>>নারীমুক্তি ৬ তম পর্ব <<

>>নারীমুক্তি ৬ তম পর্ব << সমাজ গবেষক “এডওয়ার্ড ফিড জেরাল্ড” আমাদের ধারনা দেন-
“হয়ত সব লোককথা এবং গ্রামীণ গীতের রচয়িতাই নারীরা। চরকি বুলনের ক্লান্তি অথবা পিঠা বানাতে বানাতে যা তারা গেয়ে শোনাতেন শিশু সন্তানদের”। (ক্রমশ)


>>নারীমুক্তি ৬ তম পর্ব << সমাজ গবেষক “এডওয়ার্ড ফিড জেরাল্ড” আমাদের ধারনা দেন-
“হয়ত সব লোককথা এবং গ্রামীণ গীতের রচয়িতাই নারীরা। চরকি বুলনের ক্লান্তি অথবা পিঠা বানাতে বানাতে যা তারা গেয়ে শোনাতেন শিশু সন্তানদের”। (ক্রমশ)

মেয়েদের লেখালেখি করাকে আগে ভাল দৃষ্টিতে দেখা হতনা যেমন এখনও নাট্যকলা কে ভাল চোখে দেখা হয় না। তার ওপর সব সমই এত খবরদারি ও সমালোচনা করা হত যে লেখালেখিতে পুরু মন নিবিষ্ট করা সম্ভব ছিল না তখন। একথাটা আজও সত্য অনেকাংশেই। সুতরাং প্রতিভাবান কোন মেয়ে যদি তার প্রতিভা কবিতায় খাটাতে চাইত সে অন্য দেরে দ্বারা এতই বাধাগ্রস্ত এবং নিজের বিপরীত প্রবৃত্তির পীড়নে এতই ক্ষতবিক্ষত হত যে সে মানবিক ভারসাম্য হারাত নি:সন্দেহে।আর যদিও কিছু লিখত তা হত অসুস্থ ও বিকলাঙ্গ সাহিত্য।

উদাহরণ হিসাবে আমরা লেডি উইন বিলিসের কাব্যের কথা উল্লেখ করতে পারি তার মন ফেরান ছিল প্রকৃতিও ধ্যানের দিকে কিন্তু তাকে দীক্ষা দেয়া হয়েছিল ঘৃণা ও তিক্ততায়। তার কাব্য ভরতি ছিল সেসব তিক্ত বর্ণনায় যার শিকার তাকে হতে হয়েছিল। সে লিখতে বসত রাগের বসে যেখানে তার লেখার কথা ছিল ঠাণ্ডা মাথায়। সে লিখত অন্ধের মত তার লেখা উচিৎ ছিল প্রাজ্ঞের মত। সে লিখত মনের ভেতর ঘৃণা ও তিক্ততা নিয়ে। যার কি না লেখা উচিৎ ছিল মশাল নিয়ে।

তেমনি বাংলা সাহিত্যেও বেগম রোকেয়া, নাসরিন জাহান, রাবেয়া খাতুন এমনকি তসলিমা নাসরিনও এ বৃত্ত থেকে বের হতে পারেননি। কারণ-তাদের লেখা উচিৎ ছিল তাদের গল্পের চরিত্র সম্বন্ধে তা না করে তারা নিজেরা কেমন করে বঞ্চিত হয়েছেন সে গল্প করতে শুরু করেন।

“আমার বড় বোন” আমাকে বলতেই হচ্ছে মাধ্যমিক পাস। অল্প বয়সে বিয়ে করে এখন দুই সন্তানের জননী গৃহিনী এবং প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। এত ভাল ছাত্রী ছিল , অথচ তাকে বিয়ে দেওয়া হয় ১৬ বছর বয়েসে। হয়তো তাকে পড়তে দিলে
সে হতে পারত ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার।সে হতে পারত কবি বা গায়িকা।
( এমন হাজারটা উদাহরণ পাবেন আপনার চার পাশে। আপনার মা, খালা, ভাবী , ফুপু………………………… প্রতিবেশী দের জীবনে।)

সে এখন কাঁথা আর বালিশের কভার সেলাই করে। রান্না ঘরে পুই আর পালং কাটে। তার মন ফেরান ছিল বাইরের জগতের দিকে আর তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল রান্নাঘরের দিকে।

আমি জানি এই একই গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটছে বাংলাদেশের প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে। পৃথিবীর অর্ধেক জনগোষ্ঠীর কি নিদারুণ অপব্যবহার।

সিমোন দ্য বেভোয়ার যখন তার জগত বিখ্যাত “লা দ্যজিয়েম সেক্স” লিখছিলেন তখন পুরুষদের প্রচণ্ড সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন। তাকে আখ্যা দেয়া হয়েছিল “লেখার সুড়সুড়ি বিশিষ্ট বদমাশ নারী” এবং তাকে বলা হত” অতৃপ্ত নারী –যার দরকার একটি উৎকৃষ্ট সংগম”

এর প্রভাব ছিল মারাত্মক। কারণ শিল্পীর স্বভাবই হচ্ছে তার সম্পর্কে কি ভাবা হচ্ছে সেসব নিয়ে কোন মাথা ঘামানো।এভাবেই যুগে যুগে চলছে সৃষ্টিশীল নারীদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন।
“প্রাইড এন্ড প্রেজুডিস” লেখার সময় “জেন অষ্টে-ন” তার পাণ্ডুলিপি লুকিয়ে রাখতেন কেউ দেখবে বলে। কে বলতে পারে ” প্রাইড এন্ড প্রেজুডিস হয়ত আরও ভাল কিছু হত -যদি তা গোপনে লিখতে না হত।

আর রয়েছে উপকরণের অভাব। এইসব নারীরা দার্জিলিং যায়নি নয়াগ্রায় গোসল করেনি- কাঞ্চনজঙ্ঘায় যায়নি ব্যস্ত পৃথিবী বিখ্যাত শহর বন্দর দেখেনি। ভাবের অদান প্রদান করেনি বিচিত্র মনুষ্যদের সাথে। আর কথাসাহিত্য এবং যেকোনো বিমূর্ত জিনিসই তো অনেকটা অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হয়।

আমি নিশ্চিত লেভ টলষ্টয়কে” যদি বাস করতে হত বাঘা বা পত্নীতলা বা সিলেটের হাওড় অঞ্চলে বা অন্যকোন থানায়-সাত সন্তানের জনক হয়ে তবে তিনি “ওয়ার এন্ড পিস” লিখতে পারতেন না।

মহৎ কিছু সৃষ্টি করা আসলেই কঠিন। এর জন্য দরকার একাগ্র মনোযোগ আর একনিষ্ঠ মনোযোগ। কিন্তু জগত এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন।

পৃথিবী কখনও কাওকে বলবে না কবিতা লিখতে গান গাইতে। যেমন তার দরকার পুলিশ বা আমলা এমনকি পাতিটাও কিন্তু তার কবি দরকার নেই। জীবনানন্দ দাশ, সুকান্ত, আল মাহমুদ এবং বর্তমানে ……………………….. সঠিক শব্দটি খুঁজে পেল কিনা এ নিয়ে জগতর কোন মাথাব্যথা নেই।

কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে এ সমস্যাটা অনেকটা বিরোধিতার পর্যায়ের চলে যায়।

জগত নজরুলকে বলেছিল “তুমার ইচ্ছে হলে তুমি লেখ। তাতে আমার কি আস যায়।” আর জগত তসলিমা নাসরিন কে ব্যঙ্গ করে বলছে” —- তোমাকে কে বলেছে লিখতে, লেখালেখি নিয়ে পাকামি করতে।”

এতসব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাড়িয়ে সুস্থ সাহিত্য লেখা রীতিমত অসম্ভব। কারণ মনের ভেতরে ঘুণ পোকা কামড় যে কেও টাল খেতে বাধ্য। সে যা লিখবে তা হবে ল্যাংড়া লুলা ধ্বজভঙ্গ সাহিত্য।

তাছাড়া শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড পুরুষ অধিপাত্যের এযুগে পুরুষের তৈরি মূল্যবোধ চাপিয়ে দেয়া হয় নারীর তৈরি মূল্যবোধের ওপর। এজন্যই বলা হয় “ফুটবল খেলা” গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ফ্যাশন প্রিয়তা ফালতু যদিও দুটোই অনুৎপাদনশীল । এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বই কারণ এটি যুদ্ধ নিয়ে রচিত কিংবা সেটা একটা ফালতু বই কারণ ওটি রচিত অন্দরমহলের নারীদের আবেগ অনুভূতি নিয়ে বা রান্না নিয়ে।
এখন প্রশ্ন জাগে কে আমাদের শেখাল যে নারীদের আবেগ অনুভূতির চেয়ে যুদ্ধ বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এটাও অনেকটা পুরুষ তন্ত্রেরই প্রভাব। এভাবেই যুগে যুগে নারীর তৈরি মূল্যবোধকে তুচ্ছ করে ছুড়ে ফেলা হয়েছে আর পুরুষ নির্মিত মূল্যবোধের চর্চা হয়েছে।

নারীপুরুষ উভয়ের জন্যই জীবন সমান কঠিন এবং সংগ্রাম মুখর। প্রচণ্ড দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস দাবী করে তা। তো এই আত্মবিশ্বাস কিভাবে অর্জন করা হয়? সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হল-ভাবা যে অন্যরা আমার চেয়ে অধম। এতকাল ধরে মেয়েরা এমন এক আয়নার কাজ করে আসছে যার রয়েছে পুরুষকে দ্বিগুণ করে দেখানের এক যাদুকরী ক্ষমতা । পুরুষরা বিভোর হয়ে থাকে রাতে ঘুমাতে যায় এবং প্রাতে ঘুম থেকে জাগে এই মিথ্যা সুখে যে পৃথিবীকে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর চেয়ে সে শ্রেষ্ঠ। এজন্যই পুরুষরা এত আত্মবিশ্বাসী ও চনমনে হয়ে থাকে। কিন্তু যেদিন মেয়েরা আর আয়নার সাজ কাজ করবে না? যেদিন আয়না সত্য কথা বলা শুরু করবে? ( ক্রমশ)

১ thought on “>>নারীমুক্তি ৬ তম পর্ব <<

  1. “আমার বড় বোন” আমাকে বলতেই
    “আমার বড় বোন” আমাকে বলতেই হচ্ছে মাধ্যমিক পাস। অল্প বয়সে বিয়ে করে এখন দুই সন্তানের জননী গৃহিনী এবং প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। এত ভাল ছাত্রী ছিল , অথচ তাকে বিয়ে দেওয়া হয় ১৬ বছর বয়েসে। হয়তো তাকে পড়তে দিলে
    সে হতে পারত ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার।সে হতে পারত কবি বা গায়িকা।( এমন হাজারটা উদাহরণ পাবেন আপনার চার পাশে। আপনার মা, খালা, ভাবী , ফুপু………………………… প্রতিবেশী দের জীবনে।)

    সে এখন কাঁথা আর বালিশের কভার সেলাই করে। রান্না ঘরে পুই আর পালং কাটে। তার মন ফেরান ছিল বাইরের জগতের দিকে আর তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল রান্নাঘরের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *