কারিগর

ট্যারান্টিনো একসময় বলে গিয়েছিলেন, “চলচ্চিত্র দুই প্রকারের হতে পারে, একটা হলো ফিল্ম। আর একটা হলো মুভি”।

একমত আমিও, পার্থক্যের অভিমতে। যে কেউই ফিল্ম বানাতে পারে, ফিল্ম বানিয়ে টাকা কামাতে পারে। বিলবোর্ডে তার ছবির পোস্টারে কানায় কানায় পরিপূর্ণ থাকবে শহর, থাকবে রেড কার্পেটের মহড়া… কাড়ি কাড়ি টাকা…… ৫-১০ বছর পর সে ছবির কথা মানুষ বেমালুম ভুলে যাবে।

মুভি সবাই বানাতে পারে না। কারণ, তাদের সেই ক্যাপাবিলিটি নেই। খুব কম মুভিই ব্লকবাস্টার হয়, লোকমুখে জনপ্রিয় হয়। আবার এমন অনেক মুভিও হয়, যেটা রিলিজের পর যখন কেউ নাম শোনে তখন বলে, “এই মুভির নাম তো জীবনেও শুনি নাই।”


ট্যারান্টিনো একসময় বলে গিয়েছিলেন, “চলচ্চিত্র দুই প্রকারের হতে পারে, একটা হলো ফিল্ম। আর একটা হলো মুভি”।

একমত আমিও, পার্থক্যের অভিমতে। যে কেউই ফিল্ম বানাতে পারে, ফিল্ম বানিয়ে টাকা কামাতে পারে। বিলবোর্ডে তার ছবির পোস্টারে কানায় কানায় পরিপূর্ণ থাকবে শহর, থাকবে রেড কার্পেটের মহড়া… কাড়ি কাড়ি টাকা…… ৫-১০ বছর পর সে ছবির কথা মানুষ বেমালুম ভুলে যাবে।

মুভি সবাই বানাতে পারে না। কারণ, তাদের সেই ক্যাপাবিলিটি নেই। খুব কম মুভিই ব্লকবাস্টার হয়, লোকমুখে জনপ্রিয় হয়। আবার এমন অনেক মুভিও হয়, যেটা রিলিজের পর যখন কেউ নাম শোনে তখন বলে, “এই মুভির নাম তো জীবনেও শুনি নাই।”

সময় পেরোয়… কিন্তু মুভিটা হারিয়ে যায় না। অন্তরাল থেকে প্রকাশ্যে বের হয়ে এসে তৈরি করে ইতিহাস। “ক্ল্যাসিক” শিরোনামে ঠাঁই পায় রেকর্ড বইয়ে।

এত কিছু বলার কোন মানেই ছিল না, শুধু একটু ভূমিকা আর কি! প্রজন্মের উপর আমি এক দিক দিয়ে আশাবাদী, আবার আরেক দিকে বিরক্ত!

প্রসঙ্গ অনন্ত জলিল ও তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। আশাবাদী এই জন্য, সিনেমার ব্যবসা আবারও চাঙ্গা… পুরোনো অভিনেতার ফিরছে, মানুষ হলে ছবি দেখছে। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য গ্রিন সিগনাল।

কিন্তু বিরক্তির পরিমাণ টাই বেশি। কারণ, যেটাকে ফিল্ম হিসেবে প্রেজেন্ট করা হচ্ছে সেটা নতুন বোতলে পুরোনো মদ ছাড়া আর কিছুই না। বরং আরও অখাদ্যই পাচ্ছে দর্শকরা। আর যারা বাইরের আর্ট ফিল্মের সাথে অভ্যস্ত না, তারাই ভারতীয় সস্তা এন্টারটেইন্মেন্টে আকৃষ্ট হয়ে যাচ্ছে সোসাল সাইকোপ্যাথ…

এই দেশটা মুভি আর্টিস্ট এবং ডিরেক্টরদের জন্য খুবই ভয়াবহ অবস্থান তৈরি করছে, যেটা সম্পূর্ণই একটা গোলক ধাঁধাঁ! ফিল্ম দেখে শুধুমাত্র অজপাঁড়াগাঁর কৃষক রা, অভিনবত্ব যে তাদের সইবে না। সো, বানাও একই ছবি বার বার!

এটা তো আর্টিস্টদেরই নিজস্ব অভিমত… আরও কারণ আছে। এই দেশের কতিপয় মহাজনরাই যে চাইতেন না, যে এমন কেউ কিছু করুক যাতে এদেশের মানুষের মেন্টালিটির পরিবর্তন ঘটে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আমার কাছে এটাই মনে হয়, একজন মানুষ ছিলেন যিনি পারতেন… এন্টারটেইনমেন্টের নামে মানুষকে কিছু মোরাল লেসন শেখাতে।

তিনি তারেক মাসুদ… নির্মম পরিহাস যে সেটা আর সম্ভব না। “মুক্তির গান” দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন যুদ্ধাবস্থায় বাঙ্গালীর প্রাণশক্তি… সঙ্গীতের উদ্দামে বেঁচে থাকার নব্যপ্রয়াস। এটা তো ছিল শুরু মাত্র!

কষ্ট লাগে, নিজের দেশের নির্মাতা যখন ছবি রিলিজ দেয়ার সময় সেন্সর বোর্ড থেকে ব্যান খান শুধু মাত্র ধর্মীয় পরিবেশের কারণে- তাও যে ছবিটি ছিল তার “মাস্টারপিস”। “মাটির ময়না” কিংবা “The Clay Bird” শুধু একটা মুভি ছিল না, ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য একটা ইতিহাস!

ডায়ালগগুলোর পাঞ্চ গুলো যেন ঠিক ঠাক মতোই আঘাত করে যায় দর্শকদের! “ওই মিয়া, চুল তো বড় রাখে মহিলারা আর হিন্দু সাধকেরা। তুমি কি বেদায়াতি সাধক হইবা?? এখন থেইকা চুলে এই ছাট দিবা। এই ছাটরে কয় কদম ছাট!”

তৎকালীন হিন্দুবিদ্বেষীতার পটভূমির পরই চলে আসে প্রস্তর চিকিৎসা পদ্ধতির অবলম্বন, কুসংস্কার… আনুর নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা, আর চিন্তা করা, এরা সবাই এত নিষ্ঠুর কেন?? মাদ্রাসার দুই শিক্ষকের আদর্শগত দ্বন্দ্ব, যুদ্ধপূর্ববর্তী আতঙ্ক… কি ছিল না ছবিতে! মেয়ে বিয়োগে নস্টালজিয়ায় ফিরে যেয়ে আনুর মা’র স্মৃতিবিচরণ তার স্বামীর ছোট ভাইয়ের সাথে! রোকনের অস্বাভাবিক রোগ এবং ফতোয়া এবং যুদ্ধ এর শুরু…

যে ডায়ালগটা ছিল এই মুভির সবচেয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ, “আরে মুসলমান ভাইয়েরা মুসলমানদের মারতে পারে নাকি? আর্মিরা আসতেসে ইসলাম রক্ষা করতে, শান্তি রক্ষা করতে!” যেটা বুঝিয়ে দেয়, ধর্মের কাছে দেশপ্রেম ছিল নগন্য, যেটা এখনো বজায় আছে অনেকক্ষেত্রে!

আর রানওয়ে… জঙ্গীবাদের মুখে ছিল তা এক অদৃশ্য থুথু! গরীব ঘরের ছেলেকে ধর্ম শিক্ষার নামে জিহাদের ময়দানে ছেড়ে দেয়ার পটভূমিটার ভয়াবহতা ফুটে উঠে! ফুটে উঠে অসহায়ত্ব…

ক্যামেরার ফোকাসে এমন জীবনধারা তৈরি করেছেন তিনি, যা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না কল্পনা হিসেবে! আর আজ তিনিই নেই… হারিয়ে গেছেন।

মাঝের দিকে ক্রেইজ হিসেবে কিছু উঠতি নির্মাতা উঠেছিলেন, এখনও তারা স্পটলাইটে আছেন। যারা সারাদিন “আমি, আমি, আমি, আমি, আমি আমি, আমি” করে বেড়ান আর মুক্তিযুদ্ধ এবং জঙ্গীবাদ কে ব্যাক ডেটেড টেইস্ট বলে উড়িয়ে দেন!! এরাই ধরবে ভবিষ্যতের হাল… হাসি আসে!!!

হয়তো সময় লাগতো, ১০ বছর, ২০ বছর- হয়তো আরও বেশি… এক সময় এই দেশ হয়তো চিনতো, আমাদের দেশেও একজন গুনী ব্যক্তি আছেন, তিনি তারেক মাসুদ!! সেটার সম্ভাবনা ওই যে তার হারিয়ে যাওয়া কাগজের ফুলের মতোই মনে হয়!

তবুও ভাবি, এই মানুষটার অবদান একদিন মানুষ জানবে। কৃতজ্ঞতা জানাবে… আর বলবে, ” তারেক মাসুদ মানুষটা কোন ফিল্ম বানায় নি। ঐতিহাসিক কিছু মুভি বানিয়ে গেছে!”

১২ thoughts on “কারিগর

  1. “আরে মুসলমান ভাইয়েরা

    “আরে মুসলমান ভাইয়েরা মুসলমানদের মারতে পারে নাকি? আর্মিরা আসতেসে ইসলাম রক্ষা করতে, শান্তি রক্ষা করতে!”

    দা গ্রেটেস্ট লাই এভার :মানেকি: :মানেকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :ক্ষেপছি: :ক্ষেপছি: … আর এই বিষয়টাকে এতটা চমৎকার করে ব্যাখ্যা আর চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার মত সাহস তারেক মাসুদ ছাড়া আর কারর ছিল না। আমরা আসলেও একটা কাগজের ফুলকে শুধু হারিয়ে ফেলিনি, আমাদের সবচেয়ে যোগ্য কণ্ঠটিও হারিয়ে ফেলেছি… :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ:

    1. এই ডায়ালগটা ছিল মুভিটির
      এই ডায়ালগটা ছিল মুভিটির সবচেয়ে বড় পাঞ্চ লাইন… এবং এরকম কিছু ডায়ালগের রিভার্স স্ক্রিনপ্লে থাকার কারণেই ছবিটা ব্যানড ছিল ৩ বছরের জন্য… কাগজের ফুল মুক্তি পেলে হয়তো জানতে পারতাম কেন আনুর বাবার এরকম ড্র্যাস্টিক একটা পরিবর্তন এসেছিল… সেটা আর জানা হবে না!

  2. শিরোনাম টা অন্য কিছু হলে হয়ত
    শিরোনাম টা অন্য কিছু হলে হয়ত ভাল লাগত। প্রথমে বুঝতে পারিনি কিসের উপর লিখছেন। তারেক মাসুদ কে নিয়ে বললে অনেক বলতে হয়। আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে তাকে নিয়ে বলা সম্ভবও না। তবে আশা একটাই এদেশের মানুষ একদিন তারেক মাসুদের কথা বিস্তর ভাবে জানবে। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *