যারা বলছেন সরকার যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে টালবাহানা করছে, দয়া করে এইদিকে আসুন !!!

আপনাদের অভিযোগ সরকার এই বিচার নিয়ে খেলছে। এটাকে আগামী নির্বাচনে একটা ইস্যু হিসাবে আনার জন্যই সরকার এমনটা করছে। রায় দ্রুত দিচ্ছে না, শুনানি দ্রুত হচ্ছে না, নানা সব অভিযোগ। সরকার ইচ্ছে করেই এমন বিলম্ব করছে।


আপনাদের অভিযোগ সরকার এই বিচার নিয়ে খেলছে। এটাকে আগামী নির্বাচনে একটা ইস্যু হিসাবে আনার জন্যই সরকার এমনটা করছে। রায় দ্রুত দিচ্ছে না, শুনানি দ্রুত হচ্ছে না, নানা সব অভিযোগ। সরকার ইচ্ছে করেই এমন বিলম্ব করছে।

এখন আমি আপনাদের মনে করিয়ে দিবো বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার কথা। এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। আর এই মামলার কার্যক্রম শেষ হয় ২০১০ সালে আসামীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে। ১৯৯৬ থেকে ২০১০ সাল মাঝে সময় ছিল ১৪ বছর। এর মধ্যে বিএনপির আমলে ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ৫ বছর মামলার কার্যক্রম স্থগিত ছিল। তার মানে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লেগেছিল প্রায় ৯ বছর। খেয়াল করেন বন্ধুরা বঙ্গবন্ধুর বিচার নিয়ে তো আর শেখ হাসিনা নির্বাচন ব্যাবসা করতে নিশ্চই চায়নি, নাকি?

দ্বিতীয়ত, সেখানে মামলা ছিল একটি, মানে একটি মামলার আওতায়ই সব আসামীর বিচার কার্যক্রম চলেছে।

তৃতীয়ত, আসামীরা তাদের খুনকে আন্তর্জাতিক মহলে জায়েজ করার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার দিয়েছে। তারা তাদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রমান করতে চেয়েছিল যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা খুবই যুক্তিসঙ্গত ছিল। তার মানে তারা যে খুন করেছিলো তার সাক্ষ তারা নিজেরাই দিয়েছিল। তাই তারা যে খুনি সেটা প্রমান করতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি প্রমানের অভাব পড়েনি। ইউটিউবে সার্চ দিলে এখনো আপনারা সেই খুনিদের সাক্ষাৎকার গুলো পাবেন।

চতুর্থত, সেই বিচার কার্যক্রম নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কোনরূপ প্রোপাগান্ডা স্টাব্লিশ হয়নি।

আরেকটা কথা, বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পরে।

এখন, আসুন আমরা বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার সাথে যুদ্ধাপরাধী বিচারের পরিবেশগুলোর একটু তুলনা করি।

প্রথম কথা হল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম চলছে প্রত্যেক যুদ্ধাপরাধীর নামে আলাদা আলাদা মামলার মাধ্যমে। এখানে একটি মামলার মাধ্যমে সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার কাজ সম্ভবই নয়। কারন প্রত্যেকটি অপরাধ সংগঠিত হয়েছে আলাদা আলাদা যায়গায়, আলাদা আলাদা যুদ্ধাপরাধীর মাধ্যমে। তাই তাদের বিচার এজমালিভাবে করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। অপরদিকে বঙ্গবন্ধু পরিবার হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছিলো একই যায়গায় এবং এখই সময়ে এবং একটা মাত্র টীমের দ্বারাই। মুলত এখানে ঘটনা একটাই। তাই তাদের দলগতভাবে বিচার করাতেই সব চুকে গেছে।

দ্বিতীয়ত, যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধ প্রমান করা ছিল খুবই দুরহ কাজ। ঘটনার ৩৭ বছর পর গ্রহন করা হয় যুদ্ধাপরাধী বিচারের উদ্যোগ। ৩৭ বছরে প্রত্যক্ষ দর্শীরা অনেকেই মারা গেছেন, যারা বেঁচে আছেন তারাও বয়সের ভারে নত। ৩৭ বছরে অপরাধের আলামতের অবশিষ্ট কিছুই নেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার ক্ষেত্রে আসামীরাই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলো যে তারা হত্যাকারী। মনে রাখবেন স্বাভাবিকভাবে জানা যে এই লোক এই অপরাধ করেছে আর আদালতে সেটা প্রমান করা দুইটা ভিন্ন জিনিস। আদালতে প্রমান করার জন্য যথেষ্ট পরিমান সাক্ষ্য প্রমানের প্রয়োজন পড়ে। যে কারনে সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের সময় দেখা গেছে অনেকগুলো অপরাধই প্রমান হয়নি। তার মানে এই নয় যে ঘটনাটি সংগঠিত হয়নি। ঘটনাটি সংগঠিত হয়েছিলো ঠিকই কিন্তু ৪০ বছর পর সেটা আর প্রমান করা সম্ভব হয়নি।

তৃতীয়তঃ যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রোপাগান্ডার কোন অভাব নেই। যুদ্ধাপরাধী মহল কোটি কোটি ডলার খরচ করে আন্তর্জাতিক লবিস্ট নিয়োগ করেছে। তাদের একমাত্র অ্যাসাইনমেন্টই হল যেভাবেই হোক আন্তর্জাতিক ভাবে এই বিচারিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। এছাড়া দেশের মধ্যে তাদের আছে একটা সুগঠিত জঙ্গি রাজনৈতিক সংগঠন। ব্যাকআপ টীম হিসেবে আছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। যার ফলাফল স্বরূপ সরকারের উপর আসছে প্রচুর আভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক চাপ। মুখে যতই বলি আন্তর্জাতিক চাপকে পায়ে ঠেলে বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বাস্তবিক ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। সরকার আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করলে দেশ চালাতে পারবেনা। সরকারকে সেই চাপ উপেক্ষা নয়, বরং মোকাবেলা করতে হয়। বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠলে সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হয়, ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের প্রশ্ন না উঠে সেইভাবে বেবস্থা নিয়ে বিচারিক কার্যক্রম চালনা করতে হয়। ব্যাপারটা যত সহজ ভাবা হয় ততটা সহজ নয়। আমরা ফেসবুকে একটা ইভেন্ট খুলে এক সপ্তাহের মধ্যেই একটা বড় রকম মানব বন্ধন বা, সমাবেশ করে যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়ে সরকারের কাছে পাঁচটা দশটা দাবি পেশ করতে পারি। কিন্তু সরকারকে সেই দাবি পূরণ করতে যে বারোটা বেজে যায় সেটা নিশ্চই উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে।

একটা বিষয় চিন্তা করেন নিজের পিতা এবং সপরিবারের হত্যার একটা মামলা শেষ করতে শেখ হাসিনার সময় লেগেছিল ৯ বছর। আর এই সরকারের এই সাড়ে চার বছরে অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা নিষ্পত্তির অর্ধেক সময়ে রায় ঘোষণা করেছে ৭ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর। এদের মধ্যে দুই জনের বিচারিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে আরও চার-পাঁচ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর। তারপরেও আপনি কিভাবে অভিযোগ করেন যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে সরকার টালবাহানা করছে, সরকার ইচ্ছে করেই বিচারকাজ বিলম্বিত করে নির্বাচনে ফায়দা লুটতে চাচ্ছে? এর চেয়ে বেশি দ্রুত গতিতে কিভাবে বিচার করা সম্ভব? মনে রাখবেন এইটা একটা বিচার প্রক্রিয়া, এটা জিয়াউর রহমানের প্রহসনের সামরিক বিচার না যে কয়েকদিনের মধ্যে হাজার হাজার ফাঁসির রায় কার্যকর হয়ে যাবে। সরকারকে শুধু বিচার করলেই হবে না, সেই বিচার সুষ্ঠু হচ্ছে কিনা তার জবাবদিহিতাও করতে হয়।

তারপরেও যদি মনে হয় সরকার ইচ্ছে করেই সবকিছু বিলম্বিত করছে তাহলে দয়া করে এমন একটা রাজনৈতিক দলের নাম এবং সেই দলের মার্কা বলবেন যারা ক্ষমতায় এলে এই বিচার আরও দ্রুত গতিতে এগুবে। খোদার কসম আমি সেই মার্কাতেই ভোট দিবো।

৬ thoughts on “যারা বলছেন সরকার যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে টালবাহানা করছে, দয়া করে এইদিকে আসুন !!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *