই একটা মুড়ি কুড়িয়ে মুখে দিতে দিতে শুরু হতো পেন্সিল দিয়ে পায়ের নখের কোনায় লুকিয়ে থাকা ধুলাবালি বের করার আপ্রান চেষ্টা। হঠাৎ বাবা এসে মায়ের কাছে রান্নার কতদূর জানতে চাইলে আমার ঘোড়া আবার মায়ের পাল্কির পাশে টগবগিয়ে চলতে শুরু করত।

মাকে নিয়ে বিদেশ ঘুরে, আই এয়াম কামাল- আমি হই কামাল হয়ে যখন ভাগফল মায়ের মনের মত হত তখন সূর্য আরো খানিকটা উপরে উঠে গেছে আর “স্কুলের সময় হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি খেয়ে স্কুলে যা” তে বই খাতা পেন্সিল কোন রকমে ছুড়ে ফেলে দৌড়ে রান্না ঘরে চলে যেতাম।

স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে যেত। বাবা বাড়িতে থাকলে বই, খাতা, পেন্সিল কোন রকমে ঘরে রেখে পেছনের দরজা দিয়ে আস্তে আস্তে পা ফেলে যোগ দিতাম সাঈদ, আইয়ুব, রায়হান, আসিকদের দৌড়াদৌড়ি আর হুড়োহুড়িতে। গোল্লাছুট, ডাংগুলি, চোর-পুলিশে কেটে যেত সারা বিকাল। “সন্ধ্যার আগে বাড়ি না আসলে ঠ্যাং ভেঙ্গে ফেলব” র ভয়ে কলতলায় সন্ধ্যার আগের ভিড় জমে উঠার শুরুতে একটা ঘটি নিয়ে হাজির হতাম। “এই ওরে ইট্টু সাইড দে, দেরি হলি আবার ওর মা মাইর শুরু করবেনে” গিলতে গিলতে হাত পা মুখ ধুয়ে এক ঘটি পানি নিয়ে সোজা চলে যেতাম রান্নাঘরের কোনায় যেখানে হারিকেন, কেরোসিনের বোতল, কাঁচ পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহিত ময়লা কয়েক টুকরা কাপড় রাখা হত। “যা আলো নিয়ে ঘরে যা” র অপেক্ষা না করে হারিকেন হাতে নিয়ে শোবার ঘরের বারান্দায় পড়াশুনা করার জন্য নির্ধারিত পাটিতে বই, খাতা, পেন্সিল ছড়িয়ে বসে পড়তাম। বাবা এশার নামাজ পড়তে মসজিদে যাবার আগ পর্যন্ত বাড়িতে ঘোরাঘুরি করত আর আমার দম এক প্রকার বন্ধ হয়ে আসলে কয়েকবারের “আম্মু আজান কি দিছে” চুপসে যেত একবারের “মা’র কাছে এত শোনার দরকার কি? আজান দিলে কি শোনা যাবে না?” তে। বাবা মসজিদে যাবার প্রস্তুতি নিতে থাকলে মনের ভেতর কিঞ্চিৎ আশার সঞ্চার হত আর চলে গেলে বসা থেকে একটু সামনের দিকে ঝুকে, আরও একটু ঝুকে তারপর শুয়ে পড়াশুনা শুরু হত এবং শেষ হত সারা বিকালের ক্লান্তিহীন দৌড়াদৌড়ির ফল দুই চোখের পাতা এক হয়ে আসার মধ্য দিয়ে। “ওঠ বাবা, উঠে খেয়ে নে। রাতে না খেলে হাতিও পড়ে যায়” তে হুড়মুড় করে উঠে বসে খোলা বইয়ে গভীর মনযোগে “আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান, আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে বাচাইছে প্রান” শুরু করতে গেলে “এখন আর পড়া লাগবে না, সকালে উঠে পড়িস” এ বাধ্য হয়ে বই রেখে রান্নাঘরে যেতে হত।

“প্রতিদিন রাতে এভাবে ঘুমিয়ে পড়লে লেখাপড়া করবে কিভাবে?” র প্রতিবাদে একবার অপমানে, দুঃখে, ক্ষোভে চরম সাহসিকতার পরিচয় “পাটিতে বসে বসে কি লেখাপড়া করা যায়? চেয়ার টেবিলে না বসলে ঘুম আসে” র প্রতিক্রিয়া তেমন কিছু দেখা গেল না। তিন চার দিনের মধ্যে কাঠমিস্ত্রি বিনয় কাকা এসে বৈঠক ঘরের উপরে রাখা পুরোনো লম্বা কাঠগুলো নামিয়ে এনে ঘটঘট-ফসফস -খটখট শুরু করে দিলো। পছন্দ মত কালো রঙ এর লেপন গায়ে নিয়ে একটা টেবিল আর সহকর্মী হিসেবে দুটি চেয়ার বারান্দার কোনায় হাজির হলে স্কুল থেকে ফিরে সেদিন আর খেলতে যাওয়া হলো না। সারা বিকাল বাড়ির ভেতরে, আশেপাশে কেটে গেলো সন্ধ্যার অপেক্ষায় আর অন্যদিনের চেয়ে আগেভাগে হাতমুখ ধুয়ে বহুকাংখিত টেবিল নামক বস্তুটির কাছে এসে দেখা গেলো মা আগেভাগেই হারিকেন রেখে গেছে। চেয়ারে বসা হলো, বই খোলা হলো কিন্তু বইয়ের লেখাগুলো ভালোভাবে দেখা গেলো না। কারন, আমার তুলনায় টেবিলের উচ্চতা অনেক বেশি হয়ে গেছে। মন খারাপ হলে “এখন না হলে কি হবে, বড় হলে তো পড়তে পারবা” থেকে সান্তনা নিয়ে একটু একটু করে একদিন অনেক বড় হবার আশায় আবার ফিরে এলাম আমার সেই হোগলার পাটিতে।

২ thoughts on “মায়ের পাঠশালা

Leave a Reply to আকাশ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *