নৈসর্গিক আধার

মেঘ মেঘ আবহাওয়ার দরুন হিউমিডিটি বেশী থাকায় ঘামে জব জব হয়ে আছে নিলয়। ঘাম মূল সমস্যা না- সমস্যা হচ্ছে আঠা আঠা অনুভূতি। মনে হচ্ছে দেয়ালে রং করার মতো করে কেউ একজন তাকে নাংগা করে ব্রাশ দিয়ে ভাল করে ডলে ডলে পা থাকে মাথা পর্যন্ত রং করেছে। বিশাল একটা ভুল করে ফেলেছে রং মিস্ত্রী-ব্রাশ রঙে না চুবায়ে তরল গুড়ে ডুবায়ে নিয়েছে। সেটা শয়তানী করে করেছে না বেখায়ালে করেছে বুঝা যাচ্ছে না। পিঁপড়া দল বেঁধে ছুটে আসবে গুড়ের স্বাদ নেওয়ার জন্য। নিউ ইয়র্ক সিটিতে পিঁপড়ার প্রাদুর্ভাব নেই। তেলাপোকার ইঁদুরের স্বর্গ হিসাবে মন্দ না। দিন রাত জীবিত মৃত কোন ব্যাপার না তেলাপোকা বাহিনীর কাছে। ইঁদুর দখল করে নিয়েছে সেনাপতির আসন। সে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারে এখন বাসায় থাকলে গুড়ের ঘ্রাণে ইঁদুর কামড়ে ছিঁড়ে নিতো মাংস। কুট কুট কামড়ে চেটে নিতো তেলাপোকা। ভাগ্য ভালো বলতে হবে সে এখন চলন্ত গাড়িতে।

বৃষ্টি হবে হবে করছে। বীচে যাওয়ার জন্য খুব বাজে আবহাওয়ায়। না যেয়ে উপায় নেই। মিতু দুই মাস হলো এসেছে দেশ থেকে। নতুন বউয়ের কতো শতো আবদার থাকে। যত ঝাক্কি ঝামেলা হোক জামাইকে সেটা হাসি মুখে পুরণ করতে হয়। তার নতুন বউ তার কাছে কিছু চায় না এদিকে দিয়ে সুবিধা। গত সপ্তাহে মিতু তার কোন এক বান্ধবীর সাথে কথা বলে ঠিক করে রেখেছে এই উইক এন্ডে বীচে যাওয়ার প্রোগ্রাম। চার পরিবারের আউটিং। কাছাকাছি কোথাও হলে কথা ছিলো ইস্ট হ্যাম্পটন যেতে হবে। মেয়েরা সব প্লান প্রোগ্রাম ঠিক করে নিয়েছে। রান্না করে নিয়েছে সবাই ভাগ করে। দুই তিনটা আইটেম করে এক একজনের ভাগে পড়েছে। বীচে গিয়ে পরিচয় হবে সবার সাথে। কেমন ভূতুড়ে ব্যাপার স্যাপার- চিনা জানা দূরে থাক সামান্য মুখের হাই হ্যালো হয় নেই এখন পর্যন্ত কোন পরিবারের সাথে নিলয়ের। সব চেয়ে মজা হচ্ছে মিতু তার বান্ধবীকে বলছে সেই বান্ধবী তার এইখানকার অন্য দুই বান্ধবীকে বলেছে। চার দম্পতির দুজনের তিন বাচ্চা অন্য একজনরা নতুন এসেছে। কে একজন ব্যাচেলার আছে নিনার সাথে। অবশ্য সবটা মিতুর ভাষ্যে শোনা সে কিছু জানে না।

নিলয় খচ্চর স্বভাবের। কোন জিনিস নিয়ে বেশী কথা বলতে পারে না। অল্পতে রেগে যায়। রেগে যায় না আসলে সে রেগেই থাকে। নিতু এসি সহ্য করতে পারে না; মাথা ব্যথা করে, বমি হয়। বাধ্য হয়ে এসি বন্ধ করে উইন্ডো খুলে দিতে হয়েছে। বিরক্তিতে মুখের চামড়া শক্ত হয়ে আছে নিলয়ের। মনে মনে বাপ মায়ের বংশ নির্বংশ করে দিচ্ছে। যত সব অযৌতিক কাজ কারবার তার পরিবারের মানুষদের। শহুরে স্মার্ট মেয়েরা উগ্র হয়। বুদ্ধি দিয়ে কাজ করতে পারে না। সংসার সামলাতে পারে না যতসব ফালতু লজিক দিয়ে কোথাকার কোন মফস্বল থেকে আনকালচার অবিবেচক এক মেয়ে ধরে তার গলায় ঝুলায়ে দিয়েছে। অসহ্য রাগে ভীতরে ভীতরে ফেটে যাচ্ছে নিলয়। কোন আদ্যিকালের বন্ধু বান্ধব সব এসে খুজে বেড় করেছে। সারাদিন ফোন নিয়ে গুতা গুতি। অমুক স্কুলের বন্ধু অমুক কলেজের বন্ধু।

বৃষ্টি দেখে অনেক বার বলা হয়েছে। সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠবে। বীচের জন্য প্রতিকুল আবহাওয়াই শুধু নয় বিপদজনক। কে শুনে কার কথা। প্লান করা হয়ে গেছে, পানিতে নামব না দূরে থাকব। এই মেয়েকে ঘাড় ধরে দেশে পাঠায়ে দিতে হবে। সব সময় কেমন রহস্য করে কথা বলে। কিছুদিন যাক ওর রহস্য সহ ওকে বক্সে বন্দী করে পাঠাতে হবে। এইভাবে চলে না চলতে পারে না। পড়ালেখা করে করে জীবনের প্রেম করার সময় সে পাই নেই। নিজের মতো করে ভেবে রাখা কারো জন্য ব্যাকুল সে ছিলো না। সেটা নেই তো কি? তবু মনের একটা চাওয়া আছে, নিজেস্ব একটা অবয় আছে। হাঁটতে চলতে সব কিছুতেই এই মেয়ের ঝামেলা আছে। একটা কিছু নিলয়ের মন মতো না। হাঁটে বাঁকা করে। কথা বলে না, বললে কি বলে বুঝা যায় না। সারাদিন নিজের ভীতরে বুদ হয়ে থাকে না হয় ফোনে হু হ্যাঁ করতে থাকে। শাড়ি পড়তে পড়তে দিন কাবার করে দেয়। কি রান্না করে মুখে তোলা যায় না। কোন খাবার আগ্রহ করে খায় না। উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলে কোনো বস্তু আছে সে এটা জানে বলে মনে হয় না। নিজেকে ভাল করে উপস্থাপন করতে হয় সেটাও জানে না। যন্ত্রণার একশেষ অবস্থায় আছে নিলয় এই মেয়েকে নিয়ে। সে একে বউ ভাবতে পারছে না উটকো ঝামেলা মনে হচ্ছ; সংসারের বাড়তি মানুষ কোথাও থেকে এসেছে দিন দুই থেকে চলে যাবে। এই দিন দুই জ্বালায়ে ভাজা ভাজা করে দিচ্ছে ব্যাপার সেটা হলে মানা যেত। দুইদিন পর যাচ্ছে তো না সারাজীবনের জন্য বাদুড় ঝুলা ঝুলেছে।

আসি আসি করতে থাকা বৃষ্টি আসেই গেলো। ঝম ঝম করে বৃষ্টি ফোটা না মনে হচ্ছে মেঘ নিয়ে আকাশ নেমে আসছে এখনি জানালার কাঁচ ভেঙে যাবে। পারকিং জানালা তুলে গাড়িতে বসে আছে বাধ্য হয়ে। মিতুকে আজ বেশ প্রাণে ভরপুর লাগছে। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে উপভোগ করছে সবটা। কথা বলছে নিজের মনে। এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে, উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছে। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না সে। মুখ দেখে সবসময় মনে হয় ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। নিলয় বুঝতে পারছে না আজ কি এমন ঘটে গেছে যার জন্য এই মেয়ে তার ভীতর থেকে আজ বেড় হয়ে আসলো। বিয়ে হয়েছে প্রায় এক বছর। বিয়ের পর পনের দিন সে দেশে ছিলো। তারপর এই দুই মাস এক সাথে কাটায়ে দিয়েছে। সে কখনো এই লাবণ্য দেখেনি। চোখ মুখে চাপা আলো বিচ্ছুরণ খেলে যাচ্ছে। হীরার খনির গুহা মুখে চোখ রাখলে যেমন ঝিলিক দেখা যায় তেমন ঝিলিক ঠিকরে বেড় হচ্ছে। চোখ লাগার মতো সুন্দরী মনে হচ্ছে মিতুকে। মায়া মায়া লাগছে এখন মিতুর জন্য। এই মেয়েটার সাথে কি বাজে ব্যবহার করে সে। মায়া মায়া অনুভূতি হচ্ছে। মায়া মায়া অনুভূতি ধাক্কা দিচ্ছে মনকে। ইচ্ছে করছে দুহাতে বুকে টেনে নিতে। সবটুকু মাদকতা দিয়ে চুষে নিতে ঠোঁটের নির্যাস। যাবতীয় সাজ এলোমেলো করে দিতে। লণ্ডভণ্ড হয়ে পরে থাকতে মিতু বুকে। মিতুকে সে ভালবেসে ফেলেছে। একটু লজ্জা লজ্জা লাগছে এখন নিলয়ের। মিতু বুঝে ফেলবে না তো তার মনের অবস্থা। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে নিলয়ের কপালে।

নিনা মিতুর বান্ধবী। নিনার এক ছেলে স্বামী দুর সম্পর্কের এক দেবর আলিম। অন্য দুই পরিবার নিনার পরিচিত। সবার সাথে পরিচয় পর্ব শেষ। বাচ্চারা ছুটাছুটি শুরু করে দিয়েছে বিশাল উদ্দামে। সমুদ্রের গর্জনের সাথে হইচইতে কান নষ্ট হওয়ার অবস্থা। বিরক্ত হওয়ার কথা নিলয়ের। কি আশ্চর্য ব্যাপার সে একবিন্দু বিরক্ত হচ্ছে না। যা দেখতেছে সেটাই ভাল লাগছে। সব কিছুর প্রতি এক মায়া খুঁজে পাচ্ছে। বাতাসের প্রতি, বালুকনার প্রতি, ঢেউগুলার প্রতি, বাতাসে ভেসে আসা টুকটাক কথার প্রতি, অপ্রয়োজনীয় প্রয়োজনের সবটাই তার জীবনের খুব প্রয়োজনীয় কিছু বলে মনে হচ্ছে যা সে এতদিন ভুল করে পথে ফেলে রেখেছিলো আজ খুঁজে পেয়ে বিষম আনন্দে আত্মহারা। বিরক্তিকর শব্দে মধুময় সুরের ছোঁয়া পাচ্ছে, পানির নোংরা গন্ধে বুক ভুরে নিশ্বাস নিতেই ভরসা পাচ্ছে বেঁচে থাকার। চারপাশের গাছ পালা, সমুদ্র, মানুষ পৃথিবীর সব সৃষ্টি অদ্ভুত অপূর্ব সুন্দর লাগছে। ধরণী তার কাছ থেকে সৌন্দর্য লুকায়ে রেখেছিলো এ যাবত কাল। আজ আবিষ্কারের সে মুগ্ধ।

হইচই করে, ঘুরে ঘুরে সময় কেমন করে কেটে গেলো বুঝতে পারলো না নিলয়। খেয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়া হবে এই ঘোষণায় খাওয়ার পর্ব শুরু হলো। একটু বেশী কথা বলছে মিতু আলিমের সাথে। বলুক না ক্ষতি কি। বেচারি সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে একদম একা পড়ে গেছে। খাওয়া শেষে হতেই ছেলে মানুষী খেলা শুরু করে দিলো সবাই। গানের কলি না অন্ত্যাক্ষরী এরকম কিছু একটা সাথে জোকস বলা। জীবন তার সব সৌন্দর্য আজ ঢেলে দিচ্ছে নিলয়ের জন্য। প্রেম মায়া ভালবাসা সবাই গলাগলি করে আসেছে তাকে ভাসায়ে নিয়ে যেতে। নিলয় মিতু ছাড়া ছাড়া ভাবে থাকলেও নিলয় মিতুকে চোখে চোখ রাখছে। আড়চোখে দেখেই যাচ্ছে। খেলায় মন নেই একটু আনমনা হয়ে আছে মিতু। সে কি ভয় পাচ্ছে বাসায় গিয়ে নিলয় তাকে খুব বকবে আজকের জিদ দেখানোর জন্য। কথাটা ভেবেই নিলয়ের মায়া আরো বেড়ে গেলো। আহারে বেচারি ভয়ে এনজয় করতে পারছে না। মিতু যদি জানত আজ বাসায় যেয়ে কি অঘটন ঘটনা নিলয় ঘটাবে ভয় না পেয়ে শিহরিত হতো। জগতের সব সুখ সে মিতুকে লিখে দিবে আজ। ভালবাসায় মমতায় আঁকড়ে রাখবে মিতুকে। কখনো কোথাও যেতে দিবে না। কোন কষ্ট স্পর্শ করতে দিবে না।

নিলয়ের খুব ঘুম পাচ্ছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীতে হঠাৎ করে গভীর অন্ধকারে নেমে এসেছে এখনই ঘুমায়ে পড়তে হবে তাকে। কোথাও কেউ জেগে নেই সবাই অতল স্পর্শী ঘুমে বিঘোরে ঘুমাচ্ছে। কিছুই ভাবতে পারছে না নিলয়। শরীরের কোন স্পর্শ অনুভব করতে পারছে না। বোধ শক্তি লোপ পেয়েছে কি? শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে ড্রাইভিং হুইল ধরে আছে। বার বার তাকাচ্ছে ডানের ফাঁকা সিটের দিকে। যে সিটে মিতু বসেছিলো সকালে। এখন সেটা শুন্য। একা একা ফিরতেছে নিলয়। কোথায় ফিরছে? কার জন্য ফিরছে? কে আছে সেখানে? কেউ কি অপেক্ষা করে আছে? শুন্যতা! কেউ থাকুক বা না থাকুক শুন্যতা সব সময় অপেক্ষায় থাকে। শুন্যতা অপেক্ষায় থাকে না। শুন্যতা জড়ায়ে থাকে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় আগ পাশে। শুন্যতা কখনো ছেড়ে যায় না সে তার সময় মতো এসে হাজির হয়; মাথা উঁচু করে বীজিতার হাসি হাসে। মিতু আলমের হাত ধরে যখন নিনাদের গাড়িতে উঠে যাচ্ছিলো তখন সবটা স্বপ্ন মনে হচ্ছিলো তার কাছে। সব মিথ্যে; এখনই স্বপ্ন ভেঙে দেখবে মিতু তার সাথে অঘোরে ঘুমাচ্ছে বাচ্চাদের মতো। সেই থেকে ঘুম পাচ্ছে তার। ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছে। সব কিছুর ছুটি। কোন তাড়া নেই কাজের, ঘুমের, খাওয়ার কি চরম এক অবস্বাদের বিষণ্ণ ঘুমের রাজ্যে ডুবে যাচ্ছে। ইচ্ছে হচ্ছিলো পারকিং লটেই ঘুমিয়ে পড়তে। কেন যেনো কি মনে হতে ছুটে গিয়ে গাড়িতে উঠে নিনার গাড়ির পিছু ছুটে চলছে সে। কত কথা ছিলো মিতুকে বলার কিছুই শুনে গেলো না। মিতুর কাজল আঁখির বিষণ্ণ নির্বিকার চাহনি জীবনে দেখা হবে না শেষ দেখা হয় যদি সেই আশায় স্পীড ব্রেক করে কিছুদুর গিয়ে মনে হলো মিতু যাচ্ছে তার ভালবাসার কাছে সে কোথায় যাচ্ছে? শুন্য গহ্বরের হাত বাড়ালে তলের নাগাল পাওয়া যায় না। নিমেষ কালো অন্ধকারের নেমে গেছে সে। যেখানে শুধু ঘুমাতে হয়। তাকে ঘুমাতে হবে। শুধু ঘুমাতে হবে। আদি অন্তহীন ঘুমের জন্য তার একটু জায়গা দরকার। সে ছুটে চলছে এক টুকরা নিরাপদ ঘুমস্থানের দিকে। যেখানে সে নির্ভাবনায় নিশ্চুপ শান্তির ঘুম ঘুমাবে।

২ thoughts on “নৈসর্গিক আধার

  1. কেউ থাকুক বা না থাকুক শুন্যতা

    কেউ থাকুক বা না থাকুক শুন্যতা সব সময় অপেক্ষায় থাকে।

    এই লাইনটি চমৎকার…
    কিন্তু শেষটা বুঝতে পারি নি… :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *