গৃহবন্দি – ১

কিবরিয়া সাহেবের মন মেজাজ আজকে খুব বেশী খারাপ । এমনিতেই ব্যবসায় লোকসানের পর লোকসান , এর মধ্যে বড় ছেলেটাও দিনকে দিন গোল্লায় যাচ্ছে । তবে আজকে উনার মেজাজ খারাপের কারণ হল উনার বড় ছেলে আকিবের একমাত্র বন্ধু আরফান । কিবরিয়া সাহেবের ধারণা এই আরফান ছেলেটার জন্যেই উনার ছেলের আজ এই অবস্থা । আরফান ছেলেটা আগে ভালোই ছিল । ছাত্র হিসেবেও ভালো ছিল । মানুষ হিসেবেও ভালোই ছিল । কিন্তু ইদানিং ছেলেটা বড্ড বেশী উশৃংখল হয়ে গেছে । সারাদিন টো টো করে ঘুড়ে বেড়ায় । পড়াশুনা তো মনে হয় করেই না । কারণ পড়াশুনা করলে এতো ঘুড়াঘুড়ির সময় কোথায় পায় । আর এই আরফানের ঘুড়াঘুড়ির সঙ্গী হল তার ছেলে আকিব । এইতো , কিছুক্ষণ আগেও আকিবকে কল দিয়েছে বাসা থেকে বেড় হওয়ার জন্যে । এখন বাজে দুপুর ৩ টা । এই ভরদুপুরে কিসের এতো ঘুড়াঘুড়ি ? কিবরিয়া সাহেব ঠিক করেছেন আজকে আরফানকে কয়েকটা কড়া কথা শুনাবেন । আরফানকে কল দেয়ার জন্যে মোবাইলের দিকে হাত বাড়ালেন ।

: হ্যালো , কে আরফান ?
– হুম , আপনি কে ?
: আমি আকিবের বাবা ।
– ও , আচ্ছা । জ্বী আংকেল , বলেন ।
: তুমি আকিবকে আর কল দিও না ।
– কেনো আংকেল ?
: সামনে তোমাদের এসএসসি পরীক্ষা । এখন এতো ঘুড়াঘুড়ি কিসের ? এইসব বাদ দিয়ে পড়াশুনা করো ।
– আচ্ছা আংকেল । আপনি কোন চিন্তা করবেন না । আমি আকিবকে আর কল দিবো না । কিন্তু আংকেল ও যদি আমাকে কল দেয় ?
: ও কল দিলে তুমি বলবে তুমি ব্যাস্ত বা দূরে কোথাও আছো । ও তোমাকে না পেলে বাসা থেকে আর বেড় হবে না , পড়াশুনায় মনযোগী হবে ।
– আংকেল মিথ্যা কথা বলব ?
: হ্যা বলবে । আমি আর কোন কথা শুনতে চাই না । পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের দুইজনকে যেন আর একসাথে না দেখি ।
– ঠিক আছে আংকেল ।
: হুম , মনে থাকে যেন । আর তুমিও একটু পড়াশুনা করো ।

ওপাশ থেকে আরফান কলটা কেটে দিলো । ফলে কিবরিয়া সাহেবের মেজাজ আরও গরম হয়ে গেলো । ডিম সেদ্ধ হওয়ার মতো গরম । উনি মনে মনে বলছেন , ছেলেটা কতো বড় বেয়াদব । একটা সালাম তো দিলোই না , ভালো আছি কিনা তাও জিগ্যেস করল না । আবার লাইনটাও কেটে দিলো । এই ছেলের ভবিষ্যত্‍ অন্ধকার ।

মেজাজটা ঠান্ডা করা দরকার । মেজাজ ঠান্ডা করার সহজ পদ্ধতি হল কাওকে বকা ঝকা করা বা শুধু শুধুই চিল্লাপাল্লা করা । ছোট ছেলেকে ডাক দিলেন । এই ছেলে আবার ঘড়কুনো স্বভাবের । এতেও কিবরিয়া সাহেবের আপত্তি । ক্লাস এইটে পড়া ছেলে এমন ঘড়কুনো হবে কেন ? ছোট ছেলের নাম আসিফ । আসিফ এখন কিবরিয়া সাহেবের সামনে দাড়িয়ে আছে । এই ছেলেকে বকা ঝকা করলে মেজাজটাও ঠান্ডা হবে এবং এর কোন সাইড ইফেক্টও নাই ।

: সারাদিন ঘরে বসে বসে কী করিস ?
– টিভি দেখি আর খেলি ।
: কী খেলিস ?
– আমার একটা টেনিস বল আছে না ? ঐটা নিয়ে খেলি ।
: আর টিভিতে কী দেখিস ?
– কার্টুন নেটওয়ার্কে কার্টুন দেখি ।
: তোর ক্লাসমেট বা বন্ধুরাও কী কার্টুন দেখে ?
– আমার কোন বন্ধু নাই । আর ক্লাসমেটদের সাথে আমি কথা বলি না ।
: ক্লাস এইটে পড়া একটা ছেলের কোন বন্ধু নাই ? তুই আবার সারাদিন কার্টুন দেখোস ?
– হুম , বন্ধু নাই । আর কার্টুন দেখতে আমার ভালো লাগে ।
: বন্ধু থাকবে না কেন ? বাসা থেকে বের হ । তোর সমবয়সীদের সাথে মেলামেশা কর ।
– না , বাবা । আমার এসব ভালো লাগে না । বল দিয়ে খেলতেই আমার ভালো লাগে ।

কিবরিয়া সাহেব চেয়েছিলেন আসিফকে বকাঝকা করতে । কিন্তু তার হঠাত্‍ মায়া হল আসিফের প্রতি । মন মানসিকতার দিক দিয়ে ছেলেটা এখনও বেড়ে ওঠে নি । তিনি ভাবতে লাগলেন , এটা কী তারই ব্যার্থতা নাকি ।

এক ছেলে বাড়ির বাইরে না যেয়ে থাকতে পারে না । আরেক ছেলে বাইরে যেয়ে টিকতে পারে না । এদিকে ব্যবসাও ভাল যাচ্ছে না । কিবরিয়া সাহেব পরিবার সামলাবেন ? নাকি ব্যবসা সামলাবেন ? দুশ্চিন্তায় ডুবে গেলেন ।

আপাততো ব্যবসায় মনোনিবেশ করা দরকার । ব্যবসা না চললে সংসার চলবে কী করে । ছেলেদের কথা পরে চিন্তা করা যাবে । বাসায় দুপুরের খাবার খেতে এসে , ছেলেদের নিয়ে এতো গন্ডোগল হয়ে গেলো । এখন আবার কর্মক্ষেত্রে ফিরে যেতে হবে । কিবরায় সাহেব আড়তের দিকে রওনা দিলেন । উনার কয়েকটা ফলের আড়ত্‍ আছে ।

ঐদিকে আকিব জানালার পাশে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে । রাস্তায় আরফানকে খুজছে । প্রতিদিন আরফান ওর বাসার সামনে এসে কল দেয় । আজকে কল দেয় নি দেখে আকিব আরফানের নাম্বারে কল দিয়েছিল । কিন্তু আরফানের মোবাইলটা বন্ধ । এদিকে আকিবের চোখের সামনে আসিফ একটা টেনিস বল নিয়ে ঘরের এ মাথা থেকে ও মাথা শুধু শুধুই দৌড়াচ্ছে । দেখতে বিরক্ত লাগছে ।

৩ thoughts on “গৃহবন্দি – ১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *