বিজ্ঞাপনের পোস্টমর্টেম

বিজ্ঞাপন। আগে অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হতো। দিন বদলে গেছে। এখন বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। সে হিসেবে বলা যায় পূর্বের চেয়ে বর্তমানে বিজ্ঞাপনের গুরুত্ব অনেক বেশি। যারা বিজ্ঞাপন তৈরী করেন, তারাও নিশ্চয়ই এই বিষয়টা মাথায় রেখেই বিজ্ঞাপন তৈরী করছেন। তারা কি মেসেজ দিতে চাচ্ছেন আমাদের কাছে? মাত্র কয়েকটি বিজ্ঞাপণ নিয়ে সামান্য কিছু ভাবনা সবার সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করব আজ।


বিজ্ঞাপন। আগে অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হতো। দিন বদলে গেছে। এখন বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। সে হিসেবে বলা যায় পূর্বের চেয়ে বর্তমানে বিজ্ঞাপনের গুরুত্ব অনেক বেশি। যারা বিজ্ঞাপন তৈরী করেন, তারাও নিশ্চয়ই এই বিষয়টা মাথায় রেখেই বিজ্ঞাপন তৈরী করছেন। তারা কি মেসেজ দিতে চাচ্ছেন আমাদের কাছে? মাত্র কয়েকটি বিজ্ঞাপণ নিয়ে সামান্য কিছু ভাবনা সবার সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করব আজ।

১. কিছুদিন ধরে বাংলালিংকের একটা বিজ্ঞাপণ দেখতে পাচ্ছি। ঐ যে বল মারা, মহিলার অদৃশ্য ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বকাঝকা করা আর অপরাধি হিসেবে নিজের ছেলেকে দেখে কথার ধরণ পুরোটাই উল্টে ফেলার বিজ্ঞাপণটার কথা বলছি। খুবই সূক্ষ্ম বিষয়। অনেকে আমাকে খুঁতখুঁতে স্বভাবের মনে করতে পারেন তারপরও বলছি, আমাদের সমাজের মানুষ গুলোকে এর মাধ্যমে খুব সহজে পার্শিয়ালিটি বা পক্ষপাতিত্ব শিখানো হচ্ছে। শেখানো হচ্ছে ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি আপন-পর ভেদে ভিন্ন হয়। মানুষের মনের মধ্যে অন্যায়কে ন্যায় হিসেবে গ্রহণ করতে শেখানোর কি সুন্দর ব্যবস্থা!

২.একই কোম্পানির আরেকটি বিজ্ঞাপন আমি সাইফুল। মানে ঐ যে অনেকদিন পর স্বামী ফিরে আসার পর স্ত্রী স্বামীকে দেখে রেগেমেগে হাতে বাজারের ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বাজার করে আনতে বলা হচ্ছে। এইসব কি? আমাদের সমাজে কি কোন কেউ অনেকদিন পর ফিরে আসলে তাকে কি এভাবে অভ্যর্থনা জানানো হয়? নাকি আমাদের অভ্যর্থনার নতুন পদ্ধতি শিক্ষা দেয়া হচ্ছে? আমাদের সমাজে Social Value বলতে যা আছে, তাকে একেবারে শেষ করে দেয়ার মহান মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই এইসব কর্মকান্ড হচ্ছে বলে আমি মনে করি।

৩. হাইকন টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনটিও যথেষ্ট প্রশ্নের দাবীদার। স্পষ্ট দেখাই যাচ্ছে যে ডিস কানেকশন বা নেটওয়ার্কে সমস্যার কারণে টিভি বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু দেখানো হচ্ছে এর জন্য টিভি পাল্টানো হচ্ছে। আশ্চর্য বিষয়, Brand New কোন টিভিতেও নেটওয়ার্কের সমস্যা হতে পারে। দর্শকদের এতো গর্দভ মনে করার কারণটা কি?

৪. অসাধারণ কিছু বিজ্ঞাপন প্রচার করে রবি বেশ কিছুদিন যথেষ্ট আলোচনায় ছিল, যেসব বিজ্ঞাপণের মাধ্যমে মানুষকে পরোপকারে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কালের রবির ৫৮ টাকা রিচার্জের বিজ্ঞাপণটি আমার মনে যথেষ্ট প্রশ্নের উদ্রেক ঘটিয়েছে। রিচার্জের সাথে লাফালাফি, নাচানাচির কি সম্পর্ক? নারীবাদীরা কই? তারা এখানে অযথা নারীকে ব্যবহারের কোন লক্ষণ খুঁজে পায়না?

৫. ম্যাঙ্গুলির বিজ্ঞাপণটিতেও একই প্রশ্ন। ম্যাঙ্গু জুসের সাথে একটি মেয়ের নাচানাচির কি সম্পর্ক? লাফালাফি, নাচানাচির মাধ্যমে নারীদের, শরীর প্রদর্শন ছাড়া বিজ্ঞাপনের জন্য অন্য কোন আইডিয়া পাওয়া যায়না দুনিয়ায়?

৬. গ্রামীণফোণ 3G এর বিজ্ঞাপনটিতে কি দেখানো হচ্ছে? দ্রুতগতির ইন্টারনেট আমাদের কি পাশ্চাত্যের কনসার্টেই শুধু নিয়ে যেতে পারে যেখানে ছেলে-মেয়ে সবাই একসাথে মাতাল উন্মত্ম হয়ে ডলাডলি করে থাকে? এখানে আরো একটি বিষয় দেখার মত। আমাদের সমাজে পিতামাতা সন্তানদের কনসার্টে যেতে সাধারণত বাধা দিয়ে থাকেন। এই বিজ্ঞাপনে দেখানো হচ্ছে ছেলের পরে মা-বাবাও একই পথে হাটছেন। এইসব কি আপনাদের মনে কোন প্রশ্ন সৃষ্টি করেনা?

৭. রিন পাওয়ার হোয়াইটের বিজ্ঞাপণটি খুব মজার। এইরকম জানালার কাঁচ ভেঙ্গে পাকনা পাকনা কথা বললে যদি কেউ ময়লা শার্ট ধুয়ে দেয়, বা নতুন শার্ট কিনে দেয়, তাহলে নিয়মিত এই কাজের প্র্যাকটিস করা দরকার।

৮. আপাতত শেষ করছি ম্যাক্স ফেয়ারনেসের বিজ্ঞাপনটি দিয়ে। এই ক্রিম ব্যবহার করলে নাকি কনফিডেন্স বাড়ে। কিসের কনফিডেন্স? যেহেতু বিষয়টি চেহারার সাথে সম্পর্কিত তাই বুঝাই যাচ্ছে এর মাধ্যমে মেয়ে পটানোর কথা বলা হচ্ছে। কি চায় এই সব বিজ্ঞাপন নির্মাতারা? আমাদের সমাজে বিবাহপূর্ব প্রেম-ভালোবাসার বিস্তার ঘটাতে? সমাজে ঐশী জেনারেশন সৃষ্টি করতে, যারা এইসব প্রেম-ভালোবাসায় ডুবে নিজেদের পিতা-মাতাকে খুন করতেও দ্বিধা করবে না?

মাত্র কয়েকটি বিজ্ঞাপনের কথা উল্লেখ করলাম। বর্তমানে বেশিরভাগ বিজ্ঞাপনের থিমই হচ্ছে আজাইরা কিছু বিষয়।

বিজ্ঞাপন হচ্ছে শর্ট ফিল্মের মত। খুব কম সময়ের মধ্যে অনেক কিছু থাকে একেকটি বিজ্ঞাপনে। এইরকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিজ্ঞাপন আমাদের সমাজে ভাঙ্গন সৃষ্টির জন্য, সমাজে অন্যায়, অশ্লীলতা ছড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

মনে রাখা দরকার যুদ্ধ করে দেশ দখল করার দিন এখন আর নেই। এখন হচ্ছে ডিজিটাল সাম্রাজ্যবাদের সময়। এখন কোন দেশের সামাজিক মূল্যবোধ, নিজস্বতাকে ধ্বংস করে তাতে আক্রমণকারীদের চিন্তা ভাবনাকে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমেই ঐ কাজ করা হয়।

আমাদের সচেতন হওয়ার সময় কি এখনও আসেনি?

২ thoughts on “বিজ্ঞাপনের পোস্টমর্টেম

Leave a Reply to রাজু রণরাজ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *