আই ডোন্ট কেয়ার হু ইউ আর

নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর আত্নজীবনী Long Walk to Freedom একজন বাংলাদেশীকেও উপহার দিয়েছিলেন। উপরে লিখেছেন “প্রিয় বন্ধুকে”। ম্যান্ডেলার এই প্রিয় বন্ধু হচ্ছে কুখ্যাত রাজাকার প্রিন্স মুসা। এতটাই প্রিয় বন্ধু নিয়মিত ফোন করে দুজনই দুজনের খোঁজ খবর নেন।


নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর আত্নজীবনী Long Walk to Freedom একজন বাংলাদেশীকেও উপহার দিয়েছিলেন। উপরে লিখেছেন “প্রিয় বন্ধুকে”। ম্যান্ডেলার এই প্রিয় বন্ধু হচ্ছে কুখ্যাত রাজাকার প্রিন্স মুসা। এতটাই প্রিয় বন্ধু নিয়মিত ফোন করে দুজনই দুজনের খোঁজ খবর নেন।

পাকিস্তান আর্মি ফরিদপুর শহরে প্রবেশ করে ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল। নেতৃত্বে ছিলেন মেজর আকরাম কোরায়েশি। পাকিস্তানিদের আবার পীর ফকির ভক্তি ছিলো প্রবল। ফরিদপুর গিয়েই তারা সাক্ষাত করেন ভন্ড পীর শমসের মোল্লার সাথে। পরদিন ২২ এপ্রিল মেজর আকরাম কোরায়েশীর টিমের সাথে শমসের মোল্লার বৈঠক হয়। শমসের মোল্লা আশ্বস্ত করেন ফরিদপুরকে হিন্দুমুক্ত করতে সব ধরণের সহযোগিতা করবেন। এসময় তিনি তার ছেলে নুলা মুসাকে তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।

এককালের এই নুলা মুসাই এখনকার প্রিন্স মুসা। আর মেজর আকরাম কোরায়েশি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পর বিচার শুরু হওয়া ১৯১ জন যুদ্ধপরাধীর একজন। পরবর্তীতে আলোচিত ‘সিমলা চুক্তি’র মাধ্যমে ঐ ১৯১ জন অবশ্য মুক্তি পেয়ে যায়।

নুলা মুসা হত্যা করেছেন বেশ কয়েকজনকে। এদের ভিতর ফরিদপুরের মদন গোপাল আঙিনার চন্দ্রকান্ত নাথ, গৌরপাল আঙিনার বিজয় মজুমদার, টেপাখোলার কবির আহমেদ চৌধুরী, গুড় বাজারের শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ দুলাল, খোদাবক্স রোডের অপরেশ সাহা, ভোম্বল সাহা এবং বৈদ্যনাথ সাহা খুনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তার বিপক্ষে অভিযোগ আছে ফরিদপুরের স্বর্ণ ব্যাবসায়ী অমূল্য কুন্ডু এবং কার্তিক সাহার বাড়ি লুট করে ৮ মন সোনা আত্নসাতের। এছাড়া অগ্নিসংযোগ করেছেন অসংখ্য বাড়িতে।

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ধনী হিসেবে যাদেরকে বিবেচনা করা হয় তারা সাধারণত দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির ধনী। প্রথম শ্রেণীর ধনীরা শুধু আনটাচএবল না, ইনভিজিবলও। এদেরকে আপনি কখনো দেখেন নাই। এদের নাম শুনেন নাই। মিডিয়াতে এদের কথা আসেনা। মন্ত্রী লেভেলের মানুষজনও এদের সাক্ষাত পাওয়ার জন্য ডাক্তারের সিরিয়ালের মত সিরিয়াল দিয়ে বসে থাকে। কোনো সরকারই এদের ঘাঁটায় না, ভয়ে। প্রশাসনতো এদের সনাক্তই করতে পারেনা। আর এনবিআর এর খাতায় এদের নাম নাই। এরাও দেশের কোন কিছুতে নাক গলায় না। এরা শুধু টাকা বোঝে। হাজার কোটি টাকা। টাকা বানানোর রাস্তায় বাধা এলে ঐ বাধাকে নিচিহ্ন করে দেয় সুনিপুন দক্ষতায়। অদৃশ্য গডফাদার। এরকম গুটিকয়েক ধনীর একজন হচ্ছে এই প্রিন্স মুসা।

দেশের একমাত্র ফাইভ স্টার ফ্যামেলি বিবেচনা করা হয় প্রিন্স মুসার পরিবারকে। প্রিন্স উপাধিটাও সে নিজে নিয়েছে। বিশ্বের কয়েকটা বিশ্ববিদ্যায় থেকে পেয়েছে ডঃ উপাধি। তার সম্পদের পরিমান কত সেটা আমি আপনি দূরের কথা সে নিজেই জানেনা।

২০ ডিসেম্বর ২০১০ মানবজমিনের একটা লীড নিউজে সবায় চোখ আটকে যায়। শিরোনাম ছিলো সুইচ ব্যাংকে আটকে যাওয়া ৫১ হাজার কোটি (৭ বিলিয়ন ডলার) টাকা ছাড়িয়ে আনতে মুসার লবিং। (এই টাকা দিয়ে সে একাই তিনটা পদ্মাসেতু করে ফেলতে পারবে। বিশ্বব্যাংক জাইকার কাছে ভিক্ষা করা লাগবে না)। অনিয়মিত লেনদেনের অভিযোগে সুইচ ব্যাংক তার একাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়েছিলো। ঐ সময় দৈনিক জনকন্ঠ তার সম্পদ এবং প্রতিপত্তি নিয়ে “তুই রাজাকার” শিরোনামে ধারাবাহিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। তার মুলত আন্তর্জাতিক অস্ত্রের ব্যাবসা। এছাড়া আছে আন্তর্জাতিক তেলের ব্যাবসা। উথান ছিলো জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ডাটকো দিয়ে। তাকে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির দিকপাল বিবেচনা করা হয়।

মুকেশ আম্বানী, রতন টাটা কিংবা লক্ষী মিত্তাল নয়। ৮০র দশকে ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘দ্যা হিন্দু’ প্রিন্স মুসাকে দক্ষিন এশিয়ার সেরা ধনী হিসেবে রিপোর্ট প্রকাশ করে।

প্রিন্স মুসা বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে ১৯৯৪ সালে তার ঘনিষ্ট বন্ধু ইংল্যান্ডের তখনকার বিরোধদলীয় নেতা টনি ব্লেয়ারের (পরে প্রধানমন্ত্রী) নির্বাচনী ফান্ডে ৫০ লাখ পাউন্ড অনুদান দিয়ে! পরে অবশ্য ব্লেয়ার টাকাটা নেন নাই। একজন বিদেশীর টাকা দিয়ে নির্বাচন করা উচিত হবেনা এই বিবেচনায়। আমেরিকার রিপাবলিকান নেতা বব ডেলকে জাতীয় নির্বাচনের সময় তার ব্যাক্তিগত জেট প্লেন ধার দিয়েছিলেন।

আমাদের দেশের শীর্ষস্থানীয় ধনী বলতে যাদেরকে বুঝি তাদের সাথে সে চলাফেলা করেনা তার ক্লাসের সাথে যায়না বলে। তার জীবন যাপনও যথেষ্ট বিলাসবহুল। হীরক খচিত তার বেশ কয়েক জোড়া জুতা আছে। তার স্যুটের ডিজাইন করে পৃথিবীর বিখ্যাত সব ডিজাইনাররা। বিখ্যাত কলম প্রস্ততকারী প্রতিষ্ঠান মন্ট ব্যাঙ্ক ৭২৫০ টুকরা হীরা দিয়ে একটা কলম বানিয়ে দেয়। সেটা দিয়েই সে সব ধরণের চুক্তি করে। বাকিটা সময় সুইচ ব্যাংকের ভল্টে থাকে। তার গুলশানের বাড়িতে রান্না করার জন্য রয়েছে উচ্চ ডিগ্রিধারী কয়েকজন ডাচ শেফ। রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েৎসিন তার বন্ধু। কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট তাকে ফোন দিয়ে দেশ পরিচালনার ব্যাপারে আলোচনা করে। তার সঙ্গে সবসময় ৬ জন দূধর্ষ দেহরক্ষী থাকে।

১৯৯৯ সালের ১৫ অক্টোবর সে ATN বাংলা কয়েকঘন্টার জন্য ভাড়া নেয়। ঐ কয়েকঘন্টায় শেরাটন থেকে তার জন্মদিন অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিলো।

তার সম্পর্কে আরেকটা চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছিলো আইরিশ দৈনিক ‘দ্যা ডেইলি মিরর’। ৯ নভেম্বর ২০০৯ সালে তারা রিপোর্ট করে, মুসা আয়ারল্যান্ডের বিখ্যাত কালকিনি দূর্গ কিনতে চেয়েছিলো। যদিও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

আমি স্বপ্ন দেখি কুখ্যাত এই রাজাকারের একদিন ফাঁসি হবে। টাকার কাছে ক্ষমতার কাছে সব অসহায় হয়ে থাকবেনা। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক ভাগে আমাদের আইনের হাত এখনো এতটা লম্বা হয়নি।

War Crimes Fact Finding Committeeর করা ফরিদপুরের প্রধাণ ১৩ রাজাকারের লিস্টে তার নাম আছে।

তার আরেকটা পরিচয় হচ্ছে সে শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আওয়ামীলীগ নেতা শেখ হেলালের বেয়াই। তার একমাত্র মেয়ে ন্যান্সির সাথে শেখ হেলালের ছেলে ফাহিমের বিয়ে হয়। বিয়েতে উকিল বাপ ছিলেন হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ। আবার শেখ সেলিমের আরেক বেয়াই হচ্ছেন বিএনপির সাবেক বিদ্যুতমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

এই কুখ্যাত হেভিওয়েট রাজাকার নুলা মুসা ওরপে প্রিন্স মুসার বিচার আমি চাইনা। কারণ আমি জানি সেটা হবেনা। তবে তার জন্য বরাদ্ধ রইলো আমার প্রবল ঘৃণা এবং একটা গালি “তুই রাজাকার”

৮ thoughts on “আই ডোন্ট কেয়ার হু ইউ আর

  1. এটা একটা মজার ব্যাপার।বিদেশে
    এটা একটা মজার ব্যাপার।বিদেশে সে যা কিছুর মাঝে টাকা ফলাতে গিয়েছে তার অনেকগুলোতেই ব্যর্থ হয়েছে।

      1. ভালো বুঝলেও লসও খেয়েছে।আশির
        ভালো বুঝলেও লসও খেয়েছে।আশির দশকে না কবে যেন এশিয়ান স্টক মার্কেট ক্র্যাশের সময় বিরাট লস খায়।
        সে কয়েক বছর আগে কৃষি খাতে বিরাট অনুদান দিতে চেয়েছিল।কিন্তু সরকার নেয়নি।এছাড়া যে অনেক ডলারের ব্যাংক এ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া হয় সেই ডলারগুলো সে বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখার কথা ভেবেছিল বলে জানা যায়।
        আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার কালো অধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *