অনির্বচনীয় (শূন্য)

প্রশ্নঃ

সেদিন সন্ধ্যায় একটা সিটিবাসে করে আদাবর যাচ্ছি। মিরপুর রোডের জ্যামে আটকা পরলাম। ঢাকা শহরে জ্যামে পরলেই খুব কমন একটা বিষয় হচ্ছে, হকারেরা বাসে উঠে আপনার যাত্রার শুভকামনা এবং মানিব্যাগের প্রতি সাবধান বানী দিয়ে তার নিয়ে আসা জিনিসটার উপকারিতা বর্ণনা করে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। আমার বরাবরই ব্যাপারটা বিরক্ত লাগে। নটরডেমে পড়ার সময় বিদ্যুৎ স্যার একবার বলেছিলেন – মানুষের যে জিনিসের দরকার সেটা সে বাজার থেকে গিয়ে নিয়ে আসবে, তোমাকে যখন কেউ সেটা আগ বাড়িয়ে দিতে আসবে বুঝে নিবে ‘ডাল মে কুছ কালা হেয়’। আমারও তাই ধারণা।

প্রশ্নঃ

সেদিন সন্ধ্যায় একটা সিটিবাসে করে আদাবর যাচ্ছি। মিরপুর রোডের জ্যামে আটকা পরলাম। ঢাকা শহরে জ্যামে পরলেই খুব কমন একটা বিষয় হচ্ছে, হকারেরা বাসে উঠে আপনার যাত্রার শুভকামনা এবং মানিব্যাগের প্রতি সাবধান বানী দিয়ে তার নিয়ে আসা জিনিসটার উপকারিতা বর্ণনা করে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। আমার বরাবরই ব্যাপারটা বিরক্ত লাগে। নটরডেমে পড়ার সময় বিদ্যুৎ স্যার একবার বলেছিলেন – মানুষের যে জিনিসের দরকার সেটা সে বাজার থেকে গিয়ে নিয়ে আসবে, তোমাকে যখন কেউ সেটা আগ বাড়িয়ে দিতে আসবে বুঝে নিবে ‘ডাল মে কুছ কালা হেয়’। আমারও তাই ধারণা।
তো, সেদিনও তাই হল। বাস থামতে না থামতেই একজন হকার উঠে পরল। বয়স আমার মতই। সে রাবারযুক্ত পেন্সিল আর ডরেমন পেন্সিল বিক্রি করছিল। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, তার গলায় একটা আইডি কার্ড ঝোলান। লেখা আছে-মিরপুর বাংলা কলেজ, মানবিক বিভাগ,দ্বাদশ শ্রেণী। তার কাছেই জানলাম, সে পেন্সিল বিক্রি করেই তার পড়ালেখা আর সংসারের খরচ চালায়(কীভাবে সম্ভব জানিনা!)। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। আমি জানি পড়ালেখা করতে খরচ কেমন হয়, আর সংসারই বা কি জিনিস। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে(আমি নিজেও উত্তর জানিনা, বরাবরই তাই করি, আপনাদের কাছে উত্তর পাব এই আশায়) আমাদেরই অনেকে তো প্রায়ই কাছের বন্ধুটিকে নিয়ে কেএফসিতে যাই, হাতিরঝিলের আশেপাশের দামি ফুচকার দোকান গুলোয় বসি, অনেক খরচ করে প্রিয়তমার জন্য ঘড়ি বা অন্য কিছু কিনি… কিন্তু এসবের মাঝেও কি আমরা এই ডরেমন-পেন্সিল-ওয়ালাদের কথা ভাবতে পারি না?

বিবেক

ঐ বাসেরই আরেকটা ঘটনা বলি। সবাই জানে, বাসের সামনের ডানপাশের তিন ধাপ সিট মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। আমি বাসে উঠে এই সিটগুলো ফাকা পেলেও বসি না। সহজ কথায় আমার বসতে ভয় করে। সেদিন সবগুলো সিটেই পুরুষ মানুষ বসেছিল। মেয়েমানুষ ছিল না বলে ব্যাপারটা স্বাভাবিক। কিন্তু একটা মেয়ে মানুষ ওঠার পরেও কেউ ঐ সিটগুলো ছাড়ল না। মেয়েটা তাদের কয়েকবার বলল, কিন্তু লোকগুলো যেন ‘দ্য ডিক্টেটর’ মুভির আলাদিন(তার একটা ডায়ালগ ছিল- “স্যরি আই কান্ট হিয়্যার ইউ!”)! আমি ঐ সিটগুলোতে বসে থাকা এক লোককে বললাম। তিনি এমন ভাবে আমার দিকে তাকালেন যেন আমি তার কিডনি ধার চাইছি! যাই হোক, মেয়েটা পরের স্টপেজেই নেমে গেল। অনেকে বলতেই পারে, মেয়েদের জন্য সবজায়গায় এতো সংরক্ষিত ব্যাপারটা থাকবে কেন…? মেয়েদের নারী দিবস আছে, সংসদে সংরক্ষিত আসন আছে, নারী অধিকার আইন আছে… বাসেও কেন তা লাগবে? বলি, নারীরা জাতি হিসেবেই তো দুর্বল(শারীরিক ভাবে), তাই না? তাদের সাহায্যে আপনি না এগিয়ে আসলে আমাদের পথটা কেমন করে সুগম হবে? আপনার মা-ই তো ঐ বাসে করে বাসার জন্য হয়তো বাজার করে ফিরছিলেন। আপনার বোনই হয়তো আপনার বার্থডে উপলক্ষ্যে গিফট নিয়ে ফিরছিল। ভাবুনতো, বাসায় আপনার মাকে কখনও মুরগির রানটা খেতে দেখেছেন? সবচেয়ে মজার রান্নাগুলো কার পাতে যায় আগে? আমার কিংবা আপনারই, তাই না? মেয়েদের রাঁধতেও হয়, চুলও বাঁধতে হয়… আবার,ইদানিং আমার মত উজবুকদের শাসনও করতে হয়। অনেকেই হয়তো আবার আমাকে নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ ভেবে বসতে পারেন। না, আসলে আপনার আমার এইসব ছোট্ট ছোট্ট কন্ট্রিবিউশনের জন্য আন্দোলন লাগে না। লাগে মানসিকতা।

স্বপ্ন

বাসের ঘটে যাওয়া ঘটনাই যখন লিখলাম, শেষ করব বাসকে ঘিরে আমার একটা স্বপ্ন নিয়ে(হাসবেন না প্লিজ!)। আমি স্বপ্ন দেখি, একটা রাস্তায় সাদা রঙের একটা বাস চলা শুরু করল। রাস্তার দুপাশে সবুজ আর সবুজ(মানে আমার স্বপ্ন ঢাকা শহরে পূরণ হবার নয়!)। বাসের সিট গুলো আলো করে আমার বয়সি অনেকগুলো তরুণ তরুণী বসে আছে। তাদের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তারা খুব সুখী একটি দেশে বাস করে। বাস চলতে থাকে, পথিমধ্যে বিভিন্ন বয়সের মানুষ বাসে উঠতে থাকে। বৃদ্ধ আর শিশুদের সংখ্যাই বেশি। তো, বাস গন্তব্যে পৌঁছানোর পর দেখা গেল, বৃদ্ধ আর শিশুরা সিটগুলো দখল করে বসে আছে, আর সেই হাস্যোজ্জল মুখের তরুণ তরুণীরা দাড়িয়ে আছে। তাদের এক্সপ্রেশন আগের মতই। সদা খুশি এবং সুখীভাব প্রবল। তাদের হাসি আবার মনে করিয়ে দেয়, তারা খুব সুখী একটি দেশের মানুষ!

আমাদের সংস্কৃতি তো এটাই বলে তাই না? নারী আর বয়স্কদের সাহায্য ও সম্মান আর ছোটদের কাজে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আন্তরিকতা আমাদের থেকে কাদের আর বেশি আছে বলেন? এভাবেই ছোট্ট, খুবই ছোট্ট কাজগুলোই অনেক অশান্তির মাঝে শান্তির বাতাস বয়ে নিয়ে আসে। আসুন না শান্তির বাতাসটা গায়ে লাগাই।

৫ thoughts on “অনির্বচনীয় (শূন্য)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *