একটি সাইকেলের গল্প

তার সাথে আমার পরিচয় ফেসবুকে। একদিন হুট করে ম্যাসেজে এসে বললেন, আমার ভাই হবে? হয়েও গেলাম। ম্যাসেজে টানা সেরকম কথা হতো না ওনার সাথে। এই টুকটাক হালকা কথাবার্তা। তিনি বলতেন আমার গল্প উনি খুব পছন্দ করতেন। আপুটার চেহারা খুব মিষ্টি, চোখগুলো স্ফটিকের মত স্বচ্ছ। উত্তরাতেই থাকতেন। একদিন হুট করে ফোন দিয়ে বললেন,
– পুলক আমার সাথে দেখা করতে পারবে?
– হ্যাঁ, কেন ?
– এমনি। একটা ঘটনা বলবো।
– আচ্ছা। ঠিক আছে।

তার সাথে আমার পরিচয় ফেসবুকে। একদিন হুট করে ম্যাসেজে এসে বললেন, আমার ভাই হবে? হয়েও গেলাম। ম্যাসেজে টানা সেরকম কথা হতো না ওনার সাথে। এই টুকটাক হালকা কথাবার্তা। তিনি বলতেন আমার গল্প উনি খুব পছন্দ করতেন। আপুটার চেহারা খুব মিষ্টি, চোখগুলো স্ফটিকের মত স্বচ্ছ। উত্তরাতেই থাকতেন। একদিন হুট করে ফোন দিয়ে বললেন,
– পুলক আমার সাথে দেখা করতে পারবে?
– হ্যাঁ, কেন ?
– এমনি। একটা ঘটনা বলবো।
– আচ্ছা। ঠিক আছে।
উত্তরা লেকেই ওনার সাথে দেখা করতে গেলাম। তখন বিকেল। আমি কথাবার্তার একটা বিশাল প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলাম। এবং প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলাম বেশ কিছুক্ষন হাঁটার। উনি আসলেন । হাতে একটা ডায়েরি ভীষনভাবে অস্তিত্বমান ছিল, খুব যত্ন করে ধরে রাখা। ‘কেমন আছ?’ এটা জিজ্ঞাসা করেই উনি ডায়েরিটা আমার হাতে দিলেন। ‘এখানে লিখা আছে। তুমি পড়ে নিও’ । উনি খুব দ্রুত চলে গেলেন। এক মিনিটের মতও বসলেন না, কি এক কাজ ফেলে রেখে এসেছেন। আমি সামান্য আহত হলাম যদিও কোনভাবেই সেটা চোখে মুখে বের করলাম না। রাতে বাসায় এসে ডায়েরিটা খুললাম। প্রথম ছয় সাত পৃষ্ঠা কিছু লিখা আর সমস্ত ডায়েরি খালি। আমি লিখাটা পড়া শুরু করলাম। কিছু জায়গায় আমার চোখে অশ্রু শিশিরের মত টলমল করে উঠেছে, কিছু জায়গায় একটা প্রশান্ত হাসি আমার মুখে চোখে ছড়িয়ে পড়েছে, একেবারে শেষে একটা স্তব্ধতা আমাকে গ্রাস করে ফেলেছিল।

এবং এই লিখাটাই আমি এখানে প্রকাশ করছি। বেশ কয়েকটা জায়গা আমি ইচ্ছে করেই তুলিনি কারণ আমার মনে হয়েছে ওগুলো একটা ভাবের সমস্যা সৃষ্টি করবে। কয়েকটা শব্দ একটু পালটিয়ে দিয়েছি কারণ সেটা খুব দরকার ছিল। অবশ্য ডায়েরি লেখিকা আমাকে এরচেয়ে বড় স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। ওনার লিখার হাত এত ভাল যে আমার কোন আচড় লাগাতেই ইচ্ছে করে নি। তার ডায়েরির শেষ লাইনটাই হবে এই পোস্টের শেষ লাইন।

শিফার ডায়েরি থেকেঃ
এখন তো বড় হয়ে গেছি ! ভার্সিটি থেকে বের হয়ে প্রায়ই উত্তরা সেক্টরে সেক্টরে হাঁটি। এখন হয়তো দেখলে হাসি পায়; একটু অবাকও লাগে- কেমন স্কুল কলেজ পড়ুয়ারাও লুকুচুরি করে প্রেম করে বেড়াচ্ছে ! মাঝে মাঝে আবার ভালও লাগে। এরকম লুকিয়ে প্রেম করাটা আমার হয়নি। হয়নি খুব লুকিয়ে প্রেমিকের হাত ধরা ! একবার ডানে, একবার একবার বামে, একবার পেছনে তাকিয়ে প্রেমিকের হাত ধরে সপ্রতিভভাবে হাঁটা । আমার মনে হয় আমি খুব মিস করেছি। এখন হুট করে প্রেমিককে চুমু খাই, হুট করে বলে ফেলি ‘এই লাভ ইউ’, হুট করে হাত ধরে হাঁটি; আমার ইচ্ছে করে খুব ভয়ে ভয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে আমার বাসার সিড়ি কোঠায় প্রেম করতে। যাওয়ার আগে চারদিকটা খুব ভালমত আড়চোখে চেয়ে পাখির ঠোকড়ের মত একটা চুমু এঁকে দৌড়ে সিড়ি দিয়ে উঠে যেতে। এখন আর যেটা সম্ভব নয় !

হয়তো এগুলো সম্ভব ছিল ঠিক আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়তাম। ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া শহরটায় ! এই শহর… এই গ্রাম… এই আমি শিফা… আর ওই ছেলেটি। এখন আমরা যে সব ছেলেদের দেখে বলি স্মার্ট- ডেশিং… ওখানকার ছেলেরা এরকম ছিল না; ছিল না সেই ছেলেটিও। কেমন বোকা সোকা ছিল! ডান সাইডে সিথি করে চুল আচড়াতো, একটা সাইকেল করে স্কুলে আসতো। স্কুলের ছোট বাচ্চারা সেই সাইকেলের বেইল নিয়ে টিফিনে সারাক্ষণ টুং টাং করতো। আমার খুব বিরক্ত হতো !

ছেলেটি আমার এক ক্লাস উপড়ে পড়তো, ক্লাস নিউ টেইন। আমি খুব দ্রুতই ধরতে পেরেছিলাম সে আমাকে পছন্দ করে। আমি খুব একটা পাত্তা দিতাম না, সামনে পড়লে মুখ শক্ত করে রাখতাম, ‘খুব প্রয়োজন নেই’ এরকম একটা ভাব ধরে শক্ত হয়ে কথা বলতাম। আমার সামনে এলেই তার চেহারাটা বোকার মত হয়ে যেত, বোকার মত হাসতো, প্রায়ই ঘেমে যেত, স্কুল ছুটির পর আমার পেছনে হেঁটে হেঁটে বাজার পর্যন্ত যেত সন্তপর্ণে। সেটা আমি পেছনে না তাকিয়েই টের পেতাম। প্রায়ই দেখতাম বিকেল বেলা আমার বাসার সামনের রাস্তাটি ধরে সাইকেল চালাচ্ছে। তার চেহারা দেখে মনে হতো এমনমি বুঝি খেলাচ্ছলেই সাইকেল চালাতে এসেছে ! চকিতে আমার বাসার বারান্দার তাকাত। আমি তো বুঝতাম !

আর আমি যেটা করতাম স্কুল শুরুর সময় ক্লাসের ঘন্টা পড়লে সবাই যখন ক্লাসে ঢুকে যায়, আমি দৌড়ে চলে যেতাম স্কুলের পেছনে। আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতাম হেলানো সাইকেলটার কাছে। হাত দিয়ে সিট স্পর্শ করতাম ! আমার শরীরে অদ্ভুত একটা সেনসেশন হতো তখন ! অদ্ভুত একটা ভাল লাগা কাজ করতো! এই সিটে সে বসে থাকে! হাত দিয়ে বেইলটা স্পর্শ করতাম। এখানেও সে আঙ্গুল ছোঁয়ায়, আর ওই হাতলটায়। সেখানে হাত দিয়ে ধরলে মনে হতো আমি তার হাত দুটো ধরে রেখেছি! খুব দ্রুতই আবার ক্লাসে চলে যেতাম।

ঠিক এভাবে চলছিলঃ আমার সামনে পড়লে তার জুবুথুবু হওয়া, আর তার অগোচরে আমার তার সাইকেলের কাছে যাওয়া। শেষেরটি আমি কেউকে বলি নি। কিন্তু প্রথমটি বলেছি আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীদের সবাইকে। আমি যখন ক্লাস নাইনের কিশোরী, ঠিক এখন থেকে অনেক বছর আগে, আমার সাইকোলজিটি কেমন ছিল তা স্পষ্ট করে মনে করতে পারছি না। শুধু এতটুকু মনে আছে, “আমার কথা আমি কেউকে বলবো না, কখনো না, মরে গেলেও না, রুদ্রকেও না!”

ছেলেটির নাম রুদ্র। আমার বান্ধবীরা আড়ালে ডাকতো ক্যাবলা রুদ্র। বোকার মত হাসতো তো তাই। ‘ক্যাবলা’ বলে হেসে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তো। তাদের সামনে আমিও হাসিতে যোগ দিতাম। কিন্তু ভেতরা ভেতরা আমার প্রচুর অভিমান হতো। কল্পনায় আমার বান্ধবীদের সাথে কত রাগারাগি করেছি! ‘ও বোকার মত হাসে না, খুব ভদ্রভাবে হাসে’। বাসতবে এ কথাটা কখনো বলিনি। তাহলে তারা আমাকে নিয়ে সন্দেহ করতে পারতো। আমার খুব লজ্জা লাগতো তখন!

২।

প্রথম সাময়িকী পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে তখন। প্রতি বেঞ্চে দুজনের সিট। কাকতালীয়ভাবে ঠিক আমার পাশেই বসলো রুদ্র! খুব ভাল প্রিপারেশন নিয়ে প্রথম পরীক্ষাটা দিতে গিয়েছি, বাংলা প্রথম পত্র। পরীক্ষার হলে আমার হাত আর চলে না। মনে হয় সব ভুলে গেছি। চোখ মুখ শক্ত করে বসে থাকি, বাংলা প্রথম পত্রের প্রশ্নকে মনে হয় সামাজিক বিজ্ঞান। কি বাজে অবস্থা! আর ডান পাশের রুদ্র সাহেবটি সারাটা পরীক্ষাই লিখলো! আবার লুজ শিটও নিল! আমার অনর্থক অভিমানে কি একটা গলার কাছে এসে আটকে থাকতো। আমি জানি না, কান্না দলা পাকিয়ে এসে নাকের এইদিকটাতে আটকে থাকতো। সে কেন লিখবে! সে কেন লিখতে পারবে!

এখন ঘটনার ঠিক এতটুকু মনে হলে আমার হাসি পায়। বুঝার চেষ্টা করি কিশোরী বয়সে আমি কি হিংসুটে ছিলাম নাকি সরল ছিলাম। এখন অবশ্য এর কোনটাই নেই। ঢাকার মেট্রোপলিট্রন যান্ত্রিকতা আমার ধমনীতে ঢুকে গেছে। এখানে হিংসা, আনন্দ, সরলতাও যান্ত্রিক এবং সূত্রবদ্ধ।

সেদিন পরীক্ষায় মনে হলো, কেন আমার সিটটিতেই তার সিট পড়লো? কেন সে বসলো?
আজব ব্যপার, এরপরদিন আমার পাশের সিটে সে নেই! শুধু আমার পাশে কেন, পুরো হলেই সে নেই। পরীক্ষা শুরু হয়ে যায় সে আসে না। দশ মিনিট হয়ে যায় সে আসে না। আবারও অনর্থক অভিমানে আমি ঠোট কামড়ে ধরি। সে আসে না কেন ! আমি জানি সে এসে পাশে বসলে একটি গভীর সুখ বিষাক্ত সাপের বিষের মত আমার সারা শরীরে ছেয়ে যাবে। তবুও আমি অপেক্ষা করি…
পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল সে এল না;সে আসে নি।

জীবনটা অনেকগুলো খাপছাড়া ঘটনার সমষ্টি। মাঝে মাঝে খাপছাড়া বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো মূল জীবনে এমনভাবে আঘাত দেয় যে যেটাকে মনে হতে পারে সিনেমার কাহিনী। ‘টাইটানিক’-এ কাঠটার উপর রৌজ শুয়ে ছিল আর কোণাটা ধরে ভেসে ছিল জ্যাক। একসময় জ্যাকের হাতটা ছাড়িয়ে নিতেই পাথরের টুকরোর মত অনায়াসে ডুবে যায় জ্যাক, তলিয়ে যেতে থাকে গভীর থেকে গভীরে। তখন আমার চোখ থেকে দু ফোঁটা জলও পরে, চোখটা ঝাপসা হয়ে অস্বচ্ছ করে ফেলে টিভির স্ক্রীনটা। তবুও স্বান্তণা দেই, ‘এটা তো বাস্তব না ! এটা তো ঘটেনি ! সব সাজানো’। কিছুটা হলেও আমি তখন কম কষ্ট পাই। কিন্তু জীবনে, আমরা যেটাকে ঠিক বাস্তব বলি, সেখানে যদি এরকম কিছু ঘটে সেটাকে কি স্বান্তনা দিয়ে মেনে নেয়া যায়? খুব দ্রুতই কি বলা যায়, সব সাজানো ? হ্যাঁ, অনেক শুনি এই কথাগুলো,’ জীবনটা একটা সাজানো বাস্তবতা। আমরা কারো হাতে খেলার পুতুল’। হতেও পারে, তবুও সমস্ত অনুভূতি নিয়ে জীবনটা যাপন করি আমরাই। পুতুল নিয়ে যখন খেলা করি পুতুল জানে না তাকে নিয়ে খেলা করা হচ্ছে, আবার এও জানে না সে খেলছে। মানুষের সাথে পুতুলের তফাত এই যে, মানুষ হয়তো নাও জানতে পারে তাকে নিয়ে কেউ খেলছে কিন্তু এটা জানে যে খেলোয়ার সে-ই। দুঃখ, যন্ত্রণা ভোগ করে সে-ই।

রুদ্র মারা গিয়েছিল।

রুদ্রকে মেরে ফেলা হয়েছিল। এবং সেটা গভীর রাতে।

সেদিন রাতে হয়তো রুদ্র খুব নিশ্চিন্তে ঘুমুতে গিয়েছিল। অবশ্যই সে ঘুমুতে যাওয়ার আগে আমার কথা ভাবছিল। কল্পনায় সে হয়তো আমাকে নিয়ে সাইকেলও চড়ছিল, রুদ্র হয়তো কল্পনা করছিল আমি তার সাথে হেসে হেসে কথা বলছি অথবা গভীর আবেশে বলছি ‘ভালবাসি’। অথবা হাত ধরে হাটছিলাম তিতাসের পাড়ে। অথবা অনেক কিছু। মানুষের কল্পনাতো বাস্তবতার উপাদান নিয়ে কত অবাস্তব জিনিসই দেখে। আর এটাতো বাস্তবতার কত কাছাকাছি ! অতঃপর রুদ্র ঘুমিয়েছিল পরম নিশ্চিন্তে। সে আগামীকাল পরীক্ষার হলে যাবে, বসবে আমারই পাশে- এটা ভেবে রুদ্রের ভাল লাগছিল না?

রুদ্রকে যখন মারা হয় তখন সে কি ভাবছিল? তার শরীরে যখন ধারাল অস্ত্র দিয়ে কোপের পর কোপ দেয়া হয়েছিও তখন সে কি করছিল! হয়তো চিৎকার করার সময়ও পায়নি। কিন্তু মৃত্যুর আগে যেই এক মূহুর্ত তার জ্ঞান ছিল সেই এক মূহুর্তও কত কিছু ভেবে ফেলেছিল সে! মৃত্যুর সামান্য আগে তার চোখে ছিল রাজ্যের অবিশ্বাস! ছেলেটা সম্ভবত মানুষের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে মরারও সময় পায়নি। অথচ সেটা খুব দরকার ছিল। তাহলে বলা যেত একটা সহজ সরল বোকা সোকা কিশোর তীব্র ঘৃণা নিয়ে মারা গিয়েছিল মানুষের প্রতি; যে মানুষকে প্রবল ভালবেসেছিল সে একদিন; যে মানুষের প্রতি তার হৃদয় একসময় ছিল ভালবাসায় পরিপূর্ণ! আমি এখন, এত বছর পরও কামনা করি রুদ্র যাতে রাজ্যের ঘৃণা নিয়ে মারা যায়, সমুদ্রের মত বিশাল-গভীর ঘৃণা।

মানুষতো কল্পনা সবসময়েই করে। তখন তার কল্পনায় কে ছিল? তার মা? আমি? অথবা তার অন্যকোন প্রিয়জন? আমি অনেকবার বড় হয়েই চিন্তা করেছি রুদ্র তখন কি কল্পনা করেছিল ! আমি যতবার রুদ্রের অবস্থায় নিয়ে গিয়েছি নিজেকে এটা দেখার জন্যে যে কি কল্পনা করতে পেরেছিল সে তখন, আমি কিছুই কল্পনা করতে পারি নি। রুদ্রও তখন কল্পনা করতে পারে নি, কারো কথা ভাবতে পারে নি। হয়তো একটু করে খুব আস্তে তার মাকে ডেকেছিল। এটা সে পর্যন্তই। রুদ্রের সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে ছিল তখন অবিশ্বাস।

রুদ্রের দোষ ছিল ছিল একটাই তার বাবা রাজনীতি করেন। সে দোষ রুদ্রের সমস্ত পরিবারের মানুষদেরই। বেঁচে থাকে নি রুদ্রের গর্ভবতী বোনটিও যে দুপুরে এসেছিল মায়ের কাছে, যার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে ছিল মাতৃত্বেরই চেতনা। মৃত্যু এসেছিল রুদ্রের মায়ের, যিনি গতবছর স্কুলে আমাকে বলেছিলেন, মা তুমি তো খুব মিষ্টি করে কথা বলো!
বেঁচে গিয়েছিলেন রুদ্রের বাবাই। বাড়ির বাইরে ছিলেন তিনি। আমরা সবাই জানি, একেবারে ছোট থেকে বড় পর্যন্ত সবাই, কে ঘটিয়েছিল এ কাজকর্ম। কাকে দিয়ে ঘটিয়েছিল এ কাজ তাও কারো অজানা নয়। সেই খুচরো মাস্তান পালিয়েছে কিন্তু নির্বাচনের আগে যখন সে খুচরো মাস্তানের জন্মদাতা হাতির পিঠে উঠে জনগণের কাছে ভোট চায় এবং যখন কোনভাবে নির্বাচনে জিতে ফেলে মনে হয় আত্মহত্যা করে বসি! রাগে, ক্ষোভে, দুখে, বেদনায় আমার মত দূর্বলদের শুধু চোখ দিয়ে পানিই পড়ে। কোন প্রতিবাদ করতে পারি না ঘরের কোণে বসে থাকা এই আমি। কোন কথা বলতে পারি না পৃথিবীর এক কোণে পড়ে থাকা আমরা।

রুদের বাবা আরেকটা বিয়ে করেছেন। এখন আর রাজনীতি করেন না। বেশ কিছুদিন আগে তার বাসায় গিয়েছিলাম এমনিতেই। কোন কাজ নেই। একটা সময় খোলা হলো রুদ্রের বেডরুমটা। ছয়বছর ধরে এটা নাকি এরকমই আছে। মাঝে মাঝে বুয়া ঢুকে ঝাড়পোছ দেয়। আমি খুব খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলাম রুমটা। রুদ্রের নতুন মাকে বললাম, ‘আন্টি জানেন, রুদ্রকে আমি পছন্দ অরতাম তখন!’ । উনি একটু হাসলেন শুধু। হাসলাম আমিও।
‘আন্টি কিছু মনে করবেন না, এখানে আমি একটু একা থাকতে পারি?’

রুদের খাটটাতে বসে অনেক্ষণ কাঁদলাম এই। রুদ্রের প্রতি হয়তো কৈশরের তীক্ষ্ণ ভালবাসাটা নেই কিতু আছে স্নিগ্ধ একটা ভাল লাগা, একটা প্রগাড় মায়া, আছে পুরোনো বন্ধুর মত টান। যেদিন আমি রুদ্রের মৃত্যু সংবাদটা শুনেছিলাম আমি কাঁদি নি, দরজা আটকিয়ে বসে ছিলাম ঘন্টার পর ঘন্টা অপকৃতিস্তের মত। আমি ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে অনেকদিন কাঁদি নি, মাঝে মাঝে অবশ্য নীরবে চোখের জল ফেলেছি! সামনের টেবলটাতে তাকালাম। সেই নাইন টেইনের বই তার টেবিলেঃ পাঞ্জেরি গাইড, পদার্থবিজ্ঞান, খুব যত্ন করে লিখা বেশ কয়েকটা খাতা। হাত দিয়ে স্পর্শ করলাম হাতে লিখা অক্ষরগুলো। এই চেয়ারে বসে রুদ্র কত কি লিখতো এই খাতায়! খাতার কোণাটায় খুব অদ্ভুতভাবে আঁকা মানুষটা সে যখন আঁকছিল তখন তার মুখে মনে হয় মিটিমিটি হাসি ছিল। সে হাসির অনুকরণে আমারও চোখে মুখে একটা মিটিমিটি হাসি ছড়িয়ে পড়লো।

একটু ঘুরতেই কোণার দিকে পড়েছিল সে সাইকেলটা। নীল সিটের সে সাইকেল! কৈশোরের মতই বহুদিনপর স্পর্শ করলাম সিটটা। কত বছর হলো এখানে কেউ বসে না! টুং টাং করে বেইলটা সামান্য বাজালাম। কত বছর ধরে তুই বাজিস না? আমি বাজাতেই থাকলাম বেইলটা… বাজাতেই থাকলাম…
ক্র্যাক করে দরজাটা খুলে গেল। বুয়া বলল,
‘আফা, আপনেরে মামীজান বুলায়’
‘এইতো আমার শেষ’

*****************************************

১৯ thoughts on “একটি সাইকেলের গল্প

  1. খুব সুন্দর লেখা। পড়ে খুব ভালো
    খুব সুন্দর লেখা। পড়ে খুব ভালো লেগেছে, সেই সাথে মন খারাপও হয়েছে খুব। ত্বকীর কথা মনে হচ্ছিল। শুভেচ্ছা নেবেন। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  2. গল্পটা খুব সুন্দর হ​য়েছে,
    গল্পটা খুব সুন্দর হ​য়েছে, বহুদিন এরকম বর্ননা প​ড়িনি। এরকম চালিয়ে গেলে অনেক উপরে উঠবেন আশা করছি।

    1. সত্যি বলতে কি আমারও বারবার
      সত্যি বলতে কি আমারও বারবার ত্বকির কথা মনে হচ্ছিল শেষে এসে দেখি তুইও একই মন্তব্য করেছিস!! গাজি ভাই এক কথায় চমৎকার একটা গল্প পড়লাম!! :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :bow:
      অনেকের মত আমারও একই প্রশ্ন এইটা কি সত্য ঘটনা?

  3. অসাধারণ একটা গল্প পড়লাম;
    অসাধারণ একটা গল্প পড়লাম; :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :ধইন্যাপাতা:
    পড়ার পরে কিছুক্ষণ আক্ষরিক অর্থেই বাকরুদ্ধ হয়ে থেকেছি। :bow:
    শুভ কামনা রইল, গাজী ভাই। :ফুল: :গোলাপ:

  4. সত্যিই হার্টটাচিং একটা
    সত্যিই হার্টটাচিং একটা গল্প…
    বিশেষ করে কিশোর অথবা কিশোরী বয়সের যে অবয়ব টা তুলে ধরা হয়েছে…

    “ছেলেটা সাইকেল নিয়ে বাসার সামনে খেলাছলে ঘুরাঘুরি করত,
    মেয়েটা ছেলের অগোচরে সাইকেলের সিট ছুঁয়ে দিতো…”

    সত্যিই প্রশংসার যোগ্য…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *