গন্তব্য সেই বিশুদ্ধ লাল সবুজ

ইট কাঠের খাঁচায় বন্দী জীবন। প্রতিদিনই একই রুটিনে আবদ্ধ। একই মানুষ একই যন্ত্র একই পরিবেশ একই বৃত্তে সীমাবদ্ধ। গোলাকার একটি সীমারেখায় ঘূর্ণায়মান নিঃশ্বাস নেওয়ার একটি যন্ত্র ছাড়া আর কিছু মনে হয় না নিজেকে। চিরাচরিত সংজ্ঞা অনুযায়ী যার শ্বাস প্রশ্বাস চলে তাকেই জীবিত বলে। কিন্তু জীবনকে যে যাপন করে না তাকে কি বলে? জীবনকে যাপন করার জন্য কি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?


ইট কাঠের খাঁচায় বন্দী জীবন। প্রতিদিনই একই রুটিনে আবদ্ধ। একই মানুষ একই যন্ত্র একই পরিবেশ একই বৃত্তে সীমাবদ্ধ। গোলাকার একটি সীমারেখায় ঘূর্ণায়মান নিঃশ্বাস নেওয়ার একটি যন্ত্র ছাড়া আর কিছু মনে হয় না নিজেকে। চিরাচরিত সংজ্ঞা অনুযায়ী যার শ্বাস প্রশ্বাস চলে তাকেই জীবিত বলে। কিন্তু জীবনকে যে যাপন করে না তাকে কি বলে? জীবনকে যাপন করার জন্য কি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?

স্বাধীনতা? এর সংজ্ঞা কি? নিশ্চয়ই কোথাও পড়েছি, স্বাধীনতা কাকে বলে। এখন মনে করতে পারছি না কেন? আশ্চর্য, স্বাধীনতা কাকে বলে একে জানতে হবে কেন? আমি কি স্বাধীন নই? কারো অধীনে কি আছি আমি? না। সবই তো নিজের ইচ্ছে মতো হচ্ছে। বা কেউ তো আমাকে জোর করছে না কোনকিছু আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে করার জন্য। আমি নিজেই তো সকাল উঠি ঘুম থেকে, অথবা নির্ঘুম রাতের সমাপ্তি টেনে নতুন সকালের পুরাতন রুটিন শুরু করি। আমি নিজেই তো নাস্তা করে ঠিকঠাক মতো কাপড় পরে অফিসের উদ্দেশে বের হই। অথবা কয়েকবছর আগে থেকে আমার প্রতিদিন অফিসে যাওয়া শুরু হয়েছে বলে আজও আমি একই কাজ করি। আমি নিজেই তো বাসের অসংখ্য মানুষের ভাবলেশহীন চেহারা দেখতে দেখতে ঘামের সাগরে আরও একবার স্নান করে কোন রকম অভিযোগ ছাড়াই নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌছাই। আমি নিজেই তো একজন আদর্শ কর্মচারীর মতো একের পর এক ঊর্ধ্বতমের আদেশ পালন করি। দুপুরে ঠিকই পেটের আওয়াজে আমি তাকে শান্ত করতে ক্যান্টিনে ছুটে যাই। বিকেলে আবার ঘড়ির কাটার জানান দেওয়ার সাথে আরেক চিরচেনা গন্তব্যের দিকে পা বাড়াই। কেউ কি আমাকে কখনো বাঁধা দিয়েছে? দেয় নি। তবে আমি স্বাধীনতার মানে মনে করতে পারছি না কেন? যেভাবে বেঁচে আছি একে কি স্বাধীনতা বলে না? আমি জন্মেছি একটি স্বাধীন দেশে , তবে স্বাধীনতা শব্দটির সাথে অতৃপ্তি কেন আসে?
কেন “আমি স্বাধীন” এই কথাতে কোথায় অপূর্ণতা। আমার আশেপাশে যে কয়েকজন মানুষ বসে আছে, তাদেরও কি এমন মনে হয় কখনো? তাদের মধ্যেও কি অপূর্ণতার স্বাদ আছে?

“ভাই, আচ্ছা আপনার কি কখনো অতৃপ্তি জেগেছে?”
“ মানে? কি বলেন এসব। সেলারির কথা বলছেন? ফেব্রুয়ারি মাসে সেলারি বাড়ানোর কথা। জুন মাস পার হয়ে যাচ্ছে এখনো বাড়াচ্ছে না, তৃপ্তি আসবে কেমনে”

কোন মাসের কথা বলল? ফেব্রুয়ারি মাস? তাতে কি? ফেব্রুয়ারি জুন জুলাই আগস্ট সবই তো এক। কিন্তু হঠাৎ আমি এমন অস্থির হয়ে উঠলাম কেন? কলম পর্যন্ত ধরে রাখতে পারছি না। আমার হাত ৮০ বছরের বুড়োর মতো কাঁপছে। আমি ঘামাচ্ছি, কিন্তু এসি ১৭ তেই নামানো।

আমি কিছু না বলেই অফিস থেকে বের হয়ে যাই। হাঁটতে থাকি। কোথাও যেন আমার যেতে হবে। কিন্তু কোথায়? আমার খুব পিপাসা পায়। গলা শতাব্দী ধরে শুকনো মনে হয়। আমি হাহাকার করতে থাকি পানির জন্য। আমি পানি কিনে খেলাম। কিন্তু আমার তৃষ্ণা মিটল না। আমার লেবুর পানি খেতে ইচ্ছে করছে। লেবু পানি কোথায় পাবো এখন? কিন্তু লেবু পানিই কেন খেতে ইচ্ছে করছে?

হঠাৎ আমার মনে পড়লো এক সময় আমি প্রতিদিন কোথায় যেতাম। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেতো। তারস্বরে চিৎকারে গলা জ্বলতে থাকতো। কয়েকজন বন্ধু মিলে একসাথে লেবু পানির জন্য লাইন ধরতাম। কিন্তু কখন ছিল সেই সময়?

আমার গলা জ্বলতে থাকে। কিন্তু আমি কোন চিৎকার করি নি । আমি হাঁপাতে থাকি। আমি বার বার ঢোক গিলতে গিলতে সামনে এগিয়ে যেতে থাকি। মনে হচ্ছে গলায় কেউ এসিড ঢেলে দিয়েছে। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হতে থাকে।
হঠাৎ কাঁধে আমি কারো হাতের স্পর্শ পাই।
“কি খবর অনু, তুই হঠাৎ এই দিকে?”
সামির। আমার বন্ধু। আরও কি একটি যেন তার পরিচয় ছিল। ও হ্যাঁ। ছাত্র ইউনিয়ন করতো। এখন বাবার কাপড়ের ব্যবসা দেখে। যা কয়েকবার দুর্বিত্তের হাতে ধ্বংস হতে হতে রক্ষা পেয়েছিল। সামিরের জীবনও কয়েকবার বিপন্ন হয়েছিলো। অবিশ্বাস্য জীবনীশক্তি নিয়ে বার বার ফিরে এসেছে। পরিবারের নিরাপত্তার জন্য আজ সে শুধুই সামির। কমরেড সামির আজ মৃত। কিন্তু এখনো চোখে কিসের যেন একটি দ্যুতি বের হয়। চেহারার মধ্যে এখনো কিসের যেন স্ফুলিঙ্গ বের হয়। এখনো তার গলা দিয়ে ভরাট গম্ভীর তেজী আওয়াজ বের হয়।
“কি হল ঐদিকে কই যাচ্ছিস”
“শাহবাগ যাচ্ছি”
“শাহবাগে কি কাজ”
“একটা জিনিশ হারিয়ে ফেলেছি, খুঁজতে হবে”
“কি জিনিশ , মানিব্যাগ?”
“না আরও জরুরি কিছু”
“কখন হারিয়েছিস”
“বহু দিন আগে”
“বহু দিন আগের হারিয়ে যাওয়া জিনিশ এখন খুঁজে পাবি?”
“চেষ্টা করতে ক্ষতি কি”
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো সামির আমার দিকে। একটি দীর্ঘশ্বাস নিক্ষেপ করে বলল, “আচ্ছা যা, আমার ওদিকে যেতে ভালো লাগে না”

আমি আবার হাঁটা দিলাম। একবার পিছনে ফিরে দেখি, সেই উদ্যমী নির্ভীক আপোষহীন, দলের জন্য বিরামহীন পরিশ্রম করা সামির কেমন যেন কুঁজো হয়ে হাঁটছে। ভারী একটি ক্লান্ত জীবন তার উপর প্রচণ্ড চাপ দিচ্ছে। যার ভারে সে আজ নুয়ে গেছে।

আবার গলা জ্বলা আরম্ভ হল। এতক্ষণ টেরই পেলাম না। সামিরকে বললাম শাহবাগ যাচ্ছি। কিন্তু আমি এই জায়গাটির নামই কেন বললাম। তবে কি আমার এই গলার জ্বলা, বুকের হাঁপানি এই জায়গাটির জন্য? এতো মাস পর কেন সেই জায়গাতে যাওয়ার জন্য আমি এমন ব্যাকুলতা অনুভব করছি। কেন মনে হচ্ছে আমার এক মাত্র গন্তব্য শাহবাগ। কেন মনে হচ্ছে স্বাধীনতার যে মানে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি হন্য হয়ে তা আমি সেই জায়গায় গেলেই পাবো।

আমি হাঁটতে শিখেছি শুধু সেই জায়গায় যাওয়ার জন্যই। আমি কথা বলতে শিখেছি শুধু কিছু স্লোগান দেওয়ার জন্য। কি ছিল সেই স্লোগান? মাথায় হঠাৎ ভীষণ যন্ত্রণা অনুভব করছি। কিছু শব্দ এলোমেলো ভাবে ঘুরছে। মনে করার আপ্রান চেষ্টা করছি।
ঠিকানা… পদ্মা… বাঙালি… হাতিয়ার… গর্জে উঠো… ফাঁসি… রাজাকার… জ্বালিয়ে দাও…

হঠাৎ আমি থমকে যাই। আমি শাহবাগের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। পিনপতন নীরবতায় স্তব্ধ হয়ে আছে চারিদিক। আমার সামনে একটি মানুষও নেই। কিছুক্ষণ আগেও এখানে মানুষে মুখরিত ছিল। বাস রিকশা গাড়ির আওয়াজে চারিদিক উত্তেজিত ছিল, এখন কেউ নেই , কিছু নেই। আমি পাগলের মতো এদিক ওদিক তাকাই। আমি নিজের হাঁপানোর আওয়াজ ছাড়া কিছুই শুনতে পাই না। প্রচণ্ড ভয়ে আমার হৃৎপিণ্ড প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো। আমি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ি। চোখ ফেরাতেই একজনকে দেখি আমার সামনে হেঁটে আসছে। কাছে আসতেই আমি কুঁকড়ে যাই।

মনি। আমার বোন। ওর এই অবস্থা কেন? ওর শরীরে কাপড় ছিন্ন ভিন্ন। কোমরের নিচ থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। হেঁচড়ে হেঁচড়ে হাঁটছে। মুখের আশপাশে গাঢ় রক্ত জমাটের দাগ। ডান হাতটি পিছন দিকে মোড়ানো। ভেঙে গেছে নিশ্চয়। ছেড়া কামিজের ভিতর থেকে দেখা যাচ্ছে মনির বুকে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। আমি তীব্র ভয়ে বোবা হয়ে যাই। বিস্ফোরিত চোখে ওকে আমি দেখি আর পিছনে সরে যাই। মনি আমার দিকে এগুতে থাকে। গোঙানির মতো শব্দ করে। আমি বুঝি না কি বলছে ও। আমি বুঝত চাইও না। আমি শুধু জানি মনিকে আমি সকালে বাসায় দেখে এসেছি। ওর এমন অবস্থা হতে পারে না।

হঠাৎ মনির কোমরের নিচ থেকে স্রোতের মতো রক্ত ঝরতে থাকে। মনি ককিয়ে উঠে। ওর অস্পষ্ট উচ্চারণে আমি শুনতে পাই, “ভাইয়া খুব কষ্ট হচ্ছে রে, একটু পানি দিবি? খুব পিপাসা পেয়েছে। দিনের পর দিন আমাকে ওরা ছিঁড়ে খেয়েছে। আর পারি না। আমাকে মেরে ফেল ভাইয়া । আমি মুক্তি চাই”

ওর রক্ত মাখা দুহাত আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। আমি ছুটে গিয়ে মনিকে জড়িয়ে ধরতে চাই। কিন্তু ছুটতে গিয়ে উলটে পড়ি। মাথা তুলে তাকাতেই আমি দেখি আমার বাবাকে রক্তের মধ্যে ।
আমি অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে থাকি। নিজেকে আমার অন্ধ ভাবতে ইচ্ছে করছে। চক্ষু ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা আমাকে আজ সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছে। আমি কোনোমতে গড়িয়ে গড়িয়ে বাবার কাছে যাই। বাবার শরীর বরফ শীতল। বুক দিয়ে রক্তের ধারা বেরোচ্ছে। পেট মাঝখান বরাবর চিরে দেওয়া। নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আছে। বাবাকে আমার বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে । কিন্তু নিজেকে আমার জড় পদার্থ মন হয়। এই দৃশ্য আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়কে কুড়ে কুড়ে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। আমি চোখ বন্ধ করি। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে আমি আরও বিধ্বস্ত হই।

মা। আমার মা , যাকে এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, সে শুয়ে আছে গলায় দড়ি পেঁচিয়ে। আমি “মা” বলে তীব্র এক চিৎকার দিয়ে ছুটে যাই। কিন্তু হাঁটতে পারি না। আমি একই জায়গায় বার বার যন্ত্রের মতো দৌড়াতে থাকি। আমি গলা কাটা গরুর মতো হাত পা ছুড়তে থাকি। আমাকে মার কাছে যেতেই হবে। আমি একবার মা বলে চিৎকার দেই, একবার মনি বলে , আরেকবার বাবা বলে । আমার চিৎকার নিস্তব্ধ বাতাসে ধাক্কা খেয়ে বার বার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। আমি অমানুষিক ভাবে বার বার ক্লান্তিহীন দৌড়াতেই থাকি ওদের কাছে যাবো বলে। কিন্তু পৌঁছাতে পারি না।

“অনু…… অনু”

আমাকে ডাকছে। কেউ আমাকে ডাকছে। আমি পিছন ফিরে দেখি সামিরকে। আমার মুখ থেকে কোন আহত পশুর গোঙানির মতো তীক্ষ্ণ কিন্তু তীব্র বীভৎস চিৎকার বের হয়ে গেলো। সামিরের মাথার এক পাশ খুলে ঝুলে আছে। চোখ বরাবর ভয়ংকর বিধ্বংসী কোন বুলেট ওর মাথার খুলিকে দুভাগ করে দিয়েছে। কিন্তু হাতে এখনো রাইফেল ধরা। ওর হাতে রাইফেল কেন ? ও কি যুদ্ধে গিয়েছিলো?
সামির মাটিতে পরে যায়। আমি সকল ভয়কে তুচ্ছ করে ওর কাছে ছুটে যাই।
“সামির, সামির, ফিরে আয় সামির, ফিরে আয় সামির”

সামির ওর এক চোখ খুলে। ওর চোখে আমি তীব্র ধিক্কার দেখতে পাই। অপরিসীম ঘৃণা নিয়ে ও আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি ছিটকে পিছনে চলে যাই। ধুকধুক করা হৃৎপিণ্ড আমার গলায় উঠে আসে। ভয় ছাড়া আর কোন অনুভূতি আমার কাজ করে না। সামিরের পিছনে একে একে আমার মা বাবা আর মনি উঠে আসে। তাদেরও তিনজনের চোখে একই ধিক্কার একই ঘৃণা একই বিদ্বেষ।

আমার পুরো শরীর জ্বলে যায় তাঁদের ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে। তাঁদের ভয়ংকর চাহনিতে আমি ধ্বংস হতে থাকি। চারজনই একসাথে বলে উঠে,
“তুমি স্বাধীনতার মানে খুঁজতে এখানে এসেছ? কিন্তু স্বাধীনতা তোমার জন্য না। তুমি জানো না কি পরিমাণ বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে তুমি স্বাধীন হয়েছিলে। এতটাই স্বাধীন হয়েছিলে যে এখন আর মনেই করতে পারছ না স্বাধীনতা কি”

আমি নির্বাক।

“তুমি স্বাধীনতার যোগ্য নও। তোমার মনে আত্মায় শরীরে পচন ধরেছে। তোমার অস্তিত্ব তুমি বিক্রি করেছো। নোংরা ডাস্টবিনে তুমি তোমার বিবেক ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছ।

আমি নির্বাক।

“আমরা জীবন দিয়েছে, সম্ভ্রম হারিয়েছি তোমার স্বাধীনতার জন্য। কিন্তু তুমি, তোমরা সেই জীবন সেই সম্ভ্রমকে পা দিয়ে দ্বিতীয় বার মারিয়ে আবার সেই নরপশুদের হাতে তুলে দিয়েছ।

“তোমার জন্য প্রাণ উপেক্ষা করে এনে দিয়েছিলাম রক্তিম বিশুদ্ধ লাল সবুজ। যাকে ওরা এখন আবার নির্বিঘ্নে হত্যা করছে, লুট করছে, ভোগ করছে, ধ্বংস করছে। যেটার উপর দাঁড়িয়ে আবার আমাদের ব্রাশ ফায়ার করছে”

“তুমি স্বাধীনতার মানে জানতে চাও? তবে এনে দাও সেই লাল সবুজ। যেখান থাকবে না কোন পায়ের ছাপ, যেখানে থাকবে না কোন নরপশুর ছিটানো থুথু।

আমার গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরোচ্ছে না। প্রচণ্ড অমানুষিক চেষ্টার পর আমি বলে উঠলাম, “আমাকে ক্ষমা করো, তোমরা ক্ষমা করো আমাকে”

“ ক্ষমা করবো? তোমার বাবার মতো,সামিরের মতো ত্রিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছে তোমার স্বাধীনতার জন্য। তোমার মায়ের মতো , মনির মতো দু লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে তোমার স্বাধীনতার জন্য। ক্ষমা করলেই কি এদের প্রান সম্ভ্রম ফিরে আসবে?”

আমি তীব্র অপরাধবোধের গ্লানি নিয়ে নির্বাক হয়ে রইলাম।

“ তোমার প্রাণ ছিনিয়ে নিচ্ছি না । শুধু শুদ্ধ একটি লাল সবুজ চাই।
“এনে দাও, এনে দাও সেই লাল সবুজ। এনে দাও সেই লাল সবুজ”

আমি আপ্রান প্রার্থনা করছি, কেউ আমার চোখ উপ্রে ফেলো। এই দৃশ্য আমার সহ্য হচ্ছে না। কেউ আমার কানে এসিড ঢেলে দাও। এই শব্দ এই বাক্য এই ধ্বনি এই আওয়াজ আমার সহ্য হচ্ছে না। আমার অবিরত ধুকধুক বুকে কেউ পেরেক গেঁথে দাও। এই অপার্থিব ভয়, অপরাধবোধ আমি সহ্য করতে পারছি না।

আওয়াজ গুলো ধীরে ধীরে আমার কানের আরও কাছে এসে পরে। আমার সহ্যের বাদ ভেঙে যায়। তীব্র আক্রোশে আমি চিৎকার করে উঠি। যত শক্তি আছে আমার কণ্ঠনালিতে , যতটা উচ্চে উঠানো যায় আওয়াজকে, যতটা তেজ ঢেলে দেওয়া যায়, ঠিক ততটাই তীব্রতর ভাবে আমি চিৎকার করে উঠি

“ জয় বাংলা”

সাথে সাথে আমার সামনের দৃশ্যপট পালটে যায়। অগণিত মানুষ উপচে পড়ছে। যেদিকে তাকাচ্ছি আমি মানুষ ছাড়া কিছু দেখছি না। কোটি মানুষের মুখে বিশুদ্ধ আলোর দ্যুতি পুরো শাহবাগকে আরও একবার আলোকিত করছে। প্রত্যেকটি মানুষ দীপ্ত কণ্ঠে তারস্বরে গগনবিদারী আওয়াজে বলে যাচ্ছে,

“ জয় বাংলা”
“একাত্তরের হাতিয়ার, গর্জে উঠো আরেকবার”

মুখে অবিরাম স্লোগান নিয়ে মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে। আমিও তাঁদের সাথে মিশে গেলাম। কোটি পায়ের গন্তব্য সেই বিশুদ্ধ লাল সবুজের কোলে। যেখানে একটিও নরপশুর চিহ্ন থাকবে না।

১৪ thoughts on “গন্তব্য সেই বিশুদ্ধ লাল সবুজ

  1. উপস্থাপনা টা সাবলীল ঢং এবং
    উপস্থাপনা টা সাবলীল ঢং এবং কিছু আত্মপলব্ধির মধ্য দিয়ে এগুচ্ছিল । প্রথমে সঙ্গতি হারিয়ে ফেলেছিলাম । আস্তে আস্তে প্লাটফর্ম বদলাতে থাকে । লেখার আসল উদ্দেশ্য প্রতীয়মান হতে থাকে । দৃশ্যপট এর পরিবর্তন টা লক্ষণীয় এবং আর একটা বিশেষত্ব হল – সহসা প্লাটফর্ম এর কাহিনীর বিচরনে মুহূর্ত বদলিয়েছেন কিন্তু – সবগুলা আস্তে আস্তে একটি জায়গায় মিলেছে । এটা ভাল লেগেছে আমার । আর শব্দ চয়ন – প্রয়োজনীয় মুহূর্তে – সঠিক বাচন ভঙ্গিমা এগুলা চমৎকার বলা যায় । আর যে অনুভুতি নিয়ে লিখেছেন – তার অন্তরালে চাপা পড়ে আছে অনিঃশেষ দীর্ঘশ্বাস । তবে আপনার চেতনাকে সমান জানাচ্ছি ।

    1. শেষটা করতে চেয়েছিলাম শুধু
      শেষটা করতে চেয়েছিলাম শুধু দীর্ঘশ্বাস দিয়ে। কিন্তু পরে ভাবলাম একটু আশার আলো রেখে যাই না…

  2. শুরুতে একটু ঝুলে গিয়েছিল তবে
    শুরুতে একটু ঝুলে গিয়েছিল তবে শেষটা এক কথায় অনবদ্য…
    চমৎকার লাগল!! ৫ * থাম্বস আপ :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    আর অনেক অনেক সাধুবাদ ও :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow:

    1. শুরুতে বলতে চেয়েছিলাম
      শুরুতে বলতে চেয়েছিলাম প্রতিনিয়ত যেভাবে রোবটের মতো মানুষ বেঁচে থাকে তাকেই সম্পূর্ণতা মনে করে, স্বাধীন মনে করে। কিন্তু সার্বিক স্বাধীনতার কথা কতজনই মনে রাখে?
      রবোটিক জীবন লিড করা অতি সাধারণও মাঝে মাঝে চেতনার বিস্ফোরণ ঘটায় , যা শেষে বলতে চেয়েছি।
      আপনার থাম্বস আপের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। :ফুল:

  3. ভালো লেগেছে। তবে শুরুতেই গল্প
    ভালো লেগেছে। তবে শুরুতেই গল্প খেই হারিয়ে ফেললে পাঠক আগ্রহ হারাতে পারে। এই ব্যাপারটা লেখার সময় মাথায় রাখবেন। শুভকামনা। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  4. আমার কিন্তু শুরু থেকেই বেশ
    আমার কিন্তু শুরু থেকেই বেশ ভালো লেগেছে। এধরনের লেখায় সামান্য ঝোলাঝুলির ব্যাপার থাকেই। সে সময় কষ্ট করে গল্পের সাথে মিনিটখানেক ঝুলে থাকলেই হয় 😀 । পড়ে আনন্দ পেয়েছি। শুভেচ্ছা গ্রহন করুন :ফুল: এবং চালিয়ে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *