একটি সম্পর্কের অপমৃত্যু

রফিক সাহেব পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সময় দেখলেন। তখন প্রায় পৌনে পাঁচ টা বাজে। আজকে অফিস থেকে একটু আগেই বের হয়েছেন। বের হয়েই সোজা চলে এসেছেন রমনা পার্কে।
প্রায় এক ঘন্টা ধরে তিনি এই বেঞ্চে বসে আছেন। মুখের সামনে পেপার মেলে ধরে রেখেছেন। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য পেপার পড়া না। নিজেকে আড়াল করার জন্যই আসলে এই ব্যবস্থা। মাঝে মধ্যে পেপার সরিয়ে আড়চোখে অদূ্রে বসা একজন পুরুষ আর একজন মহিলার দিকে তাকাচ্ছেন। তারা দুই জন-ই হাত ধরা-ধরি করে বসে আছে। প্রায় এক ঘন্টা ধরেই তাদেরকে লক্ষ্য করছেন রফিক সাহেব। রফিক সাহেব আন্দাজ করলেন লোকটির বয়স সম্ভবত ত্রিশ হবে।


রফিক সাহেব পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সময় দেখলেন। তখন প্রায় পৌনে পাঁচ টা বাজে। আজকে অফিস থেকে একটু আগেই বের হয়েছেন। বের হয়েই সোজা চলে এসেছেন রমনা পার্কে।
প্রায় এক ঘন্টা ধরে তিনি এই বেঞ্চে বসে আছেন। মুখের সামনে পেপার মেলে ধরে রেখেছেন। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য পেপার পড়া না। নিজেকে আড়াল করার জন্যই আসলে এই ব্যবস্থা। মাঝে মধ্যে পেপার সরিয়ে আড়চোখে অদূ্রে বসা একজন পুরুষ আর একজন মহিলার দিকে তাকাচ্ছেন। তারা দুই জন-ই হাত ধরা-ধরি করে বসে আছে। প্রায় এক ঘন্টা ধরেই তাদেরকে লক্ষ্য করছেন রফিক সাহেব। রফিক সাহেব আন্দাজ করলেন লোকটির বয়স সম্ভবত ত্রিশ হবে।

হাল্কা নীল রঙের শাড়ি পড়া মহিলাটি একটি শিমুল গাছের নিচে ঘাসের উপর দু’পা মেলে বসে আছে। দু’ ধার থেকে প্রকান্ড শিমুল গাছটা তাদেরকে আড়াল করে রেখেছে। দূর থেকে খুব সহজে তাদেরকে চোখে পড়ে না। নিজেদের আড়াল করার জন্যই সম্ভবত তারা এমন জায়গা বেছে নিয়েছে। আসলে এধরনের জায়গায় সবাই একটু আড়াল-ই খোঁজে। কিন্তু রফিক সাহেব তাদের প্রতিটা মুভমেন্ট পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন। লোকটি মাঝে-মধ্যে তার সঙ্গীনির শাড়ির ভিতর দিয়ে এখানে-সেখানে হাত দিচ্ছে। এতে অবশ্য মহিলাটি কিছু মনে করছে না। তারা দুই জন-ই হেসে হেসে কথা বলছে।
কি অদ্ভুত এই প্রেমের সম্পর্ক!!!

“স্যার, বাদাম নিবেন?” রফিক সাহেব পাশে তাকিয়ে দেখলেন একটা বার-চৌদ্দ বছরের ছেলে বাদামের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে দাড়িয়ে আছে। এরা রমনা পার্কের স্থায়ী বাসিন্দা।
-হু্ম নিবো।
– কয় টাকার? ১০ টাকার দিমু?
-দে।
ছেলেটা ১০ টাকার বাদাম মেপে একটা কাগজের ঠোঙ্গায় ভরে রফিক সাহেবের দিকে বাড়িয়ে ধরলো।

“আচ্ছা তুই এদেরকে আগে কখনো দেখেছিস?” অদূরে বসা সেই প্রেমিক যুগলকে দেখিয়ে বললেন রফিক সাহেব।
‘দেখমু না কেন? হেরা তো নিত্যই এই হানে আসে।” বলল ছেলেটা।
আর কিছু বললেন না রফিক সাহেব। মানি ব্যাগ থেকে দশ টাকার একটা নোট বের করে ছেলেটিকে দিয়ে দিলেন। সামনে থেকে চলে গেল ছেলেটা।
আবার সেই যুগলের দিকে মনোযোগ দিলেন।

ঠিক বিশ মিনিট পর পকেট থেকে আবার মোবাইল বের করলেন তিনি। পাঁচটা বেজে গেছে। প্রতিদিনের অভ্যাস মাফিক একটা পরিচিত নম্বরে কল দিলেন।
এবার সামনের সেই মহিলাটি ব্যস্ত হয়ে উঠলো। ব্যগ হাতড়ে সেখান থেকে একটা মোবাইল বের করলো। এরপর ঠোটে আঙ্গুল দিয়ে তার প্রেমিক কে চুপ থাকার নির্দেশ দিয়ে ফোনটা রিসিভ করলো।

“হ্যালো”, ওপাশ থেকে একটা অত্যন্ত পরিচিত কন্ঠ শুনলেন রফিক সাহেব। প্রায় দশ বছর ধরে শুনে আসছেন এই কন্ঠ।
-হুম, কি কর?
– এইতো, পাশের বাসার ভাবী এসেছে। উনার সাথে গল্প করছি। তোমার অফিস ছুটি হয়ে গেছে?
-হ্যা মাত্র বের হলাম। অর্পা কি করে? দুপুরে খেয়েছিলো?
– হুম খেয়েছিলো। এখন টিভি দেখছে।
-দাও তো ওকে একটু, কথা বলি। সারাদিনে মেয়েটার সাথে একটুও কথা হয় নি।
-এখন আবার কি কথা বলবা? একটু পর তো বাসায়ই আসছো।
-ও
– শুনো, আসার সময় ভাল মাছ পেলে, কিছু মাছ নিয়ে এসো। আর মশার কয়েল শেষ হয়ে গেছে। মনে করে এক প্যকেট কয়েল নিয়ে এসো। আসতে কতক্ষন লাগবে?
-আট টার মধ্যেই চলে আসবো।
-আচ্ছা এখন তাহলে রাখি। ভাবী বসে আছে।
-ওকে

চিন্তার লেশ কেটে গেলো মহিলাটির মুখ থেকে। সেখানে স্থান পেলো এক নির্লজ্জ হাসি। মোবাইলটা কান থেকে নামিয়ে ব্যাগে রাখার সাথে সাথেই প্রেমিকের হাত আবার ঢুকে গেল তার শাড়ির মধ্যে। অথচ টেরও পেলো না যে, একটু আগে যার সাথে ফোনে কথা বল্ল সে তার খুব কাছেই বসে আছে।
পার্কে তখন আলো-আধারী খেলা করছে। সেই আলো-আধারীতেই কমে এলো তাদের দু’ জোড়া ঠোটের দুরত্ত্ব। রফিক সাহেবের চোখের সামনেই। আর দেখতে পারলেন না তিনি। তার সামনের গোটা দুনিয়াটা মুহূর্তে ঝাপসা হয়ে উঠলো।

এখন আর কিছুই পরিষ্কার দেখতে পারছেন না রফিক সাহেব। সব কিছুই কেমন যেনো ঝাপসা ঝাপসা। গত দশ বছরের হিসাব কিছুতেই মেলাতে পারছেন না তিনি। সারা জীবন অফিসের কত হিসাব মেলালেন অথচ নিজের জীবনের হিসাব কিছুতেই মিলছে না।
কখন যে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলো, রাত আরও গভীর হলো, তিনি টেরও পেলেন না। তিনি এখন হিশাব মেলাতে ব্যস্ত। দশ্ টা বছরের হিসাব। কখনো কি মিলবে?

১০ thoughts on “একটি সম্পর্কের অপমৃত্যু

  1. চরম বাস্তবতা ।
    কোন কোন

    চরম বাস্তবতা ।
    কোন কোন মানবতাবাদী আবার এসব নষ্টামিকে (ডেটিং)সাপোর্ট ও দিয়ে থাকেন!
    বলি, নিজেদের বেলায় এমন ঘটলে মানবতা বেলুনের মত ফুলতে ফুলতে একসময় কি ফেটে পড়ত না?নিজের বোনকে আরেকজনের সাথে ডেটিংরত দেখলে খুব খুশি লাগতো?

    পরকিয়া নামের এই সামাজিক ব্যাধিকে গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য লেখককে অজস্র ধন্যবাদ ।

  2. এই গল্পটা আমার জীবনের সাথে
    এই গল্পটা আমার জীবনের সাথে প্রায় মিলে গেছে বলে কোনোরূপ সমালচনা মাথায় এল না। শুধু দশ বছরের যায়গাতে দেড় বছর হবে। এটাই আসলে আমাদের নিয়তি। আমরা মাঝে মাঝে এমন কাউকে বিশ্বাস করে বসি যার উপর নিজের জীবনের সমস্ত বিশ্বাস চেপে রেখে দিই। একসময় সেই মানুষটাই কাছে থেকেও মনে হয় শত আলোকবর্ষ দূরে। দূরে এন্ড্রোমিডায় পড়ে থাকে ভালোবাসার লাল টুকুটুকে একটি প্রত্যাখাত রক্তিম গোলাপ। তখন আর কিছুই হিসাব করা যায়না। অসীম সংখ্যায় ভরা পৃথিবীকে বিরাট এক শূণ্য ছাড়া আর কিছুই মনে হয়না।

    তাই গল্পের মান বিচারে এইটা ভালোই হয়েছে। পরের বার আরো ভালো এবং শাণিত গল্প আশা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *