একাত্তরের যীশু-আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্রে একটা উল্লেখযোগ্য সংযোজন


ছবিটি বেশ পুরোনো। শাহরিয়ার কবীরের গল্প অবলম্বনে ও নাসির উদ্দিন ইউসুফের পরিচালনায় ১৯৯৩ সালে নির্মাণ করা হয় ‘একাত্তরের যীশু’ চলচ্চিত্রটি ।

একাত্তরের যীশু।
ছবিটি বেশ পুরোনো। শাহরিয়ার কবীরের গল্প অবলম্বনে ও নাসির উদ্দিন ইউসুফের পরিচালনায় ১৯৯৩ সালে নির্মাণ করা হয় ‘একাত্তরের যীশু’ চলচ্চিত্রটি । ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত হয় ‘একাত্তরের যীশু’। শ্রেষ্ঠ সংলাপের জন্য ছবিটি ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়।

ইছামতী নদীর তীরে ছোট্ট একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। যুদ্ধের প্রভাব এখনো প্রকটভাবে এখানে পড়েনি। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই জেলে। হিন্দু, মুসলমানদের সাথে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বসবাস। গীর্জায় মানুষ উপাসনা করতে আসে, ফাদার সেখানে বাইবেল পড়ে শোনান। গীর্জার ফাদার আর কেয়ারটেকার ডেসমন্ডের সাথে গ্রামের সবার ভালো সম্পর্ক। এই সময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। উপার্জন আর গির্জায় প্রার্থনায় সময় কাটানো মানুষগুলোর জীবনে যুদ্ধ বিহ্বলতা ও নৃশংসতা নিয়ে হাজির হয়। দ্রুত বদলে যায় তাদের অভ্যস্ত দৃশ্যপট। এদিকে অন্য গ্রাম থেকে লোকজন চলে আসতে থাকে ফাদারদের গ্রামে। কারণ সেখানে পাকিস্তানি বাহিনী সব দখল করে নিয়েছে। ডেসমান আর ফাদারের মধ্যে বাইবেল এবং মনুষত্য নিয়ে বিতর্ক বাধে। সেই সময় ডেসমন্ড ফাদারকে বলে যে, “মানুষগুলারে দেহেন। মনে হইতাছে বাইবেলের কোন গল্পের যেন মানুষেরা”। বিরক্ত হয়ে ফাদার বলেন, “রাষ্ট্রসংঘাতের ফলে আশ্রয়প্রার্থী মানুষ মহাগ্রন্হের পাপী ও পুণ্যশীল মানুষের সাথে তুলনীয় হতে পারে না”। ফাদার ডেসমন্ডকে আর্তের নয়, ঈশ্বরের সেবা করার জন্য বলেন। উত্তরে ডেসমন্ড জানায়, ঈশ্বরের পীড়া হয় না, ঈশ্বরের পায়ে গুলি লাগে না। কি চমৎকার!
ডেসমন্ড ফাদারকে বুঝায়, এখন তর্ক-বিতর্কের সময় নেই,যে মানুষগুলি এসেছে তারা কেউ অসুস্থ,কেউ ক্ষুধার্ত। তখন ফাদার গীর্জার সিস্টারদের সায় দেয় অসহায় মানুষগুলিকে সাহায্য করার জন্য। এরপর হানাদারদের রোষানলে পড়ার ভয় থাকলেও দূরান্ত থেকে আসা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেয় তারা। আহার-চিকিৎসার ব্যবস্থাও করে।
এদিকে গঞ্জ পেরিয়ে হানাদাররা গ্রামটির দিকে অগ্রসর হলে সিস্টারদের নিরাপত্তার তাগিদে নৌকায় করে নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন ফাদার। ডেসমন্ডকেও সঙ্গে নিতে চান। কিন্তু গীর্জার সাথে চল্লিশ বছর ধরে সম্পর্কযুক্ত ডেসমন্ড গ্রাম ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন। গীর্জায় থেকে যান। কিছুদিন পর শহরের যুদ্ধের আভাস এ গ্রামেও লাগে। দলে দলে শহুরে মানুষ গ্রামে আশ্রয় নিতে চলে আসে। তাদের থাকার ব্যবস্থা করে গ্রামবাসী। কিন্তু মিলিটারিদের ভয়ে মানুষ বর্ডার পার হওয়ার জন্য এই গ্রামকেও ছেড়ে দেয়। ভুলক্রমে একটি বোবা ছোট্ট মেয়ে থেকে যায় ক্যাম্পে। ডেসমন্ড তখন মেয়েটিকে আপন করে নিতে থাকে। মেয়েটির সাথে সে খেলাধূলা করত। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান আর্মি গ্রামে প্রবেশ করে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। জ্বালিয়ে দিতে থাকে গ্রামের সব ঘর-বাড়ি। ডেসমন্ড তখন ঘরে ছিলেন না। ফিরে এসে দেখেন লাশের স্তূপের মধ্যে ছোট্ট মেয়েটির লাশ।
তার বেশ কিছুদিন পর মুক্তিবাহিনীর একটি দল আশ্রয় নিতে আসে এ গ্রামেই। একদিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্রামের একদল তরুণ, অন্যদিকে রাতের আঁধারে নির্বিচার গণহত্যা চালায় পাক সৈন্যরা। ডেসমান গ্রামের মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের খাওয়া-দাওয়া ও আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করত। মুক্তিবাহিনীর একের পর এক অভিযান সফল হচ্ছিল। একদিন মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী ঘাঁটি উড়িয়ে দিয়ে ফিরে আসার সময় পেছন থেকে ধাওয়া করে শত্রুসৈন্যরা। পালিয়ে গীর্জায় আশ্রয় নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের পাকবাহিনী ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করে। গির্জার পাশে যিশুর মতো ক্রুশবিদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধাদের আর্তচিৎকারে ঘরে লুকিয়ে থাকতে পারেন না ডেসমন্ড, বেরিয়ে আসেন। মুক্তযোদ্ধাদের সম্পর্কে হানাদাররা জানতে চাইলে ডেসমন্ড তিনবার না চেনার কথা বলেন। তার মনে পড়ে যায় ফাদারের মুখে শোনা বাইবেলের পাঠ- মোরগ ডেকে ওঠার আগে শিষ্য পিটার তিনবার অস্বীকার করবে যিশুকে। তবে কি এই ক্রুশবিদ্ধ মুক্তিযোদ্ধারাও একেকজন যিশু? এজন্যই হয়ত ছবিটার নাম হয়েছে- “একাত্তরের যীশু” !!

ধর্মগ্রন্হ বাইবেল অনুযায়ী ক্রুশবিদ্ধ যীশুর পুনরুত্থান হওয়ার কথা। এ বিশ্বাসকে দৃঢ় করে আরো একদল মুক্তিযোদ্ধা তার হেফাজতে সেল্টার নিতে আসে। ছবির শেষপর্যায়ে দেখা যায়- ডেসমন্ড তার ঘরের মধ্যে একটা ক্রুশ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে এবং আরেকদল বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধা দেশ স্বাধীন হবার আনন্দে বীরের বেশে ফেরে।
ছবির মূল দু’টি চরিত্র ডেসমন্ড ও ফাদারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন যথাক্রমে অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদি ও পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়। জহির উদ্দিন পীয়ার হচ্ছেন মাষ্টার।
শাহরিয়ার কবীরের গল্প অবলম্বনে, প্রয়াত বেবী ইসলামের চিত্রগ্রহণে ১ঘন্টা ৩৫ মিনিটের একাত্তরের যীশু ছবিটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্রে একটা উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

Ekattorer Jishu
aka Jesus 71
Director:
Nasiruddin Yousuf
Writers:
Shahriar Kabir (story)
Rafique Mahmud (writer)
Cast:
Pijush Bandapadhaya
Humayan Faride
Sharmile Florence Gaines and more.
IMDb rating : 8.0/10

২৩ thoughts on “একাত্তরের যীশু-আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্রে একটা উল্লেখযোগ্য সংযোজন

  1. ৭১ নিয়ে নির্মিত অন্যতম সেরা
    ৭১ নিয়ে নির্মিত অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র…
    আপনাকে ইস্টিশনের স্বাগতম :গোলাপ: :গোলাপ: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ফুল: :ফুল:
    আপনার কাছ থেকে দারুণ দারুণ রিভিউ পাব আশাকরি
    অপেক্ষায় থাকলাম…

  2. চলচ্চিত্র নিয়ে লেখার অনুরোধ
    চলচ্চিত্র নিয়ে লেখার অনুরোধ রাখার জন্য প্রথমেই একরাশ ধইন্না পাতাসহ গোলাপ রইল তিতলি আপু :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: … ৭১ নিয়ে নির্মিত অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র নিয়ে লেখার জন্য অজস্র অভিবাদন… হুমায়ূনের অভিনয় এই চলচ্চিত্রকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। :bow: আর পীযূষের কথা বলাই বাহুল্য… উনি যে কত চমৎকার একজন অভিনেতা, এই চলচ্চিত্রটি না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব। :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট:

    সবমিলিয়ে এক মাস্টারপিস নিয়ে চমৎকার লেখনীর মাধ্যমে আপনার ইষ্টিশন যাত্রাকে স্বাগত জানাই। এরকম আরও চমৎকার লেখার অপেক্ষায় থাকলাম… :ভাবতেছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি:

  3. খুব ভালো বর্ণনা
    খুব ভালো বর্ণনা করেছেন…সিনেমাটি অনেক আগেই দেখা ছিলো।
    আপনার প্রাঞ্জল বর্ণনায় মনে হলো আবার দেখলাম…ধন্যবাদ আপনাকে… :তালিয়া: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ:

    1. এটা আমার লেখা প্রথম রিভিউ।
      এটা আমার লেখা প্রথম রিভিউ। নিজে খুব কনফিউজড ছিলাম যে কেমন হল তা নিয়ে!
      আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  4. ছবিটি দেখা দূর্ভাগ্যক্রমে
    ছবিটি দেখা দূর্ভাগ্যক্রমে দেখা হয়নি, আপ্নার রিভিও পরে লোভ সাম্লাতে পারছিনা। সরাসরি প্রিয়তে…

  5. অসাধারণ একটি গল্পকে পূজি করে
    অসাধারণ একটি গল্পকে পূজি করে চলচিত্রটি নির্মিত হয়।অনেকদিন পর আবারো ছবিটির কথা মনে করিয়ে দিলেন।ইস্টিশনে আপনাকে স্বাগতসম্ভাষণ।

  6. মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যে কোন লিখা
    মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যে কোন লিখা আমার খুবই প্রিয়। আর কোন ভিডিও ফিকশন হলে তো কথা নেই।
    মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার আর তাদের জারজ সহযোগীরা আমাদের উপর যে নির্যাতন করেছে তা কখনও ভুলতে পারবে না বাংলাদেশ॥

  7. মুভি দেখা হয়নি তবে লেখা টা
    মুভি দেখা হয়নি তবে লেখা টা পড়েয় মুভি টা একে ফেলেছি! পরিপূর্ণতা পেতে মুভি টাই দেখে নিবো খুভ শীঘ্রয়

Leave a Reply to শঙ্খনীল কারাগার Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *