৩৪৫ খুনের যাবজ্জীবন ‘পুরস্কার’ এবং গো. আজম ‘একুশে পদক’

সম্ভবত ৯১/৯২ সালে রামপুরা থেকে বের হতো সাপ্তাহিক আকর্ষণ। মালিক ছড়ালেখক সৈয়দ আল ফারুক। আমি নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বে। আমার সহকর্মী ছিলেন- শিল্পী সৈয়দ ইকবাল, কামাল মাহমুদ, পীর হাবীবুর রহমান প্রমুখ। তখন আকর্ষণের প্রচ্ছদ কাহিনী করা হয়েছিলো- কুখ্যাত গো. আজমকে নিয়ে। তখন গো. আজমের একটা ছবির জন্য মগবাজারে গেলে কাদের মোল্লা ড্রয়ার থেকে গো. আজমের এক গাদা রঙ্গিন ছবি রেব করে দেয়। আমি বললাম, এতো ছবি কেনো? কুখ্যাত কাদের মোল্লা বলেছিলোঃ লেখার ভেতরে বাঁশ দিলেও হুজুরকে তো আপনারা ফোর কালারে ছেপে ঘরে ঘরে ড্রয়িং রুমে স্থান করে দিচ্ছেন! তাই, যেটা ভাল্লাগে সেটা নিন। আমি কাদের কথা শুনে থ মেরে গিয়েছিলাম। আজ আবার থ মেরে থু দিলাম। মনে পড়লো- কবি কাজী রোজীর কথা। তাঁর কাছে কসাই মোল্লার ভয়াবহ কাহিনী শুনেছি। রোজী আপা আমার দীর্ঘ দিনের প্রিয় প্রতিবেশী ছিলেন। আমার বাসা মিরপুর ৬ ডি ব্লকে আর তিনি থাকতেন মিরপুর ৬ সি ব্লকে। ছুটির দিন বা সান্ধ্যবিকেলের অনেক আড্ডায় কবিতা নিয়ে কথা বলতে বলতে সিকানদার আবু জাফর থেকে শুরু করে শহীদ সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব, কবি মেহেরুন্নেসার স্মৃতিচারণ করতেন। কাদের মোল্লার নিষ্ঠুরতার বর্নণা করতে করতে তাঁর চোখে ভিজে যেতো। আজ কাজী রোজী কুখ্যাত কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলার সাক্ষী, ইতিহাসের সাক্ষী। কিন্তু এ বিচারের রায় মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে, এ রায় মুক্তিযুদ্ধের লাখ লাখ শহীদের রক্তকে অপমান করার রায়।

তাই দিকে দিকে তীব্র প্রতিবারের ঝড় উঠেছে। এ রায় মানি না, মানবো না। কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই। মনে হচ্ছে- ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা, এই জনতা’। সারাদেশে, বিদেশে, মিডিয়ায়, অনলাইনে, টুইটারে, ফেসবুকে ঘৃণা-নিন্দার আগুন জ্বলছে। আমি নিজেও হতাশ হয়ে বেশ কিছু ষ্ট্যাটাস দিয়েছি। সেই গুলোই তুলে ধরতে চাই। কারণ,এ রায়ের পর অনেক প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। যেমনঃ

ক] বাচ্ছু রাজাকার পালাতক। সে কিভাবে পালালো? অনুপস্থিত পলাতকের শাস্তি মৃত্যুদন্ড আর বান্দা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন! গণহত্যার অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি!!

খ] সংসদে সাংসদ মইনউদ্দিন খান বাদল বলেছেন, মা-বোনের সতীত্ব, নিজেদের অস্তিত্ব এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে আমরা কারও সঙ্গে সমঝোতা করি না, কোনো আপস হতে পারে না। তাহলে কিসের আতাত, কিসের আপস?

গ] রায়ের আগের দিন হঠাৎ করে পুলিশ-শিবিরের শান্তিপুর্ণ ‘বন্ধুত্ব’! রাজধানীসহ সারাদেশে মিছিল-সমাবেশ করার অনুমতি দেয়ায় সন্দেহের উদ্রেক প্রকাশ করেছে স্বয়ং বিএনপি।

ঘ] তাহলে কি জামাত বিএনপিকে ‘তালাক’ দিয়ে আওয়ামী লীগের ঘর সাজাবে?

ঙ] কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ছয় সুনির্দিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে ৫টিই প্রমাণিত। তারপরও ৩৪৫টি খুনের শাস্তি কি যাবজ্জীবন সাজা! কেনো? রহস্যটা কী!

রায়ের আগে দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিলো, ৩৪৫টি খুন, ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ, লুটপাটের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে। কিন্তু তা হয়নি। ঘৃণিত চিকন আলীরা এভাবেই ‘পুরস্কৃত’ হয়।
এই রায়ে তে শুধু দেশবাসীই নয়; দুই আইনমন্ত্রি, তথ্যমন্ত্রিসহ একাধিক সাংসদ রায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন! কারণ, এ রায় ন্যায়ের রায় নয়।

রায়ের আগে ফেসবুকে লিখেছিলামঃ
“আজ সবাইকে খবর দে,/ রাজাকারদের কবর দে।/ জয় বাংলা জয় শুনি রব,/ একাত্তরের খুনি সব…/ আল বদরের ফাঁসি চাই,/ সন্তান হারার হাসি চাই।/ বিচার হবে, সাজা কার?/ যেই শালারা রাজাকার!”
কিন্তু রাত জেগে রায় পেলাম- খুনির পক্ষের রায়। টিভিতে দেখলাম- খুনি কসাই কাদের হাসছে। দুই আঙ্গুল তুলে বিজয় প্রকাশ করছে। বিজয় তো বটেই। রাজাকারদের বিজয় আর মুক্তিযোদ্ধাদের পরাজয়। এ পরাজয় বিএনপি কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যায়; কিন্তু আওয়ামী লীগের কাছে না!
তাই মনের দুঃখে লিখেছিলাম, ক) ‘আমি যদি ৩৩০ সাংসদ সদস্য (কাদের মোল্লার মতো ৩৪৫ বাঙালি) নিধন করি; তাহলে তো আমার শাস্তি আরো কম হবে’। খ) বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান গোলাম আজমের ‘নাগরিকত্ব’ রায়ে ছিলেন। মুহম্মদ হাবিবুর রহমানেরা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারে ‘বিব্রতবোধ’ করেন। আজ আবার বিচারপতি ওবায়দুল হাসানেরা কাসাই কাদের মোল্লাদের বাঁচিয়ে দেয়..গ) .
ঘ) যুক্ত করছি বন্ধু লুফর রহমান রিটনের অসাধারণ ছড়াটিঃ
“রেপ করেছ? ভয় নাই!
খুব অপরাধ হয় নাই।
খুন করেছ? আচ্ছা।
তুমিই বাঘের বাচ্চা!
তোমার বিচার করব
তোমায় জেলে ভরব!
আদালতের রায়—
তোমার পক্ষে যায়!
আমজনতা যতই চেঁচাও নইতো পেরেশান
এই বিচারের মানটা হলো আন্তর্জাতিক মান!
তিন শতাধিক খুন করেছ? তাতে কী যায় আসে!
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে ঘাতক-খুনী হাসে!
তিরিশ লক্ষ শহীদ কাঁদলে কী আর এমন ক্ষতি?
শাবাশ শাবাশ ট্রাইব্যুনাল আর শাবাশ বিচারপতি!”

পুনশ্চঃ
এখন বাঙালির সংগ্রামের মাস, ভাষা আন্দোলনের মাস চলছে। তাই জামায়াতে সাবেক আমির গো. আযমের সহধর্মিণী আফিফা আযম বলেছেন, ভাষার মাসে ভাষা আন্দোলনের সেনাপতি অধ্যাপক গোলাম আযমকে আটক রাখা বাংলাভাষাকে অবমাননার শামিল।
তাই, সকল শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে (আমার বাবার নাম মুহম্মদ শহীদুল্লাহ) গো. আজমের মুক্তি দাবি করছি এবং গো. আজমকে ‘একুশে পদক’ দেয়ার দাবি জানাচ্ছি!
……………………………………………………………………………
[সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল মূলত কবি হলেও শিল্প-সাহিত্যের সব শাখায় বিচরণ করছেন। তাঁর কবিতায় গ্রাম বাংলা থেকে শুরু করে নগরায়ন, নাগরিক জীবন, জীবনের জটিলতা, প্রেম, পরবাস, পরাবাস্তব প্রভৃতি প্রতিফলিত হয়। বর্তমান বাংলা কবিতার মূলধারাকে তিনি শাণিত করছেন, বাঁক ও বিবর্তণে ভূমিকা রাখছেন। সব্যসাচী দুলাল সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অবদান রাখার জন্য তিনি দেশ-বিদেশে পুরস্কৃত হয়েছেন।
দুলাল ছাত্রাবস্থায় দৈনিক ইত্তেফাকের মফস্বল সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিকতার জীবন শুরু। ১৯৮০ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান এবং ১৯৯৬-এ খালেদা জিয়ার শাসনামলে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। তারপর স্বাধীনভাবে লেখালেখি, সম্পাদনা ও প্রকাশনার কাজে মনোনিবেশ। প্রবাসী বাঙালিদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন নিউজ এজেন্সি ‘স্বরব্যঞ্জন’, সেই সাথে ‘পাঠশালা’র প্রকাশনা। দীর্ঘ দিন প্রবাসের পত্র-পত্রিকায় যুক্ত ছিলেন। টরেন্টো থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বাংলা রিপোর্টারে প্রধান সম্পাদওকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে দৈনিক ইত্তেফাকের কানাডাস্থ বিশেষ প্রতিনিধি এবং সাপ্তাহিক বাংলা মেইলের উপদেষ্টা সম্পাদক।
তিনি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত। বিটিভির শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘দৃষ্টি ও সৃষ্টি’র উপস্থাপক। তাঁর লেখা বেশকিছু গান ও নাটক বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত নাটকসমূহ- সাযযাদ আমিনের কথা, জাকির, সাদিকের জীবন ও সাহিত্য, বৃক্ষ বন্দনা, মুহম্মদ আলির চিঠি, ভালোবাসি ভালোবাসি, ওডারল্যান্ড, শাখা ও শেকড়, বনসাই, বৈশাখী ইত্যাদি। ‘ও ও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’, ‘এ দেশ আমার মায়ের আরেক নাম’, ‘ঐ পতাকায় তাকিয়ে দেখি আমার মায়ের শ্যামলা মুখ’…সহ বেশ ক’টি জনপ্রিয় গানের রচয়িতা। বর্তমানে ‘কানাডায় ১৯৭১’ নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৫০টি। বর্তমানে তিনি সপরিবারে কানাডায় বসবাস করছেন। গবেষণা করছেন ‘কানাডা ১৯৭১’ নিয়ে।]

………………………………………………………………………………
(মতামত বিভাগের লেখকরা আলোচনায় অংশগ্রহন করবেন না।)

১১ thoughts on “৩৪৫ খুনের যাবজ্জীবন ‘পুরস্কার’ এবং গো. আজম ‘একুশে পদক’

  1. ৩৪৫টি খুন করে কাদের মোল্লার
    ৩৪৫টি খুন করে কাদের মোল্লার ফাঁসি না হলেও ৩৪৫ জন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে সংসদে আপনার বিরুদ্ধে ফাঁসির প্রস্তাব গ্রহন করতে পারেন। আর আদালত অবমাননার দায়ে আপনার ফাঁসিও হতে পারে। লুৎফর রহমান রিটনকে যে কোন সময় আদালত অবমাননা করে ছড়া লেখার দায়ে ফাঁসিও হতে পারে। বড়ই বিচিত্র আমাদের দেশ।

  2. এই আওয়ামীলীগের উপর ভরসা করা
    এই আওয়ামীলীগের উপর ভরসা করা যায়না…এই কথা বলে দৌড়ান খাইছি কতবার।
    এই ট্রাইবুন্যালের উপর বিশ্বাস রাখতে পারতেছিনা, বলছি কতবার। তখন অনেক রংগের কথা শুনেছি,এইবার দেখছি। কাদের মোল্লাতেই এই হাল তাহলে সাইদীকে ত ৫ মাসের জেল দিবে…

  3. চমৎকার লেখা। সাইফুল্লাহ
    চমৎকার লেখা। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল এর লেখার সাথে পরিচয় ছিল। ইস্টশনে উনার মতন গুণী লেখকের লেখা পেয়ে ধন্য হলাম। উনার আরও লেখা চাই, সাথে দাবী/আবদার থাকবে এরকম গুণী লেখকদের লেখার সমৃদ্ধ হবে ইস্টিশনের প্ল্যাটফরম। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  4. আমাদের দেশের সাধারণ একজন
    আমাদের দেশের সাধারণ একজন মানুষ হত্যার প্রমান হলে সে মামলার আসামী একাধিক হলেও প্রত্যেক আসামী মৃত্যু দন্ড পায়। অথচ ৩৪৫ জন নিরীহ সাধারণ মা-বোনকে হত্যার তথ্য প্রমান পাওয়ার পরও (বিভিন্ন গণ মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য থেকে প্রাপ্ত) কসাই নামে খ্যাত কাদের মোল্লার যাবৎজীবণ কারা দন্ড হয় কিভাবে?

  5. আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে
    আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে নিয়োজিত প্রসিকিউশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণের জীবন বৃত্তান্ত পর্যায়ক্রমে ব্লগে উপস্থাপন করা যায় কিনা? ভেবে দেখার জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি। কারণ আমাদের নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই আমার এ চাওয়া। পেশাগত যোগ্যতা বিবেচনায় না নিয়ে শুধুমাত্র দলীয় কারণে এসব কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে কিনা তাও পর্যালোচনা করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। কারণ জামায়াতের অনেক ঘনিষ্টচর বিভিন্ন দলে ঘাপটি মেরে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *