যদি লাইগ্যা যায়




খুব প্রচলিত কথা বাঙালি মাগনা পেলে নাকি আলকাতরা খেতেও রাজী। বিনা পরিশ্রমে টাকা কামানোর ধান্দা বাঙালির থেকে ভাল আর কেউ জানে কি না জানি না। বিনা পরিশ্রমে টাকা কামানোর জন্য আমরা যে এক পায়ে খাড়া সেটার প্রমাণ হচ্ছে চিটার জেনেও ডেস্টিনি জাতীয় কোম্পানিগুলোর পিছনে কিংবা শেয়ার মার্কেটে জীবনের সব সঞ্চয় ঢেলে দেই। আর শেষে সব হারিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন কিংবা ডিএসই তে অর্থমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা নিয়ে মিছিল করে সাংবাদিকদের সামনে কান্নাকাটি করি।

লটারি ঠিক তেমনই এক বিষয়। লটারির প্রতি আমাদের আগ্রহের কোন অভাব নেই। সেটা আমেরিকা যাবার জন্য ডিভি লটারি, হাসপাতাল বানানোর জন্য ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন লটারি কিংবা বসুন্ধরা সিটিতে ২০০ টাকার শপিং করলেই ১৫০০ সিসি গাড়ি পাবার লটারিই হোক না কেন তাতে কিছু যায় আসে না, লটারি হলেই হল। জীবনে একবারও লটারি খেলে নি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর।

আপনাদের কাছে একটা প্রশ্ন, লটারি পেয়েছে এমন কাউকে কি কখনো দেখেছেন? যদি না দেখে থাকেন কিংবা এমন কারো সাথে আপনার পরিচয় না থাকে তাহলে আপনাদের জন্য, হ্যাঁ কেবল আপনাদেরই জন্য আমি নিয়ে এসেছি এক দারুন অফার। আমার সাথে ভালভাবে পরিচিত হয়ে নিন। কারন আমিই সেই বাঙালি যে কি না জীবনে অন্তত একবার লটারি জিতেছিলাম। যারা নিজেদের দুর্ভাগা বলে ভেবে থেকেন তারা চাইলে আমার কপালের সাথে আপনার কপালটা একটু ঘষে দেখতে পারেন ভাগ্য ফিরে কি না। এর জন্য আমি কিন্তুক কোন চার্জ নিমু না। তয় খুশি হইয়া কিছু দিবার চাইলে আমি না করুম না।

সময়টা ১৯৯৪ সাল। ক্লাস সিক্সে পড়ি। একদিন স্কুলে গিয়ে দেখি স্যারের টেবিলে এক বান্ডিল লটারির টিকেট। সবাই লাইন দিয়ে দিয়ে টিকেট কিনছে। শুনলাম সারা স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে লটারির টিকেট বিক্রি চলছে। সবাইকে কমপক্ষে একটা টিকেট কিনতেই হবে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তহবিল সংগ্রহ চলছে। কি আর করা। ১০ টাকা দিয়ে ১ টা টিকেট কিনলাম। বাসায় এসে বইয়ের ভিতরে রেখে টিকেটটার কথা ভুলে গেলাম।

যেদিন লটারি হয় সাধারনত তার পরদিন রেজাল্ট পত্রিকায় আসে। স্কুলে গিয়ে দেখি সবাই খুব উত্তেজিত। কারন লটারির রেজাল্ট হয়েছে। টিফিনের আগেই জানা হয়ে গেল স্কুলের কেউ লটারি পায় নি। আমার তখন মনে হল আমিও তো একটা লটারির টিকেট কিনেছিলাম। বাসায় ফিরে টিকেটটা অনেক খুঁজে বের করে পত্রিকা নিয়ে বসলাম। প্রথমে ২০ লাখ টাকার প্রথম পুরষ্কার। নাই। তারপর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পুরষ্কার। নাই। এইবার ১০০০০ টাকা মূল্যমানের ১০ টি পঞ্চম পুরষ্কার। আমার টিকেটটার নাম্বার ছিল খ২৬৫২৫৫। হঠাত খেয়াল করলাম যে আমার টিক্টের নাম্বারের সাথে হুবুহু মিল একটা নাম্বার পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে। আর কে পায়, আমি সাথে সাথেই চিৎকার “আম্মা, লটারি লাগসে।“ :নৃত্য: :নৃত্য: :নৃত্য:

মহামতি নিউটন বলে গিয়েছেন, “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রহিয়াছে।” আসেন দেখি লটারি পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে। টিকেট মিলানোর পরেই আম্মার চিৎকার “লিনা, রূপকের তো লটারি লাগসে।“ মিনিট পাঁচেকের মাঝে পুরা পাড়ায় এই খবর পৌঁছে গেল। আর মিনিট দশেকের মাঝেই আমি নিজেকে এলাকার বড় বোন আর খালাম্মাদের চিপায় পিষ্ট অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। কিছুক্ষণ “হায় আল্লাহ, তাই তো, আরে আসলেও তো লটারি লাগসে, দ্যাখ দ্যাখ একই নাম্বার, ভাবি কি খাওয়াইবেন?” এইধরনের চিল্লাচিল্লি চলল। ভাব দেখে মনে হচ্ছিল লটারি আমার লাগে নাই, লেগেছে যারা দেখতে এসেছে তাদের। যদিও তাঁদের এই বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসের আড়ালে নিজেদের লটারি না পাওয়ার হতাশাও চোখের কোণে বারেবারেই উঁকি দিচ্ছিল। একেকজন লটারির টিকেটগুলোকে এমনভাবে স্পর্শ করছিল তাতে আমি নিশ্চিত নিজেদের ধর্মগ্রন্থকেও তারা সেইরকম যত্ন করে স্পর্শ করে নি কোনদিন।

পরদিন স্কুলে গিয়ে দেখি স্কুল ক্যাপাসে আমি পুরাই হিরো বনে গেছি। যেইসব ছেলে আগে ধারেকাছেও ভিড়ত না তারাই দেখি এসে আমাকে তেল দেওয়া শুরু করে দিয়েছে। এইসব দেখে বুঝতে পেরেছিলাম আসলে লটারি পাওয়াটা খুব একটা খারাপ না।

এরপর থেকে কত চন্দ্রাভূক অমাবশ্যা কেটে গেল। আর কোনদিন লটারি লাগলো না। এমন কাউকে দেখলামও না যে কি না জীবনে লটারি পেয়েছে। লটারি পাবার পর এক খালাম্মা আমার মাকে বলেছিলেন, “ভাবি, আপনার ছেলে তো খুব লাকি। দেইখেন মেয়েরা তার পিছে লাইন দিবে বিয়ের জন্য।“

খালাম্মা কি আর জানত আজকালকার মেয়েরা এইসব চিন্তাভাবনাকে দুই পয়সা দিয়েও দাম দেয় না। তাই আজও বিয়েটাই করতে পারলাম না। যেই মেয়েকে পছন্দ করতাম সেও তিন বছর আগে বিয়ে করে সুখে-শান্তিতে সংসার করছে। এইসব দেখে ভাবছি একটা বাণী দিব। যদি কোনদিন বাই চান্স বিখ্যাত হয়ে যাই তাহলে স্কুল কলেজে হয়ত এই বাণী গুরুবানী হিসেবে সোনার হরফে না হোক কীবোর্ডের হরফে লেখা থাকবে। বাণীটা হচ্ছে

হে বৎস, মনে রাখবা লটারি পাইলেই যেমন ভাগ্যবান হওয়া যায় না, তেমনি মেয়েদের ভালবাসাও পাওয়া যায় না। মেয়েদের ভালবাসা পাইতে হইলে অবশ্যই তোমার মানিব্যাগ এর সাইজ ভাল হতে হইবেক। কারন মেয়েদের ভালবাসা পুরুষের মানিব্যাগের পুরুত্তের সমানুপাতে ক্রিয়া করে।

১৪ thoughts on “যদি লাইগ্যা যায়

  1. আমি একবার এক লটারিতে ১০টাকা
    আমি একবার এক লটারিতে ১০টাকা দামের কলম পেয়েছিলাম।ওটাই আমার প্রথম এখনো পর্যন্ত ওটাই আমার শেষ।

  2. আমার লটারি ভাগ্য খুব খারাপ…
    আমার লটারি ভাগ্য খুব খারাপ… খুবই খারাপ। :কানতেছি:

    লেখা পড়ে মজা পেলুম। তবে একটা ছোট্ট ব্যাকরণগত ভুল আছে। ডানার কাছ থেকে এটা আশা করিনা তাই বলে দিচ্ছি।

    বিনা পরিশ্রমে টাকা কামানোর জন্য আমরা যে এক পায়ে রাজী সেটার প্রমাণ হচ্ছে চিটার জেনেও ডেস্টিনি জাতীয় কোম্পানিগুলোর পিছনে কিংবা শেয়ার মার্কেটে জীবনের সব সঞ্চয় ঢেলে দেই।

    “এখানে এক পায়ে রাজী” এটা একটা ব্যাকরণগত ভুল। হবে এক পায়ে খাড়া। 😀

  3. আমি একবার এয়ারটেলে ২০০ টাকা
    আমি একবার এয়ারটেলে ২০০ টাকা রিচার্জ করে লটারীতে ভ্যালেন্টাইন গিফট হিসেবে বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে “মিশন ইমপসিবল ফোরঃ গোস্ট প্রোটকল”-এর কাপল টিকিট পেয়েছিলাম!
    এদিকে আমার কোন কাপল নাই! বাধ্য হয়ে এক ফ্রেন্ডকে সাথে করে নিয়ে গেলাম…
    পুরো হলে সব জোড়ায় জোড়ায় গা ঘেষা ঘেষি করে বসা… শুধু আমরা দুইজনই ব্যতিক্রমী জোড়া! কেউ কেউ আবার আমাদের দিকে ভ্রুকুচকে তাকায়… কে জানে “গে কাপল” ভাবছে কিনা! 😛 :হাসি: :হাসি: :হাসি:
    তয়- পুরো সিনেমাটা আমাগো মত মনোযোগ দিয়া আর কেউ ইনজয় করে নাই এইটা একদম শিউর! 😉

  4. ওরে লটারি রে……
    আমারে

    ওরে লটারি রে…… :পার্টি: :পার্টি:
    আমারে দেইখা রাখেন, জীবনে একটা টাকাও শুধু শুধু লটারির পেছনে ইনভেস্ট করিনাই :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান:

    1. আমিও না! তবে ক্লাস সিক্সে
      :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

      আমিও না! তবে ক্লাস সিক্সে থাকতে একবার একটাকা দিয়ে আইস্ক্রিম খাওয়ার সময় আইস্ক্রিমওয়ালার লটারির চাকতি ঘুরিয়ে ৩টা আইস্ক্রিম পেয়েছিলাম!

      ঐ ১টাকাকে ইনভেস্ট বলা যায় না নিশ্চয়ই… 😛

  5. আমার লটারি ভাগ্য আবার
    আমার লটারি ভাগ্য আবার মোটামুটি ভালই। এর আগে ছ​য়বার লটারিতে জিতেছি, এর মাঝে দুইবার ফার্স্ট পুরস্কার। তবে সবগুলা কম মানের লটারি। আমার জেতা পুরস্কারগুলো হল​, ২০০০টাকা, পেন্সিল বক্স, মগ, প্রেসার কুকার, ইস্ত্রি আর ফাউন্টেন পেন। 😀 😀 😀

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *