শুক্লপক্ষের পঞ্চদশী চাঁদ ও কয়েকটি জোনাকি

শুক্ল পক্ষের পঞ্চদশী আজ । গত কয়েকদিনে হাওয়ারা অনবরত মিষ্টি পরশ বুলিয়ে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ।এই ক্লান্তি কুরবানির গো -ছাগের মাংস কোপানো জনিত কিনা ঠাওর করা যাচ্ছে না । কোথাও একফোঁটা বাতাসের লক্ষন নেই । জানালা দিয়ে তাকালে প্রথমে যে হিজল গাছটা চোখে পড়ে তার একটা কিশোর পাতারও নড়াচড়া দেখা যায়না না ।মানুষ তো মানুষ ইমান দুদুর যুবতী হাসগুলো এক গাদা বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে সেই যে কোন সকালে পানিতে নেমেছে তা এই ভর দুপুরেও ওঠার নাম নেই । প্যাক প্যাক করে শামুক গিলছে আর কচুড়ির বেগুনি ফুলে হলুদ – লাল লম্বা ঠোঁট ডুবিয়ে ঘ্রান নিয়ে বেড়াচ্ছে!


শুক্ল পক্ষের পঞ্চদশী আজ । গত কয়েকদিনে হাওয়ারা অনবরত মিষ্টি পরশ বুলিয়ে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ।এই ক্লান্তি কুরবানির গো -ছাগের মাংস কোপানো জনিত কিনা ঠাওর করা যাচ্ছে না । কোথাও একফোঁটা বাতাসের লক্ষন নেই । জানালা দিয়ে তাকালে প্রথমে যে হিজল গাছটা চোখে পড়ে তার একটা কিশোর পাতারও নড়াচড়া দেখা যায়না না ।মানুষ তো মানুষ ইমান দুদুর যুবতী হাসগুলো এক গাদা বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে সেই যে কোন সকালে পানিতে নেমেছে তা এই ভর দুপুরেও ওঠার নাম নেই । প্যাক প্যাক করে শামুক গিলছে আর কচুড়ির বেগুনি ফুলে হলুদ – লাল লম্বা ঠোঁট ডুবিয়ে ঘ্রান নিয়ে বেড়াচ্ছে!

বিরোধীদলের মতো বলা নাই কওয়া নাই পবন দেবতা ‘ হাওয়া বনধ ’ স্ট্রাইক করে বসে আছে । কার্তিক মাসের এই সময়ে কোন দাবিতে তিনি এরকম অবিবেচক সিদ্ধান্ত নিলেন এই ভাবতে ভাবতে কখন যে হিমেলের চোখের পাতা বুজে এসেছিলো বুঝতে পারেনি। বুঝলো মেঝ ভাবি শাম্মির প্রবল ধাক্কায় । বাম হাতে লবন নিয়ে কাঁচা তেঁতুল খেতে খেতে হিহি করে হেসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে স্বভাবসুলভ ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন তিনি। তেঁতুলে খানিক লবন মাখিয়ে জিনিসটি দাঁতের ছোঁওয়া পেতে দেখা গেলো অটোমেটিক ওনার ডান চোখ বুঝে গেছে ।

‘ ঘুমাও ক্যান , নাও ধরো খাও – এই মাত্র উত্তর বাড়ির গাছ থেকে পেড়ে এনেছি ‘ ।

ছোট বেলার কথা মনে পড়ে যায় হিমেলের । মুরব্বীদের কাছে শুনা, ছেলেদের তেঁতুল খাওয়া ঠিক না । আর তেঁতুল গাছের নিচ দিয়ে হাঁটলেও বুদ্ধি নাশ হয় । সেই থেকে তেঁতুল গাছ এড়িয়ে চলা অভ্যাস হয়ে গেছে ওর । কিন্তু তেঁতুল এমন বস্তু সে তুমি খাও আর না খাও মুখের ভিতরটা পানিতে ভরে আসে । তা শফি হুজুর বা লালা শফি বা হেলিকপ্টার শফি বা তেঁতুল হুজুর খুব খারাপ কিছু কি বলেছেন । কিন্তু হলফ করে বলতে পারে তেঁতুল সমেত দণ্ডায়মান ভাবী এবং মুখের লালার কার্যকারণ খুঁজলে যা পাওয়া যাবে তা তেঁতুল ও মুখের কোষের যুগপৎ রাসায়নিক প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছু না । আর দেবর ভাবীর লোকায়ত রসায়ন এই বঙ্গ দ্বীপের শুদ্ধতম ঐতিহ্য । তা কোন লম্পট হুজুরের বয়ানে রুদ্ধ হতে যাবে কেন ?

এই সময়টায় দিন খুব দ্রুত ছোট হতে থাকে । দিগন্তের নীলে সাদা দুধের মতো মেঘ – পাহাড় দেখতে দেখতে কখন যে ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসে সে খেয়াল থাকেনা । পাট কাটা হয়ে গেছে কিছুদিন আগে । বিস্তীর্ণ জমি অপেক্ষায় আছে পরবর্তী ফসলের আশায় । তা পৌষ – মাঘ মাসে কলাই শাক যখন সবুজ শাড়ি পরে শরীর বিছিয়ে শুয়ে থাকে তখন সর্ষে কি আর চুপ করে থাকে ! সেও তখন হলুদ জামা গায়ে দিয়ে বিশাল মাঠ জুড়ে টাঙ্কি মারে । আপাতত ন্যাড়া মাঠে বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে ।

আকাশের দিকে তাকিয়ে হিমেল ভাবছিলো পার্মানেন্টলি গ্রামে চলে আসলে কেমন হয় । এই মাঠ, মেঠো পথ, শান্ত নিবিড় পরিবেশ এরা কি এই শেকড় সন্ধানী মানুষটিকে ঠাই দেবেনা তার বুকে ? ভাবনায় ছেদ পড়লো ভাবীর ডাকে –

‘ কী তলপেটে ব্যথা হচ্ছে খুব …!!! , হাঁ করে আকাশে বউ খুঁজছো ? নাকি মনে মনে কবিতা লিখে যাচ্ছ ? মনে আছে তো রাত ৮ টা আর ১০ টার কথা ? ’

ওর এই ভাবীটার সাথে চড়ুই পাখির স্বভাবের বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায় । ব্রহ্মাণ্ড যে স্থির নয় তা বিলকুল বুঝা যায় এই দুটি জীব দেখে । উত্তরের চেয়ে প্রশ্ন ওনার কাছে অধিক প্রিয় তাই উত্তর দেওয়ার দায়মুক্তি উপভোগ করতে অসুবিধে নেই । কিন্তু ৮ টা – ১০ টায় কী মনে রাখার কথা ছিল মনে পড়ছে না তো ! বলতে জবাব পেলো –

‘ বুদ্ধু ! ’ – মনে নেই ? আচ্ছা যাও মনে করতে হবে না । ঠিক ৮ টার সময় তোমাকে ডেকে নেব । দেখো আবার জোনাকির পিছে পিছে হারিয়ে যেওনা !!! ’

এই নারীর কাছে প্রতি মুহূর্তে সাসপেন্স তৈরি করা নির্মল বিনোদনের অংশ । এখন যতোই তাকে পীড়াপীড়ি করো না কেন , লাভ হবে না । অগত্যা অপেক্ষা করাই শ্রেয় ।

ওদিকে উত্তর বাড়ীর নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে কিছুক্ষন আগে আঠার বছর বয়সী চাঁদ উঠে গেছে । চন্দ্রের আঁটসাঁট শরীর বেয়ে জোছনা চুয়ে চুয়ে পড়ছে । একটানা ঝি ঝির ডাক মাঝে মাঝে জিরিয়ে নেওয়ার ফুরসৎ পাচ্ছে বাঁকা দুদুর এক পেয়ে নেড়ি কুত্তাটার ঘেউ ঘেউ শব্দে । বাঁদুরের মতো ঝুলে থাকা চন্দ্রচোরা আলো একটা ছায়া ছায়া পটভূমি রচনা করে চরাচরে মিশে আছে । তবু এক চিলতে হাওয়ার দেখা নেই । ছোট ছোট বাচ্চারা জামা কাপড়ের বাহুল্য যতোটা পারে বর্জন করে এদিক ওদিক হৈ হৈ করে বেড়াচ্ছে । ওদের ঈদ আনন্দ ধংস হতে স্কুল খোলা অতিব জরুরী । জাঁদরেল মা গুলো অহেতুক শাসিয়ে পরাভব মেনে নিয়ে মেতে আছে গুরুত্বপূর্ণ পরচর্চায় । সেই সাথে বিদ্যুৎহীন শ্বশুর বাড়ীর শাপ শাপান্ত করছে । অন্তত কয়েকটা বিদ্যুতের খাম্বা থাকলে তাও কিছুটা শান্তনা পাওয়া যেত । একটু কান পাতলেই শহর থেকে আসা রমণীকুলের বিলাপ শোনা যায় ‘ ইস অমুক সিরিয়ালে পরকীয়ার অংশটা দেখা হলনা কিম্বা বদমাইশ শাশুড়িটা না জানি কোন ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে … ’।

কিন্তু ভাবী কই ? এই চন্দ্রগ্রস্থ প্রলম্বিত সন্ধায় উনি কোন রহস্যর মায়াপাশে বাঁধতে চান ? ওইতো জোছনার শাড়ি জড়িয়ে শাসন না মানা ঘন চুল পিঠে ছড়িয়ে এদিকেই আসছেন । মৃদু হাওয়াদের জন্য আফসোস হলো ! গভীর চুলে স্পর্শ সুখ পাওয়ার অলৌকিক সুযোগ কি এক জীবনে দ্বিতীয়টিবার আর পাবে হতভাগা হাওয়ারা ! বয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা নদীর মতো হেঁটে এলেন তিনি । কয়েকটি মুহূর্ত মাত্র খরচ হয়েছে কাছে আসতে অথচ ওর মনে হলো এই মাত্র তিনি রবীন্দ্র – জীবনানন্দ যুগ পেরিয়ে এলেন । যেন প্রাণ ফিরে পেয়ে আবার জেগে উঠলো মরা ধানসিঁড়ি নদী !

‘ যাও, দু’ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে নাও । পুকুরে স্নান করতে যাবো আমরা । ’

ওনার অনেক পাগলামোর নিরব সাক্ষী হিমেল । এইতো সেদিন ১৭ বছর আগে পালিয়ে দাদাকে বিয়ে করলেন । তারপর প্রথম ওদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এলেন । না কালো না ফর্সা একহারা গড়নের উচ্ছল এক নারী । শীতের সকাল । একটা কলাপাতা রঙের শাড়ি পরে হিমেলের হাত ধরে টানতে টানতে পুরনো বাড়িতে নিয়ে এসে আম পেড়ে দিতে বললেন । সদ্য তারুণ্যে অভিষিক্ত নির্বোধ হিমেল এই নারীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে হঠাৎ যেন বীর পুরুষ হয়ে গেলো । সদ্য স্নান সেরে আসা পাট ভাঙ্গা শাড়িতে ভাবীকে মনে হয়েছিলো দেবীর মতো । নতুন শাড়ির সুবাস না কি নারীর নিজস্ব সৌরভ ও বলতে পারবে না – বুক ভরে শুষে নিয়ে গাছে উঠতে গেলো । হাঁ ঈশ্বর ! ক্ষমাহীন ঈশ্বর, তোমাকে কোনদিন ক্ষমা করা হবেনা । সামান্য একটা গাছে উঠতে ছেলেটিকে সাহায্য করলেনা ! একটুও ভাবলেনা প্রিয় মানুষের ইচ্ছে পূরণ করতে না পারলে মাঝে মাঝে মৃত্যু অপেক্ষাকৃত কাংখিত হয় ! ওর প্রাণান্ত প্রচেষ্টা ক্লাস ফাইভে করা তৈলাক্ত বাঁশে বানরের উঠা নামার অংকের মতো হয়ে গিয়েছিলো । হাতে পায়ের যেখানে সেখানে ছড়ে গিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়ার পরশ জ্বলুনি কেবল বাড়িয়ে দিয়েছিলো । ওদিকে ভাবীর আঁচল চাপা হাসি ভীমরুলের হুলের কাঁটা হয়ে বিদ্ধ হয়েছিলো হৃদয়ের আনাচে কানাচে । শেষ পর্যন্ত পরাস্ত হয়ে অসহায় আত্ম সমর্পণ করতেই হলো ।

পারলে না তো ! তুমি দাঁড়াও । আমি উঠছি, তুমি আমগুলো কুড়িয়ে এক জায়গায় জড় করো । আর খেয়াল রেখো এদিকটায় যেন কেউ না আসে ।

ওর বিস্মিত তারুণ্যের সামনে দিয়ে আঁচলটা কোমরে গুঁজে তরতর করে গাছের মগডালে উঠে গেলেন ভাবী । নিচে দাঁড়িয়ে ও দেখেলো ওনার কিশোরী সুলভ আনন্দ – উচ্ছলতা !

‘ কী হলো যাও , দেরি হয়ে যাবে যে। বড় ভাবীও এসে তাগাদা দিলেন । ’
ওদের জোছনা স্নানে আরও সঙ্গী হলো ছোট ভাই, সেঝ ভাবী । সঙ্গত কারণেই দাদারা আলাউড হলেন না ।

পুরনো বাড়ি সংলগ্ন পুকুরটার আসলে পুকুর হবার জন্য জন্ম হয়নি । কোন ঘাট টাট নেই । যে কোন প্রান্ত দিয়েই অনায়াসে নেমে পড়া যায় । উত্তর বাড়িতে নতুন ঘর তোলার জন্য মাটি কাটার দরকার পড়েছিলো ওর দাদার আমলে । দেশের নিচু এলাকা হবার কারণে বসত ভিটে যতোটা সম্ভব উচু করতে হয় । এমনিতে আষাঢ় – শ্রাবণ মাসে থৈ থৈ পানির মধ্যে বাড়িগুলোকে এক একটা দ্বীপের মতো মনে হয় ।

ঘাট না থাকলেও মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো নিজের জন্য একটা সুবিধাজনক নিয়ম তৈরি করা । সে অনুসারে পশ্চিম দিকের পাড়টাই বেশি ব্যবহার হতে হতে ওখানে একটা অস্থায়ী ঘাটের আকার নিয়েছে । ওই প্রান্ত দিয়ে প্রথমে সেঝ ভাবী নামলেন । গ্রামের মেয়ে হবার কারণে পানি টানি ওনার কাছে ডাল ভাত । দেখা দেখি বড় ভাবী, ছোট ভাই ও নেমে পড়লো । হিমেল পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলো অনভ্যস্ততার কারণে । ওর কেমন যেন শীতকালে গোসল করতে গিয়ে পানির বালতির সামনে দাঁড়িয়ে থাকার কথা মনে হলো । ওরকম পরিস্থিতে অধিকাংশ সময় যা হতো ওর মা এসে পেছন থেকে এক মগ পানি মাথায় ঢেলে দিতো । শীতের বুড়ি তখন মা – বাপ ডাকতে ডাকতে হাজার মাইল দূরে গিয়ে পালাতো ।

হিমেল নিজেকে পুকুরের জলে আবিস্কার করলো ঝপাৎ শব্দ সহযোগে । কর্মটি আর কে করবে মেঝ ভাবী ছাড়া ! ওকে আচমকা পুকুরে ফেলে দেওয়ার আনন্দে সবার মধ্যে হাহা হিহি’র কোরাস চললো কিছুক্ষন । তাতে গ্রামের নিশুতি রাতের নিরবতা খান খান হয়ে ভেঙ্গে গেলো । এতে হঠাৎ করে কোকিল নিজেকে কাকের বাসায় আবিস্কার করে লজ্জ্বায় লাল হয়ে ওদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে চলে গেলো । সেই সাথে বাঁকা দুদুর নাক ডাকার শব্দজট কয়েক সেকেন্ড বিরাম নিয়ে নব উদ্যমে পুনরায় শুরু হলো । কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে গেলো বলে একটি খয়রা মাছ বড় ভাবীর পায়ের পাতায় কামড় দিয়ে প্রতিশোধ নিলো ।

শোন, রাতে জাখু ভাইদের বাড়িতে জ্বিন আসবে ।
কি আসবে ?
আরে গাধা জ্বিন ! জ্বিন ! তোমার দাদার কাছে শুনলাম । আমি যেতে চাইলে মেজাজ দেখিয়ে নিষেধ করলো!

ভাবী, নির্ঘাত তোমার মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে !

আরে সেই জন্যইতো জ্বিন বাবার সাক্ষাৎ জরুরী ! বলে খুক খুক করে এক পশলা চাপা হাসি হেসে নিলেন ।

অন্যরা জানে তোমার এই দুরভিসন্ধি ?

তোমার দাদারা যেতে রাজি না কিন্তু আমরা যাবোই । তাতে তোমার অকর্মা দাদাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক টিকুক চাই না টিকুক ।

হিমেলের বুঝতে আর বাকি নেই । এই নারীগণকে রুখে দাঁড়ায় এমন দুঃসাহস স্বয়ং জ্বিন বাবা সংরক্ষণ করেন কিনা সন্দেহ থেকে যায় । ওদিকে সন্ধার উত্তর আকাশে দেখা ১৮ বছর বয়সী চাঁদ উত্তর – পূর্ব কোনে তেইশে এসে ঠেকেছে । ভালো করে তাকালেই স্পষ্ট বুঝা যায় একজন যৌবনবতী মা ৭ মাস বয়সী শিশুকে দুগ্ধ পান করাচ্ছে !

অনেকদিন পর পুকুরে সাঁতার কাটতে ওর বেশ লাগছিলো । শৈশবে মেঝ ভাই’র শেখানো সাঁতার বিদ্যা একটা বিরাট আত্মবিশ্বাসের উৎস হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে এই বয়সে এসেও । সাঁতার আর সাইকেল চালানো একবার শিখলে তো ব্যাস ! ভুলে যাবার কোন চান্স নেই ।

শেখ পাড়ায় রাতে মিটিং আছে । বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হবে । অযথা জেগে থেকো না ।

রয়না মাছের আরেকটা টুকরো দাদার পাতে তুলে দিতে দিতে ভাবী জানতে চায় মিটিং কিসের জন্য ।

আরে ভিলেজ পলিটিক্স, তুমি বুঝবেনা !
তাই ? তুমি খুব বোঝো ! আসো তো দুই দিনের জন্য বাড়িতে । এসব পলিটিক্স টলিটিক্সে জড়ানোর কি দরকার?

এবার দাদার স্বর নরম হয়ে আসে । কণ্ঠ খাদে নামিয়ে উত্তর দেয়-

আরে আর বলোনা ! সমিতির লিজ দেওয়া বড় বিলের ৫৬ বিঘা জমি নিয়ে কামড়াকামড়ি লাগছে উত্তর পাড়ার রুস্তুম শেখ আর পূর্ব পাড়ার জিয়াউদ্দিন বক্সের মধ্যে । শেখের দাবী লীজের শর্ত অনুযায়ী মাঘ মাসের ২৪ তারিখ পর্যন্ত জমি তার । ওদিকে বক্সের কথা না, সমিতির নির্বাহী পরিষদের ১১ সদস্যের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ তার নামে লীজ দিয়েছে এবং এ মাসের ২৫ তারিখ থেকে জমি তার । বক্সের আরও বক্তব্য সাধারণ সদস্যরা তার দাবির পক্ষেই আছে । এর পেছনে কারণ হিসেবে যুক্তি হলো, লীজ দেওয়া হয়েছিলো শুধু জমি। কিন্তু রুস্তুম শেখ জমির দুইধারের বিশাল বিশাল শাল, সেগুন, মেহগনি , নিম গাছ কেটে বিক্রি করেছে যা স্পষ্টত লীজ চুক্তির বর খেলাপ এবং এ কারণে তার চুক্তি বাতিলযোগ্য । অন্যদিকে রুস্তুম শেখের সাফ কথা সে লীজ নিয়েছে জায়গা, সুতরাং ৫৬ বিঘা সম্পত্তির উপর সমস্ত ফসল বিক্রি করার রাইট তার আছে । আর চুক্তির কোথাও বলা নেই গাছ কাটা যাবেনা ।

‘ সবাই মিলে বসে বিষয়টার মীমাংসা কি হয়না ? ’ গামছা এগিয়ে দিয়ে ভাবী জানতে চায় ।

ম্যাচের কাঠির উল্টো দিক দিয়ে দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা মাছ – মাংসের খুচরো অংশ বের করতে করতে দাদা জবাব দেয় ।

‘ বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে বলো ? শেখ আর জিয়াউদ্দিন দুজনেই গ্রাম্য এলিট । অর্থ – বিত্ত, লাঠিয়াল দুয়েরই সমানে সমান । একটা রক্তপাত ছাড়া এর কোন সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছে না ।’

এইবার ভাবী শঙ্কিত হয়ে পড়ে ! দাদার কাছে আরেকটু ঘন হয়ে বলে –

‘ তোমার যাওয়ার দরকার নেই । খামোখা ঝামেলায় জড়িয়ো না । তারচে বরং চলো জ্বিন দেখে আসি । আমি কোনদিন দেখিনি ।’

‘ আরে ধুর ! কী সব পাগলামো করো ! রাজেন মাস্টার পই পই করে বলেছে মিটিঙে থাকার জন্য । ওই দুই গুণ্ডার বিরুদ্ধে গায়ের লোক একজোট হচ্ছে । টর্চ টা দ্যাখো কোথায় । জোছনার আলোয় বেশ পরিস্কার দেখা যাচ্ছে । তবু বলা যায় না, কাজে লাগতে পারে । ’

‘ নয়ন থাকতে বোকারে তুই দেখলি না নয়ন
এ পারেতে টাকাকড়ি লোভের বাড়াবাড়ি
ওপারেতে দয়াল মাবুদ করে আহাজারি
মন তবু তুই আঁকড়ে রইলি দুই দিনের এই জীবন
ও মন দেখলি না নয়ন করলি না তাঁর স্মরণ ।

আমার মাবুদ জানে আমার ব্যাথা তারই আরাধনা
নবী আমায় করবেন পার করি তাঁর সাধনা
ও বলো করি তাঁর সাধনা …
আসমান জমিন সাগর পাহাড় চলে তাঁর ইশারায়
গাছের পাতা থির হয়ে রয় আদেশবিনা হায়
ও মুমিন করো হায় হায় হায় …
ও মুমিন জিকীর করো … আল্লাহু …আল্লাহু … আল্লা …হু …আল্লা …হু
আল্লা … হু উ উ উ … লা…হু … উ উ উ … লা … হু উ উ উ … ’

মুর্শিদী গানের সুর ভেসে আসছে ওপাড়ার জাখুদের বাড়ি থেকে । হিজল গাছের নির্জনতায় দাঁড়িয়ে হিমেল সিগারেটের ধোঁওয়ায় গোল গোল রিং বানিয়ে হালকা ধোয়াটে কুয়াশার দিকে ছুঁড়ে দিতে দিতে শুনছিলো। ওদের বাড়ি থেকে জাখু ভাইদের বাড়ীর দূরত্ব সাকুল্যে অর্ধেক সিগারেট টেনে শেষ করতে যতো সময় লাগে ততটুকু । জাখু ভাই’র দাদার বাপের দাদার ঘাড়ে ছিলো জ্বিন । বদ জ্বিন না, ভালো জ্বিন । ছোট বেলায় হিমেল ওর বাপের বাপ অর্থাৎ দাদার কাছে শুনেছে জাখুদের পর দাদার সঙ্গে থাকা জ্বিন ইরান – তুরান থেকে মিষ্টি এনে খাওয়াতো ! তা জাখুরা উত্তরাধিকার সুত্রে অল্প কিছু জমি জিরেত পেলেও জ্বিন মশাই কে পায় নাই । পর দাদার সাথে সাথে জ্বিন সাহেবও গলায় ফাঁস নিয়েছিলেন কিনা তা কারও মালুম নাই । তবে গায়ের জওয়ান মেয়েছেলে ও পোয়াতি বউঝিদের সর্বনাশ করতে মাঝে মাঝে বদ জ্বিনের আবির্ভাব হয় । তখন যুবতী মেয়েগুলোর বুকের কাপড়ের কোন ঠিক ঠিকানা থাকেনা । উসকো খুসকো চুলগুলো তেল চটচটে আঠালো হয়ে অবিন্যাস্ত হয়ে পড়ে থাকে । পেঁচার চোখের মতো ড্যাব ডেবে গোল গোল চোখ দিয়ে আগুনের হলকা বেরোতে থাকে । যখন তিনি এসে ভর করেন তখন কি আর দিক বিদিক জ্ঞান থাকে । রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে গজরাতে গজরাতে হাত -পা ছুঁড়ে, এটা ওটা ভেঙ্গে আবোল তাবোল কথা বার্তার খই ফোটে মুখ দিয়ে । না হলে কীভাবে বলে – মানীলোক বেলায়েত মেম্বার নাকি সুভান মোল্লার ১৩ বছর বয়সী মাইয়ারে পাট খ্যাতের মধ্যে চাইপা ধরছে । এ সবই বদ জ্বিনের কারসাজি । তা এমন পরিস্থিতে গাঁয়ের মোড়ল – মেম্বার কি চুপ মাইরা থাকতে পারে । এ গাঁ ও গাঁ থেকে ফকির ফাকরা তলব করে আনা হয় ।

আনন্দের খবর হলো জাখুদের পরদাদার ঘাড়ে থাকা জ্বিন ১৫০ বছর পর আবার ফিরে এসেছে । এ যেন ঘরের ছেলের ঘরে ফিরে আসা । ঘটনা হলো গত বর্ষায় কুদ্দুস ব্যাপারীর ছোট ছেলের ৩ নম্বর বউ পোয়াতি বিলকিস শশুরের সাথে গিয়েছিলো ৮ মাইল দূরে হরিদাসপুরে কবিরাজ বাড়ি । ঝাড় ফুঁক, তেলপড়া নিয়ে ফিরতে ফিরতে ওদের দেরি হয়ে যায় । অমাবস্যার রাত । আসতে হয় বিল পবন পার হয়ে শ্মশান ঘাটের পাশ দিয়ে । তারপর নাও নিয়ে একটু এগোলে পড়ে জাখুর পর দাদার ঘাড়ে থাকা জ্বিনের বাসস্থান ২৫০ বছরের থুত্থুরে বটগাছ ।

কি থেকে কি হলো বাড়ি ফেরার পর থেকে বিলকিসের মুখে রা নেই । শশুররে দেখলে মূর্ছা যায় ! দাঁত কপাটি লেগে বিশ্রী অবস্থা । শশুর কুদ্দুস ব্যাপারীর কথা, নাও নিয়া বট গাছের নিচ দিয়ে আসার পথে বউর মাথার চুল খোলা পেয়ে বদ হাওয়া লাগছে । এ জ্বিনের আছর না হয়ে পারেনা ।

এর তিন দিন পর কুদ্দুস ব্যাপারী খবর নিয়ে আসে জাখুর ঘাড়ে ওর পর দাদার জ্বিন আছর করছে । এবং পর দাদা স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছে এখন থেকে বদ জ্বিন ভূতের আছর থেকে গ্রামের মানুষকে রক্ষা করার দায়িত্ব জাখুর ।

আসর তখন জমে উঠেছে । উঠোনে অনেকগুলো মাদুর পাতা হয়েছে । মাঝখানে বৃত্ত রচনা করে বসেছে শিল্পী দল । একতারা, ঢোল, মন্দিরা, বাঁশি ইত্যাদি গ্রামীণ বাদ্যযন্ত্র যোগে মুর্শিদী গীত হচ্ছে । শিল্পীদের ঘিরে মাদুরে বসে গান শুনছে অধিকাংশ শ্রোতা । যাদের পূর্ণ মনোযোগ শিল্পী বৃন্দের মাঝখানে উপবিষ্ট জাখুর উপর । সে বসে আছে হাদিয়া হিসেবে পাওয়া কুদ্দুস ব্যাপারীর জায়নামাজে । চোখ বন্ধ করে একমনে মুর্শিদীর তালে তালে মাথা দুলাচ্ছে ।

মুরুব্বীগণ বসেছেন চেয়ারে । সেই সাথে শহর থেকে আসায় ভাবীদের সাথে সাথে হিমেলের জন্যও একটা চেয়ার বরাদ্দ করা হয়েছে । হিমেল জোছনা শোভিত আকাশের দিয়ে তাকিয়ে মধ্য বয়সী চাঁদটাকে দক্ষিণে সরে যেতে দেখলো । বেশ রাত হয়েছে । উৎসাহী কিশোরের দল ঢুলু ঢুলু চোখ জোর করে খুলে রাখার চেষ্টা করছে । কেউ কেউ মাদুরের উপরে গুঁটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে । ইমান দুদুর পাঁচ বারের ম্যাট্রিক ফেল করা ছাওয়াল রমজান তেলের শিশি ধরে বসে থাকা ওর মার ডান পাশে। কুদ্দুস ব্যাপারী আর জাখুর বোন মায়মুন শৃঙ্খলা কমিটির গুরু দায়িত্ব পালন করছে ।

গ্রামে বিদ্যুৎ না আসলে কি হবে পোলাপানের হাতে হাতে মোবাইল চলে এসেছে । কে কোথা থেকে ছবি তোলে, ভিডিও করে তার নাই ঠিক । মোবাইল ক্যামেরার ফ্ল্যাশ পর দাদার আমলের জ্বিনের সহ্য হবে কেন ? ইতোমধ্যে ৩ টি মোবাইল জব্দ করা হয়েছে । এর মধ্যে মোল্লা বাড়ির কলেজ পড়ুয়া ত্যাঁদড় আকাশের মোবাইল ও আছে । ওদিকে বদ জ্বিনে ধরা কুদ্দুসের ৩ নাম্বার ছাওয়ালের পোয়াতি বউর বাম হাত শক্ত করে ধরে বসে আছে ছাওয়াল। উঠোনের উত্তর পূর্ব কোনে বড় একটা ড্যাগে খিচুড়ি রান্না চলছে ।

গান এখন জিকিরে রূপান্তরিত হয়েছে । ডানে বামে মাথা দুলিয়ে ‘ আল্লাহু ’, ‘ আল্লাহু ’ জিকির চলছে প্রবল বেগে । বেগ বেড়ে যাওয়ায় ‘ আল্লাহু ’ শব্দ পুরো শুনা যায়না । কর্ণ পর্যন্ত কেবল ‘ হুউককু, হুউককু ’ ধ্বনি পৌঁছতে পারে । জাখুর মাথা ডানে বায়ে সব থেকে বেশি দুলছে । এমন একটা সিরিয়াস মুহূর্তে হিমেলের মাথায় আসে ,আচ্ছা আল্লাহ কি বামপন্থী ?

জাখুর মাথা ডানে বামে হুক্কু হুক্কু করতে করতে প্রায় মাটি ছোঁয় ছোঁয় ! কুদ্দুস ব্যাপারী গোলাপ জল ছিটিয়ে আসরের পবিত্রতা নিশ্চিত করছে । মায়মুন সবাইকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে নিজেদের মধ্যে কথা না বলার জন্য । এই পর্যায়ে জাখুর বালিকা বঁধু মাঝারী একটা মালসা ভর্তি চালের ভেতর আগর বাতি ধরিয়ে জাখুর সামনে পশ্চিম দিকে রাখে । সেই সাথে মায়মুন বেশ স্বাস্থ্যবান দুইটা মোমবাতি জ্বালিয়ে মালসার পাশে রাখে।

জিকির এখন সর্বচ্চ গ্রামে । উপস্থিত লোকজন বুঝতে পেরেছে দেড় শতাব্দী পর জাখুর পর দাদার ঘাড়ের জ্বিন এখন জাখুর ঘাড়ে সওয়ার হয়েছে । হিমেল বসেছে বড় ও মেঝ ভাবীর মাঝখানে । মেঝ ভাবীর ভাবান্তর বুঝা না গেলেও হিমেলের ডান হাতের কব্জির উপর বড় ভাবীর হাতের প্রচণ্ড চাপ বুঝিয়ে দেয় বেচারী বেজায় ভয় পেয়েছেন ।

মায়মুনের কণ্ঠ শুনা যায় । আপনারা কেউ এহোন ভাইজানরে জাখু কইয়ে ডাকপেন না । হুজুর কবেন । উনার ঘাড়ে জ্বিন হুজুর আইসে গ্যাছে । আর একখান কথা, বেশি বুঝা বা কম বুঝা কেউ থাকলি এহোনি বাইরোয় যান ।

জাখু ওরফে জ্বিন হুজুর বাদক দলের বৃত্ত ভেঙ্গে জিকিররত পদ্মাসন অবস্থায় মালসাকে কেন্দ্র করে নতুন একটি বৃত্ত রচনা করে ফেলে। অনেকটা ব্যাং লাফের মতো কয়েক প্রস্থ পাক খেয়ে মালসাটিকে সামনে রেখে পশ্চিমমুখো হয়ে বসে দুম দুম করে বুক চাপড়াতে লাগে । জিকির থেমে গেছে । অসহ্য রকমের শুনশান নিরবতা !

গায়েবী আওয়াজের মতো হুজুরের গলা শুনা যায় এবার –

‘ ক্যান ডাকছিস ? টাইম বেশি নাই । চান্দ ডুইবে যাবে । জলদি ক …’

হঠাৎ করে সবার মধ্যে সাড়া পড়ে গেছে । ফিসফাস, কানাকানি চলছে সমান তালে ।

নালিশ প্রার্থী সবাই একযোগে গুনগুন শুরু করে দিয়েছে । কিন্তু সাহস করে কেউ কিছু বলছে না । এরকম একটা পরিস্থিতে শৃঙ্খলা কর্ত্রী মায়মুন অবতারের ভূমিকা নিতে বাধ্য হলো –

‘ আপনারা একজন একজন কইরে নালিশ জানাবেন ।’

প্রথমে নালিশ নিয়ে এগিয়ে আসলো ইমান দুদুর ম্যাট্রিক ফেল রমজান ।

হুজুরের চোখ বন্ধ । রমজানের বড়সড় মাথাটি দুহাত দিয়ে ধরে বেশ কয়েকবার ঝাঁকালেন । পরে বাম হাত মাথার উপর রেখে বিড়বিড় করে কিছু মন্ত্র আওড়ে বলতে শুরু করলেন, ‘ এর মাথার ভেতর মগজ নাই , খালি গবর । এর মাথা টাক কইরে সোম – মঙ্গল বারে বট গাছের গোঁড়ায় নিয়ে মইষের দুধ দিয়ে গোসল দিবি । দে, তেলের শিশি দে ।’

দুদু দুইটা তেলের শিশি বাড়িয়ে ধরেন ।

‘ শিশি দুইটা আনছিস ক্যান ? ’

‘ হুজুর একটায় সর্ষের তেল আরেকটায় কিরাসিন । কুণ্ডা লাগে বোজবো ক্যাম্বালে ? ’- ইমান দুদু ব্যাখ্যা দেয় ।

এই ব্যাখ্যা শুনে উপস্থিত দর্শনার্থীদের মধ্যে বেশ একটা হাসির রোল পড়ে যায় । বিশেষ করে ত্যাঁদড় আকাশের নেতৃত্বে আগত কলেজ পড়ুয়া গ্রুপটির মধ্যে। সেই সঙ্গে মেঝ ভাবীর হাসি বিশেষ মাত্রা যুক্ত করে।

‘ তুই বেশি বুজিস !’ সর্ষের তেলের শিশিটি নিয়ে চার ঘা ফু দিয়ে শিশিটি বাড়িয়ে ধরে বলেন, ‘ নে, মাথা তিন বেলা ধুইয়ে ভাল কইরে মালিশ করবি । একফোঁটা ত্যাল জেনু মাটিতে না পড়ে । যা, সইরে যা সামনে থেইকে । মালশার মদ্দি ২১ টাকা আটআনা রাইখে জাইস । নলি কিন্তু কাম হবোনা । ’

সবই ঠিক ছিল তবে গোল বাধলো আটআনা নিয়ে । ইমান দুদু আটআনা কই পায় ? ফকির পর্যন্ত যেখানে ১ টাকার কয়েন ভিক্ষা নিতে চায় না সেখানে আটআনা মিলবে ক্যামনে ? সমস্যাটা মায়মুন বুঝতে পেরে তড়িৎ ঘোষণা জারী করে । আটআনা না পালি ২২ টাকা দিয়েন । ওর এই ডায়লগ শুনে
ভাবীসহ ত্যাঁদড়দের মধ্যে পুনরায় কোলাহল শুরু হয়ে যায়।

‘ চুপ কর শয়তানের দল ’। হুজুরের গগন বিদারী চিৎকারে হট্টগোল থামলে এগিয়ে আসে কুদ্দুসের ছেলে – পোয়াতি বউটির হাত ধরে ।

যথারীতি মাথা ঝাঁকানো শেষ হলে চুলের মুঠি ধরে মাথাটি নিচু করে মাথার মধ্যভাগে মুখ ডুবিয়ে মিনিট খানেক রাখে । ছেড়ে দিয়ে ঘোষণার মতো করে জানায় বড় খারাপ জ্বিনের খপ্পরে পড়েছে সে । ওদিকে কারণ ছাড়াই কুদ্দুস ব্যাপারীর গলা শুঁকিয়ে কাঠ হয়ে আসে।

বিড়বিড় করে আরও কিছু দুর্বোধ মন্ত্র আওড়ে হুজুর বলেন, ‘ মন দিয়ে শুইনে রাখ, এরে ভালো করতি চালি আগামী ৩ মাস আমাবস্যা তিথি’তি প্রতি শুক্র – শনিবার রাতির দুই পহরে বট গাছের পেছনে আসতি কবি।’

‘ হুজুর ও কি একলাই আসপি ? ’ কুদ্দুসের পোলার এই ইডিয়ট কথায় চরম ক্ষেপে যান হুজুর !

‘ থাপ্পর মাইরে তোর দাঁত খসায় ফ্যালবো হারামির বাচ্চা ! কথা শ্যাস হবার দিবি তো ! ওর সাথে পুরুষ আসতি পারবি তয় স্বামী ছাড়া ঘরের অন্যকোন পুরুষ মানুষ সাথে থাকতি পারবি ।’

‘ বাপ ছাড়া তো বাড়িটি আর কোন ব্যাটা লোক নেই হুজুর !’

‘ তালি তোর বাপ আসপি । ’

এই পর্যায়ে ঘটনা আকস্মিক মোড় নেয় পোয়াতি বিলকিসের অগ্নি মূর্তিতে । প্রথমেই সে যে কাজটি করে তা উপস্থিত লোকজনের পিলে চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট । চাল সমেত মালসাটি হুজুরের মুখে ছুড়ে মেরে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে, শোনেন আপনারা ওই বুইরা কুদ্দুস ব্যাপারী আমার সর্বনাশ করছে । আন্ধারে বট গাছের পিছনে নিয়ে আমারে … কথা শেষ হয় না । হুহু করে কেঁদে ফেলে বিলকিস । কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে , ‘ কাউরে কলি বুইরা আমারে মাইরে ফালাবি কইছে । এহন শয়তানডা নতুন ফন্দি আঁটছে আমারে পাওয়ার জন্যি ’ । বলে পাগলিনীর মতো ছুটে গিয়ে কুদ্দুস ব্যাপারীরে মারতে উদ্যত হলে কুদ্দুসের ছাওয়াল বুঝতে পারে বিলকিসরে সত্যি সত্যি বড় খারাপ জ্বিনে আছর করছে । জাখুর বাড়ির অন্যান্য মহিলারা ছুটে এসে বিলকিসরে ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে যায় ।

হঠাৎ টিনের চালে অজস্র ইট বৃষ্টি শুরু হয় । চাঁদটাও যেন বেআক্কেলের মতো অদৃশ্য হয়ে গিয়ে নিকষ কাল আধার লেপটে দিয়ে গেছে । একটা জমাট শ্বাসরুদ্ধকর থমথমে পরিবেশে সবাই যেন বোবা হয়ে গেছে ! ত্যাঁদড় আকাশ ও তার সাঙ্গ পাঙ্গরা নির্বাক মুখে এ ওর মুখ চাওয়া চায়ি করছে । ওদিকে উত্তর পুঁতার ঘর থেকে গোঙানির শব্দ পাওয়া যায়। একি বিলকিসের কণ্ঠনিঃসৃত! নাকি অন্যকোন পৃথিবীর অধিবাসীর ?

রাত প্রায় শেষের দিকে । সেই সন্ধ্যা থেকে আলো বিলিয়ে চাঁদটাও নিঃস্ব প্রায় । মিটিং থেকে মেঝদা ফিরে এসেছেন অনেকক্ষণ হলো। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে । আর সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রাত কেন অহেতুক জেগে থাকবে ? তাই রাত্রিও ঘুমিয়ে পড়লো বলে। হটাৎ টিনের চালে কিছু একটা পড়ার শব্দ হলো । সেই সাথে একটা পেঁচা ক্লান্ত ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেলো । হিমেল স্পষ্ট শুনতে পেলো মেঝভাবী মেঝদা’কে বলছে, ‘ ওই শোন, টিনের চালে জ্বিন ইট মারলো ’।

একটা সিগারেট ধরিয়ে হিমেল হিজল গাছটার নিচে এসে দাঁড়িয়ে আকাশ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও চাঁদের দেখা পেলনা । গাছটার পরে তাকালে চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ । উত্তরের দিকে তাকালে চোখে পড়ে শেখ পাড়া । ওদিকে জোনাকি আলো জ্বালিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে । কিন্তু আলো গুলো এক একটা গোল চাঁদের মতো দেখতে ক্যান ? জগতের আর কিছুই হিমেলে দেখতে চায় না । সিগারেটে শেষ টান মেরে ও আবৃত্তি শুরু করে –

শোনা গেল লাশ কাঁটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে
কালরাতে ফালগুণের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হলো তার সাধ …

১৯ thoughts on “শুক্লপক্ষের পঞ্চদশী চাঁদ ও কয়েকটি জোনাকি

  1. অনুরোধটি রাখার জন্য ধন্যবাদ।
    অনুরোধটি রাখার জন্য ধন্যবাদ।

    লেখা ভল হয়েছে আগেও বলেছি। আর মুর্শিদি গান টা ভাল লিখেছেন।

    আগে উত্তর দেন এবার উত্তর চাই মন্তব্যের

    এখন শুরু ফাইজলামি — “”সেই
    থেকে তেঁতুল গাছ এড়িয়ে চলা অভ্যাস
    হয়ে গেছে ওর “” সেই বদ অভ্যাস এখনও
    প্রত্যক্ষ। যাই হোক হুজুরের কাছ থেকে একটু
    তেল পরা নিয়ে নিতেন এর জন্য।
    শাম্মী ভাবি হেব্বী দুরন্ত দেখছি।
    ভাবি ভাইকে কিছু বুঝান আর কত
    দেরি করবে, আকাশে চাঁদের দিকে তাকায়ে বউ
    না খুজে বাস্তবেই যাতে খুজে

        1. এই পুলা খালি উত্তর উত্তর করে
          এই পুলা খালি উত্তর উত্তর করে ক্যান… :চিন্তায়আছি: :চিন্তায়আছি: :আমারকুনোদোষনাই: :ভেংচি: :শয়তান:

  2. দারুণ লেখা!
    মনে হলো যেন সকল

    দারুণ লেখা!

    মনে হলো যেন সকল দৃশ্য,চরিত্র একেবারে চোখের সামনে ভাসমান :থাম্বসআপ:

    কিন্তু আদৌ কি এই গল্পে কোন আলৌকিক শক্তি বা জ্বিনের উপস্থিতি ছিল না তা ভন্ড লোকেদের সাজানো নাটক?

    এটা একটু বললে খুশি হতাম :পার্টি:

    1. অর্থহীন সাব্বির,
      দেখুন

      অর্থহীন সাব্বির,
      দেখুন ব্যক্তিগতভাবে আমি জ্বীন,পরী, ভূত বা আলৌকিক শক্তি ইত্যাদিতে আস্থা রাখিনা ।
      এবার ঈদ এ বাড়ি গিয়ে কিছু অভিজ্ঞতা লাভ করি । তো সেই অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে এই গল্পের সূত্রপাত । স্বচক্ষেই দেখেছি তথাকথিত জ্বীনের ভণ্ডামি ।
      আপনাকে ধন্যবাদ গল্পটি পড়ে কমেন্ট করার জন্য !!!
      :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

  3. কার্তিক মাসের এই সময়ে কোন

    কার্তিক মাসের এই সময়ে কোন দাবিতে তিনি এরকম অবিবেচক সিদ্ধান্ত নিলেন এই ভাবতে ভাবতে কখন যে হিমেলের চোখের পাতা বুজে এসেছিলো বুঝতে পারেনি

    পাট কাটা হয়ে গেছে কিছুদিন আগে । বিস্তীর্ণ জমি অপেক্ষায় আছে পরবর্তী ফসলের আশায়

    কার্তিক মাসের বর্ণনা দিচ্ছিলেন সেক্ষেত্রে পাটের সময় আরও দুই মাস আগেহ হয়ে যাওয়ার কথা।

    কিন্তু রুস্তুম শেখ জমির দুইধারের বিশাল বিশাল শাল, সেগুন, মেহগনি , নিম গাছ কেটে বিক্রি করেছে যা স্পষ্টত লীজ চুক্তির বর খেলাপ

    বিলের জমি লিজ নিয়ে ঝামেলা। বিল বা পানি জমে এমন এলাকায় শাল, মেহেগনি, শাল গাছ হওয়ার কথা না।

    অন্য কিছু বাদ দিলাম প্রকৃতির রুপের বর্ণনা অসাধারণ লেগেছে। কারিগরি সমস্যার কারণে ইমো ব্যবহার করতে পারছি না।

    1. কিরন শেখর ,
      প্রথমত সরি যে

      কিরন শেখর ,
      প্রথমত সরি যে আপনার মেসেজের উত্তর দিতে ভুলে গেছি ।
      এবার সমালোচনার ব্যাখ্যা –
      আপনি ঠিকই ধরেছেন দেড় ২ মাস আগে পাট কাটা হয়ে গেছে । সুনির্দিষ্ট করতে ইচ্ছে হয়নি । আর কাষ্ঠল গাছ আমাদের অঞ্চলে বেশ ভালো রকমেই হয় । গাছগুলো জমির ভেতরে নয় । রাস্তার পাশে জমি ঘেসে ।
      শহরে বাস করলেও আমার মনের ভেতর গ্রাম বসত করে । গ্রামে থাকার সেই সোনালি শৈশবের কথা মনে পড়ে ।
      আপনার মূল্যবান সমালোচনার জন্য অশেষ ধন্যবাদ !!!
      :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

  4. ১।
    বিরোধীদলের মতো বলা নাই

    ১।

    বিরোধীদলের মতো বলা নাই কওয়া নাই পবন দেবতা ‘ হাওয়া বনধ ’ স্ট্রাইক করে বসে আছে ।

    খারাপনা ভালোই বলছেন। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    ২।

    ‘ বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে বলো ? শেখ আর জিয়াউদ্দিন দুজনেই গ্রাম্য এলিট । অর্থ – বিত্ত, লাঠিয়াল দুয়েরই সমানে সমান । একটা রক্তপাত ছাড়া এর কোন সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছে না ।’

    এতটা উদার আশা করিনাই। :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :ভাঙামন: :ভাঙামন: :ভাঙামন:

    ৩।

    ‘ আরে ধুর ! কী সব পাগলামো করো ! রাজেন মাস্টার পই পই করে বলেছে মিটিঙে থাকার জন্য । ওই দুই গুণ্ডার বিরুদ্ধে গায়ের লোক একজোট হচ্ছে ।

    হাস্যকর।গায়ের লোক? তাদের সংখ্যা কত? মাস্টার সাব মনে হয় প্রতিদিন সকাল বেলা এক গ্লাস গরম দুধের সাথে চার পাঁচটা চিনাবাদামও খায়। কিসের যেন গন্ধ পেলাম। :ভাবতেছি: :ভাবতেছি: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি:

    1. শঙ্খনীল কারাগার,
      আমি যদ্দুর

      শঙ্খনীল কারাগার,
      আমি যদ্দুর জানি আপনি কবিতা লেখেন !
      আফসোস রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লার পর বলার মতো কোন কবির আবির্ভাব হলনা ।
      আপনার মানসিক সুস্বাস্থ্য কামনা করছি … !!!
      সমালোচনার জন্য ধন্যবাদ !
      :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

  5. আমার অসাধারণ লাগলো রাহাত ভাই।
    আমার অসাধারণ লাগলো রাহাত ভাই। আর বিশেষ ভাবে আশা করেছিলাম গল্পের শেষে আপনি এই জ্বীনের ব্যাপারে কোনো একটা উপসংহার দেবেন। কিন্তু দেননি কেন বুঝলাম না।

    গল্পে +++++++ :থাম্বসআপ:

    1. অঘূর্নায়মান ইলেকট্রন,
      উপসংহার

      অঘূর্নায়মান ইলেকট্রন,
      উপসংহার কেমন হতে পারতো, তোমার কোন আইডিয়া আছে ?
      আর যদি জাখুর ভণ্ডামি সরাসরি ধরিয়ে দিতাম সেটি অনেক বেশি ” উইসফুল থিঙ্কিং ” হয়ে যেতো না ?
      আমাদের গ্রামীণ সমাজে জ্বীন – ভূত সংক্রান্ত ধারণা এখনো অমীমাংসিত । আমি চাইলেই আমার ইচ্ছেকে চাপিয়ে দিতে পারিনা ।
      তোমার কমেন্টের জন্য ধন্যবাদ ! এতো বড় লেখা পড়তে অনেক সময় দিতে হয়েছে তোমাকে । ভালো থেকো … :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *