মওদুদী কথন -২

গত পর্বে আমরা দেখেছিলাম কিভাবে জামায়াতের জনক মওলানা আবুল আ’লা মওদূদী সময়ের বিবর্তনে পাল্টেছিলো সংজ্ঞা, পাল্টেছিলো মতবাদ। শুধুমাত্র তোষামুদী করতেই একসময়ে যে নেজামের চাটুকার ছিলো সেই আবার হয়েছিলো ব্রিটিশ সরকারের দালাল। আবার এই মওদূদী ব্রিটিশ সরকারের দালালী করতে গিয়ে বিরোধিতা করেছিল কংগ্রেসের একই সাথে বিরোধিতা করেছিল মুসলিম লীগের। অথচ এই মুসলিম লীগের হাত ধরেই জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানের। আজকের লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করবো মওদূদীর মুসলিম লীগ বিরোধিতা সম্পর্কিত কিছু কথা।


গত পর্বে আমরা দেখেছিলাম কিভাবে জামায়াতের জনক মওলানা আবুল আ’লা মওদূদী সময়ের বিবর্তনে পাল্টেছিলো সংজ্ঞা, পাল্টেছিলো মতবাদ। শুধুমাত্র তোষামুদী করতেই একসময়ে যে নেজামের চাটুকার ছিলো সেই আবার হয়েছিলো ব্রিটিশ সরকারের দালাল। আবার এই মওদূদী ব্রিটিশ সরকারের দালালী করতে গিয়ে বিরোধিতা করেছিল কংগ্রেসের একই সাথে বিরোধিতা করেছিল মুসলিম লীগের। অথচ এই মুসলিম লীগের হাত ধরেই জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানের। আজকের লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করবো মওদূদীর মুসলিম লীগ বিরোধিতা সম্পর্কিত কিছু কথা।

এই জাতি প্রথম থেকেই একটি জমিয়ত বা সংঘ। এ সংঘের ভিতর কোন পৃথক সংঘ পৃথক নামে গঠন করা, মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষ নিদর্শন কিংবা বিশেষ কোনো নাম বা নীতি দ্বারা প্রভেদ সৃষ্টি করা এবং মুসলমানদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে তাদের মধ্যে দল-উপদলগত কোন্দল সৃষ্টি করা মুলত মুসলমানদের সুদৃঢ় করা নয়, এতে তাদের আরো দুর্বল করে দেয়া।” – পয়গামে হক, ১৯৩৮

এই উক্তিতে মওদূদী মুসলিম লীগের বিরোধিতা করে ব্রিটিশরাজ তথা কংগ্রেসকে(কিছুটা) খুশি করতেই বলেছে এই ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম জাতি আগে থেকেই এক আছে তাই তাদের এক করতে নতুন করে কোন ইসলামিক দলের প্রয়োজন নাই। এখানে এও উল্লেখ্য যে সেই সময়েও কিন্তু মওদূদীর জামায়াত-ই-ইসলামের প্রতিষ্ঠা হয় নাই। তার মতে আগে থেকেই সংঘবদ্ধ(!) মুসলিম জাতিকে পুনরায় সংঘবদ্ধ করার মানে তাদের সুদৃঢ় করা নয়, বরং তাদের মধ্যে কোন্দল বা ভেদাভেদ তৈরী করে দেয়া। অথচ এই মওদুদীই পরবর্তীতে জামায়াত তৈরী করেছিল।
বেঁচে থাকলে হয়তো প্রশ্ন করতাম “মিঃ মওদুদী জামায়াতের ফলে কি আগে থেকেই সংঘবদ্ধ জাতিকে সুদৃঢ় করা হয়েছে না বিভেদ তৈরী করা হয়েছে?
বেঁচে নেই যখন তখন নিজে থেকেই উত্তর নিয়ে নেই “খামোশ, তু নাস্তিক হ্যায়

এবার একটু বলা দরকার কেন মুসলিম লীগের তৈরী হয়েছিল বা কিসের প্রয়োজনে মিঃ জিন্নাহ মুসলিম লীগের জন্ম দিয়েছিল। সেসময়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়া মুসলিম জাতিকে নিজেদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য একাট্টা করতেই মূলত মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল। এখানে এও উল্লেখ্য যে ১৯৩৬ সালের নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার আর সেখানে নিরঙ্কুশ বিজয় কংগ্রেস পেলেও যেসব স্থানে মুসলিম লীগ জিতেছিল সেখানেও প্রধান বিরোধীদল হিসেবে কংগ্রেস নির্বাচিত হয়েছিল। এইদিক থেকে কিছুটা হলেও কংগ্রেসের সাথে মুসলিম লীগের একটা দ্বন্দ্ব ছিলো। মওদুদী যদিও সরাসরি কংগ্রেসের সাফাই দিয়েছিলো কিন্তু সে মুসলিম লীগের পক্ষে সাফাই দেয় নাই। এমনকি সেই সময়ের অধিকাংশ আলেম, ওলামা এবং সাধারণ মুসলমান মুসলিম লীগের সমর্থক থাকলেও মওদুদী তাদের কটাক্ষ করেই বলেছিল –

সারকথা, এই নামগড়া মুসলিম সমাজে অনুসন্ধান করলে রংবেরং-এর মুসলমান আপনার নজরে পড়বে। এতো ধরনের মুসলমান দেখতে পাবেন যা আপনি গুনে শেষ করতে পারবেন না। এটা একটা চিড়িয়াখানা- যাতে চিল, শকুন, তিতির, ভারই, এবং আরো অনেক প্রাণী রয়েছে। এরা সবই পাখী, কেননা এরা চিড়িয়াখানায় রয়েছে।” – সিয়াসী কাশমকাশ, ৩য় খন্ড, ২৫ পৃষ্ঠা।

মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ যখন মুসলিম জাতীয়তা, তাহজীব-তমুদ্দিন, রাষ্ট্র ইত্যাদি সম্পর্কে বিবৃতি দিতে আরম্ভ করেছিলেন তখনও মওদূদী তাদের বিরোধিতা করে সেসবকে অনৈসলামিক কাজ-কর্ম বলে প্রচার করতো। সে বিশ্বাসই করত না মুসলিম লীগ দ্বারা পাকিস্তানের জন্ম সম্ভব। এইজন্যে সে তার সিয়াসী কাশমকাশ-এর ২য় খন্ডের ২১৬ পৃষ্ঠায় মুসলিম নেতাদের কঠোর সমালোচনা করে লিখেছিলো-

মুসলমান নিরেট অজ্ঞ হবে যদি এখনো তারা পরিস্থিতির নাজুকতা যথাযথ উপলব্ধি করতে না পারে। তারা এখনো এই ধোঁকায় পড়ে রয়েছে যে, বাহাড়ম্বর সভা-সমিতি এবং ফাঁপা শোভাযাত্রা তাদের জাতীয় ধ্বংস থেকে রক্ষা করবে। তারা এমন লোকদের নেতৃত্বে আস্থা জ্ঞাপন করছে যাদের সামনে মন্ত্রিত্ব এবং ঐশ্বর্য ছাড়া আর কোন জিনিস নেই। যারা জাতির জন্য এতটুকু ক্ষতি স্বীকার করতে পারবে না, যারা কেবলমাত্র মন্ত্রিসভায় নিজেদের দখল টিকিয়ে রাখার জন্য মুসলমানদের নাম উচ্চস্বরে নিচ্ছে- তাদের ভীরুতা সম্পর্কে শত্রুদের পুরোপুরি বিশ্বাস রয়েছে।

আবার আরেকস্থানে এমনটিও বলেছে সে-

… এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্য আপনাদের ইসলামের নাম ব্যবহার করার অধিকার নেই। কেননা ইসলাম সকল প্রকার জাতীয়তাবাদের শত্রু। সেটা ভারতীয় জাতীয়তাবাদই হোক কিংবা নামগড়া মুসলিম জাতীয়তাবাদই হোক।

যে মুসলিম লীগের লক্ষ্যই ছিলো পাকিস্তানের জন্ম দেয়া সেই মুসলিম লীগের বিরোধিতা করা তাও আবার ধর্মকে ব্যবহার করে সেই বিরোধিতা পাকিস্তানের বিরোধিতার সমান। সে শুধু মুসলিম লীগের বিরোধিতাই করেনি বরং “খোঁড়া পাকিস্তান”,”না-পাকিস্তান” ইত্যাদিও সে বলেছিলো সেসময়ে মুসলিম বিরোধিতা করতে গিয়ে।

ইসলাম বা মুসলিম শব্দের ব্যবহার করে রাজনীতি করাতেও তার একটা আপত্তি দেখা যায় তার বিভিন্ন উক্তিতে। সিয়াসী কাশমকাশ, ৩য় খন্ডের ১১০-১১১ পৃষ্ঠার বিভিন্ন মন্তব্যে উঠে এসেছে সেই চিত্র-

কেবলমাত্র মুসলমান শব্দ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যারা অজ্ঞতার পূজারীদের সংস্থাকে একটি সংস্থা মনে করে এবং একথা ভাবে যে, এ ধরণের কোন প্রতিষথান ইসলামের দৃষ্টিতে কল্যাণকর হবে, তাদের স্থুলবুদ্ধি শোকজ্ঞাপনযোগ্য।

এ ব্যাপারেও আমার কোন কিছুই বলার নেই যে, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মুসলিম লীগের ‘মুসলমান’ নাম ধারণ নীতি এই জাতি যারা বাস করে তাদের জন্য কল্যাণকর হবে, না ক্ষতিকর হবে। আমার নিকট যে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো- এসময় যে জাতিকে মুসলমান নামে ডাকার দরুন পৃথিবীতে ইসলামের প্রতিনিধি মনে করা হয়, তার সবচাইতে বড় প্রতিষ্ঠান ইসলামকে বিশ্ববাসীর মনে কিরুপে পেশ করেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মুসলিম লীগের প্রস্তাবের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আমার অন্তর কাঁদতে আরম্ভ করে।

মুসলিম লীগের প্রস্তাব কি ছিলো সেই সময়ে তা তো উপরেই দেয়া হয়েছে। সেই সকল প্রস্তাবের বিরোধিতা করা, ইসলামের নাম ব্যবহার করে রাজনীতি করার বিরোধিতা এসব দেখে আপনার কি মনে হতে পারে জামায়াতে ইসলামের জন্মদাতা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী!!!

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকারী নেতাদের সম্পর্কে আবুল আ’লা মওদূদী বলে-

এই সংস্থায় যাদের প্রথম সারিতে দেখা যাচ্ছে, ইসলামী জামাতে তাদের সঠিক স্থান সবচেয়ে পেছনের সারিতে। এমনকি কেউ কেউ তো সেখানেও অনুগ্রহেই স্থান পেতে পারে। এ ধরণে লোকদের নেতা বানান, রেলগাড়ির সবচেয়ে পেছনের বগিকে ইঞ্জিনের স্থানে লাগিয়ে দেয়ার সমতূল্য। যে উঁচু স্থানে আপনারা যাওয়ার ইচ্ছে করছেন, এ নামসর্বস্ব ইঞ্জিন আপনাদের গাড়িকে এক ইঞ্চিও নিয়ে যেতে পারবে না। অবশ্য গাড়ি তার আপন গতিতে নিচের দিকে চলে আসবে। আপনারা কিছুকাল পর্যন্ত এ ভুল ধারণায় পড়ে থাকবেন যে, মাশাল্লাহ! আমাদের ‘ইঞ্জিন’ গাড়িকে খুব উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে আপনাদের উপরের পরিবর্তে নিচের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
সিয়াসী কাশমকাশ, ৩য় খন্ড, ১০৬-১০৭ পৃষ্ঠা।

ইসলামের লেবাশ পরে ভন্ডামী করা এই মওদূদী যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় তখন আশ্চর্যজনকভাবে পাকিস্তানে গিয়ে বসবাসের জন্য আগের সকল কিছু ভুলে গিয়ে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা দেয় যে সে পাকিস্তানের বিরোধিতা করে নাই, করেছে মুসলিম লীগের। ঠিক একইভাবে এইদেশীয় জামাতীরাও বলে তারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করে নাই তারা ভারতের বিরোধিতা করেছিল।

তথ্য সুত্রঃ- জামাতের আসল চেহারা – মওলানা আবদুল আউয়াল
পূর্বে প্রকাশিত

৫ thoughts on “মওদুদী কথন -২

  1. অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাই ।আপনার
    অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাই ।আপনার পরিশ্রম সার্থক হোক ।বাংলাদেশ মৌলবাদ মুক্ত হোক ।
    জয় বাংলা।
    জয় বঙ্গবন্ধু।

    1. জীনতত্ত্ব সম্পর্কে আপনার আমার
      জীনতত্ত্ব সম্পর্কে আপনার আমার ধারনা তো দেখছি একেবারে মিলে গেল। কেমনে কি!!!

    2. ছাগু তো ছাগুই থাকবে সেটা নিয়া
      ছাগু তো ছাগুই থাকবে সেটা নিয়া নতুন কইরা কি বলার আছে বলেন। তবে কথা হইলো এইসব লেখা পইড়া নতুন কইরা যেন কেউ ছাগুত্ব লাভ না করে এবং বর্তমান ছাগুদের ম্যাতকার যেন বাইড়া যায় ঘামের সাথে সাথে সেইজন্যেই দেয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *