বিশ্বাস ও জীবন

একটাই তো জীবন। সুখ সাফল্য আনন্দ খ্যাতি পার্থিব বা আত্মিক যা কিছু অর্জন তা তো এই এক জীবনেরই ফসল। তাহলে রোগ শোক অভাব ব্যর্থতা হতাশাকে কেন প্রশ্রয় দেবেন? যেখানে আপনি নিজেই পারেন নিজের সবকিছু বদলে দিতে। আর জীবন বদলানোর জন্যে, সফল জীবনের পথে যাত্রা শুরুর জন্যে অনেক প্রস্তুতির কোনো প্রয়োজন নেই। অর্থ-বিত্ত, বংশমর্যাদা, শান-শওকত, জ্ঞান-গরিমা, ডিগ্রি-পদবি না থাকলেও কোনো অসুবিধা নেই। প্রয়োজন শুধু মুক্ত বিশ্বাসের। মুক্ত বিশ্বাসই বদলে দিতে পারে আপনার জীবনের সবকিছুকে।


একটাই তো জীবন। সুখ সাফল্য আনন্দ খ্যাতি পার্থিব বা আত্মিক যা কিছু অর্জন তা তো এই এক জীবনেরই ফসল। তাহলে রোগ শোক অভাব ব্যর্থতা হতাশাকে কেন প্রশ্রয় দেবেন? যেখানে আপনি নিজেই পারেন নিজের সবকিছু বদলে দিতে। আর জীবন বদলানোর জন্যে, সফল জীবনের পথে যাত্রা শুরুর জন্যে অনেক প্রস্তুতির কোনো প্রয়োজন নেই। অর্থ-বিত্ত, বংশমর্যাদা, শান-শওকত, জ্ঞান-গরিমা, ডিগ্রি-পদবি না থাকলেও কোনো অসুবিধা নেই। প্রয়োজন শুধু মুক্ত বিশ্বাসের। মুক্ত বিশ্বাসই বদলে দিতে পারে আপনার জীবনের সবকিছুকে।

আমি পারি, আমি পারবো- ছোট্ট একটি বাক্য। কিন্তু এই ছোট বাক্যটির মধ্য দিয়ে বিশ্বাসের যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ঘটে সেটাই প্রভাবিত করে আপনার সকল কর্মকাণ্ড। ধরুন, আপনার বাড়ির সামনের রাস্তায় ১০০ ফুট লম্বা এবং ১ ফুট চওড়া ৬ ইঞ্চি পুরু একটি তক্তা বিছিয়ে বলা হলো, এর ওপর দিয়ে হেঁটে যান, আপনি কোনো দ্বিতীয় চিন্তা ছাড়াই হেঁটে যাবেন। কেউ বা হয়তো দৌড়ও দেবেন। কারণ আপনি বিশ্বাস করেন, আপনি জানেন যে, আপনি পারবেন। আপনার পা ফেলার জন্যে ১ ফুট চওড়া জায়গাই যথেষ্ট।

কিন্তু এ তক্তাটাই যদি রাস্তার এপারের বহুতল ভবনের ছাদ থেকে ওপারের বহুতল ভবনের ছাদে লাগিয়ে দেয়া হয়, আপনি এই ১০০ ফুট দূরত্ব অতিক্রম করতে পারবেন না। এক পা দুপা এগোনোর পরই হাত পা কাঁপতে শুরু করবে, মাথা ঘুরতে শুরু করবে। কাঁপতে কাঁপতে একসময় হয়তো পড়েই যাবেন, একাকার হয়ে যাবে আপনার হাড়-মাংস।

অথচ চোখের সামনেই আপনি দেখছেন একজন রাজমিস্ত্রি বাঁশ বেয়ে তরতর করে ওপরে উঠে যাচ্ছে। ৮/১০ তলা ভবনের দেয়াল প্লাস্টার করছে দুই বাঁশের মাঝখানে বিছানো এক ফুট চওড়া তক্তার ওপর দাঁড়িয়ে। একজন কাঠমিস্ত্রি পাতলা কাঠের কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে টিনের চাল বা ছনের ছাউনি লাগাচ্ছে। রাজমিস্ত্রি বা কাঠমিস্ত্রি ৮/১০ তলা ভবনের প্লাস্টার করতে গিয়ে বা টিনের চাল লাগাতে গিয়ে পড়ে গেছে, এমন কথা আপনি কখনো শুনেছেন? শোনেন নি। কেন? কারণ সে বিশ্বাস করে ৭০/৮০/১০০ ফুট ওপরের কাঠের তক্তায় দাঁড়িয়ে সে দেয়াল প্লাস্টার করতে পারবে, ছাদে উঠেও অনায়াসে টিন লাগাতে পারবে। বিশ্বাসই তার মধ্যে সৃষ্টি করেছে এই স্বতঃস্ফূর্ত কর্মদক্ষতা।

স্বাভাবিকভাবে আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, বিশ্বাস কীভাবে কর্মদক্ষতা সৃষ্টি করে। এর বৈজ্ঞানিক উত্তর খুব সহজ। বিশ্বাসের প্রথম প্রভাব পড়ে মনে। মন প্রোগ্রাম পাঠায় মস্তিষ্কে। আর মস্তিষ্ক আপনার পারার ইচ্ছাটা বাস্তবতায় রূপান্তরিত করে।

আবার আপনি প্রশ্ন করতে পারেন- মন কী? নোবেল পুরস্কারবিজয়ী নিউরোসায়েন্টিস্ট রজার স্পেরি ‘Mind, Brain and Humanist Values’ নিবন্ধে ৫০ কোটি বছরের বিবর্তনের সর্বোচ্চ অর্জন’ বলে অভিহিত করেছেন মনকে। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী স্যার জন একল্‌স Evolution of the Brain : Creation of the Self’ গ্রন্থে মনকে বর্ণনা করেছেন আত্মসচেতন, সক্রিয়, অনুসন্ধিৎসু স্বতন্ত্র প্রক্রিয়ারূপে। আর বিখ্যাত কানাডীয় নিউরোসার্জন ডা. ওয়াইল্ডার পেনফিল্ড তার ‘The Mystery of the Mind’ ‘ গ্রন্থে আরো স্পষ্ট করে বলেছেন ‘মস্তিষ্ক হচ্ছে কম্পিউটার যা মনের প্রোগ্রাম অনুসারে পরিচালিত হয়।’ তাই আমরা নিঃসংশয়ে বলতে পারি- মন এক বিশাল স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া যা পরিচালিত করে মস্তিষ্ককে। আর মস্তিষ্ক পরিচালিত করে আপনার সকল শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমকে।

মস্তিষ্ককে নিউরোসায়েন্টিস্টরা সবচেয়ে আধুনিক কম্পিউটারের চেয়েও কমপক্ষে ১০ লক্ষ গুণ শক্তিশালীরূপে বর্ণনা করেছেন। মস্তিষ্ক নিয়ে যত গবেষণা করছেন ততই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছেন বিশাল সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে তীরে ধেয়ে আসা ঢেউই কেবল তারা গুণছেন। এমনকি মস্তিষ্কের মাত্র একটি বিষয়ও যদি আমরা দেখি তাহলেও এর বিশাল কর্মক্ষমতা ও প্রতিটি মানুষের অফুরন্ত সম্ভাবনা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করতে পারবো।

মস্তিষ্কে ১০০ বিলিয়ন নিউরোন সেল রয়েছে। প্রতিটি নিউরোন ১ হাজার থেকে ৫ লক্ষ নিউরোনের সাথে সংযুক্ত। প্রতিমুহূর্তে কমপক্ষে ১০০ ট্রিলিয়ন সংযোগ ঘটছে মস্তিষ্কে। প্রতিটি নিউরোন মস্তিষ্কের যেকোনো নিউরোনের সাথে সংযোগ স্থাপনে সক্ষম। কতগুলো সংযোগ সম্ভব? যুক্তরাষ্ট্রে মেডিটেশন সংক্রান্ত গবেষণার অগ্রপথিক হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের প্রফেসর ডা. হার্বার্ট বেনসন খুব চমৎকারভাবে বলেছেন, ‘সংখ্যাটি হবে : ২৫,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০, ০০০,০০০,০০০। এটাকে অন্যভাবেও দেখতে পারেন- আপনি আপনার টেবিলে একটার ওপর একটা সাধারণ সাইজের টাইপ করার কাগজ রাখুন। রাখতে থাকুন। এটা উঁচু হতে থাকবে। আপনি যদি আপনার মস্তিষ্কের সম্ভাব্য নিউরোন সংযোগ-সংখ্যার সমসংখ্যক কাগজ রাখতে যান, তাহলে কাগজের ঢিবি উঁচু হতে হতে চাঁদ পার হয়ে সৌরজগৎ পার হয়ে গ্যালাক্সি পার হয়ে যাবে। এমনকি আমাদের জানা মহাবিশ্বের সীমানা (১৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ) পার হয়ে যাবে। তারপরও কাগজ রয়ে যাবে।’

ড. বেনসনের এ বিবরণ থেকে মানব মস্তিষ্কের অফুরন্ত সম্ভাবনা সম্পর্কে আমরা কিছুটা ধারণা করতে পারি। নিউরোসায়েন্টিস্টরা সর্বশেষ গবেষণায় দেখেছেন, আপনি যখন আপনার মস্তিষ্কে নতুন বিশ্বাস, নতুন ধারণা, নতুন স্বপ্ন প্রদান করেন, তখন মস্তিষ্কের নিউরোনে নতুন সংযোগপথ রচিত হয়। একই বিশ্বাস, একই স্বপ্ন, একই ধারণা, একই কল্পনার পুনরাবৃত্তি এই সংযোগপথকে রাখে ব্যস্ত ও সক্রিয়। মস্তিষ্কের বিশেষ বিশেষ অংশ উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। বদলে যায় মস্তিষ্কের কর্মকাঠামো। আপনার সকল মনোদৈহিক প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় ভাবে কাজ করতে শুরু করে লক্ষ্যের বাস্তবায়নে। সহজ-স্বতঃস্ফূর্ততায় আপনি আপনার কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। মুক্ত বিশ্বাসই আপনার সকল কর্মকাণ্ডে এভাবে সূচিত করে এই মৌলিক পরিবর্তন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *