ইচ্ছেঘুড়ি

১)

ইট পাথুরে শহর,ধোঁয়া উড়ে বেড়ানো পথ।যান্ত্রিক মানুষগুলো রোবটের মত যার যার গন্তব্যে ছুটে বেড়াতে ব্যস্ত।অশান্ত গলিতে শান্তির চিহ্ন খুঁজে বেড়ানোটাই যেন সকলের ধর্ম।

চার দেয়ালে বন্দী জীবনগুলো ডুব দেয় শত শত বইয়ের পাতায় পরোক্ষ জ্ঞানার্জনে।বাইরের জগৎ অপরিচিত,অচেনা তাদের কাছে।এই জীবনকে দূর্বিষহ বললে কোথাও ভুল হবেনা।

২)


১)

ইট পাথুরে শহর,ধোঁয়া উড়ে বেড়ানো পথ।যান্ত্রিক মানুষগুলো রোবটের মত যার যার গন্তব্যে ছুটে বেড়াতে ব্যস্ত।অশান্ত গলিতে শান্তির চিহ্ন খুঁজে বেড়ানোটাই যেন সকলের ধর্ম।

চার দেয়ালে বন্দী জীবনগুলো ডুব দেয় শত শত বইয়ের পাতায় পরোক্ষ জ্ঞানার্জনে।বাইরের জগৎ অপরিচিত,অচেনা তাদের কাছে।এই জীবনকে দূর্বিষহ বললে কোথাও ভুল হবেনা।

২)

অতুল বন্দীজগতের এক কিশোর।কিছুদিন আগে এস এস সি পরীক্ষা শেষ হল তার।দীর্ঘ ১০ বছর প্রচুর খেটেছিল সে।নিঃশ্বাস নেবার সময়টুকু তাকে দেয়া হতনা।স্কুল আর কোচিংয়ের পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশন।বিনোদন বলতে কিছু ছিলনা।ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক আর ডিসকভারি চ্যানেল তার একান্ত সঙ্গী ছিল।সে খুব মেধাবি ছেলে।অনেক মজার মজার চিন্তা করতে ভালবাসে।তার সুন্দর সুন্দর ইচ্ছে।তার মাঝে দারুন নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষমতা রয়েছে।নানা ব্যাপারে অভিজ্ঞতা অর্জনে রয়েছে অদম্য ইচ্ছা।কিন্তু তার চিন্তা ভাবনাগুলোর ফলন হতনা।কারণ তার ইচ্ছেগুলোর সাথে চারপাশের পরিবেশ পরিস্থিতি এবং কারও মতের মিল হতনা।

৩)

অতুলের ছোট চাচা হাসান ২৩ বছরের যুবক।সে মাঝে মাঝে গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে আসত চাকরির সন্ধানে।কিন্তু চাকরির মুখ দেখতনা।হাসান চাচা অতুলদের বাড়িতে উঁকি দিয়ে যেত প্রতিবার।একদিন আবারও এল।অতুলের পড়াশোনার ব্যস্ততা না থাকায় চাচার সাথে সেদিন তার আড্ডা বেশ জমল।চাচা বলত তার গ্রামের কথা,গ্রামীণ জীবনযাত্রার কথা।অতুলের খেলার দুনিয়া কেবলই কম্পিউটারের ঊনিশ ইঞ্চি স্ক্রীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।চাইলেই সজীব ঘাসের উপর পা ফেলে অথবা কাদা মাখামাখি করে ইচ্ছেমত খেলতে পারেনা সে।কিন্তু চাচার কাছে সে জেনেছিল অনেক প্রকার মজার মজার খেলার কথা যা সে কখনও জানতোনা।ছেলেবেলা কবে দাদাবাড়িতে গিয়েছিল তাও তার মনে পড়েনা।এরপর কত আবদার করেছিল বেড়াতে যেতে,কিন্তু ব্যস্ততা এবং পড়াশোনার দোহাই দিয়ে তাকে আটকে রাখা হয়েছে ইট পাথুরে শহরে।
একাকিত্বের মত কষ্টকর বস্তুটি আর কি হতে পারে!অতুলের সারাদিন কেটেছে একা একা।চাইলেই সে খোলা আকাশ নয়নভরে দেখতে পারেনি,বৃষ্টি ছুঁতে পারেনি,চাঁদের আলোয় বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে পারেনি,ছেলেপেলেদের সাথে আনন্দ করে খেলতে পারেনি।বাধা-নিষেধাজ্ঞা হানা দিয়েছে প্রতিবার।কিন্তু অতুল আর পারছিল না।জীবনের সবকিছু কি এভাবেই তার অপূর্ণ হয়ে রবে?

৪)

অতুল তার মা-বাবাকে খুব করে বলল গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার কথা।কিন্তু তারা ছেলের এতই ভাল চান যে তাকে গ্রামে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছিলেন না।এদিকে অতুলের মা-বাবা দুজনেই ব্যস্ত তাদের কর্মজীবনে।ঘুরে বেড়ানোর ফুরসত নেই।অতুলের আগ্রহ দেখে হাসান চাচাও তাই খুব করে ধরলো।

হাসান চাচা: ভাই,ভাবী শুনেন,এখন তো আমাদের অতুল মাশাআল্লাহ্ বড় হৈছে।দিয়া দ্যান না…।কয়টা দিন বেড়াইয়া আসুক।বিনোদনের একটা ব্যাপার আছে না?আর তুলতুল বাবারে বাড়ির সবাই দেখতে চায়।বিশেষ কইরা আম্মা আমারে প্রত্যেকবার বলে ওরে যেন নিয়া যাই।(হাসান চাচা অতুলকে আদর করে তুলতুল ডাকে।)
অতুলের মা: দ্যাখো হাসু তুমি এসব বুঝবেনা।ও আমার গাইড ছাড়া থাকতে পারবেনা।ও এখনও বাচ্চা।উল্টাপাল্টা কিছু হয়ে গেলে!ভাইরে এই রিস্ক আমি নিতে পারবনা।
অতুল: আম্মু তুমি আমাকে মোবাইলে কল করে প্রতি ঘণ্টায় দিক-নির্দেশনা দিতে পারবে।যেভাবে বলবে সেভাবেই শুনব।যেতে দাও না….।প্লীজ।
অতুলের বাবা: দেখ বাবা এভাবে বিরক্ত করেনা।থাক না এবার।কথা শুন আমাদের।তোমাকে পরেরবার যেতে দিব।
অতুল: আমার জীবনে সেই পরেরবার কোনদিনই আসবেনা।আমার কোন কথাই তোমরা রাখনা।আমি আর কথা বলবনা তোমাদের সাথে।

এই বলে গাল ফুলিয়ে অতুল চলে গেল।
অবশেষে মন খারাপ এবং তার অভিমান দেখে অতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে তার বাবা-মা রাজি হল।সেই সুযোগে চালাকি করে অতুল বেশ সময় নিয়ে নিল বেড়ানোর জন্য।

৫)

সকালে হাসান চাচা ও অতুল গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হল।বের হওয়ার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত অতুলের মা তাকে নানান উপদেশ দিতে লাগলেন।এভাবে চলবি,ওভাবে থাকবি,অমুক করবিনা,তমুক করবিনা ইত্যাদি।একা একা কখনও অতুল বাড়ির বাইরে দিনরাত কাটায়নি।অথচ এবার প্রায় দু’মাসের লম্বা সফরের জন্য বের হল সে।তাই তার মা ছেলেকে নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন।

অতুলরা যখন গ্রামের পথে পা রাখল তখন অবাক হয়ে সে চারপাশে দেখতে লাগল।এত ভাল এর আগে তার কখনও লাগেনি।সজীবতা বিশুদ্ধতা ছড়ানো এখানকার আনাচে কানাচে।হলদে-সবুজ রঙের খেলা ক্ষেত-খামারে।সেখানে চলে রঙ বেরঙা প্রজাপতি ও ফড়িংদের ছুটোছুটি।ছোট বড় পুকুর,খাল,বিল কত কি!তাদের বুকে ছোট ছোট নানা রকম নৌকার ছড়াছড়ি,দূরে চোখে পড়ে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য।

৬)

গ্রামের বাড়ি পৌঁছুতেই অতুলকে একে একে আদরে বরণ করে নিল তার দাদাবাড়ির সবাই।তার সে আনন্দ অসীম ছিল।সবার সাথে হৈ-হুল্লোর করে কাটাল।গ্রামের টাটকা সবজি,মাছ,ফল,গরুর দুধ সবকিছুতেই আলাদা টেস্ট।তার দাদীর হাতের রান্নার তুলনা নেই।পেট পুরে মজা করে এভাবে সে কোনদিন খায়নি।রাতে দাদীর কাছে শুনলো কানাভূতের নানা গল্প।সে খুব সাহসী হলেও ভয়ে গা ছমছম করছিল তার।কারণ দাদীর গল্প বলার ভঙিমাই সেরকম ভয়ানক ছিল।

পরদিন খুব সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠল সে।একা একা বাড়ির বাইরে হাঁটা শুরু করল।নির্মল বিশুদ্ধ বাতাস গ্রহণ করে সবুজের গালিচার ওপর,ঝলমলে রোদ আর খোলা নীলাকাশের নিচে হাঁটতে ভাল লাগছিল তার।গ্রামের কিছু ছোট ছোট ছেলে তাকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল।শহর থেকে কেউ গ্রামে এলে অবাক দৃষ্টিতে এরা বুঝি এভাবেই তাকিয়ে থাকে।
নাশতা করে অতুল হাসান চাচাকে নিয়ে আবার বাইরে বের হল।চাচার সাথে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াল,বাজারে গেল,অবাক হয়ে ছেলেদের হা-ডু-ডু খেলা দেখল।তখন তার সাথে কয়েকটা কিশোরের পরিচয় হল।অতুলের কথা বলার আগ্রহ দেখে কিশোরেরা তার সাথে মিশতে শুরু করল।অল্প সময়ে ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেল তাদের।সময়গুলো দারুন কাটছিল।অতুলসহ মোট ১২ জন কিশোর কিশোরীর বন্ধুত্ব বেশ জমে ওঠে।অতুল যাদের সাথে মিশত তাদের তুলনায় সে বয়সের দিক দিয়ে একটু বড় বলে সবাই তাকে মান্য করত।আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অতুল তার সুন্দর সুন্দর মজার চিন্তা ও ইচ্ছেগুলো বাস্তবে রূপ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল।ইচ্ছেঘুড়ি ওড়ানোর এই সুবর্ণ সুযোগকে সে হাতছাড়া করলোনা।অতুলের নেতৃত্বে ছোট একটা দল গঠন করা হল।অতুল সেই দলের দলনেতা হল।তার কথামত এলাকার সব ছেলেমেয়েদের একদিন জড়ো করা হয়।তাদের মধ্যে অনূর্ধ্ব ১৫ বছরের বুদ্ধিমান দুইজন কিশোরকে ছোট একটা নির্বাচনের মাধ্যমে মেম্বার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।মেয়েদের জন্যও এক কিশোরী মেম্বার নির্বাচিত হল।সবার সহযোগিতায় তাদের মধ্য থেকে একজন কিশোর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়।এদের কাজ হল এলাকার সব ছেলেমেয়েদের নেতৃত্ব দান করা,এদের মধ্যে কারও কোন সমস্যা হলে তাকে সাহায্য করা,কেউ অপরাধ করলে তাকে শাস্তি দেওয়া।ছোট ছোট ব্যাপারগুলো যতটুকু সম্ভব বড়দের কানে পৌঁছার আগে তারাই সমাধান করত।কোন সমস্যা মেম্বার সমাধান করতে না পারলে চেয়ারম্যান করত।কেউ যদি কোন অপরাধ করত,তাদের তৈরি কিশোর আইন যেখানে কিছু নিয়ম-নীতি আছে সেগুলো ভঙ্গ করত অথবা মারামারি করত তবে তার শাস্তিস্বরূপ একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তার সাথে কেউ মিশতোনা,খেলতোনা,কথা বলা বন্ধ করে দিত।একদিন ১৫ বছরের এক ছেলে ঝোপের আড়ালে বিড়ি টানার সময় গ্রামের এক কিশোরের কাছে হাতে নাতে ধরা পড়ল।

-ঐ ব্যাটা রুস্তম কি করস এইখানে?
-কইইই!কিছুনা।
-ঐ মিছা কথা কস ক্যা?হ্যাঁ?আরামসে বইয়া বিড়ি টান্তাছস।মনে করছস দেখিনাই কিছু?
-আমি তো এইখানে বইছিলাম কাম সারতে।পেডে বড়ই চাপ দিছে।সর যা।কামডা সারতে দে।
-খাড়া তুই রুস্তইম্মা।ঐ তুই চালাকি করস?মদন পোলা।এহহেরে বিড়ির কি ঘেরান কইতাছে রে।আইজ তোর বিচার অইবই অইব।
-আইচ্চা আর করতামনা এই কাম।এইবারের মতন ছাইড়া দে।
-থাপড়া যে দেইনাই এইডাই বেশি।তোর মনের সুক্ষে বিড়ি টানন বাইর করতাছি আমি।

রুস্তমকে ধরে আনা হল।বিচার করল কিশোর চেয়ারম্যান।বিচারের পর কেউ তার সাথে কথা বলতনা।সবাই তাকে এড়িয়ে যেত।এভাবে কয়েকদিন চলার পর শাস্তির সমাপ্তি ঘটল একদিন।সে তার ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইল।তা দেখে এই শাস্তির ভয়ে সবাই সাবধানে চলত।কেউ ভুল করে বসতোনা।এমনকি যারা স্কুল ফাঁকি দিত,তারাও প্রতিদিন স্কুলে যেতে লাগল।ছুটোছুটিতে মজা করে তাদের দিন কাটতে লাগল।এর ফাঁকে ফাঁকে গ্রামের ছোট ছোট সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য খুঁজে বেড়াত তারা।

৭)

অতুল ডিসকভারিতে একটা প্রোগ্রাম দেখেছিল যেখানে একটা লোক বনে বনে ঘুরে বেড়ায়।সাপ,পাখি ধরে ধরে পুড়িয়ে খায়।রাতে গাছের শুকনো ডাল,পাতায় আগুন ধরিয়ে হিংস্র প্রাণীর কবল থেকে আপন প্রাণ বাঁচায়।এই ভেবে সে তাদের এলাকার সবাইকে নিয়ে গ্রামের পাশের একটা বনে গেল যার পাশেই ছোট একটা নদী যেটা দেখতে কিছুটা খালের মত।সেখানে ডিসকভারির ঐ লোকটার মত তারা মাছ ধরে তা আগুনে পূড়িয়ে খেল,বনের দুর্গম পথ পাড়ি দিল,লুকোচুরি খেলল।বিকেল হলে শোনা গেল বিচিত্র পাখিদের ডাকাডাকি।ধ্বনিত হল নীড়ে ফেরার আহবান।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার আঁধার নামতে শুরু করলে তারা জলদি সেখান থেকে বেরিয়ে আসে।ভয় ও আনন্দ একসাথে দুটোর সংমিশ্রণ ঘটে।সেগুলো আবার ডিজিটাল ক্যামেরায় ভিডিও করে সংরক্ষণ ও করে অতুল।

৮)

অতুল তার বন্ধুদের কাছে জানল আগে তাদের এলাকায় অনেক খেলার মাঠ থাকলেও এখন নেই।শহরের পাশাপাশি গ্রামও খুব বেশি পিছিয়ে নেই।নতুন নতুন অনেক ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে।খেলার মাঠের কিছুটা সংকট।তাই সে পরিমিত জাগয়া খুঁজে অল্প জায়গাকেই পরিষ্কার করে খেলার উপযোগী করে তোলে।খেলার বিভিন্ন সরঞ্জামের ব্যবস্থা করে।অতুল ও তার দল এলাকার বিভিন্ন রাস্তা ও মোড়ের নাম নিজেদের পছন্দমত দেয়া শুরু করল। অবশ্য পরবর্তীতে বড়রাও এসব নাম ব্যবহার করছে।প্রথমে তারা নাম দিল ভূতের মোড়।কারণ লোকের ধারনা সেখানে প্রায়ই নাকি ভূত দেখা যেত।তারা অন্ধগলি নাম দিল সেই গলিটার যেটা সরু,চারপাশে বড় বড় গাছের কারণে মৃদু অন্ধকার এবং গলিটা চিপা আকৃতির।এভাবে মিল রেখে কয়েকটা রাস্তার নামকরণ করা হল।
এলাকার অধিকাংশ লোকজন অতুলকে দুচোখে দেখতে পারতনা।তারা মনে করত এই শহুরে মাতব্বর ছেলের পাল্লায় পড়ে তাদের ছেলেমেয়ে খারাপ হচ্ছে।

৯)

প্রতিদিন তারা যে মাঠে খেলত সেটা গ্রামের এক মুরুব্বির ছিল।সে ছিল হারকিপ্টে এবং দুষ্ট প্রকৃতির লোক।বাচ্চাকাচ্চা একদমই পছন্দ ছিলনা তার।সুযোগ পেলেই ছেলেপেলেদের পিছনে লেগে থাকত বুড়োটা।একদিন যখন তারা খেলছিল তখন বুড়োটা অযথা মাঠ থেকে তাদের তাড়িয়ে দেবার পর তারা কয়েকবন্ধু মিলে বুদ্ধি করল।হারকিপ্টে বজ্জাত লোকটাকে উচিৎ শিক্ষা দেয়ার জন্য তার গাছ থেকে গোপনে আম,কাঁঠাল,জাম চুরি করল…..।

চুরির পরিকল্পনাটা মজার ছিল।সবাইকে আলাদা দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল।আউয়াল পাহারায় থাকল কেউ আশেপাশে আছে কিনা দেখার জন্য,কেউ এলে “উউউউউ” শব্দ করে বিপদ সংকেত দিবে যেটা শুধু তারাই বুঝবে।করিম গাছে উঠল,অতুল নিচে দাঁড়িয়ে ফলগুলো তার হাতে ধরল এবং নাসিম অন্য স্থানে সেই ফল সাপ্লাইয়ের ভার নিল।তাদের চার বন্ধুদের মধ্যে দুর্ভাগ্যবশত আউয়ালটা ছিল বোকাসোকা ধরনের।সে ঠিকমত পাহারা দেয়া ছেড়ে বলদের মত আগ্রহ নিয়ে হা করে চুরি করা দেখছিল।ঐদিকে পাজি বুড়োটা প্রায় দেখেই ফেলেছিল চুরির কাণ্ড।অল্পের জন্য ধরা পড়েনি তারা।

অতুল: হিসহিসহিসসসসসসসস…..
নাসিম: আরে আস্তে হিসা।আউয়াল এই সিগন্যালের মাথামুন্ডু বুঝব না।ও যেমনে মনোযোগ দিয়া চাইয়া চুরি করা দেখতাছে তাতে তোর হিসহিস শুইন্যা ওর হিসু করতে খুব বেশি সময় লাগব না।

এই বলে অতুল,নাসিম,করিম তিনজন হাসতে লাগল।আউয়াল কিঞ্চিৎ লজ্জা পেল।তার বলদামির জন্য অতুল তাকে চুপি চুপি ঝাড়ি দিল।তখন সে ভ্যাবলার মত তাকিয়ে রইল।

চুরি করা ফলের স্বাদ তিনগুণ বেড়ে যায়,অতুলের তা জানা ছিলনা।তাছাড়া সরাসরি গাছের ফল ফর্মালিনমুক্ত।সবাইকে নিয়ে ভাগ করে সুস্বাদু ফল খেল তারা।

১০)

অতুলের ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে এলে তার খুব মন খারাপ হয়।তাই সব বন্ধুরা মিলে এক বিকালে নৌকাভ্রমণে বের হল।সেদিন রবিন নামের এক বন্ধু তাদের সাথে যোগ দেয়নি।পরে খবর নিয়ে জানা গেল রবিনের পড়াশুনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।তার বাড়ির বাইরে বের হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।সামনে তার প্রথম সাময়িক পরীক্ষা।প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবই বিনামূল্যে বিতরণ করা হলেও সে এবং তার মত কয়েকজন ছাত্রছাত্রী সবগুলো বই পায়নি।এ ব্যাপারে জোরালভাবে যথাযথ কর্তৃপক্ষও কোন পদক্ষেপ নেয়নি।তার দু’টি বই পাওয়া বাকি ছিল।নতুন বই কিনে দেওয়ার কথা বলতেই ১১ বছরের রবিনকে তার বাবা খুব মারধর করে এবং কোথাও কাজে লাগিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।রবিনের বাবা আগে থেকেই ছেলেদের পড়াশুনার ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখায়।রবিনের পাশাপাশি তার ছোট ভাই রাকিবের পড়াশুনাও বন্ধ করা হল।কারণ তাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ।আর রবিনের বাবার ধারনা গরিবের পড়াশুনা করে কোন লাভ নেই।

১১)

অতুলরা একটা জরুরি মিটিংয়ের ব্যবস্থা করল।মূল আলোচনার বিষয় ছিল রবিন-রাকিব ও তাদের মত দরিদ্র ছাত্রছাত্রীরা।যারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত তাদের নিয়েও আলোচনা করা হল।এদিকে অতুলের হাতে সময় ছিল মাত্র ১০ দিন।তারপর তাকে ফিরতে হবে।সে তার দলের সবাইকে বলল সকল ছেলেমেয়েদের সাধ্য অনুযায়ী টাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে।সবাই যার যার কাজে নেমে পড়ল।স্কুল পড়ুয়া সব ছেলেমেয়েরা যে যা পারল তাই দিল।ঐদিকে অতুলের বাবা-মা অস্থির হয়ে ফোনের পর ফোন করতে থাকে।কিন্তু সে পরিষ্কার জানিয়ে দেয় একটা বিশেষ কাজের জন্য তাকে গ্রামে আরও কিছুদিন থাকতে হবে।অতুলরা একটু একটু করে ধৈর্য সহকারে টাকা জমাতে লাগল।তাদেরকে উৎসাহ যোগাতে বড়রাও অনেকভাবে আর্থিক সাহায্য করল।১৫-২০ দিন একটানা টাকা জমিয়ে সেই টাকাগুলো দিয়ে তারা কিছু পাঠ্যবই,খাতা,কলম কিনল এবং রবিন,রাকিব ও দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের হাতে তুলে দিল।যারা স্কুলে পড়েনা তাদেরও পড়ার আগ্রহ বাড়াতে বই দিল।রবিনের বাবা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের এই মানবতা,উদারতা দেখে নিজের ভুল ও ব্যর্থতা বুঝতে পারল।সে খুশিতে কেঁদে ফেলল।যে করেই হোক,তার সন্তানদের সুশিক্ষিত করার অঙ্গীকার করল সে।বই খাতা পেয়ে রবিন,রাকিব ও অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা খুব খুশি হল।

১২)

ছোটছোট ছেলেমেয়েদের এই দুর্দান্ত উদ্যোগ ও সাফল্যের খবর ধীরে ধীরে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল।গ্রামের চেয়ারম্যান এক সভার আয়োজন করলেন।সেখানে জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।তাদের সবার সামনে অতুলকে তার অসাধারন কাজের জন্য পুরস্কৃত করা হল।তার দলকেও পুরস্কৃত করা হল।সবাই তাদের বাহ বাহ দিতে লাগল।পাশাপাশি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে বিতরণযোগ্য বইয়ের ঘাটতির কারণ এবং এ ব্যাপারে অবহেলার তদারকি করা হল।অতুলের বাবা-মা অতুলকে ফিরিয়ে নিতে গ্রামে এলেন।তারাও এই খবর শুনে খুশি হলেন।

১৩)

অতুলরা দুদিন পর বাড়ি ফিরল।আবারও বন্দী জগত!বাড়ি ফেরার আগে তার খুব মন খারাপ হল।তার বন্ধুরাও মন খারাপ করল।বন্ধুরা তাকে অনেক উপহার দিল।কেউ দিল গাছের রসালো ফল,কেউ মাটির পুতুল,কেউ দিল বেতের তৈরি ঝুড়ি,নকশি পিঠা ইত্যাদি।সবচেয়ে সেরা উপহার ছিল অকৃত্রিম ভালবাসা,অনেক মায়া এবং সুন্দর সব স্মৃতি।অতুল তার ইচ্ছেঘুড়িটা উড়িয়ে দিয়ে ঢাকায় চলে গেল পুণরায় গ্রামে ফিরে আসার অভিপ্রায় নিয়ে।ইচ্ছেঘুড়িটায় লিখে রেখে গেল তার তৈরি ইচ্ছে নিয়মগুলো যা কিছু কিছু ক্ষেত্রে আজও গ্রামের মঙ্গল সাধন করে।

৬ thoughts on “ইচ্ছেঘুড়ি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *