মৃত্যু উপলব্ধি

এইতো সেদিনের কথা ,খুব বেশীদিন আগের কথা নয় ,আমি তখন অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী।তারপরে ও কম করে হলেও দশ বছর।শুনেই হয়তো আত্কে উঠছেন!!!বলে কি এই মেয়ে , দশ টি বছর সেদিনের কথা !একটি নয় দুটি নয়,দশ দশটি বছর ,বাপরে বাপ …..
যতই মনে হোক না কেন,তারপরও আমি বলবো সেদিনের কথা।লেখাটা লেখার সময় স্মৃতি গুলো এতো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল ,মনে হচ্ছিল দশ দিন আগেই আমি অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরু করলাম।

এইতো সেদিনের কথা ,খুব বেশীদিন আগের কথা নয় ,আমি তখন অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী।তারপরে ও কম করে হলেও দশ বছর।শুনেই হয়তো আত্কে উঠছেন!!!বলে কি এই মেয়ে , দশ টি বছর সেদিনের কথা !একটি নয় দুটি নয়,দশ দশটি বছর ,বাপরে বাপ …..
যতই মনে হোক না কেন,তারপরও আমি বলবো সেদিনের কথা।লেখাটা লেখার সময় স্মৃতি গুলো এতো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল ,মনে হচ্ছিল দশ দিন আগেই আমি অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরু করলাম।
খুব স্পষ্ট করে না বলতে পারলেও বোধ করি আমার সবচেয়ে ছোট বোন সবে ক্লাস নাইন এ উঠলো।আমাদের ছয় ভাইবোনদের মধ্যে আমার এই পিচ্চি বোনটাকে একটু ব্যতিক্রমী মনে হয়। দৈনন্দিন জীবনের এমন অনেক ঘটনা আছে যে গুলো আর দশটা সাধারণের কাছে খুবই সাধারণ।কিন্তু আমার পিচ্চি বোনের পিচ্চি মস্তিস্ক সেই সাধারণ ঘটনাগুলোর মাঝে কোথা থেকে যেন অসাধারণ অর্থ খুঁজে পেত।সেই অর্থবহ অর্থ গুলোর বিশ্লেষন যখন ওর মুখ থেকে শুনতাম নিজের চোখগুলো তখন বিস্ময়ে ভারাক্রান্ত তো হতোই উল্টো নিজের মস্তিস্কের কাছে কেমন জানো একটা লজ্জাবোধ কাজ করতো।
আমি বা আমার ছোট বোন দুজনের সময়টা তখন ছিলো অনেকটা সুকান্ত ভট্টাচার্যের আঠারোর কঠিন সময়ের মত।জীবনের সাধারণ ঘটনা গুলো আঠারোর চোখ দিয়ে বিশ্লেষণ করলে অর্থবহ হয়ে উঠতে বাধ্য ।সেইরকম সাধারণ কিন্তু অর্থবহ একটা ঘটনা আজ কেন জানো মনকে খুব জানান দিচ্ছে …..
কৃত্তিম পদ্ধতিতে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানো ফার্মের মুরগী গুলো তখন সবে বাজারে উঠেছে।আশেপাশের অনেক বাড়িতেই দেখতাম,একটা দুইটা চার /পাচদিনের বাচ্চা গুলো কিনে লালন পালন করতো।তাদেরটা দেখে , একদিন আমার ছোটো বোন ও সেইরকম একটা চার /পাচদিন বয়সী বাচ্চা দশ টাকা দিয়ে কিনে আনলো।অনেকেই হয়তো জেনে থাকবেন,এই মুরগীর বাচ্চা গুলো দেখতে যেমন খুব সুন্দর তেমনি ওদের সারা গায়ের তুল তুল নরম পশম গুলো এতো বেশি মোলায়েম সাধারণ মানুষ তো দূরে থাক সুচিবায়ো গ্রস্ত রোগী ও ওদের আদর করতে বাধ্য।মুরগীর গন্ধের জন্য ছোট বেলা থেকেই মুরগীর মাংসের প্রতি আমার কেমন যেন একটা ঘি ঘি রুচি কাজ করতো।কিন্তু এতসব বাজে অনুভতিও আমাকে ওই গুগলি মুরগির বাচ্চাটাকে আদর করা থেকে দুরে রাখতে পারতো না।ওর সব কিছুই আমর ভালো লাগত , গুটি গুটি পায়ে সারাঘরে দৌড়ানো ,মাঝে মাঝে পুট করে শান্তিতে প্রাকৃতিক কর্ম করে দেয়া সব সবই ভালো লাগতো শুধু একটা জিনিস ছাড়া ……যখনি ওকে কোলে নিয়ে আদর করতাম ,বেশির ভাগ সময় দেখা যেত ও পানি ভর্তি পায়খানা আমার শরীরের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে দে ছুট …….প্রথম প্রথম কিছুই বুঝতাম না কারণ ঐটুকু মুরগির পানি ভর্তি পায়খানার পরিমান যতটুকু ছিল সেটা আমার জামার কাপড়-ই শুষে নিত।টের পেতাম তখন যখন সেই শুকনা কড় কড়া পায়খানা থেকে গন্ধ বের হতো …….
এভাবে আমাদের মুরগির বাচ্চাটা দিনে দিনে বেশ নাদুস নুদুস হয়ে বড় হয়ে উঠছিলো।যেহেতু এক মাস বয়সী একটা বাচ্চা তাই যুতসই একটা নামও দেয়া হলো।ভাবছেন নামটা আমি দিয়েছি ….সেইরকম কোনো সুযোগ ছিলো না।অনেক কষ্টে অর্জিত নগদ দশটি টাকার বিনিময়ে যে এই বাচ্চাটির মালিক হয়েছিলো ,আমার সেই ছোট বোন তখনকার সময়ের বিটিভির জনপ্রিয় সিরিয়াল নুরজাহানের নাম অনুসারে ওর নাম রেখেছিল “গুলহান “.
সিরিয়ালের সেই নুরজাহান গরিব ঘরের মেয়ে কিন্তু সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে আভিজাত্যের সাধ পেয়েছিল।আমাদের গুলহান ও তেমনি, গরীব পোল্ট্রি ফার্মে জন্ম গ্রহণ করেও ছোট বোনের প্রেমের কল্যাণে আভিজাত্যের সাধ পেয়েছিল।ওর থাকার জন্য আমার একমাত্র সযতনে তুলে রাখা জুতা খানি যে নতুন চকচকে বাক্সে রাখা হয়েছিল সেটাকে অনাব্রু করে দিয়ে বিনাঅনুমতিতে দখল করেছিল গুলহানের সত্তাধিকারী। তার মধ্যে আবার আয়েশ করে ঘুমানোর জন্য আমার ব্যবহৃত জামা অনেকটা কেদারার মতো করে সাজিয়ে দিয়েছিলো।শুধু তাই না, ওর পানি খাওয়ার জন্য সদ্য হোমিও প্যাথের দোকান থেকে ওষুধের সাথে পাওয়া ড্রপার টাও সযত্নে তুলে রেখেছিল আমার বোন।
প্রতি সপ্তাহে গোসলের জন্য আলমারিতে লুকিয়ে রাখা দামী ভাটিকা শেম্পু টাও যথাসময়ে ঠিকই বের করে ফেলতো।এভাবে দখল দারিত্বে ভালোই চলছিল গুলহানের জীবন যাপন।নুরজাহান সাথে যেমন জাহাঙ্গীরের অবৈধ প্রেমলীলা চলত ঠিক তেমনি আমাদের পরিবারের সবার সাথে গুলহানেরও অবৈধ লীলাখেলা চলতো।অবৈধ বলছি একারণে গুলহান কে কেনার জন্য দশটি টাকা যে খরচ করেছিল সেই ছিল গুলহানের প্রকৃত মালিক।তাই প্রকৃত মালিকের অনুমতি ছাড়া গুলহান কে আমরা খুব কম সময়ই কাছে পেতাম।

এভাবেই চলে যাচ্ছিল ,বাদ সাধলো একদিন হঠাত করে গুলহানের হলুদ পানি মিশ্রিত সাদা এক টুকরো পায়খানা।এ পায়খানা করার পর থেকেই গুলহান কেমন যান নেতিয়ে পরেছিল,আগের মত খুত ছিটিয়ে দিলে খায় না,গুলহান বললেও দৌড়ে আসে না।এক জায়গায় চুপ করে বসে থাকে।আস্তে আস্তে পায়খানার পরিমান ও বাড়তে থাকলো আর শরীরের শক্তিও কমে যেতে লাগলো।উপায়ন্তর না দেখে আমাদের জ্জরের জন্য রাখা হলুদ রঙের প্রচন্ড তিতো ওষুধের অর্ধেকটা ওকে পানিতে গুলে খাইয়ে দিলাম।তাতে কাজের কাজ যেটা হলো ,আগে গুলহানের মাথা কাপতো না এখন মাথা প্রতি সেকেন্ডে ঘড়ির সেকেন্ডের কাটার চেয়েও দ্রুত বেগে চলতে লাগলো।পাঠক রোগের বর্ণনা শুনে এতক্ষণে নিশ্চয় টের পেয়ে গিয়েছেন , আমাদের গুলহানেরও মরণ কামর রানী ক্ষেত হয়েছিল।
তবে গুলহানকে কে খুব বেশিদিন ভুগতে হয়নি, তৃতীয় দিনের মাথায় গুলহানের মাথার কাপুনি সেকেন্ডের কাটার তিন গুন বেশি বেগে চলতে থাকা মাথাটা নুইয়ে পড়েছিল। গতানুগতিক ভাবে যা হয় ,একদিন তাই হলো ,বেশির ভাগ পশুপাখি যেমন মরার সময় হা করে মরে পরে থাকে আমাদের গুলহান ও তেমনি হা করে ওর সম্রাজ্যে মরে পরেছিল।শুনলে অবাক হবেন যে গুলহানের সাথে অবৈধ প্রেমের জন্য মালিকের কাছে এত আকুতি, সে গুলহান মারা যাবার পর আমার কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই।আজব মানুষের মন।
তবে প্রত্রিক্রিয়া হয়েছিল ওর সত্যিকারের মালিকের।আমি সেদিন সত্যি অবাক হয়ে ভাবছিলাম একটা মুরগীর বাচ্চার জন্য এত কাদার কি আছে ?আমি অষ্টম আশ্চর্য আবিস্কারের মত অবাক নয়নে সত্যিকারের মালিকের নয়নের প্রবাহিত জলধারা দেখছিলাম।

পাঠক ঘটনা সবে শুরু ….জানি খুব বিরক্তিকর ভাবে বকছি …..তবু আজ মন খুব চাইছে পুরোটা বকে যেতে ……
বলে রাখা ভালো ,গুলহানের সেই সত্যিকারের মালিকের গানের গলা খুব চমত্কার ,প্রতিদিন খুব ভোরে উঠে রেওয়াজ করা ওর নিত্যদিনের অভ্যাস।আমাদের চার বোনের জন্য বরাদ্দকৃত ছোট একটি রুমে বিশালকায় গণ খাটের কারণে রুমে অবশিষ্ট কোনো জায়গা ছিল না।তাই বাধ্য হয়ে আমার বোনকে ঘুম থেকে উঠার পর বিছানায় ওর জায়গাটুকুতে হারমোনিয়াম পেতেই গান করতে হত।তবে গান যতই সুরেলা হোক না কেন ,ঘুম ঘুম চোখে সেই সুরেলা কন্ঠ বানরের হেরে গলার ডাকের মত লাগত।অনেক কষ্টে বালিশ কানে চেপে ধরে বাকি ঘুমটা পুষিয়ে নিতাম।
প্রতিদিনের মত সেদিনও আমি কানে বালিশ চেপে ঘুমাচ্ছিলাম ……………..হঠাত করে শুনতে পেলাম কে যেন দূর থেকে খুব পবিত্র কন্ঠে আমাকে আহবান করছে ….ঘুমের ঘোরে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম সেই কন্ঠ আমাকে ইশারা নয় আহবান করছে ……….পবিত্র কন্ঠ গেয়ে উঠছে
উঠ তুমো জাগো
রেনু সাবেরা
ভোলাকা পানশী শুনো
আজান ও বোকারা
আল্লাহু আকবার তাকদীর শুনো তুম
আসসালাতু খায়রুম মিনান্নার ……….
এটা একটা উর্দু রাগ।অর্থ হচ্ছে (জেগে উঠ ,দেখো ভোর হয়েছে,আজান হচ্ছে ,আল্লাহু আকবার ডাক কি শুনতে পাচ্ছ না )
সত্যি বলতে এ রাগটা ঘুমের ঘোরে প্রতিদিনই শুনতাম,কিন্তু সেদিন গানটা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম।গানটা শোনা মাত্র নিজেকে কেমন যানো খুব পবিত্র মনে হচ্ছিল আবার খুব পাপী ও মনে হচ্ছিল।যা হোক সেদিনের পর আমি আর আমার ছোট বোনকে গান করতে দেখি নি ।কারণ গুলহানের মিত্যুর কিছুদিন পর পরই আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ একজন আন্টি ব্রেস্ট ক্যন্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।সেই মৃত্য টাও ও নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছিলো।বাসায় এসে বার বার করে বলছিলো “আন্টির রানী ক্ষেত হয়েছে আর বাচবে না “পর পর এ দুটি মৃত্যু কে আমরা সাধারনেরা একটি মুরগীর মৃত্যু আর একজন ঘনিষ্ঠ আত্তীয়ের মৃত্যু হিসেবেই দেখবো।
শুরুতেই বলেছিলাম আঠারো বছরের চিন্তা সাধারণ চিন্তার মত নয়,সাধারণ কে অসাধারণ ভাবে চিন্তা করাই আঠারোর কাজ।
এই দুটি মৃত্যুও কে আমার ছোট বোন শুধু মৃত্যুও হিসেবে নেয়নি বরং মৃত্যু উপলব্ধি হিসেবে নিয়েছিল …..আর সেই উপলব্ধির পর থেকে সৃষ্টিকর্তার দেয়া সুরেলা কন্ঠ স্বর থেকে আর সুর বের হয়নি ………………….

১৪ thoughts on “মৃত্যু উপলব্ধি

  1. হুম …..তবে কি জানেন প্রিয়
    হুম …..তবে কি জানেন প্রিয় হারাতে হারাতে এমনও অনুভতি হয় যখন আর হারানোর কোনো ভয় থাকে না ….

    1. একদম আমার জীবনের বর্তমান
      একদম আমার জীবনের বর্তমান অবস্থার কথা বললেন।
      যার হারানোর ভয় থাকে না অনেক সময় সে হয়ত এমন কিছু অর্জন করে যা উপভোগ করার আর কোন ইচ্ছা বা আগ্রহ থাকে না।

      1. তারপরও জীবন চলে কিংবা চালিয়ে
        তারপরও জীবন চলে কিংবা চালিয়ে নিতে হয়।একসময় সেই হারানো অনুভতি গুলো ও ফিরে আসতে শুরু করে ….অদ্ভুত এই জীবন নামের খেলা ……

  2. জানেন আমাদের পোষা কুকুরটা দু
    জানেন আমাদের পোষা কুকুরটা দু মাস আগে আমার জন্মদিনের দিনই মারা গিয়েছিল,
    আমাদের পরিবারের আমার বাবা পাষন্ডটা ছাড়া সবাই কেঁদেছিল.
    সম্ভবত বেশি কান্না করেছি আমি নিজেই যেহেতু ওর দেখাশোনা,অসুস্থকালীন সেবাটা বেশি আমিই দিয়েছিলাম.
    দুইবার মরণ থেকে ফেরত পেয়েছিলাম ওকে কিন্তু তৃতীয়বার আর হয়নি.
    রমজানে আমরা দুই ভাই বাড়িতে যাওয়ার পর ও খাবার নেয়া বন্ধ করে দেয়!

    রোগ নির্ণয় করতে পারিনি আগের মত, অতঃপর বেশ কয়েকদিন ভুগে বিদায় নেয় জুবি.

    কিন্তু আমার কেমন জানি মনে হয় ও মরেনি আর ওর কলারটা আমি তাই বিছানার ওপর রাখি :ফেরেশতা:

    1. আপনি আপনার বাবা কে জুবির জন্য
      আপনি আপনার বাবা কে জুবির জন্য কান্না না করায় পাসন্ড বলছেন ….!!! অনেকেই আছে যারা মুখে হাসি ফুটিয়েও অন্তর দিয়ে ঠিকই উপলব্দি করে।এ ধরনের মানুষেরা হয়তো নিজের ইমোশনটা কারো কাছে দেখাতে চায় না কিংবা দেখাতে পারে না।

      “ওর কলারটা আমি তাই বিছানার ওপর রাখি” এ কথাটার মানে বুঝলাম না ……বুঝিয়ে দেন

  3. হুম। ছোটবেলায় আমার পোষা ময়না
    হুম। ছোটবেলায় আমার পোষা ময়না পাখিটার কথা মনে করিয়ে দিলেন। এখনো খুব মন খারাপ হয়। আমার নাম ধরে ডাকতে পারতো পাখিটা।

    1. আমারও খুব শখ একটা কথা বলা
      আমারও খুব শখ একটা কথা বলা ময়না পাখির …….যদি কখনও আমার এ শখ টা পূরণ হয় তবে আমি ওর নাম রাখবো “ইলেকট্রন”.

Leave a Reply to তারানণুম তারা Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *