হুমায়ুন আহমেদের প্রকৃতি বনাম করণীয়

হুমায়ুন আহমেদের একটা সাক্ষাৎকারের কয়েকটা লাইন দিয়ে শুরু করা যাক। আমার বক্তব্য হবে সে কথাগুলোকে কেন্দ্র করেই। আমি কোন লেখককের অসম্মান করতে লিখছি না লিখাটি। তবে কিছু কিছু ভুল মতামত যখন প্রভাব তৈরি করে সেটি ধরিয়ে দেয়া প্রয়োজন এবং দায়িত্বের ভেতর পরে।

হুমায়ুন আহমেদের একটা সাক্ষাৎকারের কয়েকটা লাইন দিয়ে শুরু করা যাক। আমার বক্তব্য হবে সে কথাগুলোকে কেন্দ্র করেই। আমি কোন লেখককের অসম্মান করতে লিখছি না লিখাটি। তবে কিছু কিছু ভুল মতামত যখন প্রভাব তৈরি করে সেটি ধরিয়ে দেয়া প্রয়োজন এবং দায়িত্বের ভেতর পরে।

“হুমায়ূন আহমেদ : একটা ছেলে একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে কেন? হোয়াট ইজ দ্য কেমিস্ট্রি অব লাইফ? প্রেম নিয়ে কত কবিতা, কত কাব্য রচনা করা হয়েছে, প্রথম দর্শনেই প্রেম ইত্যাদি। একটি কুৎসিত-কুরূপা, বেঁটে মেয়ের প্রেমে সচেতনভাবে কোনো ছেলে পড়বে না, কারণ নেচার বা প্রকৃতি। সে চায় বেটারটা, তাই রূপবতী মেয়ের প্রেমে ছেলেরা পড়ছে। নেচার চাচ্ছে পরের জেনারেশনে যেন রূপ আসে। একটা গায়কের প্রেমে কেউ পড়ছে, কারণ নেচার চাচ্ছে পরবর্তী জেনারেশনে যেন গায়ক আসে।”

কথাটি জীববিজ্ঞান সম্পর্কে কম ধারণার ফলাফল মাত্র। উনার প্রায় লিখাতেই দেখেছি উনি প্রকৃতির বেশ পুজো করে চলেছেন এবং ঈশ্বর জ্ঞান করেছেন। প্রকৃতি কি কোন স্বত্তা ? প্রকৃতির কি কোন চাওয়া পাওয়া আছে ? প্রকৃতির কি আছে কোন ইন্দ্রিয় ? অথবা প্রকৃতির কি বিশেষ কোন উদ্দেশ্য আছে যেটা সে চরিতার্থ করতে চাইছে সেই মহাবিশ্ব শুরুর সময়টি থেকে ? এর প্রত্যেকটার উত্তর হবে ‘না’। হালকাভাবে বিবর্তন সম্পর্কে জানলে এরকম ধারণা হতে পারে। মনে রাখা বেশ প্রয়োজনঃ বিবর্তন প্রকৃতির কোন তাগিদে ঘটে না। প্রকৃতি কোন স্বকীয় স্বত্তা নয়। ব্যপারটা এমন যে, প্রকৃতিতে বিচ্ছিন্নভাবে হাজারো জিনিস ছড়ানো ছিটানো। বিভিন্ন জীবকুল সেগুলোকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে মাত্র তা নিজস্ব তাগিদেই। প্রকৃতিতে শতকোটি প্রতিভাবান ছড়ানো ছিটানো থাকলেও তাতে প্রকৃতির কিছু আসে যায় না। প্রকৃতির উপাদানগুলোকে কোন প্রজাতি কিভাবে ব্যবহার করে সেটার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে একেকরকম ব্যবস্থা। মিউটেশনের ফলে কোন একটা প্রজাতিতে একটু অন্যরকম বৈশিষ্ট্যের সন্তান জন্ম নিলে সে বৈশিষ্ট্যটি ভাল নাকি খারাপ হবে সেটি নির্ভর করে সে বৈশিষ্টটি তাকে পূর্বের তুলনায় বেশি টিকিয়ে রাখতে পারছে কিনা সেটির উপর। সে বৈশিষ্ট্যটি বেশি টিকিয়ে রাখার সুযোগ করে দিলে বেশিদিন বাঁচতে পারবে এবং বেশি সন্তান জন্ম দিতে পারবে এবং সে বৈশিষ্ট্যের বিস্তার করার হার অনেক বেড়ে যাবে এবং এভাবেই নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নতুন আরেকটি প্রজাতি আসবে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। এখানে প্রকৃতির কোন সেচ্ছা সাহায্য নেই কিন্তু আছে প্রকৃতির ব্যবহার। প্রকৃতি কোন জীবকে ব্যবহার করে না; বরং জীবকূল প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে বেচে থাকে। প্রকৃতি মমতাময়ীও না আবার নির্মমও নয়। প্রকৃতি মূলত একটা ভাববাদী ধারণা।

হুমায়ুন আহমেদের বক্তব্যে দুটি বিষয়। এক হচ্ছে ঐশ্বরিক প্রকৃতির ধারণা আর দ্বিতীয়ত সম্পূর্ণ বিকৃত একটা ধারণা প্রেমের ব্যপারে। একটা পুরুষ একটা সুন্দরী নারীর প্রেমে পড়তে চায় এর কারণ এই নয় যে প্রকৃতি চাচ্ছে সুন্দর ছড়িয়ে পড়ুক। বরং পুরুষটি চাচ্ছে তার সন্তান একজন সুন্দর (?) লালন করুক অথবা তার সন্তান সুন্দর হয়ে জন্মাক। এ দুটোর ভেতর একটি। এটি হুমায়ুন আহমেদের ধারণার সাথে সামান্য মিল আছে বৈকি। কিন্তু এখন প্রশ্ন এসে যায় সুন্দর কাকে বলে । সুন্দরের সংজ্ঞা কি ? আমাদের ভেতর সৌন্দর্য্যবোধের জন্ম ঠিক মানবপ্রজাতির কোন সময়ের মাঝে এসে জন্ম নিল ? আমরা পূর্বে যেটাকে সুন্দর বলতাম এখন কি সেটিই সুন্দর ? এখন যেটিকে সুন্দর বলি ভবিষ্যতে সেটিই সুন্দর থাকবে ? সুন্দর কি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার মত না ? একটি নারীর সৌন্দর্য্য আর একটি পুরুষের সৌন্দর্য্য কি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সামর্থ্য রাখে ? সুন্দর বা সৌন্দর্য্য তো অত্যন্ত আপেক্ষিক একটা ব্যপার। নিচে একটু সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা যেতে পারে।

পুরুষের চোখে নারীর সৌন্দর্য্য এবং নারীর চোখে পুরুষের সৌন্দর্য্যবোধের উৎপত্তি হচ্ছে সেই শিকারী সমাজে। শিকারী সমাজেই সুঠাম দেহের পুরুষরা নারীদের কাছে আকর্ষনীয় ছিল, আর চিকন ফিগারের মেয়েররা পুরুষের চোখে আকর্ষনীয়া ছিল। পুরুষ নারীর প্রতি পরস্পরের সৌন্দর্য্যবোধের জন্ম এই শিকারী সময়ের যখন মানব প্রজাতি সাভানাতে বিচরণ করত। সুঠাম দেহের পুরুষরা এজন্যে আকর্ষনীয় ছিল কারণ তারা শিকার বেশি করতে পারত তথা খাদ্য সংগ্রহ করতে পারত বেশি তথা বেচে থাকত পারত বেশি তথা সন্তান জন্ম দিতে পারত বেশি। তাই নারীরা এটিকে সুন্দর বৈশিষ্ট্য হিসেবে নিয়েছিল। চিকন দেহের মেয়েরা সুস্থ সন্তান জন্ম দানে সক্ষম ছিল, খুব দ্রুত শত্রুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারত, দ্রুত জায়গা বদল করত পারত, বেশি ফলমূল সংগ্রহ করতে পারত এবং এ জন্যেই বেশিদিন বাঁচতে পারত। এটিই পুরুষের চোখে ভাল বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরা দিয়েছে। এখানে মাত্র মেজর দুটো বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করলাম। এরকম প্রত্যেকটা বৈশিষ্ট্যেরই বিবর্তনগত ব্যখ্যা থাকবে যেটি সে সময়ে একটি সুবিধা দিত বেচে থাকার ক্ষেত্রে। চোয়াল এবং করোটির আকৃতির সৌন্দর্য্য এ সুবিধার ভিত্তিতে সৌন্দর্য্য চেতনা সৃষ্টি করে। এবং মনে রাখা প্রয়োজন বৈশিষ্ট্যগুলো শিকারি সমাজের উপর ভিত্তি করে গঠিত যার কার্যকারিতা এ সময়ে থাকবে না কারণ এ সময়ে টিকে থাকার ফেকটরগুলো অন্যরকম এবং অনেকাংশে বিপরীত। এখনকার সময়ে একটি সুন্দর দেহ থেকে সুন্দর মন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যেই অনেক সুন্দর জিনিস পরবর্তিতে ভাল নাও থাকতে পারে। কিন্তু একসময় সত্যিই ভাল ছিল সেটি। পুরোনো অনেক প্রবৃত্তিগত ভালই বর্তমানে আমরা মানুষিকভাবে বর্জন করি। প্রবৃত্তি বা নেচার কখনো আদর্শ নয়। একটি প্রবৃত্তি বা ইচ্ছে প্রায় সময়েই প্রতারণা করে সময়ের সাথে; সমাজের সাথে। একজন সভ্য মানুষের আদর্শ গড়ে উঠা উচিৎ কোনটি সে সময়ের সমাজকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা দিতে পারে সেটির উপর ভিত্তি করে। শাশ্বত ভাল, শাশ্বত সুন্দর বলে কিছু নেই। তবে যেটা আছে সেটা হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ে ভালতর এবং শ্রেয়তর। প্রেমের উৎপত্তির একটি কারণ আমি বিবর্তনীয় মনোবিদ্যা থেকে আলোচনা করেছিলাম একটি লিখায়। এটি পড়ে নিলে বেশ ভাল হতে পারে বেশ কিছু মৌলিক বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে।

হুমায়ুন আহমেদ প্রকৃতি প্রকৃতি বলে অনেক সময় ধর্ষন করেছেন বিজ্ঞানকে। বৈধতা দিতে চেয়েছেন বেশকিছু সময়োনোপযোগী জিনিসকে, সঞ্চার করতে চেয়েছেন নিজস্ব প্রবৃত্তি। প্রকৃতি কখনো নৈতিকতার মানদন্ড না কখনোই। সমাজের সর্বোচ্চ বিকাশই নৈতিকতার মানদন্ড।

১১ thoughts on “হুমায়ুন আহমেদের প্রকৃতি বনাম করণীয়

  1. শাশ্বত ভাল, শাশ্বত
    সুন্দর বলে

    শাশ্বত ভাল, শাশ্বত
    সুন্দর বলে কিছু নেই।
    তবে যেটা আছে সেটা হচ্ছে নির্দিষ্ট
    সময়ে ভালতর এবং শ্রেয়তর”

    খুভ ভাল লিখেছেন, পোষ্টে +++++++++++

  2. অনেক সুন্দর করে উপস্থাপন
    অনেক সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন ব্যাপার গুলো। ধন্যবাদ এতো সুন্দর একটা প্রবন্ধ উপহার দেয়ার জন্য।

  3. চমৎকার লেখা। তবে এর আগেও এই
    চমৎকার লেখা। তবে এর আগেও এই বিষয়ের কাছাকাছি বক্তব্য দিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন সেখানে বেশ কিছু আলোচনা হয়েছিলো আমার স্বল্প জ্ঞ্যানের উপর ভিত্তি করে শুধুমাত্র নিজস্ব প্রকৃতি প্রদত্ত সহজাত জ্ঞ্যান থেকেই যা জীবন থেকেই অর্জিত হয়। মনে আছে সব বিষয়ে একমত হয়ে পারিনি তখন।
    আজকে আমার অনেকগুলো প্রিয় ব্লগারদের পোস্ট একসাথে চলে এসেছে, নেটও ছিলোনা অনেকক্ষন, তাই সবার পোস্টে অংশ নেওয়ার ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও পারলাম না। আশা করি সামনে অচিরেই পারবো।

  4. সহমত ।
    সুন্দর বা সৌন্দর্য্য

    সহমত ।

    সুন্দর বা সৌন্দর্য্য আপেক্ষিক ও পরিবর্তনশীল ।আজ যেটা সুন্দের লাগবে কাল সেটা না ও লাগতে পারে ।

  5. আচ্ছা, সুন্দরের সব মানদণ্ডই
    আচ্ছা, সুন্দরের সব মানদণ্ডই যদি শিকারী সমাজ থেকে বাহিত হয়, তাহলে ফর্সা মেয়েদের আমরা বেশি পছন্দ করি কেন? বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই জানি, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ফর্সা মেয়েদের তুলনায় কালো মেয়েরা টিকে থাকার সক্ষমতা অধিক প্রদর্শন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *