এপিটাফ

কিরে জালাইল্যা , তর চাপাডি এনো শুকনা লাগতাছে ক্যান বাজান ? শইলডা খারাপ নি তর ?

যাকে উদ্দেশ্য করে বলা , সে ততক্ষণে মুখ ধোয়া শেষ করেছে ।
‘না খুড়া , কিছু না । এনো ডানা দুইখানে বিষ আছে , চলবার পারুম ।’

আইচ্ছা যা । জোরাইনের থে দূরত যান না । দাজ্জালেও মাইনষক এনো ন মারে বাহে

ততক্ষণে বশির খুড়ার পুরানো রিকশাটা নিয়ে বেড়িয়ে পরেছে জালাল । শরীরে আসলেই অনেক ব্যাথা ওর । কিন্তু না বেড়োলে উপায়ও নেই ।


কিরে জালাইল্যা , তর চাপাডি এনো শুকনা লাগতাছে ক্যান বাজান ? শইলডা খারাপ নি তর ?

যাকে উদ্দেশ্য করে বলা , সে ততক্ষণে মুখ ধোয়া শেষ করেছে ।
‘না খুড়া , কিছু না । এনো ডানা দুইখানে বিষ আছে , চলবার পারুম ।’

আইচ্ছা যা । জোরাইনের থে দূরত যান না । দাজ্জালেও মাইনষক এনো ন মারে বাহে

ততক্ষণে বশির খুড়ার পুরানো রিকশাটা নিয়ে বেড়িয়ে পরেছে জালাল । শরীরে আসলেই অনেক ব্যাথা ওর । কিন্তু না বেড়োলে উপায়ও নেই ।

জুরাইনের একটা ছোট্ট খুপড়িতে দুইমাস আগে যখন গ্রাম থেকে আসলো , ইচ্ছে হচ্ছিলো পালিয়ে যেতে । পালানোর জায়গা থাকলে না পালাবে । মা আর ছোটভাই গ্রামে । বশির খুড়া তার গ্রামের লোক । ঢাকা শহরে তার অনেক চেনা জানা ।

বাপে অনেক শখ করে নাম রাখছিলো শাহাজালাল । মস্ত এক পীরের নামে নাম । গ্রামের ইশকুলে তিন কেলাস পার করতে করতে সেই নাম কিভাবে যেনো বাট্টু জালাইল্যা হয়ে যায় ।
নামটা ছাড়া আর কিছু তার বাবায় তাকে দিতে পারে নি , তার সাথে এমন বিশেষণ যোগে নাম নিয়ে ভালো লজ্জায়ই ভুগতো সে ।

দুইমাসে সে অনেক কিছু শিখেছে । তিরিশ টাকার ভাড়া পঞ্চাশ টাকা চাইলে চল্লিশ টাকা পাওয়া যায় । কখন কোথায় ভাড়া বেশি পাওয়া যায় । তবে কাল সন্ধ্যায় যা হলো সেটা বুঝতেও পারে নি । কিভাবে যেনো রিকশার চাকাটা কালো গাড়িটার গায়ে লেগে গেলো , দুইটা ছেলে এসো মারলোও ইচ্ছামতো । রিকশায় বসে থাকা মেয়েটা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় থাকলো ।

রোদটাও উঠাইছে আজকে ।
আরামবাগের মোড়টায় থেমে দুই গ্লাস পানি খেলো সে ।
বুড়ো মতন রিকশাওয়ালাটার দিকে একবার তাকিয়ে রিকশায় বসে পড়লো । হরতালের দিন , তার উপর এমন রোদ । চোখ দুটো বন্ধ করতে যাবে , বৃদ্ধ বললো
‘ঢাহা শহর নয়া নি ?’

‘ক্যা ? নয়া হমু ক্যা ?’ বেশ জোড় দিয়ে বলে জালাল ।
‘না আইজকা পরথম দ্যাখলাম ।’
‘রিকশাওয়ালা গো আবার পেরেম পিরিতি কি কাকা ?’

বৃদ্ধ হাসে ।
আসলেই তো । রিকশাওয়ালাদের আবার কিসের পরিচয় ? হাজার রিকশা ঘুরে ঢাকা শহরে । কতজনের সাথে প্রতিদিন দেখা হয় । চেনা জানা হয় । একদিন হঠাত্‍ হারিয়ে যায় । আবার নতুন কেউ আসে । এভাবেই চলছে

‘বাড়ি কো ?’
‘জ্বে জোড়াইন । বশির ম্যাকারের ভাইজতা লাগি’

মৃদু হাসে বৃদ্ধ ।
‘এইবারে খ্যাপে আইছো মিয়া । ক্যামন আছে বশির ম্যাকার ?’
‘আছে ভালাই । চক্ষে দ্যাহে না খুড়া । চ্যানেন কিবা ?’

‘চিনুম না ক্যা ? ঢাহা শহরে যহন কিছুই আছিলো না তহন থাইকা চিনি ।’

উত্‍সাহী হয়ে উঠে জালাল । বশির খুড়াকে নিয়ে কত কিছু শুনেছে সে ছোট বেলায় । বশির খুড়া তার গ্রামের সবার বশির খুড়া । তার বাবারও বশির খুড়া , তার স্কুলের মাস্টারেরও বশির খুড়া । মতি মাস্টার একবার বলছিলো বশির খুড়ারে নাকি কইতো বাঘা বশির । ক্যান কইতো তা আর শোনা হয় নি । আত্মীয় বলতে বশির খুড়ার কেউ নাই , পুরো গ্রামটাই আত্মীয় ।

‘কৈ হারাইলা মিয়া ?’ বৃদ্ধের কথায় বাস্তবে ফেরে জালাল ।
‘না কিছু না কাকা । কন আপ্নে’

‘আইয়ুব খার আমল থাইকা ঢাহা শহরে রিকশা চালাই বুঝলা মিয়া ? সেই আমলে এই এলাকায় রিকশার ম্যাকার একটাই । বশির ম্যাকার । তার দোকানের লগে চুন্নুর সিঙ্গারার দোকান আছিলো । দিক দিক থাইকা লোকে চুন্নুর সিঙ্গারা খাইবার আইতো’

উত্‍সাহী আরো কয়েকজন রিকশাওয়ালা গল্প শোনে বৃদ্ধে । কাঠফাটা রোদে হরতালের অলস দুপুরে সময় কাটানোর সুন্দর উপলক্ষ ।

বৃদ্ধ যেনো চোখের সামনে দেখছে সব ।

‘গন্ডগোলের সময় চুন্নুরে চক্ষের সামনে গুলি কইরা মারলো । হিন্দু আছিলো , নাইলে বাইচা যাইতো । আমি তহন বশির ম্যাকারের দোকানে । মিলিটারি যাওনের পর হক্কলের সামনে বশির ম্যাকার লাশটা বুকে ধইরা কি কান্না । হেই চিত্‍কার আইজও কানে ভাসে’

হ্যার পর ? জিজ্ঞাসা করে জালাল । বেশ লাগছে তার । তার বশির খুড়াকে কত মানুষ চেনে ভাবতেই ভালো লাগে

হ্যার পর আর কি । হপ্তা পার হইতে না হইতে বশির ম্যাকার গায়েব হয়া গেলো ।
মাস দুই পর একদিন রাস্তায় দেহা । কলো , মিয়া ভাই বিপদে আছি । দুইদিন থাকবার জাগা দাও ।

বৃদ্ধের চোখ গুলো জ্বল জ্বল করে উঠলো ।
তিনদিন পর সে চলি গেলো । লগে আমিও গেলাম । ভারত । মুক্তিবাহিনী ।

এক লগে থাকছি । খাইছি । মারছি । এক লগে জলে নামছি । এক লগে ডাংগায় হাটছি । দ্যাশ স্বাধীন হওনের পর এক লগে ঢাহা ফিরছি । বেতারে দ্যাশ স্বাধীন হইছে শুননের পর বশির ম্যাকার চিত্‍কার দিয়া কলো , মোর চুন্নুদার আর কষ্ট রলো না দাদা , মোর চুন্নুদার আর কষ্ট রলো না’

জালাল বুঝতেও পারে না তার গাল গড়িয়ে চোখের পানি পরে যায় । ক্যামন যেন লাগে ।

থাকেন কই কাকা ?

থাকি ? থাকতাম কমলাপুর । আর থাকুম না । দ্যাশে চলি যাবো ।

দ্যাশ কোনে ?

বৃদ্ধ জবাব দেয়ার সময় পায় না । দুই তরুণী এগিয়ে আসে জালালের রিকশার দিকে ।

মালিবাগ যাবেন ?
যামু ।
কত ?
চল্লিশ । দশটাকা বাড়িয়েই বললো সে ।
চলেন বলে উঠে পরলো তারা ।

একবার ঘুরে বৃদ্ধের দিকে তাকালো জালাল ।
হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না । না হোক ।
রিকশাওয়ালা গো আবার পেরেম পিরিতি কি ?

৭ thoughts on “এপিটাফ

  1. গল্পটা শুরু হয়েছিল ভালো,
    গল্পটা শুরু হয়েছিল ভালো, এগিয়েছেও ভালো, শেষও হল ভালো ভালভাবে একটা ম্যাসেজ দেয়ার মাধ্যমে। আমি যদিও আঞ্চলিক ভাসার ব্যাপারে দুর্বল, তারপরও বলবো আঞ্চলিকতার ব্যবহারটা ভালোই লেগেছে। অনুগল্পের স্বল্প পরিসরে বশির খুড়া আর জালালকে চিত্রায়িত করার কঠিন কাজটাই সুন্দর ভাবে করেছেন। :তালিয়া:
    অনুগল্পের ব্যাপারে আমার একটাই কমপ্লেইন , গল্পের কাহিনী বেশী Deep এ ঢোকে না।

    1. গল্পটা লেখার পর আসলে নামটা
      গল্পটা লেখার পর আসলে নামটা দিয়েছি। এটা ছারা নামও পাচ্ছিলাম না। দুজন যোদ্ধার জীবনের এপিটাফ

  2. কেন জানি মনে হচ্ছে আরো কিছু
    কেন জানি মনে হচ্ছে আরো কিছু থাকলে ভাল হত। হঠাৎ করেই থামিয়ে দিলেন কি? দুইজন মুক্তিযোদ্ধার কাহিনী না খেঁটে খাওয়া মানুষের কথা বলতে চেয়েছেন। গল্পের পরম্পরা ভাল লেগেছে। শুরুও অনেক ভাল। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :বুখেআয়বাবুল:

  3. ভালোই লাগছে। তবে নাভিদ ভাইয়ের
    ভালোই লাগছে। তবে নাভিদ ভাইয়ের সাথে একমত। গল্পের নাম অন্যকিছু হতে পারতো। গল্পে ★★★★। :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *