পথ গেছে বেঁকে পথের সিমানায়

অনেকদিন হয় উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটি হয় না। সে অনেকদিন হল যখন মোহাম্মদপুর বিআরটিসি বাস স্ট্যান্ড থেকে হাঁটা শুরু করে সাত মসজিদ রোড দিয়ে সংকর, ঝিঁকাতলা, রাইফেলস স্কয়ার, সিটি কলেজ, কলাবাগান, আসাদ গেট হয়ে আবার মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড এসে থামতাম। কোন উদ্দেশ্য নেই শুধুই হাঁটা আর আশে পাশে কি হচ্ছে একটু নজর বুলিয়ে নেওয়া। আজ খুব মন চাচ্ছে। সঙ্গীতো একজন লাগবে নাকি? সঙ্গি কোথায় পাই কোথায় পাই করে ফোন দিলাম নতুন এক বন্ধু মামনুন চৌধুরীকে। সে রাজি। শুরু হল হন্টন। যাত্রা শুরু ফারমগেইট থেকে। গ্রীন রোড দিয়ে হাঁটছি। মামনুনের তো ব্যাপক উৎসাহ। কথায় কথায় গ্রীন রোড শেষ। বিশেষ কোন ঘটনা চোখে পড়লো না। আমরা এখন সাইন্স ল্যাবকে পাশ কাটিয়ে নিউ মার্কেটের দিকে এগুচ্ছি। নিউ মার্কেটের কাছে আসতেই ঘটনা শুরু।

ঘটনা-একঃ চোখে পড়লো সেই দৃশ্য। যা দেখে গিয়েছিলাম ৪ বছর আগে এই নিউ মার্কেটের ওভার ব্রিজের পাশেই। ছোট ছোট পথশিশুগুলো ড্যান্ডি টানছে। সে এক করুন দৃশ্য। পলিথিনের প্যাকেটে জুতার গাম ঢেলে নাক মুখ ডুবিয়ে শ্বাস নিচ্ছে। প্রতি শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে বোতাম ছাড়া শার্টের নিচে বুক উঠা নামা করছে কোন এক করুন ছন্দে, যে ছন্দ শুরু হয়েছিলো মায়ের গর্ভ থেকে যখন সে নিশ্চিন্তে ছিল। দেখে সহ্য করা যায় না। শুধু মায়া লাগে করার কিছুই থাকেনা। মামনুনের চোখের দিকে তাকালাম। চোখ চিকচিক করছে সেটা চোখের জলের টলমল অবস্থার কারনে নাকি চশমার স্বচ্ছ গ্লাসের কারনে বোঝার উপায় নেই। এগুতে থাকলাম।

ঘটনা-দুইঃ আমরা এখন কাঁটাবনের পশু পাখির মার্কেটে। অসংখ্য রঙ বেরঙ্গের ছোট বড় পাখি আর মাছ। অপরূপ তাদের রূপ। মামনুন হেসে দিলো যখন দেখল কতগুলো কুকুর খাঁচায় বন্দি। ও বলে দেখ মামা কুত্তাও ওদের হাত থেকে রেহাই পায় না। কি সুন্দর খাঁচায় বন্দি কইরা রাখছে বেচার জন্য। আমার তখন খারাপ লাগছিলো খাঁচায় বন্দি পাখি গুলোর জন্য। বিশেষ করে ছোট ছোট কালারফুল পাখি গুলোর জন্য। মন চাচ্ছে সবগুলো পাখি কিনে মুক্ত করে দিতে। সিদ্ধান্ত নিলাম আগামী ১৮ তারিখ আমার আর আমার পেত্নীর মানে আমাদের এনিভার্সারিতে যে টাকা ফাস্ট ফুড খেয়ে আর ফুল কিনে খরচ করতাম সেই টাকা দিয়ে কয়েকটা পাখি কিনে উড়িয়ে দিবো। মামনুনকে বললাম, ও বলল দোস্ত আমার তো আর গার্লফ্রেন্ড নাই আমি আমার সামনের জন্মদিনে এই কাজ করমু। আমি বললাম গ্রেট। মামনুনকে জিজ্ঞেস করলাম পাখির দাম কত। ও জানেনা। দোকানদারদের কাছেও দাম জিজ্ঞেস করতে মন চাইলো না। ভাইয়ারা কেউ ছোট পাখিগুলোর দাম জানলে কমেন্টে জানাবেন প্লীজ। একটা খুশি খুশি মন নিয়ে কাঁটাবন ছাড়লাম।

ঘটনা-তিনঃ আমরা এখন শাহবাগ চত্বরে। হে সেই চত্বরে। এখানে এসে কেন যেন চুপ মেরে গেলাম। খেয়াল করে দেখি মামনুনও চুপ। যখন শাহবাগে তরুণদের উত্তাল আন্দোলন চলেছিল তখন মামনুনের সাথে পরিচয় ছিল না। কিন্তু ও এসেছিলো। আমার গলার স্বরের সাথে ওর স্বরও মিশেছিল। আমার সাথে তখন ছিল সৌরভ, আসাদ, নিপু। আমাদের সবার লক্ষ্য ছিল একটাই। ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই। সেই থেকে শাহবাগ দিয়ে যখনই যাই আসি মনের মধ্যে কেমন যেন একটু চিন চিন করে উঠে। কে বলেছে শাহবাগ থেমে গেছে? শাহবাগ বেঁচে আছে প্রতিটা আন্দোলনকারীর হৃদয়ে। শাহবাগ শুধু একটা আন্দোলন নয় এটা একটা চেতনা। এ চেতনা আজীবন লালিত হতে থাকবে পরম আদরে আমার, মামনুন, সৌরভ, আসাদ, নিপুদের মত হাজারো মামনুন সৌরভ, আসাদ, নিপুদের বুকে। শাহবাগ শুরু হয়েছিলো কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে কিন্তু শাহবাগ জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে একটি করে প্রদীপ, সে প্রদীপ চেতনার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। আমি বিশ্বাস করি আজও সেই প্রদীপ জ্বলজ্বল করছে সবার হৃদয়ে। সে প্রদীপ কখনো দীপ্তি হারাবেনা। চোখের মাঝে ভাসতে সুরু করলো সেই উত্তাল দিনগুলো, সেই উত্তাল রাতগুলো। সবাই যেন আবারো একসাথে বলছি-
ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই
রাজাকারের ফাঁসি চাই

আর পা বারাবার শক্তি ছিলোনা। মামনুনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মুন্সিগঞ্জের গাড়ি ধরলাম। ক্লান্তিতে বাসের সীটে গা এলিয়ে দিলাম, চোখ জুড়ে ঘুম এসে গেলো। হয়তো কিছু একটা স্বপ্নও দেখছিলাম, মনে নেই—

৭ thoughts on “পথ গেছে বেঁকে পথের সিমানায়

  1. শুরুটা মজার হলেও শেষটা এসে
    শুরুটা মজার হলেও শেষটা এসে একটা ইমোশনাল মোড় নিলো…

    আমার মনে পড়ে সেই দিনটার কথা যেদিন বিকালে সমগ্র বাংলাদেশ এক সাথে থেমে গিয়েছিল এক মিনিটের জন্য!
    কেন জানি না- আমার চোখে পানি এসে পড়েছিল। হৃদপিন্ডের গতি বেড়ে গিয়েছিল। শরীরে ধরেছিল এক অচেনা কাঁপন… অভুতপূর্ব সেই অনুভূতির কথা আজ আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন সম্পূর্ণ অনাকাঙ্খিত ভাবেই…

    “শাহবাগ শুধু একটা আন্দোলন নয় এটা একটা চেতনা। এ চেতনা আজীবন লালিত হতে থাকবে…”

    আজ আর মূল লেখা নিয়ে কোন মন্তব্য করবো না।
    :গোলাপ: ভালো থাকুন…

  2. ভালো লাগলো।সেই শ্লোগানমুখর
    ভালো লাগলো।সেই শ্লোগানমুখর স্মৃতিতে ফিরে গিয়েছিলাম।কিন্তু মাঝের মেয়ে দেখা ঘটনা নিয়ে রসিকতাটা না দিলে পোস্টটা আরো ভালো হত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *