কৃষ্ণকন্যা

(১)

অভির মেজাজ এখন খারাপ। মেজাজ খারাপ হবার কারণ, এখন অভির মন খারাপ। অভির যখন মন খারাপ হয়, তখন তার মেজাজ খারাপ হতে শুরু করে। তার মন খারাপের কারণ, আনিকার ডান চোখের কোণায় এক ফোঁটা জল চিকচিক করছে। আনিকার চোখে জল দেখলে তার মন খারাপ হয়। মন খারাপ হলে, তার মেজাজ খারাপ হতে শুরু করে।

অভি মেজাজ খারাপ করে বলল, “ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদবা না বলতেছি।”
আনিকার শীতল গলায় বলল, “স্যরি, আমি ভুলে গিয়েছিলাম কালো মেয়েদের কাঁদতেও মানা।”
-আচ্ছা, সবখানে এই গায়ের রংয়ের কথাটা তুলে নিজেকে নিজেই খোঁটা দেয়াটা কি তোমার মুদ্রাদোষ?
:কী করব বল! সবকিছুর শেষে এটাই তো সত্যি যে আমি একটা কালো মেয়ে।

(১)

অভির মেজাজ এখন খারাপ। মেজাজ খারাপ হবার কারণ, এখন অভির মন খারাপ। অভির যখন মন খারাপ হয়, তখন তার মেজাজ খারাপ হতে শুরু করে। তার মন খারাপের কারণ, আনিকার ডান চোখের কোণায় এক ফোঁটা জল চিকচিক করছে। আনিকার চোখে জল দেখলে তার মন খারাপ হয়। মন খারাপ হলে, তার মেজাজ খারাপ হতে শুরু করে।

অভি মেজাজ খারাপ করে বলল, “ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদবা না বলতেছি।”
আনিকার শীতল গলায় বলল, “স্যরি, আমি ভুলে গিয়েছিলাম কালো মেয়েদের কাঁদতেও মানা।”
-আচ্ছা, সবখানে এই গায়ের রংয়ের কথাটা তুলে নিজেকে নিজেই খোঁটা দেয়াটা কি তোমার মুদ্রাদোষ?
:কী করব বল! সবকিছুর শেষে এটাই তো সত্যি যে আমি একটা কালো মেয়ে।
-কোথা থেকে কথা কোথায় নিয়ে যাও! আমি বলেছি, সাদা কাক জিনিসটা আমার দারুণ লাগে। দারুণ লাগার কারণটা ছিল, আমাদের দেশে সচরাচর সাদা কাক দেখা যায় না। নতুন কিছুর প্রতি মানুষের সবসময়েই আকর্ষণ থাকে। সে কারণেই জিনিসটা আমার পছন্দের। এর মাঝ থেকে তোমার গায়ের রংয়ের কথা তুলে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদার তো কোন মানে নেই।
:আসলেই মানে নেই। আমার এটা বোঝা উচিত হয় নি যে, সাদা কাকের কথা তুলে তুমি আমাকে মনে করিয়ে দিলে, আমার চেয়ে সুন্দরী বহু মেয়ে তোমার জন্য পাগল। আমি যেন তোমাকে শাসন করার চেষ্টা না করি। তুমি ইচ্ছে করলে সিগারেট খাবে; রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে যাবে, দুপুর একটায় ঘুম থেকে উঠবে। আমার কিচ্ছুটি বলার অধিকার নেই। আমার চেয়ে সুন্দরী বহু মেয়ে পড়ে আছে, তোমার জন্য।

অভি বিরক্ত হয়ে উঠে গেল।

(২)

এই মুহূর্তে ঘটনার প্রেক্ষাপট থেকে আমরা খানিকটা ঘুরে আসতে পারি। ততক্ষণ, প্রথম পরিচ্ছেদের রোমান্টিক বিরহের আবহটা একপাশে তুলে রাখাই ভাল। কারণ, আমাদের মূল গল্পে রোমান্টিসিজমের খুব বেশি ভূমিকা নেই।

আমাদের গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আনিকা ক্লাস ফাইভে জেলার মধ্যে প্রথম হয়ে বৃত্তি পেয়েছিল। ক্লাস এইটে খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে জেলায় তৃতীয় হয়ে বৃত্তি পেয়েছিল। SSC আর HSC দু’টোতেই গোল্ডেন এ+ পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পদার্থবিদ্যায় সম্মান পড়ছে।

মেয়ে এতটা মেধাবী আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অধিকারী হবার পরেও যখন আনিকার বাবা মা সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পরই বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লাগলেন, তখন আনিকার বিস্ময়ের পরিমাণটা ছিল খুব বেশি।

তবে, এতটা ভাল ছাত্রী না হলে হয়তো আনিকার বিস্ময়ের পারদটা এতটা ওপরে উঠত না।

যদি আর দশটা সাধারণ ছাত্রীর মত কলেজে ওঠার পরপরই আনিকার ধ্যান জ্ঞান হত কোনভাবে একটা বয়ফ্রেন্ড জোগাড় করে ফেলা, তাহলেই আনিকা বুঝে ফেলত কেন তার বাবা মা তার বিয়ের জন্য এভাবে উঠে পড়ে লেগেছে।

আনিকার গায়ের রং কালো। হুমায়ুন আহমেদের ভাষায় যতটা কালো হলে মায়েরা মেয়েদের শ্যামলা বলেন – আনিকা তার চেয়েও কালো।

মেয়ে পড়াশোনায় তুখোড় কিংবা দারুণ রবীন্দ্র সংগীত গায় – এসব শুনে পাত্রপক্ষ যতটা মুগ্ধতা নিয়ে মেয়ে দেখতে আসে, মেয়েকে দেখে ফিরে যায় ঠিক ততটাই বিরক্তি নিয়ে। যাবার সময় রাগে গজগজ করতে থাকে। ঘটককে হয়তো দু’চারটা কথাও শুনিয়ে দেয়া হয় – এমন কালো মেয়েকে তাদের রাজপুত্রের মত ছেলের সাথে গছিয়ে দেবার চেষ্টা করার সাহস তার কোথা থেকে হল? অবশ্য মাঝে মাঝে দেখা যায়, সেই রাজপুত্রের সামনের চারটে দাঁত কোদালের মত; চর্বিতে সারা শরীর থলথল করে কিংবা সেই রাজপুত্তুর আনিকার চেয়েও কালো। তবুও, আনিকার বিয়ে হয় না। কারণ, আনিকা একটা মেয়ে। মেয়েদের কালো হতে নেই।

আনিকার বিস্ময়ের পারদ নিচে নামতে শুরু করে। আর তার সাথে ব্যাস্তানুপাতে বাড়তে শুরু করে হতাশার বাষ্পচাপ। আনিকা বুঝতে শুরু করে তার এতদিনের মেধাবী কিংবা সুকণ্ঠী অভিধাগুলো এখন মূল্যহীন হয়ে গেছে। তাকে এখন স্রেফ একটা বিশেষণ দ্বারাই বিশেষায়িত হতে হবে – কালো। বুঝতে শুরু করে, আমাদের সমাজে মেয়েদের একশটা গুন থাকলেও, একশ একতম গুন হিসেবে থাকতে হয় উজ্জ্বল গায়ের রং। সেটা না থাকলে আগের একশটা গুনই পুরোপুরি অর্থহীন হয়ে যায়।

আগের উচ্ছল, প্রাণখোলা আনিকা ধীরে ধীরে নিজের মধ্যেই গুটিয়ে যেতে শুরু করে। অবাক হয়ে খেয়াল করে তার চারপাশে হীনমন্যতার দেয়াল ছাড়া আর কিছুই নেই।

আনিকার ঠিক এমন মানসিক অবস্থায় গল্পে অভি নামক একজন উঠতি কবির অনুপ্রবেশ ঘটে। অভির এই অনুপ্রবেশ কর্মে তেহাত্তর বছর আগে মরে ভুত হয়ে যাওয়া রবিঠাকুরের বিশেষ অবদান রয়েছে। আজি হতে শতবর্ষ আগে তিনি কারও বিরহে কাতর হয়ে লিখেছিলেন, “মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না?”

রবিঠাকুরের ১৫২তম জন্মদিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে আনিকার গলায় এই গান শুনেই অভি ঠিক করে ফেলল, এই কৃষ্ণকন্যাকেই সে চিরদিন ধরে দেখবে।

এখন এই গল্পের নায়ক অভির একটা ছোট খাট বর্ণনা দেয়া দরকার। অভি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই বাংলা বিভাগে সম্মান চতুর্থ বর্ষে পড়ছে। ইতোমধ্যেই তার দু’টো কাব্যগ্রন্থ বেরিয়ে আগামী বই মেলায় তৃতীয়টি বের হব হব করছে। দুটো কাব্যগ্রন্থকেই ব্যবসা সফল বলা চলে।

কবি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে অভি দারুণ জনপ্রিয়। নির্দ্বিধায় অন্তত এক ডজন মেয়ে অভির এক কথায় তার সাথে সাগর পাড়ি দিতে রাজি হয়ে যাবে। শান্ত সুদর্শন এই ছেলেটাই হঠাৎ করে আর সবাইকে ছেড়ে আনিকার প্রেমে পড়বে, এটা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই বিশাল বিস্ময়। এবং অনেকের কাছে গভীর বেদনাদায়ক।

টি.এস.সি.তে রাজু ভাস্কর্যের সামনে হাঁটু গেড়ে আনিকার সামনে যেদিন একগুচ্ছ গোলাপ হাতে অভি দাঁড়িয়েছিল, পুরো টি.এস.সি. চত্বর ভেঙ্গে পড়েছিল যুবক যুবতীতে। অথচ, সবাইকে অবাক করে দিয়ে আনিকা সেই গোলাপ নিলো না। অভির সামনে থেকে চলে গেল।

পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের মত এটা অভির কাছেও ছিল, চূড়ান্ত বিস্ময়ের। এই বিস্ময়ের ঘোরে অভি আরও নিদারুণভাবে আনিকার প্রেমে পড়ে গেল।

তাদের পরের দেখাটা হল, ছবির হাঁটে। গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে সবাই যখন কোনমতে মাথা লুকোতে ব্যস্ত, তখন অভি আনিকার সামনে দাড়িয়ে বলল, “আমি কোন দিক থেকে তোমার অযোগ্য?”

আনিকা কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বলল, “আমি তো কালো”।

অভি পুরো ছবির হাঁট কাঁপিয়ে হো হো করে হাসল। বলল, “মুখ তার কৃষ্ণকায়া/ তব কায়া মাঝে লুকোচুরি করে সাঁঝের মায়া”।

আনিকার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। গায়ের রংয়ের উজ্জ্বলতা থেকে উজ্জ্বল সে আভা। পরম মমতায় অভির বুকে মাথা লুকালো।

(৩)

আনিকা অভিদের মেসের সামনে দাড়িয়ে আছে। অভির মুখে এখনও বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। বিরক্ত গলায়ই বলল, “তোমার ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদা শেষ হয়েছে?”

আনিকা মাথা নাড়ল।

-এখন আবার কী প্যান প্যান করতে এসেছ?
:আজ আমাকে দেখতে পাত্রপক্ষ এসেছিল।
-কে কে এসেছিল।
:পাত্রের বাবা আর বড় ভাই। কিন্তু, কে কে এসেছিল, সেটা বড় কথা না। বড় কথা হচ্ছে, তারা আমাকে পছন্দ করে গেছে। সেটা নিয়েই আমি খুব টেনশনে ছিলাম। তাই তখন তোমাকে অতগুলো কথা শুনিয়ে দিয়েছি। আই অ্যাম স্যরি।
অভি বিরক্ত মুখে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল।
:কিছু বলছ না যে?
-কী বলব?
:আমার যদি এখন বিয়ে হয়ে যায়?
-হলে হবে।
:তোমার একটুও কষ্ট লাগবে না?
-সারা জীবন নিজের গায়ের রং নিয়ে নিজেরই এমন প্যান প্যান শোনার চেয়ে ওটা ঢের ভালো।
:কী করব বল! ভয় হয়! যদি তোমাকে কখনও হারিয়ে ফেলি।
-হারাবে না। আমি বলছি। অভির গলার স্বরটা কোমল শোনালো।
:হ্যাঁ, পাত্রপক্ষ এসে পছন্দ করে গেছে; আর তুমি বলছ…
অভি চুপ থাকল।
:কিছু বলছ না যে?
অভি জোরে ডাকল, “ভাইয়া, একটু বাইরে এসো তো।”

চাপ দাড়িওয়ালা একজন সৌম্য চেহারার লোক বেরিয়ে এলেন। তার মুখে মিটিমিটি হাসি। যেন পেটের একগাদা হাসি চেপে রাখতে তার দম আটকে আসছে।

আনিকা তার মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর হঠাৎই মিলিয়ে নিলো, আজকে পাত্রের বড় ভাই হিসেবে এই লোকটাই তাকে দেখতে এসেছিল। সাথে সাথে তার কাছে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। আনিকা উত্তেজিত গলায় বলতে শুরু করল, “তার মানে… তার মানে… আজকে আমাকে দেখতে এসেছিল…”

অভি আলতো করে আনিকার মুখে হাত রাখল। নিজেই বলল, “মুখ তার কৃষ্ণকায়া/ তব কায়া মাঝে লুকোচুরি করে সাঁঝের মায়া”।

১২ thoughts on “কৃষ্ণকন্যা

    1. আসলে কয়েকদিন আগে রাতে ঘুম
      আসলে কয়েকদিন আগে রাতে ঘুম আসছিল না। ভাবলাম কিছু লিখি। কী নিয়ে লিখব, ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মাথায় আসল ইদানীং এক আপু মেয়েদের গায়ের রং নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি করছে। ভাবলাম, আমিও তাই নিয়েই কিছু লিখি। তখনই প্রথম দুই পরিচ্ছেদ লিখলাম। পরে রাতে কোন রকমে জগাখিচুড়ি একটা এন্ডিং দিয়ে পোস্ট করে দিলাম…

  1. চমৎকার গল্প। আর গায়ের রঙ নিয়ে
    চমৎকার গল্প। আর গায়ের রঙ নিয়ে যা বলেছেন একমত। এই সমাজে একজন মন্দ চেহারার মানুষকে একজন সুদর্শন মানুষের চেয়ে ডাবল ফাইট দিতে হয় সম অর্জনের জন্য। যে যাই বলুক এটাই সত্যি।

    1. তবুও স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন
      তবুও স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি, স্রেফ গায়ের রংয়ের জন্য মানুষ মানুষের থেকে শ্রেষ্ঠত্ব পাবে না।

  2. “তবুও, আনিকার বিয়ে হয় না।
    “তবুও, আনিকার বিয়ে হয় না। কারণ, আনিকা একটা মেয়ে। মেয়েদের কালো হতে নেই।”

    কে বলল ভাই? এই তো আপনি একটা অভির জন্ম দিলেন…
    আগামীতে আরো শত শত অভি জন্মাবে। তারা হাজারো আনিকার মুখে আলতো করে হাত রেখে বলবে- “মুখ তার কৃষ্ণকায়া/ তব কায়া মাঝে লুকোচুরি করে সাঁঝের মায়া”

    ক্যারি অন ব্রো… একজন গল্পকার হিসেবে আপনাকে :salute:

  3. বরাবরের মতঈ অসাধারণ। খুবই
    বরাবরের মতঈ অসাধারণ। খুবই ভাল্লাগলো।

    “মুখ তার কৃষ্ণকায়া
    তব কায়া মাঝে লুকোচুরি করে সাঁঝের মায়া”

    :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *