রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পাঠঃ প্রশাসন ও নিরাপত্তা।

ক্লাশ করে বের হচ্ছি বন্ধুর সাথে আলাপ করতে করতে। শহীদুল্লাহ কলা ভবনের গেটে এসেই চমকে উঠলাম। অবশ্য খুব যে একটা আতকে উঠেছিলাম তাও নয়। কিছুটা চমকেছিলাম ঠিকই। দেখি, সামনে আমতলায় যেখানে সুমনের চায়ের দোকান সেটাকে ঘিরে চার ভ্যান পুলিশ। হুট করেই মনে হল যেন আমি মতিহার থানার সামনে চলে এসেছি! ঘটনা কি? পুলিশ এখানে কেন? সামনে এগুতে গিয়েই জানতে পারলাম একটু আগে পুলিশের সাথে প্রক্টরসমুহ এসে সবার আইডি কার্ডএর তালাশ চালিয়ে গেছেন। যাদের কাছে পেয়েছেন তাদের কিছু বলেননি, কিন্তু যাদের কাছে পাননি তাদের জানিয়ে গেছেন যে, সামনের দিন থেকে এমন হলে তাদের ক্যাম্পাসে ঢুকতেই দেয়া হবে না। সেদিন দুপুর দুইটা পর্যন্ত সেই অগুণিত পুলিশি পাহারা ছিল সেখানে। ছাত্র ছাত্রীরা চাএর সাথে চোখ দিয়ে যেন কটমট করে খেয়ে নিচ্ছিল সেই নীলে ছেয়ে যাওয়া দৃশ্যপট। এছাড়া আর কিই বা করার আছে।

মনে আছে কিছুদিন আগের ঘটনা। কাজলা গেটে পুলিশ সবার আইডি দেখছে। সে সময় একটা মোটর বাইক ঢুকার চেষ্টা করছে। যথারীতি পুলিশ তাকে আটকালো। বাইকে দুইজন ব্যাক্তি অবস্থান করছিল। তাদের কাছে যেতেই তারা উচ্চস্বরে পুলিশ দুজনকে জানাল তারা ছাত্রলীগ করে। পুলিশ তাদেরকে কোন বাঁধা ছাড়াই বাইকসহ চলে যেতে দিল। তারা শুধু যে ছাত্রলীগই করে তা না, তারা ক্যাম্পাসেরও কেউ না, কাজলা এলাকার স্থানীয় ছেলে পেলে।
আর এইতো সেইদিনই ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ছাত্রলীগের সম্মিলন। শয়ে শয়ে বহিরাগত ছেলেদের পায়ের ধুলিতে গোটা ক্যাম্পাস ঝাপসা হয়ে গেল; মুহুর্মুহু শ্লোগানে কেঁপে উঠল প্রত্যেকটা দেয়াল।
জানা নেই আমাদের প্রক্টরসমূহ সেখানে কয়জনের কাছে আইডি দেখতে চেয়েছিলেন!
এটা হল রাবি ক্যাম্পাসের প্রতিদিনের চেহারা। প্রশাসন এরকম তথাকথিত চাপাচাপির কারণ বলে জানাচ্ছেন তারা সাধারণ ছাত্রদের জামাত শিবিরের আঘাতের হাত থেকে বাচাচ্ছেন! সন্ত্রাসীদের হাত থেকে উদ্ধার করছেন!
তাদের ভাষ্যমতে আমাদের সন্ত্রাসের নয়া সংজ্ঞা বের করে নিতে হয়। অস্ত্র অনেকের কাছেই থাকতে পারে, চাঁদাবাজিও অনেকেই করতে পারে, সাধারণ ছাত্রদের মারধর, ধমকাধমকি অনেকেই করতে পারে, তাদের মাঝে যখন যে সরকারে থাকে তারা ব্যাতিত বাকী সবাই সন্ত্রাসীদের তালিকায় পরেন। আর তাদের হাত থেকে সাধারণদের বাঁচানোতে প্রশাসন কখনো পিছপা হন না।
এরকম পিছপা তারা বেশ কয় বছর ধরেই হচ্ছেন না। ২০০৯ সাল থেকে ঝুলিয়ে রেখে দিয়েছেন জরুরী আইনের নিষেধাজ্ঞা। যেটা ২০১৩ তে এসেও তারা তুলে নিতে পারেননি। কেবল সুযোগ মত ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু যখনোই প্রশ্ন আসে ক্ষমতাসীন ছাত্র সঙ্গঠনের তখনই বিষয়টা হাওয়া হয়ে যায়।
সন্ধ্যা হলেই জরুরী আইন আর সান্ধ্য আইনের নাম করে মেয়েদের হলগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে পরেন প্রক্টরেরা। রিক্সা থামিয়ে থামিয়ে ছেলে মেয়েদের নামিয়ে হেয় করেন, তাদের আইডি নিয়ে নেন। পরেরদিন আইডি তুলতে প্রশাসনিক ভবনে আসলে বাসায় ফোন চলে যাবে বলে ধমকাধমকি, একটা সাদা কাগজ দিয়ে বলেন এখানে তোমার অপরাধ স্বীকার করে লেখ এমন কাজ আর হবে না।
রাজনৈতিক বাস্তবতা আর অস্থিরতায় যখন যয়টা লাশ পরার কথা পরছে, যার যার মার খাবার কথা তারা মার খাচ্ছে, রগ কেটে ফেলে রাখছে, সবগুলো গেটে পুলিশ পাহারায় চব্বিশ ঘন্টা থাকলেও যখন দরকার পরছে ককটেলের শব্দে মাটি কেঁপে উঠছে। এসবি ঘটে চলেছে আর প্রশাসন ছাত্রছাত্রীদের নৈতিকতা উদ্ধার করার দায় মাথায় নিয়ে বসে আছেন, মধ্যযুগীয় নৈতিকতা।
রাবি ক্যাম্পাসের সন্ত্রাসমুক্ত আর নিজেদের ছাত্র আন্দোলনের জঙ্গি জোট বলে শ্লোগান দেয়া প্রগতিশীল ছাত্র জোটএর ভাষ্য মতে এই পুলিশি আচ্ছাদন হল চলমান ছাত্র আন্দোলনকে বাঁধা দেয়ার প্রশাসনিক ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যিকীকরণ চলছে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে অবৈধ সিদ্ধান্তগুলো যাতে করে কোন বিপত্তি ছাড়াই বাস্তবায়ন করা যায় তাই পুলিশি ব্যবস্থা। তাদের কথারও যথেষ্ট যুক্তি আছে, যখনই বর্ধিত বেতন ফি, ভর্তি পরীক্ষার দাম কমানোর মিছিল সমাবেশ করা হয়েছে বহুবার বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে পুলিশ। অনেকবার তাদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বিদ্রোহীদের। তারা বলছেন পুলিশ দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা যাবেনা। আর প্রশাসনকে সবার নিরাপত্তার দায়ভার নিজের কাঁধেই নিতে হবে।
প্রশাসন এই নিজের কাঁধে তুলে নেবার অর্থ এখন কোন দিক দিয়ে মাথায় নিচ্ছেন কে জানে!
প্রশ্ন আসে এটাও কোন কল্প রাজ্যের কল্পনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় কি না! কারণ সাধারণ মানুষেরা অনেক সময়ই মনে করে বসে থাকেন বামপন্থীরা সব সময় কোন না কোন কল্পরাজ্যের দাবি করেন।
এরকম ভাবার বা খুটিয়ে দেখার কারণ থেকে যায় যখন প্রতিবাদী নানান দিবসে এই দাবি জানানো হয় আর ক্যাম্পাসের ছালে মেয়েরা সবাই টুকিটাকি চত্বরে বসে হয় গল্পে মশগুল হয়ে থাকে নতুবা খাওয়া নিয়ে মুখ ব্যস্ত রাখে। তারা তো পুলিশি ব্যবস্থা, সন্ত্রাসী ছাত্র সংগঠন সব কিছু দিয়েই নির্যাতিত অথবা ত্যাক্ত বিরক্ত, তাহলে তারা এগুলোর বিপরীতে যখন কেউ কথা বলছে তাদের পাশে যোগ দিচ্ছে না কেন? জোটের নেতাদের এবং নিজেও জোটের একজন হিসেবে নিজের যে অভিজ্ঞতা তা হল এক্ষত্রে সাধারণদের সাহস নিয়ে আলোচনাটা ব্যপক অর্থে করা হয়। মনে করা হয় তারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে অনেক ভীত, তাই সঠিক পথে তারা আসতে চায় না। ঝামেলায় জড়াতে চায় কে? কিন্তু প্রশ্নের উত্তর কি এখানেই শেষ? এটা তো একটা দিক, কিন্তু পুরো সমাধানটা কি? প্রশাসন তো প্রাশাসনিক ভাবেই পুলিশি একটা ব্যবস্থা কায়েম করেছেন। এখানে তারা তো তাদের দায়িত্ব পালন করছেনই। সাথে সাথে এটা জানা সত্ত্বেও অস্ত্রের মালিক কারা কারা, তাদের দেখেও দেখছেন না, সন্ত্রাসীদের ধরছেন না, সময় মত চক্ষু বুজে রেখে দিচ্ছেন। যে প্রশাসন নিজেই একটা বিকট সন্ত্রাস তার কাছে নিরাপত্তার দায় দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন করে কি কোন সমাধান আসবে?

৩ thoughts on “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পাঠঃ প্রশাসন ও নিরাপত্তা।

  1. বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব
    বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব চিত্রটিই তুলে ধরেছেন ।প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই এরকম অবস্থা ।এর কোন আশু সমাধান আশা করাটাও এক রকম স্বপ্ন বটে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *