একটি ক্যামেরা লেন্স কেনার গল্প

অনেকদিন থেকে একটা ১৮-১০৫ মিমি নাইকন ভিআর কিট লেন্স খুজঁছিলাম কেনার জন্য। পেয়েও গেলাম। মাত্র মাস খানেক ব্যবহৃত। দাম লেখা ১৭ হাজার। ফোন করলাম, লোকটা জানালো, সে ভুলেই গিয়েছিলো যে বিক্রির জন্য এ্যাড দিয়েছিলো। কিন্তু এরপর কারো কোন ফোন না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, লেন্সটা আর বিক্রি করবে না। এখন আমি ফোন দেয়াতে অত্যন্ত লাজুক ও বিনয়ী এই ভদ্রলোকটা না করতে পারলো না।

দামাদামিতে আমি বরাবরই অপটু। তাই মাত্র দু হাজার টাকা কম বল্লাম। একটু লাজুক হেসে, হালকা ইতস্ততঃ করে ১৫ হাজারে রাজী হয়ে গেলো লোকটা।


অনেকদিন থেকে একটা ১৮-১০৫ মিমি নাইকন ভিআর কিট লেন্স খুজঁছিলাম কেনার জন্য। পেয়েও গেলাম। মাত্র মাস খানেক ব্যবহৃত। দাম লেখা ১৭ হাজার। ফোন করলাম, লোকটা জানালো, সে ভুলেই গিয়েছিলো যে বিক্রির জন্য এ্যাড দিয়েছিলো। কিন্তু এরপর কারো কোন ফোন না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, লেন্সটা আর বিক্রি করবে না। এখন আমি ফোন দেয়াতে অত্যন্ত লাজুক ও বিনয়ী এই ভদ্রলোকটা না করতে পারলো না।

দামাদামিতে আমি বরাবরই অপটু। তাই মাত্র দু হাজার টাকা কম বল্লাম। একটু লাজুক হেসে, হালকা ইতস্ততঃ করে ১৫ হাজারে রাজী হয়ে গেলো লোকটা।

ফোনে চিন পরিচয় হলো। নিজের পরিচয় দিয়ে তারটা জানতে চাইলাম। জানালো, আর্মির ক্যাপ্টেন। কিছুদিন হলো র‌্যাবে পোষ্টিং হয়েছে। থাকেন ক্যান্টনমেন্টে। ভয়েস শুনে মনে হলো, বয়সে একেবারেই তরুন। কথাবার্তায় মনে হলো, যথেস্ট বিনয়ী, ভদ্র আর লাজুক। র‌্যাবের একজন সদস্য, এমনটা মানায় না ঠিক। তবে নতুন নতুন র‌্যাবে ঢুকলে সবাই মনে হয় এমনটাই থাকে, আস্তে আস্তে বদলে যায়, যেতে হয়।

জিগেস করলাম, ’বিক্রি করছেন কেন?’ লাজুক লোকটা থেমে গেলো কিছুক্ষনের জন্য। একটু হাসার চেষ্টা করলো, ফোনেও বুঝতে পারলাম। “লেন্সটা আসলে আমার স্ত্রীর। আমরা থাইল্যান্ডে হানিমুনে গিয়ে কিনেছিলাম। হানিমুনের ছবি তোলার জন্য।” আমি ফোড়ঁন কেটে বল্লাম – “বাহ, হানিমুন শেষ, আর অমনি বিক্রি করে দিতে চাইছেন?” মজা করার জন্যই বলা। কারন আমি ধরেই রেখেছিলাম লোকটি বলবে যে সময়ের অভাবে ছবি তোলা হয় না বা টাকার হঠাৎ দরকার পড়েছে। কারন লোকে সাধারনত এই দুই কারনেই শখের জিনিস বিক্রি করে দেয়। কিন্তু লোকটি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললঃ
-”না, ঠিক তা নয়, কিছুদিন আগে আমার স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে। তাই ওর স্মৃতিগুলো আর নিজের কাছে রাখতে পারছি না।”
আমি থতমত খেয়ে গেলাম। কোনমতে বল্লাম – ওহ সরি, ভাইয়া…
– না না ঠিক আছে…
– আপনি একান্তই ব্যাক্তিগত একটা কারনে বিক্রি করছেন, এটা জানলে আমি কখনই প্রশ্নটা করতাম না।
– আপনি খুবই সঙ্গত একটা প্রশ্ন করেছেন। আপনার এই প্রশ্নের উত্তর জানাটা উচিত। ক্রেতা হিসেবে এটা আপনার অধিকার, আমার মনে হয়।
আমি তাড়াতাড়ি প্রসংগ পাল্টে বল্লাম – ”বডিটাও কি আছে? ওটাও কি বিক্রি করবেন?”
– না, ওটা ও নিয়ে গেছে যাবার সময়। তাড়াহুড়ো করে গেছে বলে লেন্সটা নিতে পারেনি। এরপর আমি ওর বাসার ঠিকানায় ওটা কুরিয়ার করে পাঠিয়েছিলাম। ঠিকানা বদল করেছে বলে আবার আমার কাছেই ফেরত এসেছে।” লোকটা আবারও হাসার চেষ্টা করলো।

লোকটার সাথে আমার প্রথম দেখা হলো আজ দুপুর ১২টায়। ক্যাপ্টেন নাহিদ, সাথে তার বন্ধু ক্যাপ্টেন এরশাদ। তিনিও র‌্যাবে আছেন। বন্ধুটি অসম্ভব সুদর্শন। হঠাৎ দেখলে বিদেশী নাগরিক বলে ভ্রম হতে পারে। ক্যাপ্টেন নাহিদকে দেখলাম ফোনের মতই লাজুক। খুব নিচু স্বরে লাজুক হেসে কথা বলছে। কে বলবে এই লোক বাংলাদেশের সবচেয়ে দুধর্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে চাকরী করেন।

আমি ক্যামেরা বডির সাথে লেন্সটা লাগিয়ে চেক করতে করতে টুকটাক আলাপ করছিলাম। ক্যাপ্টেন নাহিদের মতো ক্যাপ্টেন এরশাদের কোন জড়তা নেই কথাবার্তায়। এমনভাবে কথা বলছেন যেন আমরা অনেক দিনের পরিচিত। বিক্রমপুর সুইটসের একটা দোকানে বসেছিলাম আমরা। ভেতরে রেষ্টুরেন্টের মতো বেশ কয়েকটি টেবিল-চেয়ার পাতা। অনেক জোরাজুরি করেও ক্যাপ্টেন নাহিদ আমাকে বিল দিতে দিলেন না। মনে মনে ভাবলাম, এই অমায়িক আর বিনয়ী লোকটির সংসারও টিকলো না! একমাসের ভেতর ভেঙ্গে গেলো?

আমি লেন্স চেক করে সেটাকে থলেতে ভরে পকেট থেকে টাকা বের করে টেবিলে রাখলাম। ক্যাপ্টেন নাহিদ ঠিকমতো গুনেও দেখলো না। কোনমতে কয়েকটা নোট উল্টিয়ে মানিব্যাগে ভরে রাখলো টাকাটা। এরপর সে আমার সামনে রাখা লেন্সের থলেটি নিজের দিকে টেনে নিলো। আমি ভ্রু কুচঁকে তাকালাম। সে খুব সাবধানে থলে থেকে লেন্সটি বের করে হাতে নিয়ে কিছুক্ষন বসে রইলো। কোলের উপর তাকিয়ে রইলো। আমি আর ক্যাপ্টেন এরশাদ দুজনেই তার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। টেবিলের এপাশ থেকে দেখলাম, সে ডান হাত দিয়ে লেন্সটাতে আলতো করে হাত বুলাচ্ছে। মাথা নিচু করে থাকাতে চোখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। চোখে কি তখন অশ্রু ছলছল করছিলো ক্যাপেন্ট নাহিদের? এই লেন্স দিয়ে দুজনের কোন রোমান্টিক মূহুর্ত বন্দী করেছেন….ঝাপসা চোখে তার মনে পড়ছে সেগুলো?

আমি ভীষন বিব্রতবোধ করলাম। একবার ভাবলাম, বলি – “আপনি যদি চান লেন্সটা আপনার কাছে কিছুদিন রাখতে পারেন। আমার কোন আপত্তি নেই।” কিন্তু তার আগেই দেখি তিনি লেন্সটা ভরে থলেটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুচকি হেসে থলেটা আমার ক্যামেরা ব্যাগে ঢোকালাম।

বাইরে তখন গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। অথচ তখনো আকাশে অনেক অনেক মেঘ।

১৭ thoughts on “একটি ক্যামেরা লেন্স কেনার গল্প

    1. লেখকদের জীবনে কোন মিথ্যা গল্প
      লেখকদের জীবনে কোন মিথ্যা গল্প থাকে না। তিনি যখন কিছু লেখেন তখন তা বাস্তবে না ঘটে থাকলেও সত্যি হয়ে যায়!

      চমৎকার গল্প। তারচেয়েও চমৎকার রচনা শৈলী… ক্যারি অন!
      :ফুল:

    2. নিছক ছোটগল্প হলে “লোকটার সাথে
      নিছক ছোটগল্প হলে “লোকটার সাথে আমার প্রথম দেখা হলো আজ দুপুর ১২টায়। ” – এমন একটা বাক্য গল্পে থাকতো না ভাই। 🙂

          1. ভাই, এখনবার সব মেয়েদের বড় ভাই
            ভাই, এখনবার সব মেয়েদের বড় ভাই থাকে না। আমার সাথে পরিচিত এমন কমপক্ষে ডজনখানেক মেয়ে আছেন তাদের বড় ভাই তো দূরের কথা, কোন ভাই-ই নেই। বোনও নেিই। একমাত্র সন্তান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *