বালক

নিশ্চুপ পল্লী কোঁথাও কেউ নেই । ধুসর সৃতিতে বালকটি হাঁটছিল সেই কবে থেকেই । আকাশে সাদা মেঘের ভেলা । রাস্তার মোড়ের তালগাছটা এত উচু যেঁ মাথাটা দেখতে গেলে ঘাড় ব্যথা হয়ে যায় । বাবুই পাখির বাসাগুলি বাতাসে দোল খায় । বালকটি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষন । ব্যস্ত বাবুই পল্লী । মধ্যদুপুর । কাজল কালো দীঘিটা আয়নার মত হয়ে আছে । মুহূর্তের মধ্যেই ঝাঁপিয়ে পড়ে বালকটি । আলোড়ন ওঠে শান্ত দিঘীর জলে । পাল্লা দিয়ে রোঁদে পোড়া পাখা নিয়ে চিলটিও ডানা মেলে আকাশে । বালকটি চিত সাতার দিয়ে মুগ্ধ নয়নে সেদিকে তাকিয়ে থাকে । কখনো বা পানি ঢুকে মুখে কিংবা নাকে । হার মানে না বালক । চিল টি যতক্ষণ আকাশে থাকে সেও ততোক্ষণ সাঁতার কাটে ।

দিঘীর শান্ত জলে তরঙ্গের হিল্লোল
রোদপোড়া ডানায় ভাসে চিল,
উথলে ওঠে আবেগ , ভাসি আমি,
বাজে অরফিয়াসের বিন ।

বালক চোখ লাল করে উঠে আসে ডাঙ্গায় । কচুর পাতা চোখে দিয়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে রোজই বলে – সূর্য্যি মামা আমার চোখের লালটুকু নিয়ে নাও । কিন্তু সূর্য্যি মামার কোন দিনও সেই লাল টুকু নেয়া হয়ে ওঠেনি আর মায়ের পিটুনিও পিঠ থেকে মাটিতে পড়েনি ।

সূর্য তুই আমার মামা
আমি তোর ভাগনে,
আমার চোখের লাল নে,
লাল ফড়িং এর বিয়ে দে ।

অবাধ্য এই বালকটিকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে যেত জননী । মধ্যরাত্রির জোছনা তার খুবই প্রিয় । প্রসাব করতে উঠে সে জোছনা ধরতে যায় মধ্যরাত্রিতে চুপিসারে আবার কখনো বৃষ্টি স্নাত হয়ে ঘুরে বেড়ায় পাড়া । চিল ঘুড়িটার সুতোয় হোমিও শিশির গুঁড়া শিমুল আঠা দিয়ে লাগায় । এইতো সেদিনের কথা কোথা থেকে এক শালিক ছানা নিয়ে এসে মাকে বলে – আম্মু এর নাম তুলু । পাড়ার জঙ্গলের প্রতিটি পাখির বাসা তার চেনা । পাখীরা তার কাছে কখনো বাসা গোপন করতে পারে না । জননীর ভঁয় হয়। কোনদিন যেঁ ছেলেকে সাপে কামড় দেয় ।

জন্মান্তরের শখ ছিল মা হওয়ার
কি বলব সই ! হাসব না কাঁদবো !
মা হলাম ঠিকি, ছেলে আমার অবাধ্য ।

আজ কদিন থেকেই সে ভাবছে টীয়ে পাখির ছানা পুষবে । টীয়ে পাখি মানুষের মত কথা বলে । দারিয়ার বিলের পাশে যেঁ পাকুড় গাছ টা । সেখানটায় ঝাঁকে ঝাঁকে টীয়ে পাখির বাসা । সেই কবে থেকেই ভাবছে সেখানটায় যাবে কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠেনি কখনো । হঠাৎ একদিন পুকুর পেরিয়ে মাঠ পেরিয়ে বিলের ধারে যায় বালক । নীল শরতের আকাশ আরও নীল হয়ে বিলের জলে ভাসে । বালক টি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে সেদিকে ।

ঘুমাবিনা দস্যি ছেলে ?
শান্তি দিবিনা একটুও ?
দোহাই আল্লার ,
বাবা তোর বাইরে একটু ঘুমিয়ে পড় ।

একদিন ছোট চাচা বলল দারিয়ার বিলের পুকুর টা সেচবে । দাদু প্রতি বছরই সেচে পুকুরটি । প্রচুর শউল মাছ ধরা পড়ে । গত বছর শউল মাছ ধরতে গিয়ে লেজের বাড়ি খেয়ে ছিল মুখে । এবার আর না ।

দিয়েছ লেজ দিয়ে বাড়ি
শউল তোমার সাথে জীবনের আড়ি ।

আজ অনেক বছর গড়িয়ে গেছে । বালকটিও মিশে গেছে সময়ের স্রোতে জায়গা করে নিয়েছে নুতুন এক যুবক জীবনের হাসি কান্না , আনন্দ- বেদনা , উথান-পতন তাঁকে আরও উদাসি করে তোলে । আজম্ন কালের সাধনায় মগ্ন হয় যুবক ।

আজম্ন কালের সাধনায় দীপ্ত সাধক
নারীর ভুগর্ভে যেঁ রসের ভাণ্ডার দেখেছিল-
তা ছিল ক্ষণিকের উত্তেজনা মাত্র ,
ভেঙ্গে গেল সাধুর তন্দ্রা বিলাস !
সাদামাটা জীবনের খোঁজে বেরিয়ে সাধক ,
খুঁজে পায়নিক ঠিকানা এখনো ।
পাবে কি ঠিকানা কখনো?

ছিন্ন করে জন্মান্তরের বাঁধন,
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত সাধক,
ক্রমাগতই রচনা করে ব্যথতার নতুন উপাখ্যান ।
কেবলি প্রশ্ন জাগে আর কত ?

খরদিপ্ত রোদ পেরিয়ে বর্ষা আসে,
অমানিশা পেরিয়ে জোছনা
তবুও হয়না শেষ সাধনা ।

৬ thoughts on “বালক

  1. কথাগুলো খুব আপন আপন লাগলো।
    কথাগুলো খুব আপন আপন লাগলো। মনে হল, আমিই লিখেছি।
    হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত সাধক,
    ক্রমাগতই রচনা করে ব্যথতার নতুন উপাখ্যান ।
    কেবলি প্রশ্ন জাগে আর কত ?

    আসলেই
    কেবলি প্রশ্ন জাগে আর কত ?

  2. আজম্ন কালের সাধনায় দীপ্ত
    আজম্ন কালের সাধনায় দীপ্ত সাধক
    নারীর ভুগর্ভে যেঁ রসের ভাণ্ডার দেখেছিল-
    তা ছিল ক্ষণিকের উত্তেজনা মাত্র ,
    ভেঙ্গে গেল সাধুর তন্দ্রা বিলাস !
    সাদামাটা জীবনের খোঁজে বেরিয়ে সাধক,
    খুঁজে পায়নি ক ঠিকানা এখনো ।
    পাবে কি ঠিকানা কখনো?

    — অসাধারন ।চমৎকার শব্দ গঠন ও বাচনভঙ্গি ।
    বেশ কয়েকদিন পর ইস্টিশনে ভিন্নধর্মী ভাল একটা লিখা পড়লাম ।
    ধন্যবাদ লেখককে ।অজস্র ধন্যবাদ ।

  3. ছিন্ন করে জন্মান্তরের

    ছিন্ন করে জন্মান্তরের বাঁধন,
    হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত সাধক,
    ক্রমাগতই রচনা করে ব্যথতার নতুন উপাখ্যান ।
    কেবলি প্রশ্ন জাগে আর কত ?

  4. সমালোচনা: ×××××× (করার মত
    সমালোচনা: ×××××× (করার মত কিছুই নেই)

    ক্রেডিট: আসলেই অনেক দিন পর ভালো এবং বাস্তব ধর্মী লিখা পড়লাম। আপনাকে ধন্যবাদ। পড়ে মনে হচ্ছিলো চরিত্রের সাথে আমিও হারিয়ে গেছি। মিলবিন্যাস সুসঙ্গত ও পরিষ্কার। শব্দের ক্রমধারা রক্ষিত হয়েছে ভালোভাবে। ভাব ফুটে উঠেছে স্পষ্ট। লিখাটি স্পন্টেনিয়াস ছিল। যে গল্প নিজেই গল্প বলে যাচ্ছে। শেষের দিকটা অসধারণ লেগেছে।

    কানে কানে কথা: নিজের স্বকীয় ধারা অক্ষুণ্ণ রাখুন। তাহলে সর্বদা সাধারণ সৃষ্টিকেও অসাধারণ করতে সমস্যা হবেনা। বেস্ট অব লাক।

      1. আপনাদের সকলকেই ক্লান্ত
        আপনাদের সকলকেই ক্লান্ত হ্রিদয়ের উষ্ণ ভালবাসা দিলাম । খুবই ভালো লাগলো । নিজেকে বেশ তরতাজা মনে হচ্ছে । জীবনের ক্লান্তি গুল কেটে যাক । শুভ্র হোক সবকিছু । ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *