রান্নাঘরের নারীবাদি ও ‘সমঝোতা না করা’ নারীর কথা

হুমায়ুন আজাদের একটা কবিতা আছে, রান্না ঘরের নারীবাদী নামে। অধিকাংশ মেয়েই প্রগতিশীল, নারীবাদি প্রেমময়ী হয়েও টিপিক্যাল ঘর সংসার চিন্তার বাইরে যেতে পারে না, এটাই ছিল কবিতার বিষয়বস্তু। হুমায়ুন আজাদ হয়তো কিছুটা শ্লেষের সাথে জীবন সংগ্রামে হোচট খাওয়া এবং কিছুটা ভালো থাকার জন্য জীবনের সাথে সমজোতা করা নারীর চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু কে খবর রেখেছে জীবনের সাথে সমঝোতা না করা নারীর কথা? কে খবর রেখেছে আত্মসম্মান রক্ষার লড়াইয়ে ‘নিঃসংতার একশো বছর’ পার করা নারীদের কথা?


হুমায়ুন আজাদের একটা কবিতা আছে, রান্না ঘরের নারীবাদী নামে। অধিকাংশ মেয়েই প্রগতিশীল, নারীবাদি প্রেমময়ী হয়েও টিপিক্যাল ঘর সংসার চিন্তার বাইরে যেতে পারে না, এটাই ছিল কবিতার বিষয়বস্তু। হুমায়ুন আজাদ হয়তো কিছুটা শ্লেষের সাথে জীবন সংগ্রামে হোচট খাওয়া এবং কিছুটা ভালো থাকার জন্য জীবনের সাথে সমজোতা করা নারীর চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু কে খবর রেখেছে জীবনের সাথে সমঝোতা না করা নারীর কথা? কে খবর রেখেছে আত্মসম্মান রক্ষার লড়াইয়ে ‘নিঃসংতার একশো বছর’ পার করা নারীদের কথা?

বিয়ের প্রশ্নে আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত পুরুষের মানুষিকতা- তারা গাছেরটা খেতে চায়, আবার তলারটাও কুড়াতে চায়! আরেকটু বিশ্লেষন করে বললে, তারা বউ হিসেবে এমন মেয়েকেই চায় যারা হবে শিক্ষিত, কর্মজীবী ( অবশ্য পুরুষের চেয়ে বেশি উপার্জনক্ষম নয় এবং চাকরি ছাড়তে বললেই ছেড়ে দিতে প্রস্তুত থাকনে এমন), আধুনিক, প্রগতিশীল। আবার পাশাপাশি তারা এটাও চায় মেয়েটিকে ঘরকন্নার কাজেও তাকে মনোযোগী থাকতে হবে। সুচারু ভাবে সামলাতে হবে সংসার। কে এক টুকরো মাছ কম পেলো কিংবা কে একবেলা খেলো না পাই টু পাই খবর রাখতে হবে। নাইলে সে কিসের মেয়ে মানুষ! অফিস করো, কাজ করো ঠিক আছে, কিন্তু রান্নাঘর সামলাতে না পারলে তুমি আবার কিসের মেয়ে মানুষ! এদের চোখে মেয়েমানুষ আর মানুষ হয়ে ওঠেনা।

ঝিনুক নিরমে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও, আবুল হাসানের এই কবিতায় যেন এদেশের নারীদের চুড়ান্ত ভাগ্য! আর যারা এই ভাগ্যকে খন্ডন করতে চায় তাদের জীবনে নেমে আসবে অনামিশার অন্ধকার। যখন নারী চিৎকার করে জানান দিবে তার অস্তিত্ব, অন্যের চোখে আঙ্গুল দেখিয়ে দিতে চাইবে মানুষ হিসেবে তার অধিকার, তখনই নেমে আসবে পুরুষতন্ত্রের খড়গ। স্বামী, শশুর, শাশুড়ি, সমাজ, রাষ্ট্র কখনো বাবা মাও ঝাপিয়ে পড়বে। ব্যাপারটা এরকম- যদি সংসার করতে চাও নিরবে সহে যাও, নাইলে তোমার কপালে কিছুই জুটবে না!

সম্প্রতি হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক স্যান্ডি টো চীনের অবিবাহিত নারীদের উপর গবেষনা করে বের করেছেন ভয়ানক সত্য দুটি তত্ত। অতি যোগ্য নারীদের বর মেলে না, অন্য ভাবে বলা যায়, নিজেকে যোগ্য করতে বয়স কিছুটা পার হলে পুরুষরা সেই সব নারীদের ভাবেন ‘পরিত্যক্ত হওয়া এড়াতে সংগ্রামরত’। যাদ৩২ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে, চীনা পুরুষদের বিবেচনায় তারা ‘কুড়েঘর বাসিনী’যারা নিজের কাজে ব্যস্ত থাকায় স্বামী-সংসার নিয়ে ভাবার সময়ই পান না৷ তাদের বিয়ে হওয়াটা আরো কঠিন৷ আর বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে মেয়ে যত যোগ্য, যত সুন্দরীই হোক, চীনের বিয়ের বাজারে তারা অপাঙক্তেয়৷ চীনের পুরুষরা তাদের চেয়ে যোগ্য মেয়েদের বিয়ে করতে অনিচ্ছুক, কারণ, যোগ্যতর মেয়েদের তারা ভয় পায়, মনে করে যোগ্যতার এই তারতম্য ভবিষ্যৎ জীবনে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে৷ আমাদের সমাজে এই কথা গুলো অনেক বেশি প্রযোজ্য।

লিভ টুগেদার! পক্ষে বিপক্ষে রয়েছে নানান মত । যারা মনে করেন বিয়েটা হলো একটা কাগজে সাক্ষর কিংবা কিছু সামাজিকতা পালন তারাই সোচ্চার হন বিয়ে প্রথার বিরুদ্ধে। কম হলেও এদশেও অনেকে বেছে নিয়েছেন বিবাহ বহির্ভুত একসঙ্গে, একি ছাদের নিচে জীবন কাটানোর পথ। প্রচলিত আছে, লিভ টুগেদারে জীবন যাপনের স্বাধীনতা অনেক বেশি সমৃদ্ধ। কিন্তু এখানেও পুরুষতান্ত্রিকতা অত্যান্ত নিম্নমানের আক্রমন করে। এদেশি পুরুষরা বহুদিন একত্রে বসবাসের পর উপলব্ধি করে, বিয়ে তো আসলেই বিয়ে! বিয়ে না করলে কি আর ঘরকে ঘর মনে হয়, সংসারকে সংসার মনে হয়, বউকে বউ মনে হয়!

সব থেকে খারাপ অবস্থায় থাকে ‘একলা নারী’। যারা একলা থাকতে চায়, সমাজ তাকে বার বার মনে করিয়ে দেয়, নারী তোমার একলা থাকার অধিকার নেই। চারপাশে ফিসফিস আওয়াজ ওঠে, নিশ্বয় এই মেয়ের স্বভাব খারাপ, নয়তো কেন তার কেউ জুটবে না? এ সমাজ মেনে নিতে পারে না একটা মেয়ে একলা থাকার অধিকার রাখে। নানান পুরুষ মনে করে ‘একলা থাকা নারী’ সবথেকে সহজলোভ্য আর সহজভোগ্য!

এর বাইরে নারীর প্রতি বর্বর সহিংসতা, নিপীড়ন তো আছেই। এতো লড়াই সংগ্রাম করেও নারীর একটা নিজস্ব কামরা (ভার্জিনিয়া উলফের ভাষায়-আ রুম অব ওয়ান্স ঔন) পাওয়া হয়ে ওঠেনা। আর কেন পাওয়া হলো না তা বলতে গেলেই প্রগতীশীলতার অনেকগুলো মুখোশ যে খুলে পড়বে!

৮ thoughts on “রান্নাঘরের নারীবাদি ও ‘সমঝোতা না করা’ নারীর কথা

  1. প্রত্যেকটা কথা
    প্রত্যেকটা কথা সত্যি।
    পুরুষেরা আশি বছর বয়সেও বিয়ে করার জন্য মেয়ে পায় কিন্তু মেয়েরা আঠাশ পেরুলে অপাংক্তেয়! পুরুষেরা নিজের চেয়ে বেশী বেতনওয়ালা মেয়ে বিয়ে করতে চায় না কারণ দাম বৌয়ের থেকে কমে যাবে। মেয়েরা ঘর-পর সব সামলাবে আর পুরুষেরা ডেইলি বাজার করেই “মুই কী হনু রে!” ভাব ধরে থাকবে। একলা পুরুষ বা মেসে কয়েকজন পুরুষ একসাথে থাকা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু মেয়েরা একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকলে সেটা “কুকামের আস্তানা”! সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পর একটা মেয়েকেই সবচেয়ে বেশী দুরবস্থা পোহাতে হয়। বিশ্রী কথা শুনতে হয়।
    আমরা এসব নিয়ে লিখছি? দেখুন গিয়ে, বাইরে পুরুষরা কতো কিছু বলে বেড়াচ্ছে আমাদের নামে :খুশি:

  2. ” আমি তোমার সামনে আবার
    ” আমি তোমার সামনে আবার নতজানু হয়েছি, নারী
    না, প্রেমে নয়, আশ্লেষে নয়,
    ………………………… ক্ষমা চেয়ে
    … আমার ভেতর যে পুরুষ তাকে আমি চাবুক মেরে শাসন করেছি
    তাকে হাঁটু মুড়ে বসতে বলেছি তোমার সামনে
    আমি ক্ষমা চাই, ক্ষমা করে দাও
    শুধু আমাকে নয়
    ………… সমস্ত পুরুষকে তুমি ক্ষমা কর
    আমি আজ সমস্ত পুরুষের হয়ে তোমার ক্ষমাপ্রার্থী
    ———– কবিতা, ” কর্তৃত্ব গ্রহণ কর, নারী ”

  3. হাজার বছরের পুরুষালী মনোভাব
    হাজার বছরের পুরুষালী মনোভাব আর নারীদের অন্তঃমুখীতার কারনে আজও নারীরা বেরিয়ে আসতে পারছে না।
    ‘অবলা’ নামক একটা শব্দ তাদের কপালে ঝুলিয়ে দিয়েছি আমরা। আর সেই কারনেই হয়ত বলার সাহসটুকু হারিয়ে ফেলেছে।
    এ সমাজে যারা তাদের কপাল থেকে ঘামের মত মুছে ফেলতে পারবে নারী নামের বিশেষণ গুলো আর তার পরিবর্তে লিখতে পারবে ‘মানুষ’ তখনই সে পারবে বেরিয়ে আসতে। অন্যথায় নয়।

  4. আমাদের সমাজের এক একটা পুরুষ
    আমাদের সমাজের এক একটা পুরুষ এক একজন শ্বাসক। নারী এখানে প্রজা। যার কোন অধিকার কোন বিষয়েই। সব অধিকার পুরুষের। আমাদের সমাজ নারীদের পুতুল করে রেখেছে। যেমন ভাবে ইচ্ছে সাজাও। যেমন ভাবে ইচ্ছে তাকে নিয়ে খেল।

    আমি লজ্জিত . , . .শ্বাসক শ্রেণীর প্রতিনিধি হয়ে।

  5. পুরুষ, নারী ও বিয়ে এগুলোর
    পুরুষ, নারী ও বিয়ে এগুলোর অর্থ আমরা নিজেদের প্রয়োজনে বা স্বার্থেই পরিবর্তন করে ফেলেছি । তাই আজ এত সমস্যা । একটা উদাহরন দিলেই আশা করি বুঝতে পারবেন – যেমন স্বাধীনতার অর্থ আমরা প্রায় সকলেই জানি- “যা খুসি তাই করার অধিকার” ।
    আসলে স্বাধীনতার অর্থ কি তাই ? না, সহজ ভাষায় স্বাধীনতার অর্থ – “অন্যকে কোন রূপ ডিসটার্ব না করে যা খুসি তাই করার অধিকার” ।
    আমরা নিজেদের প্রয়োজনে”অন্যকে কোন রূপ ডিসটার্ব না করে” – এই বাক্যটাকে বাদ দিয়ে শুধু নিজ নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সব কিছুই লেজে গোবরে করে ফেলেছি বলেই আমার বিশ্বাস ।

    লেখার বিষয় বস্তু ও লেখা ভাল লাগলো সেজন্য :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

  6. নারীর সমস্যা প্রাগৈতিহাসিক তা
    নারীর সমস্যা প্রাগৈতিহাসিক তা বাংলাদেশর মত অন্ধকার আর ইউরোপের মত আলোকিত সমাজেও। এ বিষয়ক পোস্ট দেব শিঘ্রই। ভাল লেগেছে লেখা।

  7. আমার মতে নারীবাদ কোন কাজের
    আমার মতে নারীবাদ কোন কাজের কথা না পুরুষবাদ ও কাজের কথা না । মুল কথা হাজার বছর ধরে চলে আসা এই নারী পুরুষ বৈসম্য দূর করতে হবে । সকলের সমঅধিকার থাকতে হবে । নারী পুরুষ একে অন্যের পরিপুরক । মিসেস আর এস হোসেন বলেছেন নারী পুরুষ সমাজের দুইটি পা । এক পা খোরা হলে অন্য এক পায়ে সমাজ আগ্রসর হতে পারবে না । এক জন রান্না ঘরে জীবন কাটিয়ে দেবে অন্যজন বাইরে থাকবে এটা মেনে নেয়া যায় না । আমি চাই আমার ভিতরে যে পুরুষ আছে এটা দমন করতে । আমি মানুষ হতে চাই পুরুষ না ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *