আয়নার ওপাশে

আবীর তার ঘরের দরজার ওপাশ থেকে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে আর তার মাকে ডাকছে। আবীর বলছে, “মা, দরজা খোলো, মা।” আবীরের মা, বাবা, দুই বোন এবং এক ভাই সবাই সেদিন বাসায় ছিল। সবাই আবীরের দরজার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আবীর দরজা নাড়ছে প্রায় পনের মিনিট হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ আগে আবীরের ছোট বোন আচল অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে। আবীরের বড় বোন অহনা আচলের চোখে মুখে পানি ছিটাচ্ছে। আবীরের বড় ভাই অনন্ত বলল, “মা, তুমি দাড়াও, আমি দরজা খুলছি।” তখন আবীরের মা মরিয়ম জামিলা বলল, “না। আমিই দরজা খুলবো।” মরিয়ম জামিলা দরজার কাছে গিয়ে দরজা খুলল আর সাথে সাথেই আবীর ঘর থেকে বের হয়ে এলো। আচলের ততক্ষণে জ্ঞান ফিরেছে। সবাই বিস্ময় নিয়ে আবীরের দিকে তাকিয়ে আছে। মরিয়ম জামিলা চিৎকার করে কাঁদতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।

প্রায় তিন মাস আগে আবীর হঠাৎ করে উধাও হয়ে গিয়েছিলো। কেউ আবীরকে কোথাও খুঁজে পায়নি। তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছিলো। কেউ কিছু বলতে পারিনি। শেষমেশ উপায় না দেখে সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছিলো। যে হারিয়ে যেতে চায় তাকে কেউ খুঁজে পায়না, এই ভেবে। কিন্তু এখন সবার প্রশ্ন হল, আবীর বন্ধ ঘরে কোথা থেকে এলো? নাকি সে এই তিন মাস ঘরের মধ্যেই ছিল। না, সেটা সম্ভব না। ঘরে তালা মারার আগে ঘরে কেউ ছিলনা, এটা তারা পুরোপুরি নিশ্চিত। তারপরে আবার সেই ঘরে অন্য কোনো পথ দিয়ে ঢোকাও যায়না। ওই ঘরে ঢোকার একমাত্র রাস্তা দরজা, যে দরজায় ছিল তালা মারা।

আবীর বসে আছে বসার ঘরের সোফায়। তাকে জীর্ণশীর্ণ দেখাচ্ছে। শুখিয়ে হাড় বের হয়ে গেছে। গায়ের শার্ট প্যান্ট দুইটাই ফালাফালা করে ছেড়া। চোখ বের হয়ে এসেছে। সমস্ত মুখে দাড়ি। মাথার চুল উস্কখুস্ক। স্থির হয়ে বসতে পারছে না। একটু পরপর কেঁপে কেঁপে উঠছে। এখনো সবাই তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সবার মনে অনেক প্রশ্ন। মরিয়ম জামিলা উঠে বসেছেন। তিনি বুঝে উঠতে পারছেননা কি করবেন। আবীরের বাবা রায়হান হোসেন হটাৎ আবীরকে প্রশ্ন করে বসলেন, “আবীর, তুই এতদিন কোথায় ছিলি?” মরিয়ম জামিলা তার স্বামীর গায়ে হাত রেখে বললেন, “থাক, পরে এসব জিজ্ঞেস করো। ওকে আগে স্বাভাবিক হতে দাও।” আবীরকে অনন্ত ওখান থেকে নিয়ে গেলো। অনেক ধাক্কা গেছে উপর দিয়ে বোঝাই যাচ্ছে। আবীরের ফিরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়লো। একে একে সবাই দেখতে আসলো। এবং সবশেষে সবার একটাই প্রশ্ন সে এলো কোথা থেকে? কিভাবেই বা এলো? সবাই আবীরকে ঘিরে ধরে প্রশ্ন করে। কিন্তু আবীর কোন উত্তর করেনা। কোন কথাই ওর মুখ দিয়ে বের হয়না।

এরপর প্রায় এক মাস হয়ে গেছে। একদিন বিকাল বেলা আবীর বসে আছে ওদের বাড়ির বারান্দায়। ওর মা হাতে করে চায়ের কাপ এনে আবীরের সামনে টি-টেবিলে রাখল। তখন আবীর বলল, “মা, একটু বসো। তোমার সাথে কথা আছে।” এই প্রথম আবীর কথা বলল। কিছুক্ষণের জন্য মরিয়ম জামিলা হকচকিয়ে গেলেন। তারপর পাশে রাখা চেয়ারে বসলেন।

-মা, রেনুমার কথা মনে আছে? আমাদের বাসার কাজের মেয়ে ছিল?
-হ্যাঁ।
-ওর কি আর কোনো খবর জানো?
-নাতো। কেন কি হয়েছে?
-মা, ও কেন বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছিলো জানো?
-না।
-আমার জন্য।
-তোর জন্য? মানে? কি বলছিস এসব?
-হ্যাঁ, মা। আমার জন্য। মা, তোমার সবাই জানতে চাও যে আমি কোথায় ছিলাম তাইনা?
-হ্যাঁ।
-আজ আমি তোমাদের সবাইকে বলব। তুমি কি একটু কষ্ট করে সবাইকে বসার ঘরে ডাকতে পারবে? আমি আসছি।

মরিয়ম জামিলা ভ্রু কুচকে কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, “আচ্ছা তুই আয়। আমি ডাকছি ওদের।”

বসার ঘরে সবাই বসে আছে। রায়হান হোসেন এবং মরিয়ম জামিলা ভ্রু কুচকে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। আর বাকি সবার মানে আচল, অহনা আর অনন্তের মনে উত্তেজনা কাজ করছে। আবীর বলতে শুরু করলো, “আমি ফিরে আসার পরে তোমরা নিশ্চয়ই দেখেছো আমার ঘরের আয়নাটা ভাঙ্গা?” অনন্ত বলল, “ড্রেসিং টেবিলের বড় আয়নাটা তো? হ্যাঁ দেখেছি, ওটা ভাঙ্গা ছিল। তুই ঘরের দরজা ধাক্কানোর আগে একটা শব্দ হয়েছিলো। মনে হয়, আয়নাটা ভাঙ্গার শব্দ।” আবীর বলল, “হ্যাঁ, ওটা আয়না ভাঙ্গার শব্দ ছিল। আমি ছিলাম আয়নার ওপাশে।” রায়হান হোসেন বলে উঠলেন, “মানে? এসব কি বলছিস?”

আবীর বলতে শুরু করলো। গত চার মাস আগে এক রাত্রে আমি আমার ঘর থেকেই হারিয়ে যাই। ওই আয়নার ওপাশে। ওই রাতে ঘুমানোর আগে আয়নার সামনে দাড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি, আমি নড়ছি, কিন্তু আমার প্রতিবিম্বটা নড়ছে না। খুব অবাক হই। কিন্তু পরক্ষনে ভাবি, ভুল দেখেছি। আয়নার সামনে থেকে সরে আসার পর কি মনে করে আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখি, আমার প্রতিবিম্ব আমার দিকে তাকিয়ে ভয়ঙ্কর ভাবে হাসছে কিন্তু আমি তার হাসি শুনতে পাচ্ছিনা। খুব ভয় পেয়ে যাই। ঘর থেকে বের হয়ে আসার জন্য দরজার কাছে গিয়ে দেখি আমি দরজা খুলতে পারছিনা। যে কোন কারনেই হোক, দরজা খুলছে না। ততক্ষণে আমি ভয়ে ঘামতে শুরু করেছি। হটাৎ একটা কণ্ঠ শুনতে পেলাম। কণ্ঠটা বলছে, “তুই আজ নরকে যাবি। তোর পাপের সাজা হবে।” কণ্ঠটা মেয়ের না ছেলের আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু এখনো কণ্ঠটা আমি মনে করতে পারছি। যাই হোক, তারপর যা দেখলাম তাতে আমার দম বন্ধ হয়ে যাবার কথা ছিল। আর আমার মনে আছে আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমি দেখলাম, আমার প্রতিবম্ব আয়নার ভিতর থেকে বের হয়ে আসলো। আমার খুব কাছে এসে আমার দুই হাত শক্ত করে ধরল। তার হাত দুইটা এতটাই শক্ত ছিল, মনে হচ্ছিলো কোন লোহা দিয়ে আমার হাত দুইটা সে চেপে ধরেছে। কোনভাবে ছাড়ানো সম্ভব ছিলনা। আমি ওইসময় আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করতে গেলাম, দেখলাম মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না। তখন হটাৎ মনে হল, আমি হয়ত স্বপ্ন দেখছি। সেটা হলে তো ভালোই হতো। কিন্তু না, সেটা স্বপ্ন ছিল না। আমার প্রতিবিম্ব সত্যি সত্যি আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো আয়নার কাছে। আমি তখন হাত পা ছড়াছড়ি করছি। কোন লাভ হচ্ছে না। আয়নার কাছে এসে সে নিজে আগে আয়নার ভিতর ঢুকল, তারপর আমাকে টেনে আয়নার মাঝে নিয়ে গেলো। আমি অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম, আমার হাত আয়নার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে আমি আয়নার ওপাশে চলে গেলাম। এতটুকু বলেই আবীর দম নিলো। আবীর ঘামছে। মাথা নিচু করে বসে আছে। রায়হান হোসেন বললেন, “তারপর কি হল?” আবীর বলল, “বাবা, তারপর কি হল, আমি বলতে পারবো না। তবে এতটুকু বলতে পারি, আয়নার ওপাশে গিয়ে দেখি সেখানে কোন আয়না নেই। এমনকি আমার সেই প্রতিবিম্বটাও নেই। তিন মাস ধরে আমি নরকের যন্ত্রণা ভোগ করেছি আর আয়নাটা তন্নতন্ন করে খুজেছি। শেষে যখন পেলাম আয়নাটা ভেঙ্গে ঘরে ফিরে এলাম।”

সবাই এর ওর দিকে তাকাচ্ছে। কেউ তাদের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। প্রকৃতি রহস্যময় এটা ঠিক, তাই বলে এতটা রহস্যময় হবে এটা তারা বিশ্বাস করতে পারছে না।
এটা কি আদৌ সম্ভব? রায়হান হোসেন বললেন, “কেন এমন হলো, তোর কাছে কোন ব্যাখ্যা আছে?” আবীর বলল, “হ্যাঁ আছে। তবে সেটা আমি কিভাবে বলব খুঁজে পাচ্ছি না। মা, আমি বললাম না, রেনুমা আমার কারনে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে?” মরিয়ম জামিলা বললেন, “হ্যাঁ।” আবীর বলল, “যে রাতে আমি আয়নার ওপাশে চলে যাই, তার কয়েকদিন আগে তোমরা কেউ বাসায় ছিলে না। রেনুমা বাসায় একা থাকায়, আমি ওকে আমার ঘরে নিয়ে গিয়ে ওর সর্বনাশ করি।” শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে আবীরের গলা ধরে আসছিল। হাত পা কাঁপছিল। হটাৎ আবীর কাঁদতে শুরু করলো। আর বলতে লাগলো, “মা, আমি পাপ করেছি, অনেক বড় পাপ। পাপের সাজাও পেয়েছি। আমি যখন রেনুমার উপর শুয়েছিলাম, রেনুমা হাউমাউ করে কাঁদছিল। কেউ দেখছিল না। শুধু আয়নার ওপাশে দাড়িয়ে আমার ভালো মনের প্রতিবিম্বটা দেখছিল। আমার সেই প্রতিবিম্বটাই আমাকে নরকের যন্ত্রণা দিয়েছে। মা, আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না, কিসের মধ্যে দিয়ে আমি তিনটা মাস পার করেছি। মা, আমি এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।” সবাই হতবাক হয়ে আবীরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবীর কেঁদেই যাচ্ছে। কারোর মুখে কোন কথা আসছে না। কে কি বলবে? কারোরই কিছু বলার নেই। রায়হান হোসেন হটাৎ তার স্ত্রীকে বললেন, “তুমি আমার সাথে ঘরে আসো। কথা আছে।”

আজ আবীরের বিয়ে। কনে রেনুমা বিরাট একটা ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। সে এখনো পর্যন্ত কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। এমনকি সে কল্পনাও করতে পারিনি যে মানুষটা তার সর্বনাশ করেছিল, সেই মানুষটাই তাকে বিয়ে করছে। রেনুমা বসে আছে তাদের বাসর ঘরে। আবীর ঘরে ঢুকল। রেনুমার পাশে বসে সে হাত জোড় করে প্রথম কথা বলল, “আমাকে আমার ভুলের জন্য মাফ করে দাও।” রেনুমা তখন অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “আরে আল্লাহ, ছিঃ ছিঃ কি করেন? আপনাকে মাফ চাইতে হবেনা। আপনি আমারে বিয়ে করছেন এতেই আমার দিল খুশ।” আবীর রেনুমার কথা শুনে বেশ অবাক হয়েই হালকা একটা হাসি দিলো। তারপর কি মনে করে একবার তার ঘরের নতুন আয়নার দিকে তাকাল। অবাক হয়ে দেখল। তার প্রতিবিম্ব আয়নার ওপাশে দাড়িয়ে আছে। চোখ বন্ধ করে হাসছে। তবে এই হাসিতে আনন্দ আছে। ভয় নেই। সম্মতি আছে। বীভৎস কোন আর্তনাদ নেই।

১০ thoughts on “আয়নার ওপাশে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *