খুব চেনা এক অচেনা মানুষ কিংবা এক অদ্ভুতুড়ে কল্পনা

ঠিক শেষ মুহূর্তে জানবাজি রাখা এক দৌড় দিয়ে বাসের হ্যান্ডেল ধরে ফেলা আমার পুরনো অভ্যাস। তবে আজকের দিনের শুরুটাই যখন কুফা দিয়ে শুরু হয়েছিল, তখন বাসে উঠার মত জলবৎ তরলং কাজটিও যে কুফাময় হবে, এতে আর আশ্চর্য কি? সকাল ৯টায় ভাইভা ভার্সিটিতে, আমি বাসের পিছে দৌড়াচ্ছি ৮:৪৭শে। কারনটা কি শুনবেন? সকালবেলায় উঠেই গডফাদার (পার্ট-থ্রি) নিয়ে বসছিলাম। শতবারের উপরে দেখা এই মুভিটার ভেতরে যখন প্রায় ঢুকে গেছি, ঠিক সেই মুহূর্তে আম্মুর বাগড়া। যার ফলাফলে পরপর দুইটা বাস মিস করে ২৫ মিনিট লেটে ভাইভা বোর্ডে ঢুকলাম। আমি যে তখনও গডফাদার থেকে বের হতে পারিনি, সেটা বুঝলাম যখন রাশভারী ফ্যাকাল্টি আমার নাম জিজ্ঞেস করে তার জীবনের সবচেয়ে উদ্ভট উত্তরটা পেলেন। আমি তখনও বুঝতে পারিনি যে,আমি আমার নামটা “”ডন মাইকেল কর্লিওনি”” বলেছি। তিনজন ফ্যাকাল্টির মধ্যে দুজন টাস্কি খেলেও একজন বিষয়টা বুঝতে পারলেন। উনি আমায় বললেন, “I asked what is your name.not the name of Godfather.”

সেই যে কট দিয়ে দিনের শুরু, সেটা অব্যাহত থাকলো পুরোদিনটা জুড়ে। আর সেটা পূর্ণতা পেল উত্তরা থেকে দৌড়ে বাসে উঠতে গিয়ে। হেল্পার আমাকে টেনে তুলতে আর এক সেকেন্ড দেরি করলেই আমি চলে যেতাম বাসের পিছনের চাকার নিচে। একগাদা বকা খেতে হল তার কাছে। ড্রাইভারের ঠিক পিছনের সিটে বসে সামনে তাকাতে যাকে দেখলাম, তাকে না দেখার চেয়ে বাসের চাকার তলে যাওয়াও ভালো ছিল। আমার ঠিক সামনেই বসে আছে সেই মেয়েটা, যার সাথে পরিচয় হয়েছিল আজ থেকে ৬ বছর আগে। এই ৬ বছরের প্রায় পুরোটা সময় সে ছিল আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার সাথে আমার সম্পর্কটা ঠিক কখন বেস্ট ফ্রেন্ড থেকে আরও গাড় কিছু হয়ে গিয়েছিল, আমি টেরই পাইনি। অথবা পেতে চাইনি। কেননা তার সাথে আমার সম্পর্কটা তার কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল, আমার কাছে ছিল ঠিক ততটাই হালকা। যার ফলে একসময় তার প্রতি দুর্বল আমার মন যখন আমায় জানালো যে আমার সাথে তার সম্পর্কটা আর বন্ধুত্বের মাঝে আটকে নেই, তখনও আমি খুব নিষ্ঠুর অবহেলায় আমার মনের জানালাটা বন্ধ করে দিলাম। ভালবাসার যে ফুলগুলো কুড়ি থেকে সবে ফুটতে শুরু করেছিল, আমার এ নির্দয় অনাদর সইতে না পেরে একে একে শুকিয়ে গেলো। ও আমার জন্য অনেকটা সময় অপেক্ষা করেছে। প্রথমদিকে ওর মাঝে আমার জন্য যে আবেগের নদীটা ছিল, ধীরে ধীরে সেটার ধারা ক্ষীণ হয়ে এলেও ও কখনই সেটা শুকিয়ে যেতে দেয়নি। কিন্তু একের পর এক অবহেলা আর ওর আবেগ বুঝেও না বোঝার ভান সইতে সইতে আজ ও ক্লান্ত হয়ে গেছে। তাই আজ যখন প্রায় সাড়ে ৪ মাস পড় ওর সাথে এভাবে মরতে মরতে দেখা হয়ে গেলো, তখন আর ওর চোখে আমাকে দেখামাত্র ফুটে উঠা সেই পুরনো আনন্দের ঝিলিক দেখতে পেলাম না। তার বদলে ভর করল রাজ্যের ক্লান্তিমাখা এক অনিঃশেষ বিষাদ। আমি চমকে গেলাম। প্রায় ১০ মিনিট একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবার পর হঠাৎ ও যেন কিছু বলল…

ও– পালিয়ে বেড়াচ্ছিস কেন??
আমি– অপরাধী কি কখনও ধরা দেয়? তোর খবর কি বল।
ও– আমি একটা মানুষ, আমার আবার খবর!!
আমি– বিয়ের কেনাকাটা সব কমপ্লিট?? ওরা কি সামনের মাসে কোন ডেট ঠিক করেছে??
ও– কেন জিজ্ঞেস করছিস?? এতে তো আদৌ তোর কিছু যায় বা আসে না ,তাই না??

ওর চোখ ভেজা… হঠাৎ টের পেলাম আমার চোখও আর শুকনা নেই। পেছনের সিটে কার মোবাইলে যেন বেজেই চলেছে…

তুমি গুছিয়ে কোন কথা বলতে পারোনা
তুমি গুছিয়ে ঠিক কথা বলতে পারোনা
শুধু সময় নিজের গল্প বলে যায় . . . .

“”মামা, ভাড়াটা দেন। পিছনে চলে যাব… “” কন্টাক্টরের গলা শুনে সম্বিত ফিরল। কোথায় কি? ও আমার সামনে ঠিক সেভাবেই বসে আছে। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, অপেক্ষা করতে করতে আর আমার অবহেলার লাভায় পুড়তে পুড়তে ওর হৃদয়টা আজ শক্ত কয়লা হয়ে গেছে।আজ ও বড় ক্লান্ত,পরিশ্রান্ত। আমার মত একটা অর্থহীন মানুষের সাথে কথা বলার মত সামান্যতম ইচ্ছাও আজ ওর মধ্যে অবশিষ্ট নেই। আসলে এর কোন প্রয়োজনও নেই। কি দরকার কষ্টগুলোকে জাগিয়ে তোলার… ভালো থাকুক ও… ভালবাসুক কোন মানুষকে… অর্থহীন কোন জড়পদার্থকে নয়… আনন্দময় হোক ওর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত…

২২ thoughts on “খুব চেনা এক অচেনা মানুষ কিংবা এক অদ্ভুতুড়ে কল্পনা

    1. সময় গেলে সাহস হয় না
      গুছিয়ে

      সময় গেলে সাহস হয় না

      গুছিয়ে এভাবে সত্য কথা বলেন কিভাবে… :তালিয়া: :তালিয়া: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট:

      আমার জন্য কারোর অপেক্ষায় থাকার প্রয়োজন নেই, যে অপেক্ষার মূল্য জানে না, তার জন্য অপেক্ষা অর্থহীন… :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ:

  1. ওভাবে বাসে আমি কখনই উঠতে
    ওভাবে বাসে আমি কখনই উঠতে পারিনা।তাই সময়ের হিসেব না করে লাইনে দাড়িয়ে থাকতে হয়।কবিতা তোমায় দিলাম দাদা আমার কথাটি বলে দিয়েছে ,তাই উনাকেও ধন্যবাদ।খুব ভালো লাগলো আপনার ব্যাক্তিগত কথা কাব্য।

    1. ধন্যবাদ শঙ্খনীল ভাই…
      ধন্যবাদ শঙ্খনীল ভাই… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

      ভালো থাকবেন… :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :ভাঙামন:

  2. বাসে উঠার ভঙ্গির সাথে আমারো
    বাসে উঠার ভঙ্গির সাথে আমারো মিল আছে! আর এইরকম পরিস্থিতিতে পড়ার অভজ্ঞতা আমারো আছে রে ভাই। বাসে একটাই সিট খালি। তাও, সেই ডাবল সিটের জানালার পাশেঈ রমনী বসে আছে। আর আমি সিট খালি পেয়েও দাঁড়িয়ে আছি! অনেক বার এমন হইছে!

    আর লিখনীর স্টাইল খুব ভাল্লাগলো। গডফাদার দেখছিলাম আরো আগে। কাল সময় আছে। দেখে নেবো আবার। আপনার মুভি দেখার নিয়ম নীতি কি? দিনে কয়টা করে দেখেন?

    1. তাও, সেই ডাবল সিটের জানালার

      তাও, সেই ডাবল সিটের জানালার পাশেঈ রমনী বসে আছে। আর আমি সিট খালি পেয়েও দাঁড়িয়ে আছি! অনেক বার এমন হইছে

      কারন কি জনাব… :মানেকি: :মানেকি: :ভাবতেছি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :কনফিউজড: :কনফিউজড:

    2. আর মুভি দেখার নির্দিষ্ট কোন
      আর মুভি দেখার নির্দিষ্ট কোন সিস্টেম নাই। :শিস: ইচ্ছা হইল ২৪ ঘণ্টার ১৮ ঘণ্টাই মুভি দেখলাম, আবার ইচ্ছা হইল একটা মুভি এক সপ্তাহ লাগায়া দেখলাম… :টাল: ঠিক নাই… :চিন্তায়আছি:

  3. ওহ!কী লিখতে কী লিখা
    ওহ!কী লিখতে কী লিখা ফেলছি!!!আমারই হাসি পাইতাছে!! লিখতে চাইছিলামঃ
    ‘সময় গেলে সাধন হয়না’
    আর সেই খানে লিখা ফেলছি
    ‘সময় গেলে সাহস হয়না’
    হাহাহাহা!!
    যাই হোক আমি কইতে চাইছিলামঃ
    ‘সময় গেলে সাধন হয়না’
    ব্যাপারটা প্রায় এরকমই।

  4. ‘অবহেলার লাভায় পুড়তে পুড়তে
    ‘অবহেলার লাভায় পুড়তে পুড়তে ওর হৃদয়টা আজ শক্ত কয়লা হয়ে গেছে”
    — অসাধারণ একটি চিত্রকল্প।। খুবই ভাল লাগল…
    আর,
    রাশভারী ফ্যাকাল্টি আমার নাম জিজ্ঞেস করে তার জীবনের সবচেয়ে উদ্ভট উত্তরটা পেলেন। আমি তখনও বুঝতে পারিনি যে,আমি আমার নামটা “”ডন মাইকেল কর্লিওনি”” বলেছি। তিনজন ফ্যাকাল্টির মধ্যে দুজন টাস্কি খেলেও একজন বিষয়টা বুঝতে পারলেন। উনি আমায় বললেন, “I asked what is your name, not the name of Godfather.”
    –এমন শুরু হওয়া একটা ছোট গল্পের জন্য অসাধারণ একটি ব্যাপার…

    ট্যাগ ব্যক্তিগত কথাকাব্য আর অনুগল্প করে দিন!! এতো সুন্দর একটা লিখাতে হুদাই ট্যাগ মানায় না… আর শিরোনামটা নিয়ে হালকা আপত্তি ছিল!! ছোট গল্পের শিরোনাম ছোট হলেই ভাল লাগে… যেমন- “অচেনা মানুষ” অথবা “অদ্ভুতুড়ে কল্পনা”

    1. আসলে গল্প আমি লিখতে পারি না
      আসলে গল্প আমি লিখতে পারি না তারিক ভাই, এখানে বা এর আগে একটা পোস্টে যা লিখেছিলাম, সবই আমার ব্যাক্তিগত দুঃখগাঁথা… :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: ইষ্টিশন আর এর যাত্রীরা আমার আমার কাছে যখন মনের আদালতের কাঠগড়ায় মনের প্রচণ্ড জেরা আর সহ্য করতে পারি না, তখন পালিয়ে আসি এই প্লাটফর্মে, আবেগ সামলে রাখতে না পেরে খুলে দেই সব বাঁধ… :মাথাঠুকি: :মনখারাপ:
      তারপরও যখন আপনে বললেন, দিলাম চেঞ্জ করে ট্যাগ… নামসংক্রান্ত সাজেশনের জন্য টাটকা গোলাপ রইল… :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *