ব্রেসিকোম, পাজির পা ঝাড়া আর একটা আত্নভোলার গল্প!

সুলগ্না,

তোমার দাদার শোবার ঘর দেখে অনুমান করলাম, তোমার শোবার ঘরের জানালা দিয়েও অনায়াস আকাশটাকে দেখা যায় না। দেখতে হলে রীতিমতো কসরৎ করতে হয়। তবেই না এক চিলতে আকাশের দেখা মেলে। তাও আবার কালে ভদ্রে।


সুলগ্না,

তোমার দাদার শোবার ঘর দেখে অনুমান করলাম, তোমার শোবার ঘরের জানালা দিয়েও অনায়াস আকাশটাকে দেখা যায় না। দেখতে হলে রীতিমতো কসরৎ করতে হয়। তবেই না এক চিলতে আকাশের দেখা মেলে। তাও আবার কালে ভদ্রে।

তোমার জানালা দিয়ে বরং দেখা মেলে ইটের। হ্যাঁ, সারি সারি অসংখ্য ইট। তোমার দিন শুরু হয় পাশের দালানের পলেস্তার বিহীন ইটের কংকাল দেখে আর যেদিন এনএসইউ’র ক্লাস থাকে না, লাল লাল আস্ত চৌকোনা ইটের পরত পরত দেখতে দেখতে তোমার সে দিন কাটে, তোমার রাতও হয় তাই দেখে। জানালার কার্নিশে পুরনো সিমেন্টের এটোঁ দাগ, ছিটে এসে লেগেছে! যেন কত অবজ্ঞা করে বলছে তোমায়! – “আকাশ দেখবে! শখ কত!! তার চে বরং, এই নে সিমেন্টের ফোটা গায়ে মেখে নে, শখ মেটা! হি হি হি।”

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, পলেস্তার বিহীন ইটের কংকালের খাচাঁয় তোমার জানালা আটকে গেছে চিরতরে যদি না তুমি শোবার ঘরটি আংকেল-আন্টির সাথে অদল-বদল করো।

আমি ভাবলাম, “পাজির পা ঝাড়াটার” যখন অনেক কষ্ট হবে, বা যখন মন খারাপ করবে, তখন তো সে আকাশ দেখতে চাইবে। কিন্তু জানালার ওপারে যে আরো মন খারাপ করে দেয়া ৮ ইন্চি বাই ৫ ইন্চি থান ইটের শোকেস। ভাগ্যিস, আমরা চোখ দিয়ে শ্বাস নেই না লগন, নাহলে তোমার ঐ জানালা দেখেই আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যেতাম।

তোমাদের আধ চিলতে বেলকনিতে দেখলাম বিকেলের সমস্ত রোদটুকু উপচে পড়েছে । তাতে মেজেন্ডা রংয়ের ব্রেসিকোম ফুলের গাছগুলো নিপাট চকচক করছে। তার ঠিক পাশেই আরেটা ব্রেসিকোমের টব, এটা সাদা রংয়ের। নীচতলা থেকে এটাকেই সবার আগে চোখে পড়েছিলো আমার। তাই দেখে চিনেছিলাম তোমাদের ফ্ল্যাটটা তিনতলায়। তুমি ভাবছো, তোমার ব্রেসিকোমের কথা কে জানালো আমায়? রুবেল ভাই জানিয়েছেন। কথায় কথায় বলেছিলেন যে তোমাদের আধ চিলতে বারান্দায় গোটা চারেক ফুলের টব রয়েছে। ব্যস ঐটুকুই। আর শুধু একবার মাত্র। আর ভুলিনি।

ডি ব্লক ৮ নম্বর রোডে ঢুকেই আমার চোখ দুটো শুধু ব্রেসিকোম খুজঁছিলো। অবাক হয়ে দেখলাম, ওই রোডের অত শত সুরম্য বাড়ীর ভীড়ে তোমার ব্রেসিকোমগুলো ছাড়া আর কারো কোন ব্রেসিকোমের গাছ নেই, অন্ততঃ বাইরে থেকে চোখে পড়ে না!

ব্রেসিকোম তোমার বুঝি অনেক পছন্দের? না হলে চারটের ভেতর দুটোই বা কেন ব্রেসিকোমের হবে?

[তোমার মনে আছে লগন, আমার বাসার ব্যালকনিতে, বছর দুয়েক আগে,

তুমি কল থেকে আজলা ভরে পানি নিয়ে আমার বনসাই আর অর্কিডগুলোতে দিতে, হেসেঁলের ছোট্ট ফনিমনসাটা পেতো তোমার আঙ্গুল থেকে চুইঁয়ে পড়া সরু সরু জলধারা । আমি তোমার পেছনে দাড়িঁয়ে চুপচাপ দেখতাম। আর ভাবতাম, এত মমতা তো আমিও ওদেরকে কখনো দেখাইনি।

অথচ তোমাকে দেখো, তোমাদের বনদেবতা কুড়ি হাজার মাইল ঠেলে তোমাকে ঠিক পাঠিয়ে দিলেন, বুঝিবা আমার বেলকনির গাছগাছালিকে যত্নআত্তি করতেই! তবে কি জানো লগন, তোমার ঐ আজলাখানি এতটাই মমতাময়ী ছিলো যে, আমার মনে হতো, জল না দিয়ে তুমি যদি শুকনো হাতেও দু হাত বুলিয়ে দিতে, তাতেই ওদের বেশ জলসিঞ্জন হয়ে উঠতো! ]

আন্টি কত্ত রকমের ফল ফলাদি যে কেটে দিলেন, হিসেব নেই, টেবিল ভরে গিয়েছিলো সেসবে। আমি কাটাঁ চামচ এড়িয়ে হাত দিয়েই একটা টক আপেলের টুকরো তুলে নিলাম। ভাবলাম, তোমরা ব্রাক্ষ্নন। নিজেদের ধর্মের নীচু জাত স্পর্শ করলেই অমঙ্গল হয়, আর যদি অন্য ধর্মের স্পর্শ লেগে যায়, তাহলে তো বিরাট অধর্ম হবে। তাই আমি কাটাঁ চামচ স্পর্শও করিনি, এমনকি চেষ্টা করেছি যাতে পিরিচেও আমার হাতের স্পর্শ না লাগে।

আর আমার শঙ্কা হচ্ছিলো, আন্টি সন্ধ্যের পুজোটাই না মিস করে বসেন। আমাকে ফোনে বলেছিলেন সাড়ে ৫ টায় বেরুবেন, আমি আৎতেঁ উঠে দেখি ঘড়িতে তখন ৬টা!

ওদিকে আন্টি তোমার ঘরের দরজা ধাকাচ্ছেন! তুমি কি গিয়েছিলে আন্টির সাথে শেষতক, পূজোয়?

তাড়াহুড়ো করে বিদায় নিয়ে নিলাম, মাঝপথে এসে মনে পড়লো, যাচ্চলে, আমি তো তোমাদের বাসায় বইটা ফেলে এসেছি। বাসে বসে পড়ার জন্য যে বইটা সবসময় আমার ঝোলায় ফেলে রাখতাম, সেটাকেই কিনা ফেলে আসলাম!

তবে যা হয়েছে, বেশ হয়েছে। ওটা আনতে আগামী সপ্তাহে যেতে পারি। তখন কিন্তু তুমি মাথাব্যথার অজুহাতে ঘরের দরজায় খিল এটেঁ ঘাপটি মেরে থাকবে না, এই বলে দিলাম। মনে থাকে যেন। কারন, আমার খুব শখ, “অশুভ শক্তি ভাইয়ার” বড় বড় বাউলিয়ানা চুল দেখে পাজির পা ঝাড়াটা কি করম অপ্রস্তুত হয়, কতটা অবাক হয় আর প্রথম কি উদ্ভট মন্তব্যটা মুখ থেকে বেরোয়। শখটা মেটানোর জন্য তোমার জেগে থাকা জরুরী।

তোমার সাথে শেষবার যখন দেখা হয়েছিলো, তারপর থেকে আর চূলে কাচিঁ লাগাইনি লগন।

ভালো থেকো। …. ও হ্যাঁ, ভালো কথা, বাম পাশের দুটো টবে একটা করে টুথব্রাশ গুজেঁ রাখা হয়েছে কেন? 😐

১৫ thoughts on “ব্রেসিকোম, পাজির পা ঝাড়া আর একটা আত্নভোলার গল্প!

  1. গল্প বর্ণনার কাব্যময়তাটুকু
    গল্প বর্ণনার কাব্যময়তাটুকু উপভোগ করলাম। হঠাৎ হঠাৎ কিছু সুন্দর কথা বলে ফেলেছেন।
    যেমনঃ
    “ভাগ্যিস, আমরা চোখ দিয়ে শ্বাস নেই না লগন, নাহলে তোমার ঐ জানালা দেখেই আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যেতাম।”
    আমার মতো যারা প্রকৃতির অনেক কাছকাছি, গ্রামে কিংবা মফস্বলে বড় হয়েছেন তারা বুঝবেন ইট-পাথরের এই শহরে আনন্দ আছে গতি আছে কিন্তু প্রান নেই।

    আজকাল কি সবাই অনুগল্পই লিখছে? কেন? সময় নেই বলে, নাকি পাঠক পরবে না বলে কেউ গল্প লিখতে চায় না? বুঝলাম না। অনুগল্পের ভালো লাগা তো সাময়িক। লেখার মান ভালো হলে সেটা পাঠককে টানবেই। সেটা আজ হোক বা কাল।

    1. ভাই এটা মনে হয় অনুগল্পের যুগ
      ভাই এটা মনে হয় অনুগল্পের যুগ চলছে। মানুষ পড়ে না এটা মনে হয় ঠিক না। অনেকে হয়ত ভাবে অণুগল্প লেখা তুলনা মূলক সহজ। এছাড়া গল্প লিখতে গেলে যথেষ্ট চিন্তা ভাবনার প্রয়োজন আছে চরিত্র, ঘটনা, বিভিন্ন বিষয়ের বিশদ বর্ণনা থাকতে হয়। যেটার জন্য বেশ চিন্তা ভাবনা করতে হয়। অনুগল্পের একটা নির্দিষ্ট ডাইমেনশন থাকে কিন্তু একটা গল্পের বেশ কিছু ডাইমেনশন থাকতে পারে। যেটা চিত্রিত করা সহজ না। তার মানে আমি বলছি না অনুগল্প লেখা সহজ।

    2. এটা আসলে ঠিক গল্প নয় রায়ান
      এটা আসলে ঠিক গল্প নয় রায়ান ভাই। একটা বাস্তব ঘটনা। বাংলাদেশে সুলগ্নাদের বাড়ীতে আমার প্রথম পর্দাপণ। ঐদিন রাতে বাসায় ফিরেই এটা লিখে ফেলি। এটাকে একটা খসড়া লেখা বলতে পারেন, কোন কিছু চিন্তা না করেই হুট করে ফিলে ফেলা একটা ছাইপাশ লেখা।

      আমি তো বড় গল্পও লিখি। এখানে দেখতে পারেন।

    1. ধন্যবাদ; আতিক ভাই। আপনি আমার
      ধন্যবাদ; আতিক ভাই। আপনি আমার ছাইপাশ লেখার একজন খুবই নিয়মিত পাঠক। আপনার কমেন্ট না পেলে কি যেন নেই কি যেন নেই মনে হতে থাকে 😀

  2. সুপাঠ্য, কাব্যিক ছোঁয়ায় লেখা।
    সুপাঠ্য, কাব্যিক ছোঁয়ায় লেখা। কিন্তু কিছু বিষয় বুঝতে পারি নি। সেটা আমার অক্ষমতা হিসেবেই ধরে নিচ্ছি। যেমন নিচের লাইনটা,

    অথচ তোমাকে দেখো, তোমাদের বনদেবতা কুড়ি হাজার মাইল ঠেলে তোমাকে ঠিক পাঠিয়ে দিলেন, বুঝিবা আমার বেলকনির গাছগাছালিকে যত্নআত্তি করতেই!

    1. সুলগ্না অষ্ট্রেলিয়াতে আমার
      সুলগ্না অষ্ট্রেলিয়াতে আমার বাড়ীতে বেড়াতে এসেছিলেন। বাংলাদেশে থেকে অষ্ট্রেলিয়ার দুরত্ব ২০ হাজার মাইল। ধন্যবাদ আপনাকে। 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *