মেঘ, রোদেলা আর চন্দ্রাবতী কাব্য

মেঘ ঘুম থেকে ওঠলো ধড়ফড় করে! তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। তার পাশের সিটের ছেলেটা বিকট শব্দে রেডিও শুনছে। সেই শব্দে ঘুম ভেঙ্গেছে। মেজাজ বিগড়ে গেলো মেঘের। নাহ, এই মেসটা আশু ছাড়তে হবে তার। হঠাৎ রেডিওতে শুনলো, আগামীকাল হরতাল ডেকেছে জামাত-শিবির। সাথে সাথে সে গায়ের কম্বল ছুড়েঁ দিয়ে তৈরী হতে লাগলো। এমনিতেই মেজাজ খারাপ তার উপর এই খবর। দাতঁ ব্রাশ করতে করতে তার জানা-অজানা সব কয়টা গালির ভান্ডার জামাত-শিবিরের উপর একেবারে উপুড় করে ঢেলে দিলো। কাল হরতাল, পরশুদিন শুক্রবার, রোদেলা বাসা থেকে বের হতে পারবে না [কারন ও অফিসের লাঞ্চ ব্রেকে মেঘের সাথে দেখা করে। শুক্রবারে যেহেতু অফিস নাই সেহেতু ওদের ১ ঘন্টার ডেটিংও বন্ধ] আর পরশুদিনের পর থেকে মেঘ সারাদিন ব্যস্ত থাকবে সুতরাং আজ যে করেই হোক রোদেলার সাথে দেখা করতে হবে।



মেঘ ঘুম থেকে ওঠলো ধড়ফড় করে! তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। তার পাশের সিটের ছেলেটা বিকট শব্দে রেডিও শুনছে। সেই শব্দে ঘুম ভেঙ্গেছে। মেজাজ বিগড়ে গেলো মেঘের। নাহ, এই মেসটা আশু ছাড়তে হবে তার। হঠাৎ রেডিওতে শুনলো, আগামীকাল হরতাল ডেকেছে জামাত-শিবির। সাথে সাথে সে গায়ের কম্বল ছুড়েঁ দিয়ে তৈরী হতে লাগলো। এমনিতেই মেজাজ খারাপ তার উপর এই খবর। দাতঁ ব্রাশ করতে করতে তার জানা-অজানা সব কয়টা গালির ভান্ডার জামাত-শিবিরের উপর একেবারে উপুড় করে ঢেলে দিলো। কাল হরতাল, পরশুদিন শুক্রবার, রোদেলা বাসা থেকে বের হতে পারবে না [কারন ও অফিসের লাঞ্চ ব্রেকে মেঘের সাথে দেখা করে। শুক্রবারে যেহেতু অফিস নাই সেহেতু ওদের ১ ঘন্টার ডেটিংও বন্ধ] আর পরশুদিনের পর থেকে মেঘ সারাদিন ব্যস্ত থাকবে সুতরাং আজ যে করেই হোক রোদেলার সাথে দেখা করতে হবে। আজকে দেখা না করতে পারলে আগামী সপ্তাহের আগে আর দেখা হবে না।

রাস্তার জ্যাম পার হয়ে গুলশানে আসতে আসতে সন্ধ্যা নেমে গেলো। শীতের রাত। ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে যায়। এদিকে কাল রাতের জ্বর জ্বর ভাবটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠতে লাগলো মেঘের। রোদেলাকে বলেনি। বল্লে আসতে দিতো না। ওকে একটা বার দেখার জন্য যে মনটা কেমন অস্থির হয়ে থাকে মেঘের!! আসতে না দিলে ব্যাপারটা তাই বেশ খারাপ হতো।

রোদেলার অফিস গুলশান ২ এর সিটি ব্যাংক। মাস খানেক হলো এনএসইউ থেকে বেরিয়ে মেয়েটা সেখানে ইন্টার্নি করছে। রোদেলার রেজাল্ট অত্যন্ত ভাল । জিপিএ ৪ এর ভেতর সে পেয়েছে ৩.৯১। তার ডিপার্টমেন্টে এটাই হায়েষ্ট।

গুলশানে ২ এর মোড়ে এসে মেঘ পড়লো বিপদে। একে তো রোদেলার অফিসের রাস্তা সে চেনে না, তার উপর এখন সন্ধ্যা, চারিদিকে কুয়াশা আর অন্ধকারের কারনে বেশী দূরে চোখও যায় না তার উপর আবার জ্বর ওঠছে গায়ে। এদিকে পাশে তাকিয়ে দেখে সিটি ব্যাংকের অফিস। মেঘ তো মহাখুশী। কিন্তু রোদেলার সাথে ফোনে কথা বলে জানা গেলো, তার অফিস City Bank। আর মেঘ দাড়িঁয়ে আছে Citi Bank এর সামনে। যন্ত্রনা!! গুলশানে যে দুইরকম বানানওয়ালা সিটি ব্যাংক রয়েছে এইটা সে কল্পনাও করে নাই!!! তাই সে পুরোই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো।

রোদেলা গাড়ীর ভেতর বসে ছিলো অফিস শেষ করে। মেঘের আসতে দেরী থেকে সে গাড়ী থেকে নেমে রাস্তা পার হয়ে হাটাঁ ধরলো। কিছুদূর এগোতেই ক্যাটস আইয়ের দোকানটার সামনের ফুটপাথে মেঘকে গোবেচারা ভংগিতে দাড়িঁয়ে থাকতে দেখলো। এই বোকা বোকা চেহারার ছেলেটাকে সে এত অসম্ভব পরিমান ভালবাসে কেন, সে নিজেও জানে না।

রোদেলা রাস্তা পার হয়ে হাত ধরে মেঘকে নিয়ে এসে ওর গাড়ীতে বসালো। রোদেলা ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে রইলো কিছুক্ষন। মেঘ হাত বুলিয়ে দিলো রোদেলার মাথায়। রোদেলা চান্স পেলেই এই কাজটা করে। মেয়েটা বড্ড কোলে মাথা রেখে শোবার ন্যাওটা!

রোদেলা মেঘকে গুলশান ১ এর বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিয়েছিলো। মেঘকে বাসা পর্যন্ত লিফট দেয়া সম্ভব নয় কারন রোদেলাকে প্রতিদিন তার অনকোলজিষ্ট বাবাকে মহাখালি ক্যান্সার ইনটিটিউট থেকে পিকআপ করতে হয়।

মেঘ গাড়ী থেকে নামার আগে রোদেলা মেঘের শার্টের পকেটে একটা এটিএম কার্ড ঢুকিয়ে দিয়ে বল্ল – “এখানে ১৫ হাজার টাকা আছে। আমি পিনকোড এসএমএস করে দিয়েছি তোমাকে।” মেঘ আপত্তি করার জন্য মুখ খুলতেই ঠোটেঁ আংগুল রেখে রোদেলা ওকে থামিয়ে দিয়ে বল্ল –

– টিউশনির টাকাগুলো এ মাসেও পাওনি, তাই না? মেঘ চুপ করে রইলো। ও তো জানেই না যে মেঘের দুটো টিউশানিই চলে গেছে গতমাসে।

– “আংকেল টাকা এ মাসেও টাকা পাঠাননি, তাই না?” – আবার জিজ্ঞেস করলো রোদেলা। এবারও মেঘ চুপ। ওকে কি করে বলবে যে বাবা আর টাকা পাঠাতে পারবে না বলে চিঠিতে জানিয়ে দিয়েছে?

রোদেলা পরম মমতায় মেঘের কপালে হাত রাখলো। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। এরপর শাসানোর ভংগিতে বল্ল – “তুমি গাড়ী থেকে নেমে সোজা একটা সিএনজি নেবে। আজ যদি বাসে ওঠে টাকা বাচাঁনোর চেষ্টা করেছো, তবে তোমার একদিন কি আমার একদিন। আর মেসে ঢুকার আগে দোকান থেকে ওষুধ কিনবে। তারপর পেটভরে খেয়ে ওষুধ খেয়ে সকাল সকাল ঘুমাতে যাবে। কথাগুলো মনে থাকে যেন।” মেঘ সুবোধ বালকের মতো মাথা নাড়লো। তার মনে থাকবে।

মেঘ গাড়ী থেকে নেমে যাবার পর চোখ ফেটে কান্না আসলো রোদেলার। এত জ্বর নিয়ে এই বোকা মানুষটা কিভাবে এই শীতের রাতে সমুদ্রসমান জ্যাম পেরিয়ে গুলশান ১ থেকে মিরপুর ১ এ যাবে? একটা হচ্ছে শহরের এ মাথা, আরেকটা ওমাথা।

রোদেলার গাড়ীটা চোখের সীমানা থেকে আড়াল হতেই মেঘ ট্রাফিক সিগন্যালে দাড়াঁনো বিআরটিসির একটা দোতলা বাসে চড়ে বসলো। পুরো বাস বলতে গেলে ফাকাঁ। সে এক কোনায় গিয়ে বসে পড়লো। বসার সাথে সাথেই টের পেলো, তার গা কাপিঁয়ে জ্বর আসছে। খানিক পরে জ্বরের ঘোরে চোখে মুখে অন্ধকার দেখতে লাগলো মেঘ। এদিকে বাসের নড়াচড়ার কোন লক্ষন নাই। ভেবেছিলো তাড়াতাড়ি বাসায় পেৌছেঁ যাবে কিন্তু মেঘ একটু পর জানতে পারলো, এই রূটের বাসগুলো বলতে গেলে পুরো ঢাকা শহর এক পাক দিয়ে তবেই মিরপুরের দিকে রওনা দেয়। তার আগে নয়। এমনিতে জ্যাম তার উপর শহর পাক দেয়া রুট, তার মানে মেঘ মাঝরাতের আগে বাসায় পেৌঁছতে পারবে না বলেই ধরে নিলো।

একটু পর মেঘের পেছনের সীটে এসে বসলো দুজন মুখরা রমনী। দুজনই পুরানো ঢাকার উচ্চারনে কথার তুবড়ি ফুটিয়ে যাচ্ছেন। মেঘের মাথা আরো ধরে গেলো। খানিকবাদে তার সামনে একজন অল্পবয়সী প্রেগনেন্ট মেয়ে এসে বসলো। মেঘের মুখোমুখি। মেয়েটার বয়স ২৪/২৫ এর বেশী হবে না। লাল রংয়ের কার্ডিগান পরনে। তার উপরে ডাক্তারদের মতো এ্যাপ্রন। হাতে বিশাল একটা ভ্যানিটি ব্যাগ। মেঘ জ্বরের ঘোরে তার ছেলেবেলার মেয়েবন্ধু সিনথিয়াকে কল্পনা করলো। প্রাইমারিতে পড়ার সময় সিনথিয়া প্রতিদিন একটা লাল কার্ডিগান পড়ে আসতো। মেঘ প্রাণপনে চেষ্টা করছে সিটের পাশে কোথাও একটু হাত রেখে সে হাতের উপর মাথা রেখে ঘুমাতে কিন্তু সে হেলান দিতে পারলেও হাত রাখার জাগা খুজেঁ পেলো না।

খানিকবাদে হঠাৎ মেঘের খেয়াল হলো, কোথায় যেন সে পড়েছিলো, গর্ভবতী নারীরা পা ঝুলিয়ে বেশীক্ষন এক জাগায় বসে থাকতে পারে না। তার সামনে বসা মেয়েটির সিট একটু উঁচুতে তাই তাকে পা ঝুলিয়ে বসতে হয়েছে। সে মেয়েটিকে বল্ল – ‘আপনার মনে হয় বসতে কষ্ট হচ্ছে। আপনি চাইলে আমার সাথে সিট বদলাতে পারেন।’ মেয়েটা মৃদু স্বরে বল্ল – ‘না ঠিক আছে’। বলার ধরন থেকেই বোঝা গেলো আসলেই মেয়েটার বসতে কষ্ট হচ্ছে। এটা দেখে মেঘের পাশে বসা লোকটি মেয়েটিকে বল্ল – ‘আমি সামনেই নেমে যাবো। আপনি চাইলে আমার সিটে বসতে পারেন।’ মেঘ চমতকৃত হলো। লোকটাও বুঝতে পেরেছে যে মেয়েটার ওখানে বসতে কষ্ট হচ্ছে, নাহলে যেচে নিজের সীটে বসার কথা বলতো না।

একটুপর লোকটা নেমে গেলে মেয়েটা মেঘের পাশে এসে বসলো। তার কিছুক্ষন পর মেয়েটা মেঘকে বল্ল – ‘ধন্যবাদ আপনাকে।’

মেঘ হেলান দিয়ে শুয়ে ছিলো বাসের গায়ে। মেয়েটার গলা শুনে কোনমতে চোখ তুলে তাকিয়ে বল্ল – ‘কেন?’

– ‘আপনি কিভাবে বুঝলেন আমার কষ্ট হচ্ছিলো বসতে?’

– ‘কোথাও পড়েছিলাম।’

-‘একটা আপাত: গুরুত্বহীন তথ্য জেনে সেটাকে জায়গামতো এ্যাপ্লাই করে গুরুত্বপূর্ণ বানিয়ে ফেলেছেন। এই কারনে ধন্যবাদ আপনাকে’। সুন্দর করে হাসলো মেয়েটা।

– ‘আপনি ম্যাটারনাল সিকনেস [মাতৃত্বজনিত অসুস্থতা] নিয়েও এত রাতে একা বাসায় ফিরছেন, তাও আবার পাবলিক ট্রান্সপোর্টে! আপনার তো এখন বাসায় বসে বিশ্রাম নেয়া উচিত।’

-‘কি করবো বলুন। ডাক্তারদের তো কোন ছুটি নেই।’

-‘পিজিতে ইন্টার্নি করছেন বুঝি?’

-‘কি করে বুঝলেন?’ মেয়েটা অবাক।

-‘খুব সহজ। এই বাসটা একটা ঐ হাসপাতালের সামনে দিয়েই এসেছে। কষ্ট করে হাসলো মেঘ। তার কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। যন্ত্রনায় মাথা ছিড়ে যাচ্ছে!!

-‘হুম। ঠিক ধরেছেন। আর ইন্টার্নি করছি সেটা বুঝলেন কি করে?’

– ‘ইন্টার্নি ডাক্তাররাই গায়ে এপ্রন চড়িয়ে রাস্তা ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। প্রথম প্রথম পেশাজীবি হলে একটা ছেলেমানুষী শো অফ সবার ভেতরেই কাজ করে।’

– ‘বাব বাহ! আপনি তো দেখি শার্লক হোমসের মতো ডিডাকশান করতে পারেন। কিন্তু আপনিও তো অনেক অসুস্থ মনে হচ্ছে। এত অসুস্থ শরীর নিয়ে বের হওয়াটাও আপনার উচিত হয়নি।’ মেয়েটা যেন পাল্টা উপদেশ দিয়ে শোধ তুল্ল।

-‘বের হতে চাইনি। কাল হরতাল শুনেই বাধ্য হলাম বের হতে।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর মেঘের। সে কথপকথনের ইতি টানতে চাইছে।

-‘ও। আপনার জ্বর এসেছে তাই না?’

-‘জ্বি। বিকেল থেকেই। কি করে বুঝলেন?’

-এটা বুঝতে তো শার্লক হোমস হবার দরকার নেই। আপনার চোখ লাল হয়ে আছে। গাড়িতে ওঠার পর থেকেই দেখছি আপনি কাত হয়ে শুয়ে আছেন।’

একটু থেমে মেয়েটা আবার বল্ল – আমার ব্যাগে থার্মোমিটার আছে। আপনি যদি কিছু মনে না করেন, আমি কি আপনার জ্বরটা দেখবো?

– ধন্যবাদ। আমার মনে হয় তার কোন দরকার নেই। প্রায়ই জ্বর হয় আমার। এর একটা সুবিধা হলো, থার্মোমিটার ছাড়াই আমি জ্বরের মাত্রা নির্ভুলভাবে অনুমান করতে পারি।’ আবারো হাসার চেস্টা করলো মেঘ।

– বাহ! তাই নাকি? দারুন তো! কিন্তু ‘প্রায়ই জ্বর’ হওয়া তো কোন কাজের কথা না। আচ্ছা বলুন তো আপনার এখন জ্বর কত?

– ১০৩। খানিকটা কম বেশী হতে পারে।

– এবার এটা মুখে দিন। দেখি আপনার অনুমান কতটা নির্ভুল।’ মেয়েটা ব্যাগ থেকে থার্মোমিটার বের করলো। মাপা শেষে হাতে নিয়ে আবারো অবাক হয়ে বল্ল- ‘আরে তাইতো! আপনার অনুমান তো এক্কেবারেই ঠিক। একদম কাটায় কাটায় ১০৩!’

মেঘ কোন জবাব দিলো না। সে চোখে মুখে অন্ধকার দেখছে। আর গর্ভবতী মেয়েটার কন্ঠস্বর যেন অনেক দূর থেকে কোন একটা সুরংগের ভেতর দিয়ে ভেসে ভেসে আসছে। সে মৃদু স্বরে প্রলাপ বকা শুরু কররো – ‘আপনার নাম কি সিনথিয়া? আপনি কি ছোটবেলাতেও লাল কার্ডিগান পড়তেন?’

– না ভাই, আপনার দুটি প্রশ্নের উত্তরই ‘না’। আপনার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। আপনি চুপ করে শুয়ে থাকুন। আমি লাইটটা অফ করে দিতে বলি? আপনার আরাম হবে।

-বলুন।

মেয়েটা চিৎকার করে কন্ডাকটরকে ডেকে মেঘের মাথার উপরের লাইটটা অফ করিয়ে দিলো। মেঘের মৃদুস্বরে প্রলাপ বকা আবার একটু পর শুরু হলো – রোদেলা কেন আমাকে এত ভালবাসে? ওর আগের বয়ফ্রেন্ডটা ওকে কষ্ট দিয়ে ছেড়ে চলে গেছে এই কারনে নাকি সত্যি সত্যিই সে আমাকে ভালবাসে?

– রোদেলা সত্যি সত্যিই আপনাকে ভালবাসে।

– জানেন রোদেলার কাছ থেকে এভাবে টাকা নিতে আমার একদম ভাল লাগে না। আমার যখন অনেক টাকা হবে তখন আমি ওর সব টাকা শোধ করে দিবো।

– অবশ্যই দিবেন।

– আমি একটা খাতায় ওর দেয়া সব টাকার হিসেব রেখেছি। আমি শোধ করে দিবো সব।

– আচ্ছা। আপনি এখন ঘুমান। কথা বলবেন না।

– আপনার ঘরে নতুন অতিথি আসতে আর কতদিন বাকী?

– বেশী দিন না। আর দুয়েকমাস। আপনি ঘুমান। আর কোন কথা বলবেন না। প্লিজ।

– বাচ্চার নাম ঠিক করেননি এখনো?

– ‘না করিনি। আচ্ছা আপনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না? পানি খাবেন? পানি দেই আপনাকে? আমার ব্যাগে পানি আছে।’ উত্তরে মেঘ কি বল্ল সেটা মেয়েটা শুনতে পেলো না কারন এমন সময় পেছনের সীটে বসা মহিলা দুটি কি নিয়ে যেন অট্টহাসি দিয়ে উঠলো। ম্যাটারনালি সিক মেয়েটা প্রায় ধমকে ওঠলো তাদেরকে – আপনারা কি দয়াকরে একটু আস্তে কথা বলবেন? এখানে একটা মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে।’ ধমকে কাজ হলো। তারা হালকা বিড়বিড় করতে করতে থেমে গেলো পুরোপুরি।

– ‘আপনার যদি ছেলে হয়, তাহলে নাম রাখবেন মেঘ। আর মেয়ে হলে রোদেলা।’ অনেকক্ষন পর বল্ল মেঘ।

– ‘বাহ মেঘ আর রোদ! ইন্টারেস্টিং কম্বিনেশন তো!’ [মেয়েটা খেয়ালই করলো না যে একটু আগে রোদেলা নামের একটা মেয়েকে নিয়ে মেঘ কিছু বলছিলো]

– হুম ইন্টারেস্টিং তো বটেই। মেঘ আর রোদ কখনো একসাথে দেখা যায় না। কখনো একসাথে হয় না।

– ‘হয় তো। খেক শিয়ালের বিয়ে যখন হয়। আমি আপনাকে একটা ওষুধ দিচ্ছি। প্যানাডল। এটা চুপচাপ পানির সাথে গিলে ফেলুন।’ মেঘের মনে হলো মেয়েটার কন্ঠস্বর হুবহু রোদেলার মতো।

– ‘প্যানাডল নামে তো কোন জ্বরের ওষুধের নাম শুনিনি।’

– ‘বিদেশী ওষুধ। আমাদের দেশের প্যারাসিটামলের মতই। আপনি গুগলে সার্চ করে দেখতে পারেন সুযোগ পেলে কখনো। বানানটা বলছি PANADOL’

-‘দেখুন তো আমার মাথার উপরে কোন কথা লেখা আছে কিনা।’

মেয়েটা অবাক হয়ে দেখলো বাসের গায়ে লেখা রয়েছে – ‘অপরিচিত কারো দেয়া কোন কিছু খাবেন না।’

মেয়েটা লজ্জা পেয়ে গেলো, অপ্রস্তুত হয়ে বল্ল – সরি, আমি আসলে…ভুলে গিয়ে….মনেই ছিলো না। প্লিজ আপনি বাজে কিছু ভাববেন না।’

– আচ্ছা বেশ ভাববো না। এবার ওষুধটা দিন।

– না না, এখন খেতে হবে না। আমি আপনাকে ওষুধটা দিয়ে দিচ্ছি। বাসায় গিয়ে খাবেন। এখানে নয়।

– আপনি আমার জন্য এত কিছু করছেন কেন?’ প্রায় গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে বল্ল মেঘ।

– ভাল প্রশ্ন করেছেন। জানি না কেন করছি।’ মেয়েটা প্রশ্নটা শুনে যেন বিব্রত হলো।

– আপনি জানেন, কিন্তু বলছেন না।

– না আমি আসলেই জানি না। হতে পারে আপনার জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে।

– খারাপ লাগতেই পারে। কিন্তু তাই বলে আপনি কখনই এত কিছু করতেন না যদি না আপনার শরীরে আরেকটি প্রাণ থাকতো। মা হবার কিছু সময় আগেই নাকি একজন নারীর ভেতর মাতৃত্ববোধ জেগে ওঠে।

– কি জানি, হবে হয়তো। আপনি ঘুমান। ইস আপনাকে এই কথাটা বলতে বলতে এত ক্লান্ত হয়ে গেছি যে এখন আমার নিজেরই ঘুম পাচ্ছে!

এরপর গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো মেঘ। মাঝে একবার মেয়েটা জানতে চাইলো সে কোথায় নামবে, তাকে কখন ডেকে দেবে? মেঘ কোন উত্তর দেয়নি। ইতিমধ্যে মেঘের ফোন বেজে উঠলো। অনেকক্ষন বাজার পর মেঘের পাশে বসা মেয়েটি সেটি হাতে তুলে নেয়। যদি কোন জরুরী কল হয়। ‘হ্যালো বলার আগেই ও প্রান্ত থেকে রোদেলা বলে উঠলো – ‘এত্তগুলো এসএমএস করলাম, একটারো রিপ্লাই দাও নাই। জ্বরের মধ্যেও তো দুটো শব্দ লেখা যায় নাকি? আমি এদিকে টেনশানে মরি!!’

– “উমম…আপনি নিশ্চয়ই রোদেলা?’ এবার রোদেলার কথা মনে পড়লো মেয়েটির।

– “কে আপনি?’ রোদেলা হতভম্ব! এরপর মেয়েটি রোদেলাকে সব খুলে বলে। সব শুনে রোদেলা কেদেঁ দিলো – ‘ওকে পই পই করে বল্লাম বাসে ওঠো না। আমার একটা কথাও শোনে না এই ছেলেটা।’

– সেটা বরং ভালই হয়েছে। এইরকম অসুস্থ শরীর নিয়ে একা একা সিএনজিতে ওঠার ফল হয়তো আরো খারাপ হতো।…. আপনি এতক্ষন পর ফোন দিলেন? এদিকে উনি তো জ্বরে প্রায় বেহুশ হয়ে আছে।

– বাবা ছিলো এতক্ষন সামনে তাই ফোন দিতে পারিনি। আমি এই মাত্র বাসায় এসে আমার রূমে ঢুকেই ওকে ফোন দিলাম।

– ওহ, সরি। আচ্ছা বলুন তো উনার বাসার ঠিকানাটা কি? উনার যে অবস্থা, একা একা যেতে পারবে না বাসায়।

– তাই বলে আপনি ওকে এত রাতে বাসায় দিয়ে আসতে চাইছেন?’ – মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো রোদেলার। বাসে আর কেউ নাই?

– দেখুন আপনি ভুল বুঝবেন না আমাকে। আমার স্বামী মিরপুর ১ নং এ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। সে পুলিশে চাকরী করে। আমার স্বামী আর আমি দুজনে মিলে উনাকে উনার বাসায় দিয়ে আসতে চাইছিলাম যদি আপনি ঠিকানাটা বলেন। ওটাই যেহেতু বাসের শেষ স্টপিজ, সেহেতু ধারনা করছি সেখান থেকে উনার বাসা খুব বেশী দূরে নয়।

– ‘আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। কিন্তু একটা ব্যাপার….আমি তো আসলে অপরিচিত কাউকে ওর বাসার ঠিকানা দিতে পারি না…কিছু মনে করবেন না…আপনার বাসার ঠিকানা এবং ফোন নাম্বারটা যদি তার আগে দিতেন….আমার ভালো লাগতো….’

– ‘হাহা। একই কথা তো আমিও বলতে পারি। তাছাড়া আমাকে এখন বিশ্বাস না করে আপনার উপায়ও নেই। কারন প্রয়োজনটা আপনার। আমার নয়। যাই হোক, আমি আমার বাসার ঠিকানা আর ফোন নাম্বার দিচ্ছি।’

– ধন্যবাদ। প্লিজ কিছু মনে করবেন না….’

– বুঝতে পারছি আমি। যে দিনকাল পড়েছে, কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না। আপনি এক কাজ করুন না, আপনার বয়ফ্রেন্ড সুস্থ হলে তাকে নিয়ে আমাদের বাসায় একদিন বেড়াতে আসতে পারেন। মিথ্যে ঠিকানা যে দিইনি, তাহলে সেটাও বুঝতে পারবেন।

– না না …মিথ্যে ঠিকানা দেবার কথা কি আমি বলেছি…?

– ফান করলাম। আপনার সামনে কাগজ কলম আছে?

আধঘন্টা পর। বাস মাত্র মাঝ রাস্তায়। মেঘের বাসার ঠিকানা রোদেলা তাকে এসএমএস করে দিয়েছে। মেঘ বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। মেয়েটার মায়াই লাগছে মেঘের জন্য। আহারে বেচারা! হঠাৎ করে ওদের বাস কড়া করে একটা ব্রেক কষলো। তাল সামলাতে পাশে বসা মেঘের উরু প্রচন্ড জোরে খামচে ধরলো মেয়েটা। এই কাজটা না করলে তাকে হয়তো হুমড়ি খেয়ে পড়তে হতো বাসের মেঝেতে। মেঘ প্রায় আর্তনাদ করে ওঠলো। মেয়েটা ধাতস্থ হয়ে শশব্যস্ত হয়ে বল্ল – ‘সরি সরি, আপনার লাগেনি তো?’

– ‘হুম লেগেছে। মনে হয় ব্লিডিং হচ্ছে ভেতরে। আপনি ডাক্তার হয়েও এত বড় আরি এত ধারালো নখ রেখেছেন যে সেগুলো আমার জিনসের প্যান্ট পর্যন্ত ভেদ করে উরুর মাংসে গেথেঁ গেছে!’

মেয়েটার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করলো! ছি কি একটা কান্ড হয়ে গেলো। লম্বা নখ তার ছোটবেলার শখ। তাই সে লুকিয়ে চুরিয়ে নখ রাখে। মেয়েটার এই কিংকতর্ব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে মেঘের হাসি পেলো। ঘুম জড়ানো কন্ঠে বল্ল – ‘সরি আপনার সাথে দুষ্টুমি করেছিলাম। জিনস ভেদ করতে হলে শুধু বড় আর ধারালোই নয়, প্রচন্ড শক্ত নখ চাই। আপনার সেটা নেই। সুতরাং ঘাবড়াবেন না। আমার কিছু হয়নি।’

মেয়েটা হাফ ছাড়লো।

রাত ১০টায় বাস থামলো ওদের গন্তব্যস্থলে। মেয়েটার স্বামী মেঘকে কোনমতে ধরে বাস থেকে নামালো। সিএনজি পাওয়া গেলো না। মেঘ বল্ল – ‘একটা রিকশা নিয়েই যেতে পারবো। আপনাদের কাউকেই আসতে হবে না। অনেক করলেন আমার জন্য। ধন্যবাদ দিলে অনেক কম হয়।’ মেয়েটা তার স্বামীর সাথে আরেক রিকশায় ওঠে গেলো।

মেঘ রিকশার হুডে মাথা রাখতেই মনে হলো, যাহ! মেয়েটার সাথে তো পরিচয়ই হলো না! ভাবতে ভাবতে রিকশার ঝাকুনিঁতেও তন্দ্রা এসে গেলো মেঘের। স্বপ্নে দেখলো মেয়েটা বলছে – ‘আমার নাম চন্দ্রাবতী।’ সেই দূর থেকে সুরংগ দিয়ে ভেসে আসা কন্ঠস্বর। প্রতিধ্বনি হচ্ছে।

আজ আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। কুয়াশার চাদর ভেদ করে জোসনা মাটিতে এসে পড়ছে। অপার্থিব দৃশ্য। আজ যদি বৃষ্টি হতো! কিন্তু মেঘ জানে জোসনা রাতে কখনো বৃষ্টি হয় না। ….বৃষ্টি, মেঘ…জোসনা….রোদ….রোদেলা…চন্দ্রাবতী….মেঘ ঘোরের ভেতর সবাইকে একসাথে তার চোখের সামনে দেখতে পেলো যেন। এমন সময় ফোন বেজে উঠলো। কে ফোন দিয়েছে? রোদেলা? চন্দ্রাবতী? নাকি তার পক্ষাঘাতগ্রস্থ বোন? নাকি তার কোন রূমমেট? পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলেই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে সে কিন্তু সেটা করতে ইচ্ছে করছে না এখন তার। তারচেয়ে বরং মন্ত্রমুগ্ধের মতো জোছনাই দেখা যাক।

এমন সময় রিকশাওয়ালা বল্ল – মামা, ফাছ কলোনী তো আইসা পড়ছি। এখন কুনদিকে যামু?

– তোমার যে দিকে ইচ্ছে যাও।

– কন কি মামা? বাসায় যাইবেন না?

– না। তোমার যেদিকে ইচ্ছে যাও। আমার কোন তাড়া নেই। আমার কোন বাসা নেই। আমার কোন গন্তব্য নেই।

– মামায় কি পাগলা পানি খাইছেন নি?

– না মামা। আজ আমি সারা রাত তোমার রিকশায় ঘুরে ঘুরে জোছনা দেখবো। তুমি যদি রিকশা থেকে নামিয়ে দাও তবে হেটেঁ হেটেঁ ঘুরবো।

– বিরাট দিকদারীতে পড়লাম।

– কোন দিকদারীতে পড়ো নাই। তুমি চালাও মামা।

– এত রাইতে কই যামু মামা?

– বল্লাম তো তোমার যেদিকে ইচ্ছা যাও।

– না মামা যামু না। আপনে নামেন। অন্য রিকশা নেন।

– বেশ। আমার পকেটে কিন্তু কোন টাকা নেই। বিশ টাকা ছিলো বাস ভাড়া দেবার পর তাও নেই।

– এইটা আগে বলবেন না?

– সরি, মনে ছিলো না। তুমি এক কাজ করো, আমাকে কোন একটা এটিএমের সামনে নিয়ে যাও।

– ভাড়া লাগবো না মামা। আপনে নামেন।

অগত্যা রিকশা থেকে নেমে সে হাটাঁ ধরলো। মাথা ব্যথা খানিকটা কমেছে কিন্তু চরকির মতো মাথা ঘুরছে। জ্বর বাড়তে বাড়তে এখন আর কোন বোধ নেই তার ভেতর। সে হাটঁছে টলতে টলতে। প্রচন্ড বমি বমি লাগছে। তার ফোন এখনো বেজেই চলেছে। মেঘের মাথার উপরে একখন্ড মেঘ তার উপর বিশাল চাদঁ।

৮ thoughts on “মেঘ, রোদেলা আর চন্দ্রাবতী কাব্য

  1. চমৎকার গল্প। একটানে পড়ে
    চমৎকার গল্প। একটানে পড়ে ফেললাম। এতো সুন্দর একটা গল্পে কোন মন্তব্য নেই দেখে কষ্ট পেলাম। ইস্টিশনের যাত্রীরা কি সব ট্রেনে উঠে মেঘের মতো ঘুম দিছে?

    গল্পে একটা তথ্যে অসঙ্গতি আছে। গল্পটা সুন্দর। তাই বললাম। নাহলে বলতাম না। পিজিতে কেউ ইন্টার্নী করে না। পিজি হাসপাতাল হচ্ছে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের প্রতিষ্ঠান। তাই পেশা জীবনের সূচনা পিজিতে হওয়ার কোন চান্স নাই।

    1. ধন্যবাদ আতিক ভাই আপনার কাছ
      ধন্যবাদ আতিক ভাই আপনার কাছ থেকে একটা নতুন জিনিস শিখলাম। 🙂 পোষ্ট এডিট করে ঢামেক দিবো ভাবছি।

    1. এটা লেখার সময় প্রচন্ড জ্বরে
      এটা লেখার সময় প্রচন্ড জ্বরে আচ্ছন্ন ছিলাম। খুব কষ্ট হচ্ছিলো মনিটরের আলোতে, চোখ দিয়ে পানি পড়ছিলো। তাই তাড়াহুড়ো করেই শেষ করে দিয়েছি। 🙂 ধন্যবাদ ফরিদ ভাই

    1. এরচাইতেও ভালো গল্পও তো মনে হয়
      এরচাইতেও ভালো গল্পও তো মনে হয় এখানে হর হামেশাই দেখা যায়। আপনাকে ধন্যবাদ রাজু রণরাজ। 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *