একটি খুন ও তার ব্যবচ্ছেদ

বিষয়টা হটাতই মাথায় আসলো। ঠিক ভোরবেলার আগের মুহুর্তে। মসজিদ থেকে ভেসে আসছে “নামাজ ঘুম থেকে উত্তম”, ঠিক সেই সময়ে। মাথার উপরের ভারী বোঝাটা হালকা হয়ে গেলো সাথে সাথেই। আমি নিজেকে কেবল উড়তে থাকা পালকই ভাবতে পারলাম, অন্য কিছু না, কেননা আনন্দের আতিশয্যে আমি নির্ভার, চিন্তা করার ক্ষমতাও যেখানে নিঃশেষ।

আমি একটি খুন করবো। হয়তোবা ইতিহাসে লেখা থাকবে না, তারপরও এটা হবে, দা পার্ফেক্ট মার্ডার!


বিষয়টা হটাতই মাথায় আসলো। ঠিক ভোরবেলার আগের মুহুর্তে। মসজিদ থেকে ভেসে আসছে “নামাজ ঘুম থেকে উত্তম”, ঠিক সেই সময়ে। মাথার উপরের ভারী বোঝাটা হালকা হয়ে গেলো সাথে সাথেই। আমি নিজেকে কেবল উড়তে থাকা পালকই ভাবতে পারলাম, অন্য কিছু না, কেননা আনন্দের আতিশয্যে আমি নির্ভার, চিন্তা করার ক্ষমতাও যেখানে নিঃশেষ।

আমি একটি খুন করবো। হয়তোবা ইতিহাসে লেখা থাকবে না, তারপরও এটা হবে, দা পার্ফেক্ট মার্ডার!

বিষয়টা আমার আগেই বুঝতে পারা উচিত ছিলো। জানি না, কেনো বুঝতে পারি নাই। আমি কি তবে আজন্ম নির্বোধ? হ্যা, হতে পারে। হতেই পারে! রিতি তো তাই বলতো। আমি নির্বোধ, আমি বোকা। আশ্চর্য্যের বিষয় হচ্ছে আমি বোকা থাকতেই ভালোবাসতাম, ওর মুখে সেই “বোকা” ডাকটা শোনার জন্য। আহা! কতদিন শুনি না, সেই মধু কণ্ঠে “বোকা” কথাটা।

হাতের সিগারেটটা টান মেরে ফেলে দিলাম, আমি চাই না, চাই না কোন বিষাক্ত নিকোটিন ঢুকে মিশে যাক আমার রক্ত প্রবাহে, যে শিরায় শিরায় রিতি এখনো ছুটে বেড়াচ্ছে সেই শিরাতে আমি কোন বিষ ঢুকতে দেবো না। পর মুহুর্তেই আবার আরেকটা বেনসন এন্ড হেজেস ধরাই। আমি জানি না আমি কি করছি, আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না, জানতে চাই না। শুধু জানি আমি একটা খুন করবো। পারফেক্ট একটা মার্ডার, কোন খুঁত থাকবে না।

আমার বেচে থাকা শুধু এই একটা খুন করার জন্যই। কি জেনো বলে না, ওই যে, “ইটস মাই ডেস্টিনি”। হ্যা আমি এ খুনটা করবো। করবোই। আমাকে করতেই হবে। না করে যে আমি মরতে পারবো না। কিন্তু আমার যে বড়ো সাধ হয় মরার! আমাকে যে মরতে হবে। আমি চাই হিম শীতল মৃত্যুর সাথে এক কাপ গরম কফি খেতে, পুরনো বন্ধুর মতো গলা জড়িয়ে ধরে ওপারে যেতে। পৃথিবীটা বড্ডো কুৎসিত!

৩.
কটা বাজে জানি না। জানতে চাই ও না। আবার জানতে চাই। আচ্ছা বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে? ঝমঝম শব্দ শুনছি কেনো? জানি না। জানতে চাই না। না বোধহয়, বৃষ্টি হচ্ছে না। হেলুসিনেশন? হতে পারে। জীবনটাই তো বড়ো একটা হেলুসিনেশন! আহা! মেয়েটা বৃষ্টি বড্ডো পছন্দ করতো। ওর ওখানে কি জানালা আছে? বৃষ্টি দেখতে পারে সে? হাত ভেজায় না বৃষ্টিতে? জানতে ইচ্ছে করে, করে না।

৪.

এখন রাত। হ্যা, আমি রাতকে ভালো চিনি। খুব ভালো চিনি। আমি যে অন্ধকারের বাসিন্দা। আমার একটুকরো আলো ছিলো ও। মিলিয়ে গেছে, আমার জীবন থেকে। কিভাবে যেনো। জানি আবার জানি না। বুঝতে পারি না। আমি বোকা। রিতির “বোকা”।
কুয়াশা আমার চারপাশে। বিষাক্ত কুয়াশা। নাহ, ওর কথা ভাবতে ইচ্ছে করে না। মাথার ছাড়পোকা গুলো ওর স্মৃতি অপছন্দ করে। পোকা গুলোকে ঘাটানো উচিত হবে না, ওরা রাগ করবে। রাগ করলে একটা না অনেকগুলো খুন করতে হবে। আমি যে শুধু একটা খুন করতে চাই!

৫.

সময় হয়ে গেছে। আজ আমার প্রস্তুতির দিন। আজ আমার পাপ মুক্তির দিন। নতুন মোড়ক খোলা সাবান দিয়ে গোসল করলাম, অনেকদিন পর। শেষবার গোসল যেদিন করেছিলাম সেদিন অনেক রক্ত ছিলো আমার গায়ে। বাথরুমটা লাল হয়ে গিয়েছিলো। সাথে কিছি নোনা জল ছিলো। তারা মিলেমিশে একাকার। ওদের রসায়ন টা ভালো ছিলো, বিক্রিয়াগুলো ছিলো অসম্পূর্ণ, যদিও!
আকাশী একটা শার্ট পড়লাম। ওর দেয়া, বাইশতম জন্মদিনের উপহার ছিলো সেটা। নাহ, প্ল্যান করা দরকার। সন্ধ্যার আজানের পরেই ভালো হবে। বেশ নিরিবিলি থাকে তখন ওই এলাকাটা। সেলিমের চায়ের দোকানের পাশের রাস্তাটা ভালো। কেও জানবে না। একটা হাসি ফুটে ওঠে আমার মুখে, ক্রুর হাসি, অনেকদিন পর হাসি।

৬.

আমি অপেক্ষায় আছি ছেলেটার। জানি আমি, সে আসবে আজকে। এটা যে ওর নিয়তি। একই সাথে আমারো নিয়তি। আমি এখন নিয়তিতে বিশ্বাস করি, পুরোপুরি। নাহলে কি আর এমন হয়? সে সন্ধ্যাটার কথা আমার আজো মনে পড়ছে। মেয়েটার আর্ত চিতকার আমার মনে পড়ছে। সেই পশুটা, যার জন্য আমি আজ অপেক্ষা করছি মশার কামড় খেয়ে, সে পশুটা। এতোটা পশুত্ব কারো থাকতে পারে? না দেখলে বিশ্বাস হয় না। কি অপরাধ ছিলো রিতির? কি অপরাধ? আমার? আমারই বা কি অপরাধ ছিলো? বলতে পারো মহাকাল? আমার ভালোবাসাটাকে, ফুলের মতো ভালোবাসাটাকে, ফুলটার জরায়ু ছিন্ন ভিন্ন করার আগে কি একবারো ভাবলো না পশুটা? আমার হাতদুটো দিয়ে ওকে নিয়ে আমি হসপিটালে ছুটে গিয়েছিলাম। সে হাতে তো আজো রক্ত লেগে আছে, আজো আমি তার গন্ধ পাই।

আচ্ছা, পশুটা কি একবারো ওই চোখ জোড়ার দিকে তাকায় নি? তাহলেও তো কুৎসিত মস্তিষ্ক পূত পবিত্র হয়ে যাওয়ার কথা। নাহ, আর চিন্তা করবো না।

পায়ের শব্দ না? হ্যা আসছে। পশুটা আসছে। আজ আমার মুক্তির দিন। আমি এরপর হাত মেলাবো মৃত্যুর সাথে। আমার দেবীর সাথে দেখা হবে, অনেকদিন পর, স্বর্গে।

শেষকথা

জামাল সাহেব চায়ের পেয়ালা হাতে পেপার দেখছেন। নাহ, আবার শেয়ার মার্কেটে ধস। স্কুলছাত্র অপহৃত। বাংলাদেশের খেলা কালকে থেকে। কালকে তাড়াতাড়ি অফিস থেকে আসতে হবে। এক কোণায় চোখে পড়লো, “রাজধানীতে নৃশংস খুনঃ পুলিশ হতভম্ব” ।
‘নাহ, দেশটা রসাতলে গেলো’ আপন মনেই বলে ওঠেন জালাল সাহেব। তার চোখে এড়িয়ে গেলো, এক কোণায় লেখ আরেকটি সংবাদ, “যুবকের মৃতদেহ আবিষ্কারঃ আত্মহত্যা বাড়ছে শহরে”।

সংবাদটাতে লেখা ছিলো, “কাব্য নামের এক তেইশ বছরের যুবকের আত্মহত্যা। সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে। তাতে লেখা, ‘আজ আমি মুক্ত হলাম’। লাশ ময়না তদন্তে পাঠানো হয়েছে ।। নিজস্ব প্রতিবেদক।

শেষকথা ২

নার্ভাস লাগছে। অনেকদিন পর রিতিকে দেখবো। একতোড়া গোলাপ নিয়েছি হাতে। এই যায়গাটা অদ্ভুত। যা চাচ্ছি, তাই পেয়ে যাচ্ছি। গন্ধটাও সুন্দর। কেমন একটা বুনো গন্ধ। ওই যে সে! সেই ভুবন ভুলানো হাসি রিতির মুখে। বাতাসে চুল, গায়ের পোষাক উড়ছে। আমি এগিয়ে গেলাম। আজ আমি মুক্ত, আজ আমি
খুশি। আহ, জীবন এতো ভালো কেনো?

শেষকথা ৩

“বোকাটা আসছে। ইস, শুকিয়েছে বেচারা একটু। আহারে, আহারে! হাতে আবার গোলাপ নিয়ে আসা হয়েছে। ছেলেটা এতো ভালো কেনো?”

এক চিলতে হাসি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রিতি, কাব্যের দিকে।

৯ thoughts on “একটি খুন ও তার ব্যবচ্ছেদ

  1. আমার কাছে আনুগল্পটা আসাধারন
    আমার কাছে আনুগল্পটা আসাধারন লেগেছে
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *