হয়ত বা ভালবাসা ,নয়ত বা না

– এই ছেলে দাড়া। তোর নাম কি? পিছনে একা একা বসছিস কেন?

একটু রেগেই কথাটা বলল নাজিফা। ওরা এসেছে ডিপার্টমেন্ট এর নতুন ছাত্র ছাত্রিদের সাথে পরিচিত হতে। আজ ডিপার্টমেন্টের নতুন ব্যাচের প্রথম ক্লাস।নাজিফা এখন দ্বিতীয় বর্ষে।বড় ভাই বোন হিসেবে নতুনদের সাথে পরিচিত হওয়া দায়িত্ব। তাই এসেছে।কিন্তু এসেই নাজিফার এমন ব্যবহারে সবাই একটু অবাক হল।

নাজিফা আবার বলল,
– তোর নাম জিজ্ঞেস করলাম না?
– জি আপু ফাহাদ।
– তা তুই পিছনে বসছিস কেন? সামনে চেয়ার টেবিলের অভাব পড়েছে? আর একদিন যদি পিছনে দেখি, চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিব। ফাজিল। সামনে এসে বস।

চুপচাপ ব্যাগটা নিয়ে সামনে এসে বসল ফাহাদ।

– যত্তসব!


– এই ছেলে দাড়া। তোর নাম কি? পিছনে একা একা বসছিস কেন?

একটু রেগেই কথাটা বলল নাজিফা। ওরা এসেছে ডিপার্টমেন্ট এর নতুন ছাত্র ছাত্রিদের সাথে পরিচিত হতে। আজ ডিপার্টমেন্টের নতুন ব্যাচের প্রথম ক্লাস।নাজিফা এখন দ্বিতীয় বর্ষে।বড় ভাই বোন হিসেবে নতুনদের সাথে পরিচিত হওয়া দায়িত্ব। তাই এসেছে।কিন্তু এসেই নাজিফার এমন ব্যবহারে সবাই একটু অবাক হল।

নাজিফা আবার বলল,
– তোর নাম জিজ্ঞেস করলাম না?
– জি আপু ফাহাদ।
– তা তুই পিছনে বসছিস কেন? সামনে চেয়ার টেবিলের অভাব পড়েছে? আর একদিন যদি পিছনে দেখি, চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিব। ফাজিল। সামনে এসে বস।

চুপচাপ ব্যাগটা নিয়ে সামনে এসে বসল ফাহাদ।

– যত্তসব!

বলেই ক্লাসরুমের বাহিরে চলে আসল নাজিফা। পিছনে পিছনে জেরিন।

– এসব কি হল, নাজি? নতুনদের সাথে এমন আচরণ করে কেউ? লাস্টে বসেছে তাতে হয়েছে টা কি? আজব মেয়ে তুই। এক জিনিস নিয়ে সারাটা জীবন পরে থাকবি? চল নতুদের সাথে কথা বলবি।
– আমি চলে যাব। ঘুম আসতেছে। অনেক সকালে ঘুম থেকে উঠেছি। আমি থাকতে পারব না। তোরা যা।

হনহন করে চার তালা থেকে নেমে আসল নাজিফা। হঠাৎ করেই খুব মনে পড়ছে নিলয়ের কথা। গত বছর প্রথম ক্লাসে এসে ঠিক ওভাবে একা একা লাস্টে বসে ছিল। সবাই কত আগ্রহ নিয়ে সবার সাথে পরিচিত হচ্ছিল। আর নিলয় সবার পিছনের চেয়ারে বসে টেবিলে কি যেন আঁকছিল কলম দিয়ে। কারও সাথেই কথা বলছিল না।
এসব ভাবনা থাক না। কষ্টের স্মৃতিগুলো মনে করার কি দরকার? নাজিফা ভার্সিটি থেকে বের হয়ে একটা রিকশা নিল।ঘুম পাচ্ছে খুব।হঠাৎ একটা চায়ের দোকানের সামনে রিকশা থামাতে বলল। আবার ঘুরে ফিরে পিছনের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়া হচ্ছে।

প্রথম ক্লাসের দিন প্রায় সবাই এসে কথা বলল নাজিফার সাথে। নাজিফা খুব তারাতারি মানুষের সাথে মিশে যেতে পারে। খুব তারাতারি বন্ধু হয়ে যেতে পারে। নিলয় শুধু কথা বলল না। শুধু নাজিফার সাথে না। কারও সাথেই কথা বলেনি।
একবার রাজিব গিয়ে কাঁধে হাত দিয়ে বলল,
– কিরে ভাবুক।একা একা পিছনে কি করিস? এমন বলদের মত পিছনে বসে আছিস। মনে হচ্ছে তোর কেউ নাই।
-don’t touch me. এখান থেকে যাও। আর একটা কথা না।
– আরে এভাবে react করার কি আছে?আমি তোকে কি করলাম?
– আমি তোমাকে এখান থেকে যেতে বলছি। নয়ত খারাপ কিছু হবে। just go.

রাজিব চলে আসল।
– যত্তসব পাগল ছাগল ভর্তি হইছে।

প্রথম দিন ক্লাস শেষ হল ২ টার দিকে। সবাই বের হয়ে যে যার মত রিকশা করে, cng করে যেতে লাগল। কেউ কেউ অবশ্য আড্ডা দেবার জন্য রয়ে গেল।ভার্সিটিতে।নাজিফার ঘুম খুব বেশি। দুপুরের ঘুমটা কোন ভাবেই মিস করা যায় না। তাই তারাতারি একটা রিকশা নিল। রিকশা দিয়ে যাবার সময় নিলয়কে দেখল নাজিফা। কি আজব ছেলে। এরকম ফাজলামির মানে কি? সব লোকসহ রিকশা গুলোকে বলছে
– এই যাবেন?

আর রিকশা চালক এবং যাত্রী দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কেউ পাগল বলে। আর কেউ বেয়াদব। নাজিফার রিকশাকেও বলল
– এই যাবেন?

নাজিফা খানিকটা অবাক হল। ক্লাসে লাস্টে বসা চুপচাপ ছেলেটা এতো দুষ্ট। ভারী বেয়াদব তো। নাজিফা কি মনে করে যেন রিকশা থামাতে বলল,
– হ্যাঁ যাবে। আয় উঠে বস।

নিলয় উঠে বসে বলল
– আচ্ছা আপনি যান তাহলে। আমি একা যেতে পারব।

নাজিফা অবাক চোখে বলল
– সমস্যা নেই। আমরা এক রিকশাতেই যেতে পারব।আর আমি তোর ক্লাসমেট। আমাকে আপনি করে বলতে হবে না। তুই করে বলবি।
– আমি কাউকে তুই করে বলিনা। তুমি করে বলি তাহলে।
– নাম কি তোর?
– নিলয়। তোমার?
-নাজিফা।
– ওহ, আমার খুব বিরক্ত লাগছে। তুমি নাম তো রিকশা থেকে।
– কোন সমস্যা?
– না থাক বসো।

নিলয় আর নাজিফা রিকশা করে যাচ্ছে। টুকটাক কথা হচ্ছে। নাজিফার খুব অস্বস্তি লাগছে ব্যাপারটা,নিলয় ওকে তুমি করে ডাকছে। আর নাজিফা তুই করে। নাজিফাও তুমি করে ডাকতে লাগল। নিলয় হঠাৎ একটা চা এর দোকানের সামনে এসে বলল
– রিকশাটা থামাতে বল না।

নাজিফা রিকশা থামাল। তারপর নামল দুজন। নিলয় বলল- চল চা খাই।
-আল্লাহ,এখানে? এখানে মেয়েরা কি করে চা খায়? রাস্তার পাশে। এখানে তো শুধু ছেলেরা।
– চল তো আমার সাথে।

নাজিফা নিলয়ের সাথে গেল।
– মামা ২ কাপ চা দেন। নাজিফা বসো তুমি।

নিলয়ের পাশে বসল নাজিফা। কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। সবাই আড় চোখে তাকাচ্ছে। দোকানদারও। তার দোকানে এই প্রথম মনে হয় কোন মেয়ে আসল চা খেতে।
– মামা একটা চায়ে চিনি কম। আর আমারটায় বেশি।

নাজিফা বলল- আমারটায় কম কেন?
-মেয়েরা তো চিনি কম খায়।
– কে বলল এটা?
– আমার আম্মু যে কম খেত।
– আমি বেশি খাই।

নিলয় ২ চাতেই চিনি বেশি দিতে বলল। চা খেল দুজন। চা শেষ করে নিলয় বলল
– কেমন লাগল?
– হ্যাঁ অনেক ভাল। প্রথম এভাবে চা খেলাম।
– আরও ভাল লাগবে। আর একটা কাজ করব আমরা এখন।
– কি কাজ?
– দেখই না।

নিলয় দোকানদারের কাছে বলল
-মামা। ২ প্যাকেট সিগারেট দেন তো।
– কোনটা দিমু?
– ঐ হলুদ প্যাকেটের টা দেন।

নিলয় ২ প্যাকেট সিগারেট নিয়ে নাজিফার কাছে আসল। নাজিফা চিৎকার করে বলে উঠল,
– ছিঃ ছিঃ। তুমি সিগারেটও খাও। তোমাকে দেখে কত ভদ্র ছেলে মনে হয়। আর তুমি কিনা………

নিলয় নাজিফার দিকে এক প্যাকেট বাড়িয়ে দিল। নাজিফা আরও অবাক
– এই কি শুরু করছ তুমি? রাস্তার পাশে চা খাইছি। এখন সিগারেট খেতে বলতেছ?
– কে তোমাকে খেতে বলল? ধর এটা আগে।
– না আমি এসব নিয়ে নাড়াচাড়া করি না।
– ওহ ধর তো।

ধমক দিয়ে বলল নিলয়। নাজিফা চুপ চাপ প্যাকেটটা নিল। আর মনে মনে ভাবল,
কি ছেলের পাল্লায় পড়লাম।
নিলয় আদেশের ভঙ্গিতে বলল
– পিছন পিছন আসো আমার।

নাজিফা তাই করল। হাতে সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে পিছন পিছন গেল। একটা ড্রেনের সামনে এসে নিলয় বলল
– আমি যা যা বলব। তুমিও তাই তাই বলবে আচ্ছা?
– আচ্ছা।
– বল, সিগারেট খাওয়া স্বাস্থের জন্য খারাপ। সিগারেট খাওয়া আর ড্রেনের পানি খাওয়া সমান। সিগারেট আর ড্রেনের পানি ২ ভাই। তাই আমরা ২ ভাইকে এক করার জন্য সিগারেট ড্রেনে ফেলে দিচ্ছি। সাথে সাথে ২ প্যাকেট সিগারেট নষ্ট করার মাধ্যমে.দেশ ও দেশের মানুষের অশেষ উপকার করছি।

বলেই ঝুপ করে ড্রেনে প্যাকেটটা ফেলে দিল নিলয়। নাজিফা চুপচাপ প্যাকেট নিয়ে দাড়িয়ে।
– আমি ভুলে গেছি তুমি কি বলছ।
– আবার বলব?
– না থাক। শুনেছি তো। বলা আর শোনা একই। প্যাকেটটা ফেলে দেই।

নাজিফা প্যাকেটটা ফেলে দিয়ে নিলয়ের তাকাল। সত্যি অদ্ভুত একটা ছেলে। নিলয় বলল
– তোমার সাথে থাকতে আমার খুব ভাল লাগছে। তোমার কোন কাজ নেই তো? বাসায় একটু দেরী করে গেলে কি আম্মু বকা দিবে?
– না আমি ফ্রি আছি। আমার ফ্রেন্ডদের সাথে থাকলে আমার আব্বু আম্মু কিছু বলেনা।
– আচ্ছা তাহলে আমার সাথে আসো। একটা ভাল কাজ করছি। এখন একটা খারাপ কাজ করতে হবে।
– খারাপ কাজ কেন?
– আসো না। মজা লাগবে।

নাজিফাকে নিয়ে একটা গলিতে ঢুকল নিলয়। দুপুর বেলা। তাই চারপাশে লোকজন একদমই কম। রাস্তার পাশ থেকে একটা লাঠিও যোগার করেছে নিলয়। নাজিফার একটু একটু ভয় লাগছে। কি যে করবে ছেলেটা কে জানে? গলির সাথে মিলানো এক বাসার জানালার কাছে আসল ওরা।নাজিফার কানের কাছে মুখ নিয়ে নিলয় বলল
– এটা আমার মামার রুম। মামা খুব মোটা। ঘুমও খুব বেশি।আজ তিনি বাসায় আছেন। বাসায় থাকলেই ঘুমান। আমরা এখন মামার ঘুমে বিরক্ত করব। আচ্ছা?

নিলয় নাজিফার হাতে লাঠির অর্ধেক দিয়ে বলল
– আমার সাথে সাথে ৫ টা বারি মারবে জানালায়। বারি মারার পর আমার পিছন পিছন দৌড় দিবে। আমি জানি মেয়েরা কম দৌড়াতে পারে। তাই আমি আস্তে আস্তে দৌড়াব।

নাজিফা ভিতরে ভিতরে অন্যরকম আনন্দ অনুভব করছে। এমন কিছু ও আগে কখনও করে নি।নিলয় বলার সাথে সাথে, নিলয় আর নাজিফা জানালায় ৫ টা করে বারি দিয়ে দিল দৌড়। নিলয়ের পিছন পিছন নাজিফা। কতদূর গিয়ে হাপাতে হাপাতে থামল দুজন।
নিলয় বলল- কেমন লাগল?
– অনেক ভাল।

নাজিফা হাপাচ্ছে আর নিলয় তাকিয়ে আছে। একদৃষ্টিতে। সুন্দর লাগছে অনেক নাজিফাকে। নাকের উপর একটু ঘাম জমেছে।ঘামটুকুর জন্য আরও সুন্দর লাগছে।মায়াময় লাগছে।
– তোমাকে না খুব সুন্দর লাগছে।
– তাই? আমি সবসময়ই সুন্দর। আচ্ছা, আর কিছু করব না আজ?
– না। আজ একটা ভাল কাজ। আর একটা খারাপ করা শেষ। আজ আর না। আমি বাসায় চলে যাব।
– আচ্ছা যাও। আমিও যাই। ঠিক আছে? কাল দেখা হবে। you are a good boy as friend, নিলয়।
– you too,bye.

নাজিফা নিলয় যে যার বাসায় চলে আসল।
—– ——- ——- ——-
পরদিন সবার আগে ক্লাসে গেল নিলয়। ক্লাসরুমের তালা খোলার আগেই। ক্লাসরুমের সামনে কাঁধে ব্যাগ। হাতে ৪ টা বেলুন নিয়ে দাড়িয়ে আছে নিলয়। বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। ওহ! মাত্র ৭ টা ১৫ বাজে। ৮ টায় ক্লাস। কিছুক্ষণ পর এক লোক তালা খুলতে আসলেন।
– কি বাবা? তুমি এতো আগে আইছ ক্যান?
– জি আঙ্কেল। ঘুম ভেঙ্গে গেল। তাই ভাবলাম চলে আসি। তারাতারি না আসলে সিট পাব না।
– কে কইছে তোমারে? সকালের ক্লাসে পোলাপানই আসে না। খুব অল্প।
– নাজিফা আসবে না?
– নাজিফা কে?
– আপনি চিনবেন না। থাক। আপনি কি তালা খুলবেন?
– হ। আমার কাজই এগুলা। শান্তি মত ঘুমাইবারও পারি না। আসি সবার আগে। যাই সবার শেষে। বেতনও সবার থেকে কম।
– আচ্ছা। আপনি বেলুন গুলা ধরেন। আমি খুলে দেই। আপনাকে একটু সাহায্য করি। আমার তালা খুলতে খুব মজা লাগে। আচ্ছা আঙ্কেল আপনার নাম কি?
– মজিদ। আব্দুল মজিদ।
– আচ্ছা, মজিদ চাচা। তালা আমি খুলি?
– নাও খুল। মজা পাইলে খুল। আমার এগুলা ভাল্লাগে না।

নিলয় খুব আগ্রহ নিয়ে সবগুলা ক্লাসরুমের তালা খুলল। পিছনে বেলুন হাতে মজিদ চাচা ঘুরছেন। তালা খুলতে পেরে নিলয় খুব খুশি।আর না খুলে মজিদ চাচাও খুশি। তালা খোলা শেষে মজিদ চাচা বলল
– বাবা,একটা কথা কই তোমারে?
– বলেন চাচা।
– তোমাগো কি কোন অনুষ্ঠান আইজ? বেলুন আনছ ক্যান?
– না চাচা। এমনি এনেছি।
– জানো, আমার নাতনি আছে একটা। পিচ্চি। ২ বছর বয়স। দেখতে খুব সুন্দর। মাঝে মাঝে মন চায় কিছু খেলনা পাতি লই।কিন্তু টাকায় কুলায় না।কত্ত বড় সংসার। আমি একার ঘাড়ে সব। মাইয়া বিয়া দিছি। জামাই গেছে মইরা। বাবা, আমারে একটা বেলুন দেবা? নাতনি টারে দিমু। দাম তো কম অনেক। তাও আমি কিনতে পারি না। আমি একটা লই?

নিলয় মজিদ চাচার দিকে তাকিয়ে আছে। কত অসহায় ভাবে একটা বেলুন চাচ্ছেন। না জানি কত বড় অপরাধ করে ফেলছেন। বেলুনটা চেয়ে। গরীব মানুষ গুলোর চাওয়া পাওয়া গুলো কত ছোট। বেশি কিছু চাইতে এরা ভয় পায়। কত ছোট জিনিসের মধ্যে কত ভালবাসা খুঁজে এরা।

– চাচা , আমার এগুলো লাগবে না। আপনি আপনার নাতনির জন্য নিয়ে যান।
– কি কও বাবা? এতো গুলা নিয়া যামু? ও আল্লাহ। এতগুলা দিয়া কি করুম? সত্যি নিয়া যামু সবগুলা?
– হ্যাঁ চাচা। সবগুলো নিন। আচ্ছা আপনার নাতনির নাম কি?
– মিষ্টি। কও তো এইটা কারও নাম হয়? মিষ্টি হইল খাওয়ার জিনিস। নাম রাখার কি দরকার? রাখলে গাছের ফল পেয়ারা রাখলেই তো হয়। আমার মাইয়া ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়ছে। পড়ালেখা জানে। তাই যা বুঝায় বুঝি।
– না চাচা। মিষ্টি তো অনেক সুন্দর নাম।

মজিদ চাচাও মেনে নিল। কেন যেন নিলয়ের কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে। মানুষের মন অনেক রহস্যে ভরা। কখন কার প্রতি ভালবাসা। কার প্রতি বিশ্বাস। কার প্রতি মন টানে বলা যায় না। মনটা নিজের। কিন্তু নিয়ন্ত্রন খুব কম তার উপর। মজিদ চাচা হাসি মুখে বেলুন নিয়ে চলে গেলেন। আজকের দিনটা যাবে তার উত্তেজনায়। কখন বাড়ি ফিরবেন। আর বাড়ি ফেরার পর অভাবের সংসারের প্রতি দিনকার দুঃখ, রাগারাগির কিছুটা হলেও স্মিত হবে ,এই ৪ টা বেলুনের জন্য। আসলেই কত ছোট কিছু কত সুখ দিতে পারে।
নিলয় ফাঁকা ক্লাসে ঢুকে সবার পিছনের চেয়ার টেবিলটায় বসল।মনে মনে খুব খুশি। সবার আগে এসে ভাল জায়গাটা পাওয়াতে।কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই আসা শুরু করল। কয়েকজন আসার পর স্যার আসল। নাজিফা আসছে না এখনও। নিলয় সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছে। কতক্ষণ পর ক্লাসে এসে ঢুকল নাজিফা। সামনে একটা সিট ফাঁকা থাকাতে ওখানেই বসল। হঠাৎ করেই নিলয় বলে উঠল
– এই নাজিফা। ওখানে কেন? আমি তোমার জন্য জায়গা রেখেছি। আমার সাথে এসে বস।

নাজিফা কিছুটা ইতস্তত অনুভব করছে। স্যার বলল- যাও, ওর সাথে গিয়ে বস।

নাজিফা আস্তে করে পাশে এসে বসল। ছেলেটাকে যত দেখছে তত অবাক হচ্ছে নাজিফা।ক্লাসটা শেষ হবার পর নিলয় বলল,
– আমরা আজও একসাথে যাব, আচ্ছা? আমার তোমার সাথে থাকতে খুব ভাল লাগে। রিকশা চড়ে ঘুরতেও। এই জানো তোমাকে দেখানোর জন্য একটা জিনিস এনেছি। দেখো আমার ছোট বেলার ছবি। আমি কত কিউট ছিলাম। আর এখন কেউ কিউট বলে না।

নাজিফা অবাক হয়ে নিলয়ের কাজ কর্ম দেখছে। নিলয় বলেই চলছে
– নাও দেখো। কিছু ছবি উল্টে রেখেছি। দেখা যাবে না। আগে তো একদম লজ্জা ছিল না। তাই জামা কাপড় ছাড়া ছোট বেলার কতগুলো ছবি আছে। এখন আমার অনেক লজ্জা তাই……
– এই চুপ। কি বল এসব? আমি দেখছি দাও।

নাজিফা সবগুলো ছবিই দেখল। উল্টানো গুলোও। ঐ ছবিগুলো দেখার সময় নিলয় বার বার মুখ লুকিয়ে ফেলছিল। যেন কত লজ্জার একটা ঘটনা ঘটছে। সেদিনও রিকশা করে গেল একসাথে।পরদিনও ক্লাসে একসাথে বসল। এভাবে বেশ কয়েকদিন গেল। নিলয় প্রতিদিন সবার আগে এসে ক্লাসরুমের সামনে দাড়িয়ে থাকে। প্রতিদিন মজিদ চাচার নাতনির জন্য বেলুন নিয়ে আসে। নিলয় নাজিফাকে একসাথে দেখে ক্লাসের নানা জন নানান কথা বলে। ফুসফাস করে।এক ছেলে আর এক মেয়ে প্রতিদিন সবার থেকে আলাদা হয়ে নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে থাকছে। ব্যাপারটা অবশ্যই সবার কাছে ভাল লাগার কথা না। পৃথিবীর মানুষগুলো নিজের কাজ বাদে অন্য সবার কাজের মাঝে খুব সহজে খারাপ ঠিক খুঁজে বের করতে পারে।কাজটাকে খারাপ বানিয়ে দিতে পারে। যুক্তি তত্ত্বের অভাব হয় না।পিছনে বসে ফুছুর ফুছুর মানুষের জন্মগত অভ্যাস। পৃথিবীর অন্য প্রাণীগুলো তা করে কিনা জানা নেই। হয়ত করে না। তাইতো মানুষ আলাদা।নাজিফা নিজেও ব্যাপারটা বুঝতে পারছে।ও খুব নিলয় কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। এতো বন্ধু থাকতে শুধু নিলয়ের সাথেই সময় কাটাচ্ছে। নাজিফা এমন না। ভেবে চিন্তে দেখল, এমন থাকলে হবে না। নাজিফা নিলয়ের সাথে মিশছে ঠিকই।কিন্তু নিলয়ের মাঝে অস্বাভাবিক কিছু আছে।নিলয় ক্লাসে নাজিফা ছাড়া কারও সাথেই কথা বলতে চায় না।কারও সাথে কথা বলতে গেলেই, ঝগড়া বাঁধিয়ে দেয়। কারও সাথে কিছু হলে আবার নাজিফাই নিলয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলে। খুবই খারাপ অবস্থা। তাই সবাই যতটা সম্ভব নিলয় থেকে দূরে থাকে।আর নিলয় চায় নাজিফাও শুধু ওর সাথেই কথা বলুক। সময় কাটাক। এসব হাজারটা নিয়মে বাঁধার মত মেয়ে নাজিফা না।
—— —— —— ——–
পরদিন। নিলয় আজ ওর মায়ের কথা বলবে নাজিফাকে। কালই বলে দিয়েছে। আজ ওর মায়ের গল্প নাজিফাকে শুনাবে। তাই মায়ের অনেকগুলো ছবি নিয়ে এসেছে। ক্লাসে ঢুকে নাজিফা নিলয়কে দেখেও না দেখার ভান করে আশরাফের পাশে বসল। বসার পর আশরাফ বলল,
– কি রে? আজ কি হল? কাপলদের ঝগড়া নাকি? আজ আমাদের ভাগ্য খুলে গেল মনে হয়।
– ধ্যাৎ ।তোরা যে কি বলিস। জাস্ট ফ্রেন্ড আমরা।
– হ্যাঁ , আমারাও জানি জাস্ট ফ্রেন্ড। তাইতো বলে লোকে।

নিলয় এসে দাঁড়াল নাজিফা আর আশরাফের সামনে। চোখে মুখে প্রচণ্ড রাগি ভাব।
– কি হচ্ছে এসব? তুমি এখানে কেন? আমি ওখানে বসে আছি দেখো নায়?
– দেখেছি।
– তাহলে এই জায়গায় কি? এখানে বসছ কেন?
– তো কি করতে বল? প্রতিদিন তোমার সাথেই বসব? আমার আর কোন বন্ধু থাকবে না?
– না থাকবে না। আমি অন্য বন্ধু ছাড়া থাকতে পারলে। তুমি পারবে না কেন? আমার শুধু তুমিতে চললে তোমার চলবে না কেন?
– তুমি আর আমি এক না। তুমি যাও। আমি এখানেই বসব। আমি আর তোমার সাথে বসব না। সবাই আমাদের নিয়ে আজে বাজে কথা বলে। আমি যা করি নায়। তা নিয়ে কেউ বললে আমার ভাল লাগে না।
– কে বলে বাজে কথা? কি বলে?
– তুমি আর আমি নাকি প্রেম করি।
– কে বলছে এই কথা?

আশরাফ উঠে বলল,
– সত্যি কথা দোস্ত সবাই বলে।
– তুমি বলছ?
– সত্যি কথা। বলবই তো।

এরপরের ঘটনাটা খুবই অপ্রত্যাশিত। নিলয় আশরাফকে অকথ্য ভাষায় একটা গালি দিয়ে., মাথাটা ধরে অনেক জোরে টেবিলের উপর বারি মারল।প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে আশরাফ।মাথা ঘুরছে আশরাফের। মুখ দিয়ে কিছু বলার অবস্থায় নেই ও এখন। নিলয় নাজিফার হাত ধরে টেনে এনে বলল
– এখানে বস। কোথাও যাবে না। তুমি শুধু আমার সাথে বসবে। অন্য কারও সাথে বসলে তাকে খুন করে ফেলব। আমার জিনিস আমি অন্য কাউকে দিব না। তুমি আমার বন্ধু। অন্য কারও না। আমি তোমাকে আজ আমার আম্মুর গল্প শুনাব।
– আমি তোমার কোন কথা শুনব না। তুমি আশরাফকে মারলা কেন?
-আমার জিনিসে কেউ ভাগ বসালে আমি তাকে ছেড়ে দিব?

এর মধ্যেই ক্লাসের অন্যরা এসে নিলয় আর নাজিফাকে ঘিরে দাঁড়াল। এমন একটা ঘটনায় সবাই কিছু সময়ের জন্য হতবাক হয়ে গিয়েছিল। এতদিন অনেক চুপ থাকা হয়েছে। এক পাগল পাগলামি করে যাচ্ছে। আর সবাই মেনে নিচ্ছে। অনেক হয়েছে আর না। সিহাব নিলয়ের কাছে এসে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল
– কি পাইছিস তুই, হ্যাঁ? মাস্তানি করিস? মাস্তানি? খুব ভাব তোর। তুই আশরাফকে মারলি কেন? এতো সাহস থাকলে মার আমাকে। পাগলের ভাব ধরিস? একেবারে হাত পা ভেঙ্গে রাস্তায় বসিয়ে দিব।

সিহাব নাজিফার একটা হাত ধরে নিলয়ের সামনে নিয়ে আসল। এনে বলল
– নাজিফা, কি শুরু করছিস তোরা? এসবের কোন মানে হয়? একটা সাইকো পাগলামি করে যাচ্ছে। আর তুই তা মেনে নিচ্ছিস? তুই দেখছিস ও বাড়াবাড়ি করছে। তুই স্যারকে জানাতে পারতি।

নিলয় এবার রাগ চেপে রাখতে না পেরে সিহাবকে বলল
– নাজিফার হাতটা ছাড়। ঐ নাজিফার হাতটা ছেড়ে কথা বল। খারাপ হবে কিন্তু।
– কি খারাপ করবি তুই আমার? আমি আমার বন্ধুর হাত ধরব। আরও ধরব। ছাড়লাম না হাত।

নিলয় মোটামুটি লাফ দিয়ে সিহাবের উপর পড়ল। এলপাতারি কয়েকটা ঘুষি মারল। এর মধ্যে সবাই এসে দুজনকে দুই দিকে নিয়ে গেল। নাজিফা এক কোণে দাড়িয়ে আছে। কিছু বলছে না। ঘটনাটা ডিপার্টমেন্ট হেড পর্যন্ত পৌছাল। পরদিন নিলয়কে অভিবাবক সহ আসতে বলে দেয়া হয়েছে।

পরদিন। ডিপার্টমেন্ট হেডের রুমে নিলয় আর নিলয়ের বাবা। রুমের বাহিরে আশরাফ সিহাব আর কয়েকজন ক্লাসমেট দাঁড়ান। নাজিফার আসার কথা। কিন্তু আসে নি। হেড স্যার খুব কড়া কিছু কথা শুনিয়ে দিলেন নিলয়ের বাবাকে। তিনি বললেন
– আমাদের ভার্সিটির একটা রেপুটেশন আছে। আপনার ছেলের কারণে আমাদের কাছে কয়েকটা কমপ্লেইন এসেছে। আমাদের এখানে পলিটিকাল কোন ঝামেলা নেই। এমনিও কোন মারামারি হয় না।কিন্তু আপনার ছেলে কাল দুজনের সাথে মারামারি করেছে। এর আগেও কয়েকজন কমপ্লেইন করেছে। গতকালের কথা শুনে তো আমি অবাক। এই জিনিস নিয়ে আপনার ছেলে মারামারি করেছে!!!!! আপনার ছেলেকে আর আমাদের ভার্সিটিতে রাখা সম্ভব না। ওর নামে ইতিমধ্যেই অনেকেই কমপ্লেইন করেছে। ক্লাসের সবার সাথেই ওর মারামারি ঝগড়া।ভার্সিটিতে ভর্তির আগেই আমরা rules বলে দিয়েছিলাম। আপনার ছেলে rules break করেছে। তাই প্লিজ আপনার ছেলেকে অন্য কোথাও ভর্তি করিয়ে দিন। আর আপনার ছেলের মানসিক সমস্যা আছে। একজন ভাল সাইকোথেরাপিস্ট দেখান। নয়ত অন্য জায়গা থেকেও এভাবে চলে আসতে হবে।

নিলয় আর নিলয়ের বাবা কাগজ পত্র নিয়ে, কিছু না বলেই রুম থেকে বের হয়ে আসলেন। সিহাব আশারাফের সামনে গিয়ে বাবা নিলয়কে বললেন
– ফ্রেন্ডদের সরি বল।

নিলয় শান্ত ছেলের মত সরি বলে ,সামনে থেকে চলে আসল। নিলয় ওর বাবার হাত ধরে হাঁটছে। দেখে মনে হচ্ছে কোন বাচ্চা ছেলে ,তার বাবার হাত ধরে হাঁটছে। যে মাত্র হাঁটা শিখেছে। বাবা না ধরলে পরে যাবে। হোঁচট খাবে।
-বাবা, আমি ২ জনের সাথে একটু কথা বলব। বলে আসি?
– আচ্ছা যাও। তারাতারি চলে এস।আমাদের চলে যেতে হবে।
– আচ্ছা, বাবা। খেলনা গুলো আনিয়ে দাও কার থেকে।

নিলয়দের গাড়ির ড্রাইভার অনেক গুলো খেলনা নিয়ে আসল। খেলনা গুলো নিয়ে নিলয় মজিদ চাচার কাছে গেল। খেলনা গুলো দিয়ে বলল
– চাচা, আপনার নাতনির জন্য খেলনা এনেছি। আমি চলে যাচ্ছি। আর আসব না।আমাকে ভার্সিটি থেকে বের করে দিছে। এই খেলনা দেখলে আপনার নাতনি খুব খুশি হবে।
– বাবা, তুমি চইলা যাবে ক্যান? আমার খেলনা লাগব না। তুমি থাইকা যাও। আমি স্যাররে কইলে শুনবে। আমি স্যার এর পায়ে ধইরা কান্নাকাটি করমু। বাবা,তোমার মত সহজ সরল ছেলে আমি দেখি নায়। তোমার জন্য আমার ঘরে কয়েকটা দিন ধইরা কোন ঝগড়া ঝাটি নাই। বাপ রে একটা গরীব মানুষের এর থেইকা বেশি কিছু লাগে না। বাবা তুমি থাইকা যাও।

চোখ বেয়ে পানি পড়ছে মজিদ চাচার। এতো বয়স্ক একটা মানুষ কাঁদছে কত অসহায় ভাবে।
– চাচা, আপনি অনেক ভাল মানুষ। ভাল মানুষগুলো সবাইকে ভাল ভাবে। আমি ভাল না। সবার সাথে ঝগড়া হয় আমার। চাচা আপনাকে একটা গোপন কথা বলি। আমাকে যদি নাজিফা থেকে যেতে বলে। মরে গেলেও আমি কোথাও যাব না। চাচা আমি যাই। নাজিফার সাথে কথা বলে আসি।

নিলয় ক্লাসে গিয়ে নাজিফাকে খুঁজল। ও নেই। পরে কতক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর নাজিফাকে দেখল নিলয়। নাজিফা একটা শিমুল গাছের নিচে একা একা বসে আছে। পাশে ব্যাগ। নিলয় গিয়ে ব্যাগটা সরিয়ে রাখল। তারপর নাজিফার পাশে বসল। নাজিফার চোখের দিকে তাকাল। আনন্দ বা বেদনা কোনটাই চোখে নেই।
– নাজিফা, আমি চলে যাচ্ছি। আমাকে ভার্সিটি থেকে বের করে দিয়েছে।আমি জানতাম কালই। আমাকে বের করে দিবে। জাস্ট ফর্মালিটি হিসেবে আজ আসলাম। শোন না? আমি জানি আমি যা করছি একদমই উচিৎ হয় নি। আমি সত্যি আর এমন পাগলামি করব না। আমাকে একটা সুযোগ দাও না। প্লিজ আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। তুমি আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু। আমি সত্যি আর কখনও তোমাকে কারও সাথে কথা বলতে মানা করব না। কারও সাথে মারামারি করব না। আমার সাথে রিকশা করে যেতে হবে না। আমি শুধু তোমাকে দেখতে পারব। মাঝে মাঝে কথা বলব তাতেই হবে।আমি এতো ভাল বন্ধু কখনও পাব না।আমি তোমাকে আমার আম্মুর গল্প শুনাব। আমার আম্মুর ছবি দেখাবো। আমি হাত জোর করি তোমাকে। আমাকে তাড়িয়ে দিও না। তুমি আমাকে থাকতে বল। আমি থাকব। আমাকে কেউ এখান থেকে তাড়াতে পারবে না।আমি ভাল হয়ে যাব। আমি সাইকো না। আমি সুস্থ মানুষ। আমার কোন সমস্যা নেই। তুমি আমার পাশে থাক। আমাকে একটু সাপোর্ট দাও। আমি একদম ভাল হয়ে যাব। কোন পাগলামি করব না। নাজিফা তোমার এতো বন্ধু মাঝে…এই পাগল বন্ধুটাকে একটু রাখো, প্লিজ।

নিলয় হাউ মাউ করে কাঁদছে। নাজিফা চুপ করে আছে এখনও। কিছু বলছে না। নিলয় চোখ মুছে বলল
– নাজিফা, আমি চলে যাচ্ছি। আমাকে ডাক দিলে আমি ফিরে আসব। নয়ত আসব না।কখনও না।

নিলয় হেঁটে চলে গেল। অনেক আশা করে ছিল। হয়ত নাজিফা ডাক দিবে। কিন্তু ডাকেনি। নাজিফার কাছে ওর স্বাধীনতার দাম অনেক বেশি। জেদের দাম অনেক বেশি।

সেই চলে যাবার পর আর দেখা হয়নি নিলয়ের সাথে। সেদিন যেই জিনিসটাকে খুব দামি মনে হয়েছে। মূল্যবান মনে হয়েছে। একটা সময় যাবার পরই তা মূল্যহীন হয়ে গিয়েছে। একটা অপরাধ বোধ কাজ করেছে সবসময়। নিলয়ের মত হয়ে যাচ্ছে নাজিফা। কারও সাথেই কথা বলে না। একদম চুপচাপ থাকে। সেই চলে যাবার পর থেকে। এই একটা বছর অসম্ভব মিস করেছে নিলয়কে। নিলয় মাঝে মাঝে মেসেজ দেয়। নাজিফা এতো মিস করার পরও , কোন এক কারণে রিপ্লাই করে না। কিছু মানুষ নিজের আবেগ গুলোকে আটকে রাখতে পারে।অনুভুতি গুলোকে বেঁধে রাখতে পারে।কখনও প্রকাশ করতে চায় না। নাজিফা হয়ত তাদের দলে। নিলয় বন্ধু ভাবছে। নাজিফা হয়ত বেশি কিছু। তবুও আবেগ আটকে রাখছে। কিন্তু আজ আর পারছে না। নিলয়ের বাসায় যাবে আজ নাজিফা।নিলয়কে সব বলবে। ক্ষমা চাবে। শুধু বন্ধু না। সারাজীবনের জন্য ভালবাসার মানুষ হয়ে থাকবে নাজিফা। পাগলটাকে আর পাগলামি করতে দিবে না। একদিন নিলয়ের বাবা এসে নাজিফার সাথে কথা বলল। উনি সব বললেন। নিলয়ের মা মারা যাবার পর থেকে ও এমন অস্বাভাবিক আচরণ করত। মা ছিল ওর সবচেয়ে কাছের মানুষ। সেই মানুষটাকে হারিয়ে। পৃথিবীর সব হারিয়ে ফেলেছে ভেবছিল। সবসময় একা থাকা ছেলেটা, নাজিফাকে পেয়ে আবার ভেবেছিল, কাছের মানুষটাকে ফিরে পেয়েছে। আর নাজিফা কিনা এমন করল। এ জন্যই বার বার ওর মায়ের কথা, বলতে চাচ্ছিল। নাজিফার একদম উচিৎ হয় নি এমন করা। আজ সব কিছু বদলে যাবে। নিলয় আবার ওর কাছের মানুষটাকে ফিরে পাবে। আর নাজিফাও শান্তি পাবে। ভালবাসা পাবে। কাছের মানুষ পাবে। নাজিফা খুব খুশি। আজ অন্যরকম কিছু হবে। নিলয়দের বাসা থেকে একটু দূরে থাকতেই একটা মেসেজ আসল। নিলয় দিয়েছে।
-” জানো, বুকের বুকের বাম পাশটায় খুব ব্যথা করছে। তুমি চলে যাবার পর থেকেই এমন হচ্ছে। বুকে ব্যথা হতেই পারে। আর আমিও কি পাগল!!! এর সাথে তোমার চলে যাবার সম্পর্ক খুঁজছি। আসলে বেশ কয়েকদিন ধরেই হচ্ছে। ডাক্তার দেখালেই ঠিক হয়ে যাবে। সময় করে যাওয়া হচ্ছে না। জানো চোখ দিয়েও পানি পড়ে ইদানীং। অকারণেই। দেখো এর সাথেও তোমাকে হারানোর সম্পর্ক খুঁজবো। একটু পরেই। আসলে কিন্তু তা না। সব আমার পাগলামি। সাইকো মানুষের মনের ভাবনা। ডাক্তার দেখালেই ঠিক হয়ে যাবে। তোমার জন্য আমার একদমই কষ্ট হয় না। কষ্ট হলে তো কাঁদব। আমি কাঁদি না। কাঁদব কেন? তুমি আমার কেউ না। আর মাঝে মাঝে চোখ দিয়ে পানি পড়া ভাল। চোখ ভাল থাকে। ”
নাজিফা কিছু সময়ের জন্য চুপ হয়ে গেল। চুপচাপ দাড়িয়ে রইল। নিজেকে কত ছোট মনে হচ্ছে। খুব তারাতারি সিদ্ধান্ত বদলে ফেলল। নিলয়ের বাড়ির দিকে না গিয়ে , উল্টা চলা শুরু করল। নিলয় এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। এখন ও একা থাকতে পারে। আমি না থাকলে কিছুই হবে না ওর। আমি ওর কেউ না। ডাক্তারের কাছে গেলেই ওর সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। আমাকে দরকার নেই। আমার জন্য ওর কোন কষ্ট হয় না। থাকুক ভাল। আর ও একটা সাইকো। কেন শুধু শুধু নিজের জীবনের সাথে একটা সাইকোর সাথে জড়াব? নাজিফা ভাবতে ভাবতেই চলছে। হয়ত বা ভালবাসা নয়ত বা কিছুই না, পিছনে ফেলে আসছে। কিন্তু বুকের বাম পাশটায় খুব ব্যথা করছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। টপ টপ করে। ও কিছু না। ডাক্তারের কাছে গেলেই ঠিক হয়ে যাবে। আর মাঝে মাঝে চোখ দিয়ে পানি পড়া ভাল। চোখ ভাল থাকে।

– রিয়াদুল ইসলাম ( শেষ রাতের আঁধার)

৪ thoughts on “হয়ত বা ভালবাসা ,নয়ত বা না

  1. অনেক বড় লেখা- তবু ধৈর্য ধরে
    অনেক বড় লেখা- তবু ধৈর্য ধরে পড়লাম।

    ইমোশনটা অনেক বেশি। যদিও প্রাঞ্জলতার একটু ঘাটতি ছিল… সব মিলিয়ে খারাপ লাগেনি।
    সমাজের অস্বাভাবিক ব্যপারগুলো আমরা খুব কমই স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারি। অথচ এমন অনেক অস্বাভাবিকতাই ঘটে রোজ আমাদের চারপাশে…

    লিখতে থাকুন। শুভকামনা রইলো… :ফুল:

    1. ধন্যবাদ। আবার অনেকদিন পর লেখা
      ধন্যবাদ। আবার অনেকদিন পর লেখা দিলাম। এমন বিষয় নিয়ে লেখার অভ্যাস নেই তো, তাই একটু ঘুলিয়ে পাকিয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *