যে দৃষ্টি মিষ্টি হবেই

জানালার গ্রিল ধরে বসে মাঠে ছোট বাচ্চাদের খেলা দেখছে অন্তি। নাকটা গ্রিলের ফাক দিয়ে বাহিরে বের হয়ে আছে। পচা কাঁদার ভিতর লাফালাফি,ঝাপাঝাপি,খেলাখেলি সব করছে বাচ্চাগুলো। বৃষ্টি এসে নাক, গাল, ঠোঁট সব ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।খুব ইচ্ছা করছে পচা কাদায় নেমে পা ভিজিয়ে আসতে। কিন্তু সম্ভব না। এত বড় মেয়েকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখলে চায়ের দোকানের বখাটেগুলো হা করে তাকিয়ে থাকবে। যেন দুনিয়ার সব বৃষ্টি অন্তির গায়ে পরছে। আর কোথাও কোন বৃষ্টি নেই। ফাজিল গুলোর চোখের মধ্যে একটা করে কাঁটা কম্পাস দিয়ে গুতা দিয়ে আসতে পারলে ভাল হত। বৃষ্টিতে ভেজা মেয়ে দেখার শখ মিটে যেত।



জানালার গ্রিল ধরে বসে মাঠে ছোট বাচ্চাদের খেলা দেখছে অন্তি। নাকটা গ্রিলের ফাক দিয়ে বাহিরে বের হয়ে আছে। পচা কাঁদার ভিতর লাফালাফি,ঝাপাঝাপি,খেলাখেলি সব করছে বাচ্চাগুলো। বৃষ্টি এসে নাক, গাল, ঠোঁট সব ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।খুব ইচ্ছা করছে পচা কাদায় নেমে পা ভিজিয়ে আসতে। কিন্তু সম্ভব না। এত বড় মেয়েকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখলে চায়ের দোকানের বখাটেগুলো হা করে তাকিয়ে থাকবে। যেন দুনিয়ার সব বৃষ্টি অন্তির গায়ে পরছে। আর কোথাও কোন বৃষ্টি নেই। ফাজিল গুলোর চোখের মধ্যে একটা করে কাঁটা কম্পাস দিয়ে গুতা দিয়ে আসতে পারলে ভাল হত। বৃষ্টিতে ভেজা মেয়ে দেখার শখ মিটে যেত। এমন করে যদি ফাহিম তাকাত কত ভাল লাগত। তা না করে গাধাটা পাশে বসে থেকে আশেপাশের পরিবেশ দেখে। পরিবেশবিদ। যেন গাছপালা ওর ভালবাসার মানুষ, আর অন্তি আশেপাশের গাছপালা। অবশ্য একেবারে তাকায় না তা না। আড় চোখে চোরের মত তাকায়।

-এই কি? এমন চোরের মত আমাকে দেখছ কেন?সোজাসুজি তাকাও।
– না না। আমি তোমাকে দেখতেছিলাম না।
-কেন দেখবা না? আমি কি দেখতে পচা?
– না, তা না। কিন্তু লজ্জা করে।

একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ছাড়ে অন্তি।প্রতিবারই অনেক ভেবে আসে আজ ফ্যালফ্যাল করে ফাহিম তাকিয়ে থাকবে আর অন্তি লজ্জায় লাল হয়ে মুখ নিচু করে রাখবে। একটু পর ফাহিমকে ধাক্কা দিয়ে বলবে, ইশ, তুমি এত বেহায়া কেন? এভাবে কেউ কাউকে দেখে? আমার লজ্জা করে না? আগামী ৫ মিনিট তুমি আমার দিকে তাকাবে না।

তা না ।হয় উল্টা। পাশের জন লজ্জায় লাল টমেটো হয়ে বসে থাকে। আর অন্তি বলে ,আগামী ৫ মিনিট আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে।খুব লজ্জা পেতে ইচ্ছা করছে।

ফাহিম একটু তাকিয়ে আবার মুখ নামিয়ে নেয়।

-আচ্ছা তোমার সমস্যাটা কি?
– তোমার দিকে তাকাতে ভয় করে।
– ভয়ের কি আছে? আমি বুঝি না। আমি কি দেখতে বাঘ ভাল্লুকের মত যে ভয় করে?
– না তা হবে কেন? তুমি দেখতে অনেক সুন্দর।
– বুঝলে কি করে অনেক সুন্দর? কোনদিন ঠিক মতন তাকিয়েই তো দেখ না।
– দেখি।
– কই?
– তুমি যখন অন্য দিকে তাকাও তখন।

অন্তি কিছু বলে না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বলে- আমাকে ভয় পাও কেন তুমি?
– জানিনা। অলি গলিতে হাঁটলে যেমন কখন উত্তর দিক পশ্চিম দিক হয়ে যায় টের পাওয়া যায় না। তেমনি তোমার সামনে আসলে আমি কখন এত ভিতু হয়ে যাই বুঝতে পারি না।
– আমার চুলগুলো দেখতো কেমন লাগছে?
– হুম অনেক সুন্দর।
– কিছু বুঝতে পারতেছ?
– কি?
– চুলগুলো প্রতিদিনের মত সুন্দর লাগছে?
– হ্যাঁ।
– নতুন কিছু?

ফাহিম কিছুক্ষণ চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
– হ্যাঁ, প্রতিদিনের মত অনেক সুন্দর লাগছে।

অন্তি আর কিছু না বলে উঠে হাঁটা শুরু করল।

-এই তুমি কই যাও?
– বাসায় যাই।
– কেন? বলে যাবে না? এভাবে হুট করে চলে যাচ্ছ?
– তোমাকে বলার চেয়ে, ঐ যে বাদামওয়ালা দেখছ না? ওকে বলা ভাল।
– এসব কি কথা?
-রাস্তার মানুষ হা করে তাকিয়ে তোমার প্রেমিকাকে দেখে। আর তুমি দেখ গাছপালা। তুমি ওখানে বসে থাক।আমার পিছনে আসবে না।

অন্তি চলে এল। আর ফাহিম ঐ গাছের নিচেই বসে রইল।

বাচ্চাগুলো এখনও খেলে যাচ্ছে। এখন আর ভিজতে ইচ্ছা করছে না। কাঁদতে ইচ্ছা করছে। প্রতিদিন দেখা করতে যাবার আগে, কতসময় নিয়ে সাজগোজ করে যায় অন্তি। আর ফাহিম তাকিয়েও দেখে না। ফাহিমের জন্যই তো এত সাজগোজ করে।আর ও বলদের মত হাম্বা হাম্বা করে আর ঘাস খায়। চোখে একটা চশমা পরে আদিকালের। কানা। গার্লফ্রেন্ডকে দেখবে তাও পারে না। কাল কত শখ করে পার্লার থেকে চুল স্ট্রেট করে গেল। ফাহিমের জন্যই তো। আর ও বলে কিনা, হ্যাঁ আগের মতই সুন্দর লাগছে। কত ভেবে গেল ফাহিম বলবে,এই তুমি চুল স্ট্রেট করছ?
নাহ, অন্তি বলে দিল,তাও বলতে পারে না। পারবে কি করে? আগে কোনদিন তাকালে তো জানবে চুল কি করছে।
অন্তির খুব মন খারাপ লাগছে। সাদা মোবাইলটার দিকে চোখ বুলালো। আজ একবারও কল করেনি ফাহিম। কাল রাতে অনেকবার কল করল। মোবাইল রিসিভ করেই অন্তি বলে দিল, তুমি আর জীবনে আমাকে কল করবে না।
বলেই কেটে দিল। পরে আর সত্যি কল করেনি। আগেও এই কথা অনেকদিন বলেছে। কিন্তু ফাহিম শুনে না। কল করেই যায়।রাগ শেষে অন্তি বলে, তুমি আমাকে এতবার কল দাও কেন? জানো রাগ করে আছি। আমার রাগ এমনিতেই কিছুক্ষণ পর ভেঙ্গে যাবে। তোমার উপর রাগ করে থাকতে পারলে তো।রাগ চলে গেলে আমি তোমার সাথে কথা বলবই। মাঝে বিরক্ত কর কেন?

আজ বিরক্ত করাটাই মিস করছে অন্তি। রাগ চলে গেছে। রাগ করে থাকতেই পারে না ফাহিমের উপর। ফাহিমকে নিজেই কল করল।
– হ্যালো।
– হ্যাঁ।
– তুমি আমাকে কল দিলা কেন আর?
-তুমি না মানা করলে।
– তাই বলে আর দিবা না সত্যি সত্যি?
– সরি। রাগ শেষ?
– হুম। আমার সাথে আজ সন্ধ্যায় দেখা করবা।আমি তোমার সাথে আজ রিকশায় ঘুরব।
– আচ্ছা।
– আজ আমার দিকে না তাকালে খবর আছে।
– হাহা, তাকাব।
-তাহলে তুমি রেডি হও।আমি আসতেছি।
– আচ্ছা।

ফাহিম অনেকক্ষণ ধরেই একটা খাবারের দোকান খুঁজছে।পেটের ভিতর ভুমিকম্প বয়ে যাচ্ছে। প্রতিবারের মত এবারও ঝগড়ার রাগ খাবারের উপর দিয়ে গেল। কাল বিকেল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। ঝগড়ার পর সব অভিমান ফাহিম খাবারের উপর ঢালে কোন এক কারণে।ঝগড়া পর্ব শেষ মানে খাওয়া পর্ব শুরু। রাস্তার পাশে একটা হালিমের দোকান। ফাহিমের রাস্তার পাশের খাবারের প্রতি অদৃশ্য এক মায়া আছে। রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে দম আটকে আসে। ফিসফিসিয়ে কথা বলা, এসির বাতাস একদম অসহ্য। তার চেয়ে খোলা হাওয়া. চিৎকার করে কথা বলা. নাচানাচি, গান গাওয়া সব কিছুর সুযোগ আছে রাস্তার পাশে। হালিমের দোকানে বসে দোকানদারকে বলল, মামা,বিশ।
মামা এই শব্দের সাথে পরিচিত। তিনি বিশ টাকার হালিমই দিবেন। ফার্মাসিতে গিয়ে বললে অবশ্য বিষ দেবার সম্ভাবনা থাকে।খুব মারাত্মক অবস্থা।
ফাহিম হালিমের দোকানের নাম দেখল। টুনটুনি শাহী হালি। হালিমের “ম” মুছে গেছে। হালিম দিতে দেরী হওয়াতে ফাহিম বলল, টুনটুনি মামা, একটু তারাতারি দেন। খুব ক্ষুদা লাগছে।

হালিম বিক্রেতা একটু বিরক্ত মুখে চেয়ে বলল, আমার নাম টুনটুনি না। আমার বউয়ের নাম টুনটুনি।
– ও ও ও। মামা। ভুল হয়ে গেছে। টুনটুনির জামাই মামা। একটু তারাতারি হালিম দেন।

আর একবার হালিম বিক্রেতা বিরক্ত মুখে তাকাল। কিন্তু কিছু বলল না।চুপ করে হালিম হাতে দিয়ে দিল। ফাহিম হালিম খাচ্ছে আর ভাবছে, আহা, হালিম মামার তার বউয়ের প্রতি কত ভালবাসা। আমিও হালিম বিক্রি করলে দোকানের নাম দিব। অন্তি শাহী হালিম। নাহ, হালিম কেন বেচব? হালিমওয়ালাকে অন্তি বিয়ে করবে না। অন্তির কাছে আজ জিজ্ঞেস করতে হবে, আমি কি করলে ও খুশি। যদি বলে ব্যাগের ব্যাবসা কর। তাহলে দোকানের নাম হবে, অন্তি ব্যাগ। এখানে দেশি বিদেশি, নারী পুরুষের সকল প্রকার ব্যাগ পাওয়া যায়।
ভাবতে ভাবতেই দোকানে বসা এক পিচ্চির দিকে চোখ পড়ল ফাহিমের। হাফ প্যান্ট, খালি গা, মাথায় একটা ছেড়া টুপি, পায়ে উল্টা করে পরা জুতা। বাম পায়েরটা ডান পায়ে। ডানেরটা বামে।পিচ্চিকে ফাহিম জিজ্ঞেস করল, এই বাবু তোমার নাম কি?
– আজব।
– কি নাম?
– আজব।

জীবনে প্রথম এমন নাম শুনে, ফাহিম একটু অবাক হল। আবার জিজ্ঞেস করল, হালিম খাবে?
– না, আমার কাছে ২ টাকা আছে। ২ টাকায় হালিম দিবে না।
– আমি কিনে দেই।
-না আপনারটা আমি নিব না।
– কেন?
– আপনাকে পছন্দ না।
– হাহা,তাই?তোমার জামা কই?
– বাসায়।
– পর নায় কেন?
– এমনি।
– স্কুলে যাও?
-না, আম্মু বলছে। মুসলমানির পর স্কুলে যাব।
– কবে মুসলমানি?
– জানিনা।
– হুম। বাসা কই তোমার?
– ঐ মসজিদের ঐ জায়গায়।
– আব্বু কি করে? আব্বু, ঘুমায় গ্রামে।ছোটো একটা মাটির ঘর আছে ওখানে। আমার আম্মু বলছে আমি অনেক বড় হলে.. আব্বু ঘুম থেকে উঠে আমাকে কোলে নিবে।

ফাহিমের মনটা খারাপ হয়ে গেল। এতটুকু বাচ্চার বাবা নেই।
– তোমার আম্মু কি করে?
– মসজিদের পাশে বড় বিল্ডিং। ওখানে ইট ভাঙ্গে। আম্মুর কষ্ট হয়। আমি একদিন আম্মুর সাথে গিয়ে একটু ভাঙছিলাম। আঙ্গুলে ব্যথা পাইছি পরে থেকে আম্মু নিয়ে যায় না।

ফাহিম হালিম খাওয়া বন্ধ করে দিল। ভাল লাগছে না। হালিমের বাটিটা রেখে টাকাটা দিয়ে দিল। আবার মুখ ঘুরিয়ে আজবের দিকে তাকিয়ে ফাহিম বলল,
– ঈদে জামা কিনেছ?
-রোজার ঈদের সময় আম্মু বলছে, গরু কাটা ঈদে জামা দিবে। এখন গরু কাটা ঈদ। আম্মু জামা কিনে লুকিয়ে রাখছে। ঈদের দিন আমরা দুজন সবার বাসায় বাসায় যাব। মাংস চাব। সবাই একটু একটু দিবে। অনেক হবে। তারপর সেগুলো নিয়ে বাসায় আসব। তারপর জামা পরব। আগে পরলে নাকি মানুষে মাংস দিবে না। মাংস চাবার সময় খালি গায়ে যেতে হয়। আর একটু কান্না কান্না ভাব করতে হয়।

ফাহিম আজবের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়ত আজবের মা জামা কিনেনি। মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছি ছেলেকে। খানিক সময়ের জন্য নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। মানুষ কত কষ্টের ভিতরও আনন্দ খুঁজে নেয়।আজবের মা, একজন মহিলা হয়ে ইট ভাঙছে। হয়ত সারাদিন শেষে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে। ইট ভাঙতে ভাঙতে শক্ত হয়ে যাওয়া হাত দিয়ে আদর করে দেয়। এমন কিছু মিথ্যে আশা দেখিয়ে সন্তানকে সুখ দেয়।ভালবাসা এটাই। মিথ্যে কথাগুলোও আজব নিরবিগ্নে শুনে যাচ্ছে। বিশ্বাস করে যাচ্ছে। মাকে ভালবেসে যাচ্ছে। অল্প একটু স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে। ঈদের দিন ভিক্ষে করা মাংস দিয়ে ভাত খাবে। নতুন জামা পরবে। স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে, মুসলমানির পর মা স্কুলে ভর্তি করে দিবে। বড় হলে বাবা এসে কোলে তুলে নিবে। কিছু স্বপ্ন হয়ত পূরণ হবে না। তাই বলে ভালবাসা কমে যাবে না। আবার কিছু স্বপ্নে ভালবাসা আশ্রয় খুঁজে নিবে। স্বপ্নের মৃত্যু আছে, ভালবাসার নেই।
ফাহিম আজবের হাত ধরল।
– চল আমার সাথে।
– কোথায়?
– আমাকে খারাপ লাগলেও আমার সাথে যেতে হবে।চল।
– এখন আর আপনাকে খারাপ লাগছে না।
– তাহলে চল।

ফাহিম আজবকে জামা কাপড় কিনে দিচ্ছে। আজবের পছন্দ খুব সুন্দর। বেছে বেছে দারুন সব জামা কাপড় পছন্দ করছে। ফাহিম বুঝতে পারে, আজবের খেলার সাথীগুলো মোটামুটি ভাল ঘরের ছেলেমেয়ে। আজবের কথা বলা, পছন্দ থেকে তাই বোঝা যায়।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেক আগে।অন্তির কথা ফাহিমের মাথায় একদমই আসে নি। অন্তি কল করে যাচ্ছে।আশেপাশের শব্দে তা ফাহিমের কানে যাচ্ছে না।

কেনাকাটা শেষ করে আজবকে বাসার কাছে দিয়ে গেল ফাহিম। আজবকে রেখে ফাহিম চলে যাচ্ছিল। পিছন থেকে আজবের ডাকে ফিরে তাকাতে হল।
– কিছু বলবে?

আজব হাফ প্যান্টটার পকেট থেকে একটা দুই টাকার নোট বের করল।
– আপনি আমাকে অনেক কিছু উপহার দিলেন।আমার কাছে শুধু এই ২ টাকা আছে। নিন, আপনাকে আমি এটা উপহার দিলাম।

ফাহিম একটুখানি হেসে ২ টাকার নোটটা হাতে নিল। আজবের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল- ধন্যবাদ। ভাল থাকবে। ভাইয়া আবার ঈদের দিন আসবে ঠিক আছে?
– আচ্ছা।

ফাহিমের অনেক ভাল লাগছে। কারও স্বপ্ন পূরণ করে দিতে পেরে। স্বপ্ন সবাই দেখাতে পারে। পূরণ করতে খুব কম মানুষই পারে। খুশি মনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল।অন্তি। মাথার ভিতর চক্কর দিয়ে উঠল। মেয়েটার সাথে দেখা করার কথা। একদম মনে নেই। ভয়ে ভয়ে মোবাইলটা ধরল। ওপাশ থেকে কাঁদো কাঁদো গলায় অন্তি বলল- কোথায় তুমি? আমি যে কতক্ষণ ধরে মোবাইল করছি। ধর না কেন? খুন করে ফেলব তোমাকে আমি। আমি একা একা এখানে কি করি? তোমার আসার কথা আসলা না কেন?
– প্লিজ, প্লিজ, একটু দাড়াও আর। আমি আসতেছি।
– আসো।

মুখ নিচু করে ফাহিম দাড়িয়ে আছে অন্তির সামনে। সাজাপ্রাপ্ত আসামীর মত।
– তুমি এমন করলে কেন?
– সরি।
– সরি বললেই সব ঠিক?কাল আমাদের ঝগড়া হল। আজ ঠিক হয়ে দেখা করতে আসলাম। আর তুমি। ওহ, অসহ্য। তুমি এমন কেন করলে?

মুখ নিচু করেই ফাহিম বলল- রাগ কইর না। আমাকে একটু বলার সুযোগ দাও।
– বল। মুখ নিচু করে না। আমার দিকে তাকিয়ে। না তাকালে আমি কোন কথা শুনব না। চলে যাব এখনি।

ফাহিম মুখ তুলে তাকাল। ভয়ে ভয়েই সব বলে গেল। রাস্তার পাশের হালকা আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তাও অন্তি একদৃষ্টিতে ফাহিমের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। ফাহিম আজ চোখ নামাচ্ছে না। বলে যাচ্ছে। মুগ্ধ হয়ে শুনে যাচ্ছে অন্তি। ভালবাসার মানুষের অল্প কিছুতেই মানুষ অনেক তারাতারি মুগ্ধ হয়ে যায়। অন্তি হচ্ছে। কথা শেষ করেও ফাহিম তাকিয়ে আছে।
– সরি।

অন্তি কিছু বলে না। ফাহিম আবার বলে- সরি তো। ভুল হয়ে গেছে। রাগ করে আছ এখনও?
অন্তি মাথা নেড়ে বলে, না। মুখে কিছু বলে না।হঠাৎ বলা কওয়া ছাড়া বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। ফাহিম তারাতারি মানিব্যাগ থেকে কিছু একটা বের করল। পলিথিন একটা।অন্তির হাত ছুয়ে বলল- দাও দাও, মোবাইলটা দাও তারাতারি। ভিজে যাবে। পলিথিনে ঢুকিয়ে রাখি।

অন্তির থেকে মোবাইল নিয়ে পলিথিন ব্যাগে রেখে দিল। হাতটা ধরে ফাহিম বলল- ভিজে যাচ্ছ। চল।

অন্তি ফাহিমের হাতটা আরও শক্ত করে ধরে।
-আমি আজ তোমার সাথে ভিজব। আমি ভিজতে থাকব। আর তুমি আমাকে দেখবে। খুব লজ্জা পেতে ইচ্ছা করছে।একটু লজ্জা পেতে দিবে না আমাকে?

ফাহিম হা করে তাকিয়ে আছে অন্তির দিকে। অন্তি হাসছে। বৃষ্টিতে ভেজা অন্তিকে দেখতে অসাধারণ লাগছে। আবছা আলোয় স্পষ্ট দেখা যায় না। তবুও ভাল লাগছে। মেয়েটা এত সুন্দর কেন? আজ চোখ নামাতে ইচ্ছা করছে না। ভয় করছে না।হাতে হাত রেখে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে।মিষ্টি একটা মেয়েকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখছে ফাহিম। যার দিক থেকে দৃষ্টি ফেরানো সম্ভব না। আর অন্তি এই দৃষ্টির অপেক্ষায় ছিল এতদিন। আজ রাগ করেই সেজে আসেনি। আজই ফ্যালফ্যাল করে দেখছে পাগলটা। একটু একটু লজ্জা করছে। না, আর দেখতে দেয়া যাবে না। ফাহিমকে বৃষ্টির মধ্যে জড়িয়ে ধরল অন্তি। কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, খুব লজ্জা করছে।
আর ফাহিম জমে ঠাণ্ডা হয়ে আছে। বৃষ্টির ছোঁয়ায় না অন্তির ছোঁয়ায়। বুঝতে পারছে না।

ভালবাসা আসলেই অন্য কিছু।একেক জনের ভালবাসা একেক রকম। কারও ভালবাসা হালিমের দোকানের নাম লিখে। কারও ভালবাসা সন্তানকে ইট ভেঙ্গে খাওয়ানোতে। মিথ্যে আশ্বাসে।বিশ্বাসে। কারও ভালবাসা বৃষ্টির মাঝে অপলক দৃষ্টিতে। কিংবা লজ্জা পেয়ে জড়িয়ে ধরায়।

১৫ thoughts on “যে দৃষ্টি মিষ্টি হবেই

  1. সমালোচনা: “আজিবের খেলার সাথী
    সমালোচনা: “আজিবের খেলার সাথী গুলো মোটামুটি ভালো ঘরের ছেলে মেয়ে।” এই লাইনটা বুঝতে পারলাম না। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এইটা সমর্থন করেনা। রাস্তার ছেলের খেলার সাথী ভালো ঘরের কিভাবে হবে? আপনি সমাজ ব্যবস্থার উল্টো পথে বেশি হেঁটে গিয়েছেন।

    ক্রেডিট: এক কথায় অসাধারণ। আপনার লিখার হাত চমৎকার।আপনার একটা জিনিস খেয়াল করলাম আপনি কাহিনীকে সাবলীল ভাবে লম্বা করতে পারেন, কিন্তু সেইটা বুঝা যায়না। অপ্রয়োজনীয় কথাগুলোকে একটা সাহিত্যিক পর্দা দিয়ে ঢেকে সেটাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন। এইটা নিঃসন্দেহে আপনার দক্ষতা। ভালো লেগেছে।

    কানে কানে কথা: এভাবেই লিখতে থাকুন। পকেটে পুরে নিন এত্ত গুলো শুভকামনা।

      1. না খেললে কিন্তু ভালো
        না খেললে কিন্তু ভালো হবেনা।।

        আম্মুউউউউউউ,,, দেখোনা, জয় নাকি আমার সাথে আর খেলবে না!! :টাইমশ্যাষ:

  2. অসাধারণ অসাধারণ অসাধারণ
    আমি

    অসাধারণ অসাধারণ অসাধারণ

    আমি আপনার লেখার ভক্ত হয়ে গেলাম রে ভাই ………
    পরবর্তি পোস্ট কবে দিবেন তাই বলেন!

  3. ইলেকট্রনের পর্যবেক্ষণের সাথে
    ইলেকট্রনের পর্যবেক্ষণের সাথে সহমত ।
    আর সত্যি মনে হচ্ছে আপনার গল্প বলার সহজাত ক্ষমতা আছে ।
    আরও ভালো লিখবেন সেই আশায় রইলাম ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *