বিলুপ্তির পথে বাবুই

বাবুই Ploceidae গোত্রের অন্তর্গত একদল প্যাসারাইন পাখি। খুব সুন্দর বাসা বোনে বলে এরা “তাঁতী পাখি” (Weaver Bird) নামেও পরিচিত। এদের বাসার গঠন বেশ জটিল আর আকৃতি খুব সুন্দর। কয়েক প্রজাতির বাবুই একাধিক কক্ষবিশিষ্ট বাসা তৈরি করতে পারে।তুতির সাথে এরা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এরা মূলত বীজ-ভোজী পাখি, সে জন্য তাদের ঠোঁটের আকৃতি বীজ ভক্ষণের উপযোগী চোঙাকার আর গোঁড়ায় মোটা। অধিকাংশ বাবুই প্রজাতির আবাস সাব-সাহারা আফ্রিকায়। তবে কয়েকটি প্রজাতি এশিয়ায় স্থায়ী। অল্প কয়েকটি প্রজাতিকে বিভিন্ন দেশে অবমুক্ত করা হয়েছে।এরা বেশ দলবদ্ধ প্রাণী আর কলোনি করে জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত।বেশিরভাগ বাবুই প্রজাতির পুরুষ সদস্য বেশ উজ্জ্বল রঙের হয়। কিছু প্রজাতি তাদের প্রজনন মৌসুমে বর্ণের ভিন্নতা প্রদর্শন করে। বাংলাদেশে তিন ধরনের বাবুই দেখা যায়:
১।দেশি বাবুই (Ploceus philippinus),
২।দাগি বাবুই (Ploceus manyar)

৩।বাংলা বাবুই (Ploceus bengalensis)।

@@বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগত/রাজ্য: Animalia
পর্ব: Chordata
শ্রেণী: Aves
বর্গ: Passeriformes
উপ-বর্গ: Passeri
পরিবার: Ploceidae Sundevall

@@বাসস্থান:
বাবুই পাখির বাসা উল্টানো কলসির মত দেখতে। বাসা বানাবার জন্য বাবুই খুব পরিশ্রম করে। ঠোঁট দিয় ঘাসের আস্তরণ সারায়। যত্ন করে পেট দিয়ে ঘষে(পালিশ করে) গোল অবয়ব মসৃণ করে। শুরুতে দুটি নিম্নমুখী গর্ত থাকে। পরে একদিক বন্ধ করে ডিম রাখার জায়গা হয়। অন্যদিকটি লম্বা করে প্রবেশ ও প্রস্থান পথ হয়। বাবুইয়ের বাসা করার জন্য প্রয়োজন হয় নলখাগড়া ও হোগলার বন। কিন্তু দেশে নল ও হোগলার বন কমে যাওয়ায় এই বাবুইয়ের সংখ্যা খুবই কম। তা ছাড়া এই পাখি যেখানে বাস করে—নল ও হোগলার বনে—সেখানে মানুষের চলাচল থাকে। এরা সাধারণত খুটে খুটে বিভিন্ন ধরনের বীজ, ধান, ভাত, পোকা, ঘাস, ছোট উদ্ভিদের পাতা, ফুলের মধু-রেণু ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারণ করে। গ্রীষ্মকাল এদের প্রজনন ঋতু। তারা সাধারণত কাটা জাতীয় বৃক্ষে বাসা তৈরি করে এবং আহার সংগ্রহে সুবিধা হয় এমন স্থান নির্বাচন করে।

@@কথিত আছে: রাতে বাসায় আলো জ্বালার জন্য বাবুই জোনাকি ধরে এনে গোঁজে।
@@বিলুপ্তির পথে বাবুই: কালের আবর্তে গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি।বাংলাদেশে বাংলা ও দাগি বাবুই এর প্রজাতি বিলুপ্তির পথে, তবে দেশি বাবুই এখনো দেশের সব গ্রামের তাল, নারিকেল, খেজুর, রেইনট্রি গাছে দলবেঁধে বাসা বোনে। এরা সাধারণত মানুষের কাছাকাছি বসবাস করে, তাই দেখা যায় এদের বাসা মানুষের হাতের নাগালের মাত্র পাঁচ অথবা ছয় ফুট উপরে। ফলে অনেক অসচেতন মানুষ এদের বাসা ভেঙে ফেলে আর একারণেই এদের সংখ্যা রহস্যজনক ভাবে কমে যাচ্ছে।

গ্রামবাংলায় এখন আর আগের মতো বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা চোখে পড়ে না। আগে নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরের বিভিন্ন এলাকায় বেশ দেখা যেত বাবুই পাখির বাসা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে আজ এ পাখিটি আমরা হারাতে বসেছি। সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে শিল্পী, স্থপতি এবং সামাজিক বন্ধনের কারিগর বাবুই পাখি ও তার বাসা। খড়, তালগাছের কচি পাতা, ঝাউ ও কাশবনের লতাপাতা দিয়ে উঁচু তালগাছে চমৎকার বাসা তৈরি করত বাবুই পাখি। সেই বাসা দেখতে যেমন আকর্ষণীয় তেমনি মজবুত। প্রবল ঝড়েও তাদের বাসা ভেঙ্গে পড়ে না। বাবুই পাখির শক্ত বুননের এ বাসা টেনেও ছেঁড়া যায় না। বাবুই পাখির অপূর্ব শিল্পশৈলীতে বিস্মিত হয়ে কবি রজনীকান্ত সেন তার কবিতায় লিখেছিলেন:

বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই
কুঁড়েঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই।
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকার পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে।

বাবুই পাখি বাসা তৈরির পর সঙ্গী খুঁজতে যায় অন্য বাসায়। সঙ্গী পছন্দ হলে স্ত্রী বাবুইকে সাথী বানানোর জন্য কতই কিছু না করে এরা। পুরুষ বাবুই নিজেকে আকর্ষণ করার জন্য খাল- বিল ও ডোবায় ফুর্তিতে নেচে নেচে বেড়ায় গাছের ডালে ডালে। বাসা তৈরি কাজ অর্ধেক হলে কাঙ্ক্ষিত স্ত্রী বাবুইকে সেই বাসা দেখায়। বাসা পছন্দ হলেই কেবল সম্পর্ক গড়ে। স্ত্রী বাবুই পাখির বাসা পছন্দ হলে বাকি কাজ শেষ করতে পুরুষ বাবুইয়ের সময় লাগে চারদিন। স্ত্রী বাবুই পাখির প্রেরণা পেয়ে পুরুষ বাবুই মনের আনন্দে শিল্পসম্মত ও নিপুণভাবে বিরামহীন কাজ করে বাসা তৈরি করে। অফুরন্ত যৌবনের অধিকারী প্রেমিক যত প্রেমই থাক প্রেমিকার জন্য, প্রেমিকার ডিম দেয়ার সাথে সাথেই প্রেমিক বাবুই খুঁজতে থাকে আরেক প্রেমিকা। পুরুষ বাবুই এক মৌসুমে ৬টি বাসা তৈরি করতে পারে। ধান ঘরে উঠার মৌসুম হলো বাবুই পাখির প্রজনন সময়। দুধ ধান সংগ্রহ করে স্ত্রী বাবুই বাচ্চাদের খাওয়ায়। এরা তালগাছেই বাসা বাঁধে বেশি। সঙ্গত কারণেই বাবুই পাখি তালগাছ ছেড়ে ভিন্ন গাছে বাসা বাঁধছে। একসময় বাংলাদেশের সব জেলায় প্রায় সবখানেই দেখা যেত শত শত বাবুই পাখির বাসা।
কিন্তু অপরিকল্পিত ভাবে তাল গাছ কাটা ও এক শ্রেণির মানুষ অর্থের লোভে বাবুই পাখির বাসা সংগ্রহ করে শহরে ধনীদের নিকট বিক্রি করার ফলে বাবুই পাখি আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে বিলুপ্তির পথে । আর এই বাবুই পাখির বাসাগুলো শোভা পাচ্ছে ধনীদের ড্রইং রুমে।
মন্তব্য: আমদের কি এগিয়ে আসা উচিত নয় এই বিপন্ন পাখিটির যত্নে।
তথ্য সুত্রঃ বাংলাদেশের পাখি, ব্লগ, ফেসবুক, পত্রিকা ও বিভিন্ন সাইট। https://www.facebook.com/golammaula.akas/posts/586490331418896
https://www.facebook.com/#/golammaula.akas

৩ thoughts on “বিলুপ্তির পথে বাবুই

  1. বাবুই পাখির বাসা দেখে মুগ্ধ
    বাবুই পাখির বাসা দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। এতো ছোট একটা পাখি শুধু পা এবং ঠোঁট দিয়ে এমন নিপুণ শিল্পকর্ম কিভাবে সাধন করে ভাবা যায় না।
    লেখাটা ভালো লাগলো। তবে পাখি এবং পাখির বাসার কিছু ছবি যোগ করলে আরও ভালো হতো।

    1. ছবির কথা বলতে গিয়ে দেখি আতিক
      ছবির কথা বলতে গিয়ে দেখি আতিক ভাই অলরেডি সেকথা বলে ফেলেছেন। বাবুই পাখি হারিয়ে যাচ্ছে শুনে খারাপ লাগলো। সমস্যা নাই, রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও অচিরেই হারিয়ে যাবে। ক্রিকেট টিমের জার্সিতে যে বাঘের ছবি থাকবে সেটা ইন্দিয়া থেকে ধার করে আনতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *