রক্তিম

এক –
বাম বুকে গুলিটা লাগলো । রিসাত তার দুই হাত দিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরলো । তার সারা শরীর কুঁকড়ে আসছিল । আস্তে আস্তে বসে পড়লেন তিনি । হঠাৎ করে তার ঠোঁটের এক পাশে কিঞ্চিত হাসি দেখা গেলো । তা উক্ত জায়গায় উপস্থিত কারোরই চোখ ফাঁকি দিলো না । যেন সবাইকে দেখানোর জন্যই । রশিদ সাহেবের বুকের উপরে চাপানো পাথরটা সরে গেলো যেন আর মাথার উপরে থাকা পাহাড়টা যেন হঠাৎ করেই গলে পড়ে গেলো । শুধু তার নয় উক্ত এলাকার সবার মনে যেন আজ একটি শান্তির হাওয়া বয়ে গেলো ।
দুই –

এক –
বাম বুকে গুলিটা লাগলো । রিসাত তার দুই হাত দিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরলো । তার সারা শরীর কুঁকড়ে আসছিল । আস্তে আস্তে বসে পড়লেন তিনি । হঠাৎ করে তার ঠোঁটের এক পাশে কিঞ্চিত হাসি দেখা গেলো । তা উক্ত জায়গায় উপস্থিত কারোরই চোখ ফাঁকি দিলো না । যেন সবাইকে দেখানোর জন্যই । রশিদ সাহেবের বুকের উপরে চাপানো পাথরটা সরে গেলো যেন আর মাথার উপরে থাকা পাহাড়টা যেন হঠাৎ করেই গলে পড়ে গেলো । শুধু তার নয় উক্ত এলাকার সবার মনে যেন আজ একটি শান্তির হাওয়া বয়ে গেলো ।
দুই –
পুরো নাম মোহাম্মাদ রিসাত উদ্দিন । গনিতের উপর পড়াশোনা শেষ করে একটি প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকতা করেন । একা থাকেন কাটাসুরের একটি বাড়ির এক তলায় এক রুমের বাসায় ।
স্কুলের ক্লাস শুরু হয় সকাল আঁটটায় । রিসাত বের হয় সাড়ে সাতটায় । হেঁটে হেঁটে যান । স্কুল লালমাটিয়ায় ।
নতুন নিয়োগ হওয়ায় এখন শুধু সিক্স , সেভেন আর ক্লাস এইটের গণিত ক্লাস নেন । পরবর্তীতে নাইন টেনের ক্লাস নিতে পারবেন বলে তাকে বলা হয়েছে ।
স্কুলে প্রত্যেক স্যারের একটা নাম দেয় ছাত্ররা । তারও একটা নাম আছে । তাকে ছাত্ররা ‘ সিদে ‘ নামে ডাকে । তার চরিত্র ‘ সাদাসিধে ‘ এই জন্য প্রথম অক্ষর আর শেষের অক্ষর নিয়ে শর্টকার্টে তাকে ‘ সিধে ‘ ডাকে । বিষয়টা রিসাত জানে । তবুও না জানার ভান করে থাকে । কারণ নামটা তার ভালো লেগেছে । অন্যান্য স্যারদের নাম বড়ই ভয়াবহ ।
তিন –
একদিন ছুটির দিন বাসায় বসে পেপার পড়ছিলেন । পাশের বাসার দুলাল সাহেব রুমে আসলো ।
” রিসাত সাহেব কি ব্যস্ত নাকি ? ”
” না । পেপার পড়ছিলাম আর কি । ”
” তা একটু সাহায্য করতে পারবেন ? ”
” কেমন সাহায্য বলেন ? পারলে করে দেই । ”
” তেমন কিছু না । কিছু মুরগি কিনে এনেছি । বুয়াটা আজকে আসে নি এখনও তো দুপুরে রাঁধবে । এখন একটা একটু জবাই করতে হবে । গিন্নি আবার রক্ত ভয় পায় । না হলে আপনাকে বিরক্ত করতে আসতাম না । ”
” বাজার থেকে কেটে আনলেই পারতেন । ”
” ওরা কীভাবে না কীভাবে কাটে । মনের ভিতর খুত খুত থেকেই যায় । এই জন্য বাসায় করি । কি পারবেন ? ”
” চলেন । ”
” ধন্যবাদ । ”
মুরগি ধরার দায়িত্ব পড়লো রিসাত সাহেবের উপর । দুলাল সাহেব যখন ছুরি মুরগির গলার উপর দিয়ে চালিয়ে দিলেন । তখন মুরগির গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো । সাথে ছিল একটি ঘ্রাণ ।
রিসাত সাহেব রক্তের প্রবাহ দেখতে থাকলেন । আর এমন একটা ঘ্রাণ তিনি নাকে পেলেন যেটি এর আগে কোনদিন তিনি পান নি ।
ঐ ঘটনার পর তিনি প্রায়ই টাওন হলের বাজারে যেতেন যেখানে মুরগি , হাঁস জবাই করা হয় । ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হওয়া দেখতেন । আর সেই ঘ্রাণ নিতেন ।
এক পর্যায়ে এটি নেশা হয়ে গেলো । এই রকম দৃশ্য না দেখলে আর ঐ ঘ্রাণ না নিলে তিনি স্বাভাবিক থাকতে পারতেন না ।
আর একটা জিনিসের নেশা এক পর্যায়ে তার তেজ হারায় ।
রিসাত সাহেবের আর ঐ দৃশ্য আর ঐ ঘ্রাণে এক পর্যায়ে পুষালো না ।
তিনি এরপর থেকে রাতে বের হয়ে কারওয়ান বাজারে যেতেন । যেখানে শত শত গরু জবাই করা হয় । এতে তিনি শান্তি পেলেন । রক্তের পরিমাণ ঢের বেশি । আর আরেক ধরনের ঘ্রাণ তিনি পেতে লাগলেন । এ যেন আলাদা অনুভূতি ।
এই কারণে তার ক্লাস নেয়ার উপর কোন প্রভাব পড়তে লাগলো না । তিনি স্বাভাবিকভাবেই জীবন যাপন করতে লাগলেন ।
তবে এই নেশাও একদিন উবে গেলো । আরও নতুন কিছুর সন্ধানে মন ও শরীর উভয়ই আনচান হয়ে উঠলো ।
তিন –
খবরের কাগজ সকাল সাতটার দিকে দিয়ে যায় । চা খেতে খেতে খবরের কাগজের উপর চোখ বুলাতে থাকেন ।
সেদিন খবরের কাগজের প্রথম পাতায় একটি লাশের ছবি দেখলেন । ছবিটা দেখে একটি চিন্তা তার মাথায় খেলো গেলো । চিন্তাটা আসতেই তিনি ঘাবড়ে গেলেন । চা পুরো না খেয়ে পেপার না গুছিয়ে কোন রকম দরজা তালা দিয়ে তিনি বের হয়ে গেলেন স্কুলের জন্য ।
এই দিন তিনি ঠিক মতো ক্লাস নিতে পারলেন না । স্কুলের হেডমাষ্টার রতন সাহেব তাকে বললেন ,” ছুটি তো নেন না একদিনও । টানা ক্লাস করাতে করাতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন । এইবার একেবারে সাতদিনের ছুটি নেন । ”
রিসাত সাহেবও সাই দিলেন । এরপর ছুটি চেয়েএকটি দরখাস্ত লিখে দিলেন । আর সাথে সাথেই অনুমদিত হয়ে গেলো ।
বাসায় এসে গোসল আর খাওয়া দাওয়া সেরে তিনি চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন । কিন্তু সকালের সেই চিন্তাটা তার মাথায় এসে ঘোরা ঘুরি করতে লাগলো । ভয় আর সেই কাজ করার প্রতি এক দ্বিমুখী আকর্ষণ অনুভব করলেন । প্রতিটাই প্রচুর প্রবল ।
এই অবস্থা আর সহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না । তিনি আবার গোসল করার জন্য বাথরুমে গেলেন । অনেকক্ষণ ধরে গোসল করলেন । এই চিন্তা থেকে কিন্তু তিনি মুক্তি পান নি ।
ক্লান্ত হয়ে এক পর্যায়ে ভেজা শরীর নিয়েই বিছানায় তিনি শুয়ে পড়লেন । ঘুম ভাঙল রাত এগারোটার দিকে । আবার সেই চিন্তা ।
” এখন মানুষের গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হওয়ার দৃশ্য দেখার পালা । সেই রক্তের ঘ্রাণ দেয়ার পালা । ”
এই চিন্তা থেকে একটুর জন্য হলেও মুক্তির জন্য তিনি ব্লেড দিয়ে নিজের আঙ্গুলের উপর কেটে ফেললেন , সেই ঘ্রাণ নিয়ে মাথাকে ঠান্ডা করার জন্য । অল্প সময়ের রসদ জোগাল সেটি । কারণ পরিমাণ কম ।
শরীর আর মানতে চাইল না । পশুর মতো আচরণ শুরু করলো । একটি ছুরি পাঞ্জাবির পকেটে গুঁজে দরজা বন্ধ করে রওনা হলেন ।
রাস্তায় রাস্তায় হাটতে লাগলেন । তার খোঁজ একজন মানুষ শুধু আর আশে পাশে কিছুই থাকবে না । কিন্তু যে জায়গায় কোন গাড়ি নেই সেই জায়গায় কোন মানুষই নেই আবার যে জায়গায় আছে দুটোই আছে । মিলছে না ।
হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন রাত একটা বাজে । দূরে একজনকে দেখতে পেলেন তখন তিনি । শরীর যেন অনেকদিন ধরে খুদার্ত । এমন আচরণ করে উঠলো ।
আশে পাশে তেমন কিছুই নেই । এই রকম সুযোগ আর হয়তো পাওয়া যাবে না ।
মানুষটা কাছে আসার পড়ে বুঝা গেলো লোকটা বেশ বয়স্কই । এতো রাতে রাস্তায় কি করছে ?
এরপর রিসাত সাহেব চিন্তা করলেন তাতে তার কি ? তাকে আগে তার শরীর ঠাণ্ডা করতে হবে ।
রিসাত সাহেব দৌড়ে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে ফেলে দিলেন । শক্ত করে বাম হাত দিয়ে মুখটা চেপে ধরলেন আর ডান হাত দিয়ে ডান পকেটের ছুরিটা বের করে গলার উপর চালিয়ে দিলেন । ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো । তিনি রক্ত দেখতে থাকলেন । কি সুন্দর রক্ত । কি তার ঘ্রাণ ।
অপূর্ব । অপূর্ব । এর থেকে সুন্দর আর কি হতে পারে ?
তার শরীর ঠাণ্ডা হল । নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ যেন বুঝে পেলেন । এরপর তিনি দেখতে পেলেন সেই লোকটি আর কেউ নন তার স্কুলের হেডমাস্টার রতন সাহেব ।

রিসাত সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন । এ তিনি কি করলেন ? তবে তার তৃপ্তি এর পরিমাণও কম ছিল না । ছিল নতুন নেশার উম্মাদনা , ছিল সুখ খুঁজে পাওয়ার শান্তি ।
তিনি শিক্ষক মানুষ বলে পকেটে কাগজ কলম থাকে । তিনি ছোট একটি কাগজ বের করলেন । এরপর লিখলেন ,
” এ যেন এক নতুন প্রাপ্তি ,
নতুন রক্তের ঘ্রাণ ,
নতুন রক্তের রং । ”
কি জন্য লিখলেন তিনি নিজেও ঠিক বুঝতে পারলেন না । তবে মনে হয় মুহূর্তের কথা একটু লিখে রাখা । তিনি কাগজটি লাশের পাশে রেখে চলে গেলেন । জামায় বেশখানিকটা রক্ত লেগে ছিল ।
রাত গভীর । মানুষ নেই বললেই চলে । তাই একটু কম চিন্তা মাথায় নিয়েই রিসাত সাহেব হেঁটে বাসায় বলে এলেন । কেউ তাকে দেখে নি । তিনি জামা ছেড়ে তখনই ধুয়ে দিলেন । পরের দিন তো আর স্কুলে যাওয়া লাগবে না তিনি ছুটি নিয়েছেন আগেই । শরীরে লেগে থাকা রক্ত পরিষ্কার করে তিনি শুয়ে পড়লেন । এই রকম ঘুম যেন আগে কখনো তিনি ঘুমান নি । শান্তির ঘুম । মাথায় কোন প্রকার চিন্তার অস্তিত্ব নেই । শুধুই তিনি আর ঘুম পরস্পরকে জড়িয়ে রয়েছেন । একজন যেন অপরজনকে বহুদিন পড়ে পেলো । কি সেই ক্ষণ । কি সেই মিলন ।
তিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না বলে তাকে তার বাসায় এসে হেডমাস্টার সাহেবের মৃত্যুর খবর দিয়ে যায় গণিত বিভাগের আরেকজন শিক্ষক নাম রিয়াজ ।
” লোকটার কোন দুশমন তো ছিল না । ছাত্রদের সাথে রাগারাগি বেশি করতেন মানলাম । কিন্তু কোন ছাত্রর পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব না । আর তিনি যে রাতে বের হয়েছেন এই খবরই বা পাবে কীভাবে ? ”
” হুম । ‘
” আমি নিশ্চিত পরিবারের কেউ ই এই কাজ করেছে । বাসা থেকে যেই বের হয়েছে লোক লাগিয়ে মেরে ফেলেছে । গ্রামে নাকি বেশ জমি জমা আছে । তবে পুলিশ বলছে কাজটা কোন অদক্ষ লোকের করা । ”
” হুম । ”
” আপনার মনে হয় এখনও ঘুমের ঘোর কাটে নি । আর ঐ যে পুলিশ টাকা দিলেই বলবে আপনি খুন করেছেন । ”
রিসাত বেশ ভয় পেয়ে কেঁপে উঠলো । রিয়াজ সাহেবের চোখ এরালো না ।
” আরে আমি এমনেই বললাম । ভয় পাওয়ার কি আছে ? ”
কিছুতেই যেন নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারছিল না রিসাত সাহেব । জিনিসটা বুঝতে পেরে রিয়াজ সাহেব বেশ লজ্জিত হলেন তাকে এইরকম বিব্রত পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়ে ।
ক্ষমা চেয়ে চলে গেলেন , জানাজার নামাজে শরিক হওয়ার জন্য বলে ।
পাঁচ –
দুই দিন কেটে গেলো । আগে ছুটির দিনগুলো যেভাবে কাটতো সেভাবেই কেটে যেতে লাগলো । কিন্তু আবার সেই পশুত্ব ফিরে আসতে কতদিন ? রিসাত সাহেব চিন্তা করলেন , ”একটু হাওয়া পরিবর্তন করে বাহিরে থেকে ঘুরে এলে কেমন হয় ? ছুটি আরেকটু না হয় বাড়িয়ে নিলাম । ”
তিনি সমুদ্র সৈকত দেখতে যাবেন বলে মনঃস্থির করলেন । টিকিটও কেটে ফেললেন । বাস রাতে ছাড়বে । ঐদিন সকালে বাড়ির মালিক রায়হান সাহেব এলেন । হাসি- খুশি , সহজ সরল মানুষ ।
রুমে ঢুকার অনুমতি চেয়ে অনুমতির জন্য দেরি না করে ঢুকে গেলেন ।
” তা কেমন আছেন ? বারিয়ালা হয়েছি বলে তো লাট সাহেব হয়ে যাই নি । ভাড়াটিয়াদের একটু খবর টবর নিতে হয় । তাই আসলাম । কোন সমস্যা নেই তো ? ”
” নাহ কোন সমস্যা নেই । ”
” বললেন না তো কেমন আছেন ? ”
” আছি কোন রকম । ”
” কোন রকম ? ”
এর উত্তর কি দিবেন রিসাত সাহেব বুঝে উঠতে পারলেন না ।
” আচ্ছা যাক ও কথা । তা ব্যাগ গুছাচ্ছেন যে ? কোথাও যাবেন নাকি ? ”
” হু । একটু কক্সবাজার যাবো । ”
” একটু কেন ? পুরা গেলে সমস্যা কি ? ” বলে তিনি হেসে উঠলেন ।
নিজের মতো করে উত্তর দেয়ার জন্য রিসাত সাহেব বলে উঠলেন
” শরীর টা ঠিক ভালো যাচ্ছে না । তাই ঐ দিকে যাচ্ছি । হাওয়া বদল আর কি । ”
” তা কতদিনের জন্য ? ”
” দেখি । যতদিন ভালো লাগে আর কি ।”
” ভালো । ভালো । তবে আপনার স্কুল ? ”
” ছুটি নিয়েছি । ”
” আমার ঐ মেয়েটার জন্য আচার আনবেন আর এক কেজি লইটকা শুটকি আইনেন । বেশি কিছু না । ”
” ঠিকাছে । মনে থাকলে । ”
” শিক্ষক মানুষ । কিছু ভুলে নাকি ? ” এর উত্তরের আশা না করেই বলতে থাকলেন ।
” বুঝছেন , রাতে ইজিচেয়ারে করে বাইরে বসে থাকি । এই ধরেন এগারোটা থেকে বারোটা পর্যন্ত । হালকা বাতাস শরীরে লাগে । ভালোই লাগে । চিন্তা কম কম মনে হয় । এর চেয়ে বেশি থাকতে ইচ্ছা করলেও পারি না । ঘুম ধরে । ”
রিসাত সাহেবের মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ । তাই দেখে আর কথা বাড়ানো উচিত হবে না চিন্তা করে রায়হান সাহেব বিদায় নিয়ে চলে গেলেন ।
রিসাত সাহেব চিন্তা করেন , ” লোকটার এখনও তেমন বয়স হয় নি । কিন্তু এখনই কথা বেশি বলার বাতিকে ধরেছে । ”
রাত বারোটায় বাস । এগারোটার দিকে বের হলেন । সামনে ইজিচেয়ারে রায়হান সাহেব বসে আছেন । তার সাথে আগ বাড়িয়ে কথা না বলে রিসাত সাহেব চলে গেলেন । কলা বাগান থেকে বাস ছাড়বে । একটু হেঁটে পড়ে রিক্সা নিবেন বলে ঠিক করলেন । কিছুক্ষন হাঁটার পর তার মনে পড়লো তিনি হাতের ঘড়িটা আনেন নি । দেয়াল ঘড়ি দেখে বের হয়েছেন ।
বাসার সামনে রায়হান সাহেবকে আধো শোয়া অবস্থায় দেখে সেই রাতের শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতে তিনি পড়ে গেলেন । তিনি নিজের উপর থেক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে শুরু করলেন ।
ঘরে ঢুকলেন । হাত ঘড়ি নিলেন । এরপর চোখ গেলো ছুরির দিকে । তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে লাগলেন । কিন্তু মন যেন বলছে , ” সেই দিনের ঘ্রাণ মনে নেই । মনে নেই কি সেই রক্তের গন্ধের কথা । মনে না থাকলে আরেকবার নিয়ে দেখ । ”
নিজে নিতে না চাইলেও হাত ছুরি নিয়ে পকেটে ঢুকালো । দরজা তালা দিয়ে ব্যাগ নিয়ে ইজিচেয়ারের কাছে গেলেন । ঘুমিয়ে পড়েছেন রায়হান সাহেব । মনকে মানাতে ব্যর্থ হলেন রিসাত সাহেব । ইজিচেয়ারের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি । বা হাত দিয়ে শক্ত করে মুখ চেপে ধরে ডান হাতের ছুরি গলার উপর চালিয়ে দিলেন ।
ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো । রক্তটা সেইদিনের তুলনায় বেশি লাল । ঘ্রাণটাও একটু ভিন্ন ।
আজ জামায় রক্ত লাগে নি । হাতে যা লেগেছিল ছিটে ফুটা বাহিরের কলে গিয়ে ধুয়ে নিলেন । স্বাভাবিক মানুষের মতো হেঁটে চলে গেলেন মহাম্মাদপুর বাস স্ট্যান্ড । একটা রিক্সা নিলেন কলাবাগানের উদ্দেশে ।
বাস ঠিক সময় ছেড়ে দিলো । চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলেন । সেইদিনের সেই ঘুম আবার ফিরে এলো । বাস চলতে লাগলো ।
ছয় –
বাস যখন চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছালো তখন রিসাত সাহেবের কক্সবাজার যাওয়ার ইচ্ছা উবে গেলো । তিনি বাস থেকে নেমে গেলেন । চিন্তা করলেন আশে পাশের কোন হোটেলে থেকে এরপর আবার ঢাকায় ফিরে যাবেন ।
যেই চিন্তা সেই কাজ । ‘ পিয়াসা ‘ নামের একটি তিন তারকা হোটেলে উঠলেন ।
তখন ভোর ছয়টা বাজে । গোসল ছেড়ে ঘুম দিলেন ।
সাত –
স্কুলের হেডমাস্টার রতন সাহেবের খুনের সময় একজন শিক্ষকই অনুপস্থিত ছিলেন । তার নাম ছিল রিসাত । তবে তাকে সন্দেহ করাও ছিল বড়ই কঠিন । তাকে সন্দেহ করে কোন কথা বললেই সবাই রেগে যেতো । আর সে ছুটি আগেই নিয়েছে । আর লাশের কাছে পাওয়া নোটের হাতের লেখার সাথে তার স্কুলে পাওয়া হাতের লেখার কোন মিল ছিল না । তাই বেশি দূর আগানো যায় নি ।
আর এই দিকে রায়হান সাহেবের মৃত্যুও একই ধরনের আর এখানেও একটি নোট পাওয়া গেছে । যেখানে লেখা ছিল –
” নতুন রক্তের রং ,
নতুন রক্তের ঘ্রাণ ,
নতুন প্রাপ্তি । ”
এই লেখার সাথে সেদিনের লেখার হুবহু মিল আছে । সুতরাং এইবার রিসাত সাহেবকে সন্দেহের তালিকায় উপরে রাখতে কোন বাধা নেই । যদিও জিনিসটা প্রকাশ্যে বলা যাচ্ছে না । সে যে এই ধরনের কাজ চিন্তাও করতে পারে না তাই সবাই বলছে ।
মোহাম্মাদপুর থানার ওসি রশিদ সাহেবের উপর দায়িত্ব পড়েছে এই কেসের । উপরে রিপোর্ট করতে গিয়ে তাকে ঝাড়ি খেতে হয়েছে বেশ । কারণ তাদের কথা রিসাত সাহেবকে আগেই ধরা উচিত ছিল । সময় অনেক গড়িয়ে গেছে । তবুও ট্রান্সফার বাচাতে না পারলেও অন্তত চাকরিটা বাচাতে পারবেন যদি কেসটা এক দুই দিনের মধ্যে সমাধান করে দিতে পারেন ।
তিনি কিছুতেই বুঝাতে পারলেন না তাদের যে , ” রিসাত সাহেবের হিস্টোরি এতোই ক্লিয়ার যে তার বিরুদ্ধে কোন স্টেপ নিলে তার আশে পাশের মানুষ গণ্ডগোল শুরু করবে । যারা খুন হয়েছে তাদের আত্মীয় স্বজন পর্যন্ত তার উপর কোন সন্দেহ পোষণ করে না । ”
রশিদ সাহেবের চাকরি বাঁচানো নিয়ে কথা । একটা সুরাহা করতেই হবে । কিন্তু তাকে ধরার তেমন কোন ক্লু তারা পাচ্ছেন না । তবে তার প্রতিবেশীর কাছ থেকে জানতে পেরেছেন তার বাহিরে যাওয়ার কথা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখেছেন এগারোটার দিকে । আর খুন হয়েছে এরপরে । ঠিক মিলাতে পারছেন না । আর কোথায় গিয়েছেন তাও কেউ বলতে পারলো না ।
রশিদ সাহেব রিসাত সাহেবের রুমের তালা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকলেন । বাসায় ধারালো কিছুই নেই । হয়তো সাথেই নিয়ে গেছে । তার মানে আরেকটা খুন হতে পারে । এরপর ছোট একটা ডাইরি পেলেন । আর সেটি খুলে অবাক হয়ে গেলেন এই যে সেই হাতের লেখা । আরেকটি পৃষ্ঠা পেলেন যেখানে পরীক্ষার জন্য প্রশ্ন করা হচ্ছে সেই লেখাটি স্কুলে রিসাত সাহেবের পাওয়া হাতের লেখার সাথে মিলে । রশিদ সাহেব পুরোই হতভম্ব । তিনি আশে পাশের মানুষদের জিজ্ঞেস করলেন তিনি কি একা থাকতেন নাকি তার সাথে আর কেউ থাকতেন ?
কারণ একই জায়গায় দুই ধরনের হাতের লেখা । এক্সপার্টদের পরামর্শ নিয়ে জানতে পারলেন দুটি পুরোই বিপরীত ধাঁচের কারো পক্ষে এটি সম্ভব নয় । তবে দুই হাতেই লিখতে পারলে সম্ভব ।
রিসাত সাহেবের রুম দেখে বুঝা যাচ্ছে তিনি কোথাও কিছুদিনের জন্য গিয়েছেন আর চলে আসবেন । কারণ অনেক জিনিসই রেখে গিয়েছেন । বেশ কিছু টাকার একটা ব্যাগও আলমারির ভিতরে আছে ।
যেহেতু রিসাত সাহেব কোথায় গিয়েছেন জানা যাচ্ছে না তাই রশিদ সাহেব ঠিক করলেন বাসার আশে পাশে লোক রাখবেন । যেন আসার সাথে সাথে ধরা যায় ।
আট –
দুপুরের দিকে রিসাত সাহেবের ঘুম ভাঙল । ঘুমের ঘোর কাটতে সময় লাগলো । কিছুক্ষন পর বাহিরে হই চই এর শব্দে তিনি বাহিরে তাকালেন দেখলেন কয়েকজন মিলে একজনকে মারছে । এর কারণে তার মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে । এই রক্ত দেখে রিসাত সাহেব অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন । তার আবার নেশা ডাক দিয়েছে । তিনি বুঝতে পারলেন না , এতো তাড়াতাড়ি তো নেশা ডাক দেয় না । কালকে রাতেই তো নেশার ডাকে সারা দিলেন । আবার এখন কেন ?
তবে নেশার ডাক প্রবল হতে লাগলো । পাঞ্জাবির পকেটে হাত চলে গেলো অজান্তেই আর সেখানে বিদ্যমান ছুরির অস্তিত্ব টের পেলেন । তা নেশার ডাককে প্রশমিত করলো ।
তিনি খাবার রুমে দিয়ে যাওয়ার জন্য রিসিপ্সনে ফোন করে বললেন । বেশ অশস্তিকর মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন ।
ওয়েটার এসে খাবার রাখলো টেবিলে । চলে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে যাচ্ছিল যখন তখন রিসাত সাহেব তাকে ডাক দিয়ে বসতে বললেন । এরপর জিজ্ঞেস করলেন বাহিরে তখন কি হচ্ছিল ?
” স্যার । তেমন কিছু না এক চোরকে ধরে পিটানো হচ্ছিল । ”
কথা বলতে বলতে রিসাত সাহেব ছেলেটির পিছনে চলে গিয়েছেন ।
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন ,’ কেন ? কি চুরি করেছে ? ” বলেই আর অপেক্ষা করলেন না শুধু বললেন , ” আমায় মাফ করিস । ”
মুখ চেপে ধরে পাঞ্জাবির পকেট থেকে ছুরি বের করে চালিয়ে দিলেন । তবে এইবার তার কষ্ট হচ্ছে । কিন্তু শরীরকে ঠাণ্ডা করার জন্য এর বিকল্প যে নেই । এক পর্যায়ে চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে ।
কি যে কষ্ট । তা কাউকে বলার নয় । ছেলেটার চোখগুলো বড় বড় করে মৃত্যুর পরও রিসাত সাহেবকে দেখছে । আস্তে আস্তে ঘোলা হয়ে যাওয়া চোখগুলোকে রিসাত সাহেব বন্ধ করে দিলেন ।
একটা কাগজে লিখলেন ,
” এই বোধ হয় শেষ রক্ত দেখা ,
এই বোধ হয় শেষ রক্তের ঘ্রাণ নেয়া । ”
তিনি নিজের শরীরে লাগা রক্তগুলোকে পরিষ্কার করে নিলেন । ছুরি ধুয়ে আবার পকেটে রাখলেন । বিছানায় শুয়ে নিজেকে শান্ত করে নিলেন ।
কিছুক্ষনপর নিচে গেলেন বিল পরিশোধ করতে । বিলের রসিদ যখন লেখা হচ্ছিল তখন রিসাত সাহেব তার পাঞ্জাবির পকেট হাতড়াচ্ছিলেন । তার ডাইরিটা কোথায় ? তিনি একটা কাগজ চাইলেন ম্যানেজারের কাছে । কাগজে কি যেন টুকে রাখলেন । এরপর রিসাত সাহেবকে এক জায়গায় স্বাক্ষর দেয়ার জন্য বললেন ম্যানেজার সাহেব । রিসাত সাহেব স্বাক্ষর করলেন । এরপর ম্যানেজার সাহেব বললেন , ” স্যার , আপনি দুই হাতেই লিখতে পারেন দেখি । কাগজে লিখলেন ডান হাতে আর স্বাক্ষর বাম হাতে । ”
” হুম । জরুরি কিছু লেখা বাম হাতে লিখি আর ডান হাতে সাধারণ লেখা লিখি । ”
” আমি এই প্রথম দেখলাম , স্যার । বেশ অবাক হলাম । ধন্যবাদ । আবার আসবেন । ”
হোটেল থেকে বেরিয়েই ঢাকার জন্য টিকেট কাটতে গেলেন বাস কাউন্টারে । এক ঘণ্টা পরে বাস আসবে । টিকেট কেটে ফেললেন । বাসে উঠলেন ঢাকার উদ্দেশ্যে ।
চিন্তা করতে লাগলেন , ” তিনি এ কি করে চলেছেন ? ”
নয় –
চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া খুনের ঘটনা রশিদ সাহেবের কাছে ততক্ষণে পৌঁছে গেছে । আর তিনি ম্যানেজারের সাথে কথা বলে জেনেছেন , খুনের ধরন , রেখে যাওয়া নোট সম্পর্কে । যা আগের ঘটে যাওয়া খুনের সাথে অবিকল মিলে যায় । আর রিসাত সাহেবের দুই হাতে লেখার সক্ষমতার কথাও জেনেছেন । এখন রশিদ সাহেব নিশ্চিত ‘ রিসাত সাহেব ‘ ই খুনি । আর তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন । রশিদ সাহেব সকল প্রকার প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন ।
দশ –
দুপুর তিনটা এর দিকে রিসাত সাহেব ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন । রাত দশটার দিকে কলাবাগান বাস স্ট্যান্ডে নামলেন । এরপর রিক্সা করলেন বাসার জন্য ।
বাসার সামনে রিক্সা থেকে নামলেন । ভাড়া চুকিয়ে রুমের জন্য হাঁটা ধরলেন ।
ঐদিকে রসিদ সাহেব প্রস্তুত । ঘরে ঢুকার আগেই ধরে ফেলবেন । আর উপর থেকে নির্দেশ পেয়েছেন ধরে রাখার দরকার নেই কেস ডিসমিস যেন অন দা স্পট হয় ।
তাকে রশিদ সাহেব থামতে বললেন । তখন চারপাশ থেকে আরও কয়েকজন জড়ো হলো ।
রিসাত সাহেব ঘাবড়ে গেলেন । তখন তার মনে পড়লো , ” আমি একজন শিক্ষক হয়ে জেলে যাবো ? আমার ছাত্ররা কি বলবে ? কি শিখবে ? ”
তিনি তখনই পকেটের ছুরি বের করলেন । পুলিশরাও তখন যার যার পিস্তল বের করলেন । তাকে আত্মসমর্পণ করার জন্য হলো । কিন্তু সেই সকল কিছুই যেন রিসাত সাহেব শুনতে পেলেন না । তার মাথায় হাজার হাজার চিন্তা খেলা করতে লাগলো ।
তিনি এক পুলিশ অফিসারের দিকে ছুরি ছুড়ে মেরে ঘুরে দৌড় দেবার আগেই রশিদ সাহেব গুলি করলেন । গুলিটা রিসাত সাহেবের বাম বুকে লাগলো ।
তিনি তার দুই হাত দিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরলো । তার সারা শরীর কুঁকড়ে আসছিল । আস্তে আস্তে বসে পড়লেন তিনি । নিজের ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্ত দেখে আর সেই রক্তের ঘ্রাণ পেয়ে আপনা থেকেই ঠোঁটের এক পাশে হাসির উদ্ভব হলো ।
যা সবাই দেখলো । আর রশিদ সাহেবের চাকরিও বেচে গেলো ।
” যায় জ্বলিয়া যায় , পরাণ আমার ,
নিভাই সেই জ্বালা অন্যের পরাণ নিয়া । ”

৩ thoughts on “রক্তিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *