সেন্স অফ হিউমার

আমি তখন থার্ড ইয়ার কিংবা ফোর্থ ইয়ারে। একদিন হোস্টেলে এসে দেখি বেশ সাজ সাজ রব। স্লোগান ঠিক করা হচ্ছে। মিছিল হবে। সেই মিছিলে একজনের চামড়া তোলার ব্যাপারে কিঞ্চিৎ দিক নির্দেশনা দেয়া হবে। আমার রুম মেট এর কাছে কারণ জানতে চাইলে সে উত্তর দিলো, ‘হুমায়ূন আহমেদ এর খুব বাড় বেড়েছে’। কিভাবে এই মহৎ তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেল জানতে পারলাম একটু পরে। ‘বহুব্রীহি’ নাটকে একজন ডাক্তার কে বোকা হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তাও সহ্য করে নিচ্ছিল সবাই। আজ ডাক্তারকে দিয়ে বোকামি করাবার একেবারে সীমা ছাড়িয়েছে। আজকে সেই ডাক্তার বুয়াকে কদম বুসি করেছে আর মিষ্টি গ্লাসে ফেলে দিয়েছে। শুধু তাই না, সেই মিষ্টি আবার চামচ দিয়ে উঠানোর চেষ্টাও করিয়েছে। ডাক্তার সমাজকে এমন ভয়ানক অপমান করার স্পর্ধা পেল কোথা থেকে। আজ হুমায়ুনের একদিন কি আমাদের একদিন।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোরা কি পাগল? এজন্য তোরা মিছিল করবি?’ দারুণ ক্ষিপ্ত আমার বন্ধুটি বলল, ‘করব না? সব সময় ডাক্তার দের এভাবে বাজে ভাবে প্রেজেন্ট করে।‘ আমি জানতে চাইলাম, ‘মিছিল করলে কি প্রমাণ হবে? ডাক্তার রা খুব চালাক?’ ভয়ানক ক্ষিপ্ত বন্ধুটি জানালো, ‘তাই বলে প্রতিবাদ করবো না?’ বুঝলাম আর তর্ক করতে গেলে আমাকে ঘরের শত্রু বিভীষণ উপাধি দেয়া হবে। হয়তো আমাকেই কুশ পুত্তলিকা বানিয়ে জ্বালানোর ব্যবস্থাও হতে পারে। চুপ করে গেলাম।
যথারীতি ভয়ংকর প্রতিবাদ হল। হোস্টেলের রুমের সামনের করিডোরে ঘুরে ঘুরে গমগমে মিছিল হল। হুমায়ূন সাহেবের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার হল। সঙ্গে এও জানিয়ে দেয়া হল আবার এমন কিছু লিখলে তাঁর চামড়া ছিলা হবে। শুধু তাই না, তাঁর কৃষ্ণ বর্ণের হাতও ভেঙ্গে ফেলা হবে। প্রতিবাদ এবং প্রতিশধের এখানেই সমাপ্তি হল না। পরের সপ্তাহে ডাক্তার সমাজের অপমান দেখতে সবাই সদলবলে আবার হাজির হল ‘কমন রুমে’ বহুব্রীহির পরবর্তী এপিসোড দেখতে।
ডাক্তারদের নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ অনেক লেখাই লিখেছেন। কিছু ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় ভাবে উপস্থাপ করলেও, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই হয়তো ব্যাঙ্গাত্মক ভাবেই। শুধু উনি না, পৃথিবীর অনেক লেখকই এমন কাজ করেছেন। এবং বিভিন্ন পেশাকে ব্যঙ্গ করেছেন। কেউ রাজনীতিবিদ দের ব্যঙ্গ করেছেন, কেউ সাংবাদিক দের। কেউ বা উকিল দেরকে। ‘হিউমার’ টা সুন্দর হলে সেগুলো অনেক দিন টিকে থেকেছে আর ভালো না হলে সেগুলো হারিয়ে গিয়েছে। আর পাঠক? সে শুধু গল্পটা থেকে হিউমার টা নিয়েছে। গল্পটা পড়ার পর থেকে ডাক্তার, উকিল কিংবা সাংবাদিক কাউকেই গণ হারে বোকা ভাবতে শুরু করেন নি।
ডাক্তারদের নিয়ে কোন ব্যাঙ্গাত্মক লেখা দেখলেই বেশীর ভাগ ডাক্তার ই কেন যেন অতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠেন। ‘ইচ্ছা করে ডাক্তারদের ছোট করার জন্য লিখেছে’। কিংবা ‘এই ব্যাটা আসলে ডাক্তার দের দেখতে পারে না’। কিছু অতি বুদ্ধিমান ডাক্তার আবার কারণটাও আবিস্কার করে ফেলেন, ‘এই ব্যাটা নিজে ডাক্তারি তে চান্স পায় নি তো, সেই রাগ এখন ঝাড়ছে’। এরপরে শুরু হয়ে যায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের গুণগান। ‘ডাক্তার হওয়া কত কঠিন’, ‘কত কাঠ খড় পোড়াতে হয়’, ইত্যাদি ইত্যাদি।
সেন্স অফ হিউমারের এমন আকাল বোধকরি সার্বজনীন না। আমার তখন পোস্টিং একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আমরা দুইজন ডাক্তার তখন আউট ডোর ডিউটি করছি। দুজন বসেছি একই রুমে, পাশাপাশি দুই টেবিলে। আমার সেই কলিগের কাছে একজন মহিলা রুগী এসেছে। সে জানতে চাইলো, সমস্যা কি? রুগী উত্তর দিল, গ্যাস। আমার সেই কলিগ খুব গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল, দেখোতো, দেশে কত গ্যাস। আর সরকার বলে কি না গ্যাস রপ্তানি করবে না। মহিলা হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তাঁর শারীরিক সমস্যা যে একটি জাতীয় সমস্যা এই তথ্য জানতে পেরে সে তখন বেশ বিভ্রান্ত। আমি জানি, আমার এই গল্প শুনে অনেকে মন্তব্য করবেন, ‘রুগীর সঙ্গে ফাজলামি? ডাক্তারদের মধ্যে মানবতা বলে কিছু নাই। কত কষ্টে পরে একজন মানুষ ডাক্তারের কাছে আসে, আর তখন যদি একজন ডাক্তার এসব ফাজলামি করে, কেমন লাগে?’
একটি পেশার একজন মানুষ সম্পর্কে কোন গল্প বলা মানে কি সেই পেশাটিকে কটাক্ষ করা? কখনও কখনও হয়তো। ‘সব পুলিশ ঘুষ খোর’। কিংবা ‘সব পলিটিশিয়ানই করাপ্ট’। অহরহই এসব কথা বলে আমরা পুরো পেশাটিকেই হেয় করি। ডাক্তারদের কপালে জোটে ‘কসাই’ উপাধি। কিছুদিন আগেই একজন মানবাধিকার কর্মী এই উপাধি দিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে পুরো চিকিৎসক সমাজ গর্জে উঠেছিল। কারণ আর কিছুই না, তিনি তাঁর বক্তব্যে ‘সব ডাক্তার’ বলেছিলেন। আর এসব উপাধি নিয়ে আলোচনা হলে যে যুক্তি হাজির করা হয় তা হল, ‘কিছু কিছু আছে এরকম, সবাই না। বেশীর ভাগই’ এই বলে শুরু হবে সেই পেশার গুণগান।
কোন পেশায় সৎ কিংবা অসৎ ব্যক্তি থাকবে কি না, তা আমার আলোচনার মুখ্য বিষয় না। মূল হচ্ছে, কোন পেশাকে নিয়ে হিউমার করতে সমস্যা কি? হিউমার করার সঙ্গে সঙ্গেই কি পেশাটি নর্দমায় নেমে যাবে? বা কেউ গুণগান করলেই একটি পেশা শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হয়ে যাবে? তাঁর চেয়েও বড় কথা, হিউমারের ভেতরে সত্য খুঁজতে যাচ্ছি কেন?
একটা ধাঁধা ধরি। বলুন তো ডাক্তার রা খুব বিচ্ছিরী হস্তাক্ষরে তাঁদের প্রেস্ক্রিপশানে কি লেখে যা ফার্মেসীর দোকানদার ছাড়া আর কেউ বোঝে না? পারলেন না তো? উত্তর হচ্ছে, সে লেখে, এই রুগীকে আমি যতটা পারি লুটপাট করে নিয়েছি, এবার তোর পালা। এই গল্পটা শুনে কি মন হচ্ছে এই গল্পের আবিষ্কর্তা ডাক্তারদের হস্তাক্ষরকে কটাক্ষ করেছেন? ডাক্তার মানেই তাঁর হাতের লেখা পড়া যায় না। কিংবা গল্পকার ডাক্তারদের কে ডাকাত বলতে চেয়েছেন?
মূল প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই গল্পের ভেতরে সত্য খুঁজতে যাচ্ছি? গল্পটাকে কেন নিছক একটা রসিকতা ভাবছি না? কেন এঁকে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ভাবছি? ফেসবুক কিংবা ব্লগে ডাক্তারদের নিয়ে কোন টীকা টিপ্পনী কেউ করলেই দেখছি অনেকে ব্যাপারটাকে ডাক্তার সমাজের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন। শুরু করে দিচ্ছেন গালি গালাজ। কেউ কেউ আবার সবাইকে ডাকছেন, ‘চলো দলে দলে যেয়ে গালি দিয়ে আসি’। এতে কি প্রমাণ হয়? ডাক্তার রা খুব ভালো গালি দিতে পারে? না ডাক্তার দের ‘সেন্স অফ হিউমার’ বলে কিছু নেই। পরিশেষে ডাক্তারদের দুর্বোধ্য হস্তাক্ষর নিয়ে আরও একটা গল্প বলে আজকে শেষ করব।
এক ডাক্তার একবার ডেট এ গেছেন। একটা পরিচিত রেস্টুরেন্টে। প্রেমিকার পৌছানোর আগেই একটা জরুরী কল আসলো। তাই সে প্রেমিকার কাছে ক্ষমা চেয়ে, কখন ফ্রি হয়ে দেখা করবে দ্রুত একটা নোট লিখে ওয়েটারের হাতে ধরিয়ে বিদায় হল।
প্রেমিকা আসার পর ওয়েটার সেই নোট ধরিয়ে দিল। একে তো ডাক্তার, তার উপর তাড়াহুরায় লিখা… প্রেমিকা কোন মতেই বুঝে না কি লিখা। শেষে সে বুদ্ধি করে একটা ফার্মেসিতে গিয়ে নোটটা দিয়ে “বললো দেখেন তো ভাই কি লিখসে”।
কম্পাউন্ডার সেই নোটটাতে এক নজর দিয়েই, এক বোতল সিরাপ বের করে দিয়ে বললো,
“৩৬ টাকা দেন। প্রতিদিন দুপুরে দু-চামচ খাবেন।“

১৮ thoughts on “সেন্স অফ হিউমার

  1. “৩৬ টাকা দেন। প্রতিদিন দুপুরে
    “৩৬ টাকা দেন। প্রতিদিন দুপুরে দু-চামচ খাবেন।“

    :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি:

    আপনি তো ভাই আসলেই ঘরের শত্রু বিভীষণ

    :হাসি: :হাসি: :হাসি:

    1. ওটা ধার করা। আমার এই লেখা
      ওটা ধার করা। আমার এই লেখা অন্য এক ব্লগে দেয়ার পরে একজন এটি শোনায়। এরপরে জোক টা সহ লেখাটা আবার লিখি। মতামতের জন্য ধন্যবাদ।

  2. সমস্যাটা মাথায়,

    সমস্যাটা মাথায়, :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট:
    :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট:
    আমার এইচ আই ভি টেস্ট কেন করা হইলো বুঝলামনা ডাক্তার সাব। :ভাবতেছি: :ভাবতেছি: :ভাবতেছি: :ভাবতেছি: :ভাবতেছি: :ভাবতেছি:

      1. হুম,গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়
        হুম,গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় জানতে পারলাম।ডাক্তার বাবুকে জিজ্ঞেস করছিলাম,উনি শুধু গম্ভির হইয়া বল্লেন-টেস্ট গুলা প্রয়োজন। বাস এই টুকুই। ইজ্জত পাইছি,টেস্টে ধরা খাই নাই। :নৃত্য: :নৃত্য: :নৃত্য: :নৃত্য:

  3. ‘সব পুলিশ ঘুষ খোর’। কিংবা ‘সব

    ‘সব পুলিশ ঘুষ খোর’। কিংবা ‘সব পলিটিশিয়ানই করাপ্ট’। অহরহই এসব কথা বলে আমরা পুরো পেশাটিকেই হেয় করি। ডাক্তারদের কপালে জোটে ‘কসাই’ উপাধি। – See more at: http://www.istishon.com/node/5287#sthash.EAI7x8R9.dpuf

    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :ফুল: :ফুল:
    চরম বলেসেন ভাই……
    অনেক দিন পর ডাক্তার নিয়া জোক শুনে হাসলাম।

  4. আরি! আপনেও ডাক্তার
    আরি! আপনেও ডাক্তার নাকি???
    খাইছেরে- ইস্টিশনে দেখি “কসাই” দিয়া ছড়াছড়ি! এইরকম একটা “কসানো” পোস্ট লেখার জন্য কইস্যা লাইক! 😛
    :হাসি: :হাসি: :হাসি:

    :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল:
    আপনেগো মত ডাক্তাররা আছেন বইলাই না ওটিতে রোগির অট্টহাসি শুনতে পাওয়া যায়! 😉

    1. “আপনেগো মত ডাক্তাররা আছেন
      আপনেগো মত ডাক্তাররা আছেন বইলাই না ওটিতে রোগির অট্টহাসি শুনতে পাওয়া যায়!

      😀 :থাম্বসআপ:

    2. লাইক এর জন্য ধন্যবাদ। শেষের
      লাইক এর জন্য ধন্যবাদ। শেষের লাইন টা মজার। যদিও আমি সার্জন না, তারপরও তথ্য টা জায়গা মত পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করবো, কোন রসিক সার্জনের কাছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *