ভালবাসা ডাক দিয়ে যায়


****
আস্তে আস্তে চোখ খুলছে শাহানা। দৃষ্টি ঝাপসা লাগছে। কিছুক্ষণ বন্ধ রেখে আবার খুলে চোখের পাতা। আবার। আবার। দৃষ্টি কিছুটা পরিষ্কার হয়ে আসে। মাথা ঘুরিয়ে দেখে চারপাশ। ঘরটা পরিচিত লাগছে। এখানে সে আরও একবার এসেছিল। ঢাকা মেডিক্যালের ৪০৩ নাম্বার কেবিনে শাহানা।



****
আস্তে আস্তে চোখ খুলছে শাহানা। দৃষ্টি ঝাপসা লাগছে। কিছুক্ষণ বন্ধ রেখে আবার খুলে চোখের পাতা। আবার। আবার। দৃষ্টি কিছুটা পরিষ্কার হয়ে আসে। মাথা ঘুরিয়ে দেখে চারপাশ। ঘরটা পরিচিত লাগছে। এখানে সে আরও একবার এসেছিল। ঢাকা মেডিক্যালের ৪০৩ নাম্বার কেবিনে শাহানা।

এ নিয়ে দু’বার হল। আত্মহত্যা করতে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তাকে। খুব ভীতু শাহানা। তাই গলায় ফাঁস নেয়ার সাহস পায়না। অনেকবার চেষ্টা করে দেখেছে। খুব কষ্ট হয়। তাই দুইবারই বিষ খেয়েছে সে। কিন্তু মরার মরন দেখা দিল না। এইবারও তাকে বাঁচিয়ে তোলা হয়েছে।

খুব রাগ লাগছে শাহানার। কেন? কেন মানুষের স্বাধীনতা বলে কিছু থাকবেনা? মানুষ যদি স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার জন্য আন্দোলন করতে পারে তবে কেন মানুষকে স্বাধীনভাবে মরতে দেয়া হবে না? শাহানা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল এবার বাড়ি ফিরে সে এই আন্দোলনটা করবে।

‘মরার জন্য স্বাধীনতা’ শিরোনামের ব্যানার পোস্টার নিয়ে শাহবাগে অবস্থান নিবে। শাহবাগ এখন আন্দোলনের জন্য উর্বর ভূমি। গণজাগরণ মঞ্চের কল্যাণে কেউ পাঁদ মারলেও তার বিরুদ্ধে আন্দোলনের স্থান এখন শাহবাগ। বাঙ্গালির গোড়ায় সমস্যা। কোন কিছু সম্মান করতে জানার স্বভাবে নেই।

শাহানার বিশ্বাস বেশ কিছু সমর্থক পেয়ে যাবে সে। বেশ কিছু না, অসংখ্য কিছু। কারণ দুনিয়াতে প্রেমে ব্যর্থ মানুষের সংখাই বেশি। এই দেশেও প্রেমে ব্যর্থ প্রেমিক-প্রেমিকার অভাব নেই। যাদের সাহস শাহানার মত তেলাপোকা টাইপের নয় তাদের অনেকেই অবশ্য ফাঁস নিয়ে মরে ভালবাসাকে অমর করছে অহরহ।

প্রতিদিনই খবরের পাতায় শাহানা অনেক আত্মহত্যার খব দেখে। যেসব আত্মহত্যার বেশিরভাগ কারণ প্রেম। তবে সবাই তো আর সাহসী হয় না। নিশ্চয় এমন অনেকেই আছে যারা মরতে গিয়েও তাদের বোকা পরিবারের সদস্যদের জন্য মরতে পারছে না। তারাও তো শাহানার মত মৃত্যুর স্বাধীমতা চায়।

শাহানা নিজেকে বিপ্লবী ভাবতে থাকে। ভীতু বিপ্লবী। তাই বিষ খায়। কিন্তু আফসোস মরন হয় না তার। নাছোড়বান্দা মানুষগুলো বারবার তাকে বাঁচিয়ে তুলে। ওরা কেন বুঝে না, অমিকে ছাড়া তার পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব। না, এইবার একটা কঠিন ব্যবস্থা নিতেই হবে। মরতে তাকে হবেই হবে।

****
ঘরে একজন নার্স ঢুকল। তার হাতে কিছু জিনিসপত্র। মনে হচ্ছে ওষুধ। এই মহীলাকেও সে আগেরবার দেখেছে। শাহানার চোখের দিকে তাকিয়ে চমতকার এক হাসি দিল নার্স মহীলা। হাসির ভাব এমন যেন তিনি রাজ্য জয় করে কোন সুন্দরী রাজকন্যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন।

মহীলার প্রতি ভীষন রাগ লাগছে শাহানার। ইচ্ছে করছে মাথার টুপিটা খুলে চুল্গুলো টেনে চিড়ে ফেলতে। এই হারামাজাদীইতো গতবার তার চিকৎসা করেছিল। নিশ্চয় এবারও করেছে। হারামাজাদী। মনে মনে গালি দিল শাহানা।

নার্স এসে শাহানার পাশে বসল। হাত রাখল শাহানার মাথায়। তার মুখে এখনও মিষ্টি হাসি।
-ওয়েলকাম শাহানা।
-কোথায়? অবাক হয়ে নার্সের ওয়েলকামের স্থান জানতে চাইল শাহানা।
-পৃথিবীতে। আমরা ভাবিনি এবার তোমাকে বাঁচানো যাবে। আমার মনে হয় তোমার বাবার দোয়াতেই আল্লাহ তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। নার্সের মুখে হাসি।

মুখভর্তি থু থু আসছে শাহানার। ইচ্ছে করছে নার্সের মুখেই ছুঁড়ে মারতে। কিন্তু পারছে না এই জন্য, কোন হাস্যোজ্জল মানুষকে অপমান করা যায় না। যে কারণে অমিকেও অপমান করতে পারেনি সে। নার্স শাহানার হাত ধরল। তার হাতে কি যেন গুঁজে দিল মহীলা।

-তোমার আব্বা দিয়ে গেছেন।
-কী এটা? জানতে চাইল শাহানা।
-আমি তো জানি না। আমাকে বললেন তোমার জ্ঞান ফিরলে কাউকে যেন ঢুকতে না দেই। আর এই বাক্সটা তোমাকে দিতে বললেন। তোমার জন্য তোমার আব্বার উপহার। এটা দেখার পর তুমি যখন ডাকবে তখন সবাই তোমাকে দেখতে আসবে।

-আব্বা কই? -সে তো জানি না। তবে উনি ওয়েটিং রুমে নেই।
-ওখানে কারা আছে?
– তোমার ভাই, ভাবি, তার ছেলে মেয়েরা, আরও কয়েকজন। আমি চিনি না। নাও, এই তোমার বাক্স। খুলে দেখ এখানে কী। আমি বাইরে আছি। দশ মিনিট পর ফিরছি। বেরিয়ে গেলেন নার্স। শাহানা বাক্সটা খুলল খুব অবাক হয়ে।

সে আন্দাজ করতে পারছে না, আত্মহত্যা করতে যাওয়া মৃত্যুপথযাত্রী মেয়েকে বাবা বাক্সে করে কী উপহার দিতে পারে! একটা কাঠের বাক্স। খুব সুন্দর কাজ করা। দেখে মনে হয় পানের কৌঠা। শাহানা মুখটা খুলতেই সাদা কাগজে মোড়ানো ছোট্ট একটা কি যেন গড়িয়ে পড়ল। একটা সাদা কাগজও দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে চিঠি। আব্বার হাতে লেখা।

চিঠি পড়ছে শাহানা।

মা রে…
জীবনে মানুষের অনেক রকম পরাজয় থাকে। কিছু পরাজয় একেবারে অস্থিত্ব নিয়ে লড়াই করে। তোর আত্মহত্যা করতে যাওয়া আমার জন্য তেমনই পরাজয়।

বিগত ২৭ দিনে তুই দুইবার বিষ খেয়েছিস একটা ছেলের জন্য। এটা কোন ভাল কথা হতে পারে না। তোর মা নেই আজ ছয় বছর। কই একদিনও তো বললি না-আব্বা মায়ের জন্য কষ্ট হচ্ছে। আমি এক চিমটি লবন খাব।

অথচ একটা ছেলের জন্য তুই দুইবার দুই বোতল বিষ খেয়েছিস। তোর মায়ের চাইতে ওই ছেলেটা বেশি কাছের মানুষ হয়ে গেল রে মা? এমন কোন কষ্ট নেই যা তোর মা তোর জন্য করেনি। তুইতো ডাক্তারি পড়ছিস, জানার কথা। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে একজন মা ৭২ বার মৃত্যুর মুখোমুখী হয়। তোর ভালবাসার ছেলেটা তোর জন্য কয়বার মরতে চেয়েছে? কত রাত গিয়েছে তোর মায়ের চোখের পাতা এক হয়নি।

কত দিন গিয়েছে তোর মায়ের সময়ের খাওয়া সময় হয়নি। তোর জন্য। মারে ওই ছেলেটা কয়দিন তোর জন্য না খেয়ে পার করেছে? কয়দিন নির্ঘুম থেকেছে রে? তোর মা যখন মারা যায় তখন তুই দশম শ্রেণীর ছাত্রী। স্মৃতি নষ্ট হবার কথা নয়। একবার মনে করে দেখ মায়ের ভালবাসাটা কত মিস করছিস।

তোর ভাইয়ের কথা বলি। আজ সে আমার হাত ধরে কাঁদছিল আর বলছিল-আব্বা তুমি এবার হজ করতে যাবে। ক্বাবা শরীফ স্পর্শ করে আল্লাহর কাছে দোয়া করবে আমাদের শাহানাকে যেন ভাল করে দেয়। তোর ভাবি, পরের মেয়ে। কাল তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েছে তুই যেন ফিরে আসিস। সোমা, রাইমা-ছোট ছোট বাচ্চাগুলো বারবার বলছে-ফুপ্পির কাছে যাব, ফুপ্পির কাছে যাব।

আর তুই কোথায় যেতে চাইছিস রে মা? কোথায় যাবি তুই? তিন বছর ধরে একটা ছেলেকে ভালবাসিস তুই? সে তোকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই বলে মরে যেতে হবে! তুই মরে গেলে সেকি তোর সঙ্গে যাবে? তার জীবন কী আটকে থাকবে? মানুষের জীবনে ভালবাসা খুব প্রয়োজনীয় বিষয়, কিন্তু একমাত্র প্রয়োজনীয় না। তবুও চাইলে যা।

মানুষকে আটকে রাখা যায় না। তুই মরতে চাইলে তোকে বাঁচিয়ে রাখা কীভাবে সম্ভব! বাক্সের মধ্যে একটা বিষের শিশি দিয়ে দিলাম। ভাল বিষ। যদি পারিস এতগুলো মানুষের ভালবাসা পায়ে ঠেলতে তবে ওটা খেয়ে নিস। কেউ দেখবে না। নিশ্চিন্তে মরতে পারবি। সত্যি বলছি আমি আর তোর দেখা চাই না। আমি আমার শাহানাকে চাই। আমার ডাক্তারি পড়ুয়া শাহানাকে চাই।

যার হাত ধরে জোছনা দেখি আমি সেই শাহানাকে চাই। যাকে আমি আজ ২৬টা বছর মা বলে ডাকছি। প্রেমে অন্ধ মেয়ের সাথে আমার পরিচয় নেই। আমি আর ওই মুখ দেখতে চাই না। তার জন্য কাঁদতেও চাই না। ভাল থাকিস। তুই ফিরে এলে দেখা হবে রে মা…

ইতি শাহানার অসহায় ছেলে

চোখের পানিতে ভাসছে শাহানার গায়ে ছড়িয়ে দেয়া সাদা চাদর। এত বোকা সে। একজন মানুষের ভালবাসার জন্য এতগুলো মানুষকে অপমান করতে চায়? শাহানার খুব ইচ্ছে করছে আব্বাকে দেখতে। সে নার্সকে ডাকতে যায়। গলায় আওয়াজ নেই। বিড়বিড় করে তবু বেরিয়ে আসে…কেউ শুনছেন, আমি আব্বার কাছে যাব…আমি আমার ছেলের কাছে যাব…প্লীজ কেউ শুনছেন???

৫ thoughts on “ভালবাসা ডাক দিয়ে যায়

  1. বাবা-মা রা কেন জানি খুব ভালো
    বাবা-মা রা কেন জানি খুব ভালো ইমোশনাল করতে পারে।
    লেখা পড়ে খুবই ইমোশনাল হয়ে গেলাম।
    সকল বাবা-মাদের জন্য শ্রদ্ধা

  2. গল্পটা পড়ে রাগে আমার গা জলে
    গল্পটা পড়ে রাগে আমার গা জলে যাচ্ছে। বাস্তবে যদি এমন শাহানাকে পেতাম, থাপ্পর দিয়ে দাঁত ফেলে দিতাম।

    1. দাঁত ফেলতে হলে ভাই ঘুসি মারতে
      দাঁত ফেলতে হলে ভাই ঘুসি মারতে হবে, থাপ্পরে অতোটা জোর পাবেন না!
      :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি:

Leave a Reply to লিমন আহমেদ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *