শুভ জন্মদিন ‘দ্য কিং অব পপ’


জনপ্রিয়তায় যিনি নিজেই পূর্ণাঙ্গ একটা আকাশ। তাকে বলা হয় তারকাদের তারকা। খুব বেশি দিনের জীবন নয় তার। অথচ রেখে গিয়েছেন অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্পকথা। যা হার মানায় রূপকথাকেও।

তিনি মাইকেল জ্যাকসন। বিশ্ব সঙ্গীতের জনপ্রিয়তার রাজা। ‘দ্যা কিং অব পপ’।

সঙ্গীত, নৃত্য, অভিনয়, মানবতা ও ভালোবাসার ভুবনে মাইকেল একজন মুগ্ধ জাদুকরের নাম।

সংগ্রামী জীবন আর মানুষের ভালোবাসায় তিনি হয়ে ওঠেছিলেন কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা। আজ এই মহা তারকার ৫৫তম জন্মবার্ষিকী।



জনপ্রিয়তায় যিনি নিজেই পূর্ণাঙ্গ একটা আকাশ। তাকে বলা হয় তারকাদের তারকা। খুব বেশি দিনের জীবন নয় তার। অথচ রেখে গিয়েছেন অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্পকথা। যা হার মানায় রূপকথাকেও।

তিনি মাইকেল জ্যাকসন। বিশ্ব সঙ্গীতের জনপ্রিয়তার রাজা। ‘দ্যা কিং অব পপ’।

সঙ্গীত, নৃত্য, অভিনয়, মানবতা ও ভালোবাসার ভুবনে মাইকেল একজন মুগ্ধ জাদুকরের নাম।

সংগ্রামী জীবন আর মানুষের ভালোবাসায় তিনি হয়ে ওঠেছিলেন কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা। আজ এই মহা তারকার ৫৫তম জন্মবার্ষিকী।

নানা খেয়ালে ভরপুর ছিল জীবন তার। আজন্ম জ্বরে ভোগা লিকলিকে শিশু মাইকেল একদিন ভুবনজয়ী সঙ্গীতপ্রতিভা হবে সে কে ভেবেছিল? যাদের জীবনধারণ করতে হয় উদয়াস্ত পরিশ্রমে, যারা প্রতিনিয়ত হয় সামাজিক বৈষম্যের শিকার, জীবনের কোনো সুন্দর কোমল বৃত্তির কথা চিন্তা করাও বিলাসিত মাত্র তাদের কাছে-এমন একটি পরিবারেই জন্মেছিলেন মাইকেল জ্যাকসন।

তবে অভাবের হলেও মাইকেলের পরিবার ছিলো সঙ্গীতপ্রিয়। সেই গানপাগল পরিবারের কর্তা ছিলেন জোসেফ জ্যাকসন। নিজে ছিলেন গিটার বাদক। স্ত্রী ক্যাথেরিনও ভালোবাসতেন সঙ্গীতের সুমধুর সুর। তবে নয় সন্তানের বিশাল পরিবার সামলাতে গিয়ে জোসেফের আর গান-বাজনা করার সুযোগ থাকেনি।

বেঁচে থাকার সংগ্রামে নেমে পড়লেও বাবা চাইতেন- তার ছেলে-মেয়েরা গান। তবে তিনি নিশ্চয়ই ভাবেননি- তার সাত নম্বর ছেলেটা এককালে সারা বিশ্বের এক নম্বরের পপ গায়ক হয়ে উঠবেন। কিন্তু তাই হয়েছিলেন মাইকেল জ্যাকসন।

সঙ্গীতে তার অর্জন, সুনামের কাছে পরাজিত হয়েছে এই অঙ্গনে সর্বকালের মানুষদের জনপ্রিয়তা।

জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গ্যারি শহরে, ১৯৫৮ সালের ২৯ আগষ্ট। বাবা-মায়ের উৎসাহে ৬০ এর দশকে জ্যাকসন পরিবারের অপর তিন সদস্য- জ্যাকি, টিটো এবং জার্মেইনের দলে আরেক ভাই মার্লোনকে সঙ্গে নিয়ে গাইতে শুরু করেন।

জ্যাকসন- ৫’র ক্ষুদে সদস্যরা শহরের নানা প্রান্তে গাইতে শুরু করে। তবে বাকিদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি প্রতিভাধর ছিলেন মাইকেল। তার গানের গলাও ছিল বালককন্ঠের হিসেবে অনেক পরিণত। ফলে এই ছোটদের দলটার নেতা হতে খুব বেশি সময় লাগেনি তার।

প্রধান ভোকালিস্ট তিনি ছিলেন- এটা বলাই বাহুল্য! এই দলের মধ্যে প্রতিভার ছোঁয়া খুঁজে পেয়েছিলেন আরেক বিখ্যাতজন ব্যারি গোর্ডি। ফলে তার হাত ধরে জ্যাকসন ৫’র ব্যাক টু ব্যাক অ্যালবাম বেরুনোর সঙ্গে সঙ্গে এক বিষ্ময়কর প্রতিভা মাইকেল জ্যাকসন তার আলাদা জাত চিনিয়ে দিলেন আশেপাশের সবাইকে।

সারা বিশ্বের মানুষের কাছে আমেরিকার পপ সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে মাইকেল জ্যাকসন যে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন তার শুরুটা হয়েছিল ১৯৭১ সালে এককভাবে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করে।

১৯৮০ সালে মাত্র ১০ বছরের মধ্যে জ্যাকসন বিশ্বের পপসংগীত শ্রোতাদের কাছে হয়ে ওঠেন নয়নমণি। ১৯৭৯ সালে তার প্রথম সলো অ্যালবাম ‘অফ দ্য ওয়াল’ বের হয় কুইন্সি জোনসের প্রযোজনায়। এই অ্যালবামের চার চারটি গান ইউএস টপচার্টের প্রথম দশটি গানের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছিল।

শুরু হলো তার একচ্ছত্র আধিপত্য। এলভিস প্রিসলি পপসংগীতের সম্রাট হওয়া সত্ত্বেও মাইকেল জ্যাকসনকেই শ্রোতারা গুরু ডাকতে শুরু করল।

১৯৮২ সালে তার `থ্রিলার` অ্যালবামটি সারাবিশ্বে বেস্ট সেলিং অ্যালবাম হিসেবেই ইতিহাস গড়ে। ১৯৭৯ সালে `অব দ্য ওয়াল`, ১৯৮৭ সালে `ব্যাড`, ১৯৯১ সালে `ডেঞ্জারাস` এবং ১৯৯৫ সালে `হিস্টরি` শিরোনামের অ্যালবামগুলোও বেস্ট সেলিং খেতাব গড়তে সক্ষম হয়েছেন।

তারকাখ্যাতির সঙ্গে অর্থ-বিত্তের প্রাচুর্যে রূপকথার জীবন কাটাতে লাগলেন মাইকেল জ্যাকসন। গানের তালে তালে মাইকেলের নাচের কৌশলগুলোও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মাইকেলের জনপ্রিয় নাচের মধ্যে রবোট, ও মুনওয়াক (চাঁদে হাঁটা) রয়েছে।

‘মুনওয়াক’ হচ্ছে সামনের দিকে হাঁটার দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টি করে পিছনে যাবার ভঙ্গিমা। গানের সঙ্গে নাচের ব্যতিক্রমী মুদ্রা ছিল মাইকেলের বড় একটি গুণ। বিশেষ করে মঞ্চে মাইকেল মানেই তার উন্মাতাল নাচের আসর।

এমটিভি কালোদের গান প্রচার করত না। কিন্তু মাইকেলের থ্রিলার ভেঙে ফেলে সেই বাধা। সব বাধা পেরিয়ে বিশ্বের বুকে মাইকেল জ্যাকসন নিজেকে তুলে ধরেন। ২০০১ সালে থ্রিলারের একটি রিভাইসড এডিশন বের হয়। এরপর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০৮ সালে বের হয় ডিলাক্স এডিশন থ্রিলার ২৫। যাতে নতুন একটি গান, সাক্ষাৎকারসহ যুক্ত হয় নানা ফিচার।

এখনো অনেক নতুন অ্যালবামের ভিড়ে ২৮ বছরের পুরনো অ্যালবামটির বিক্রি কমেনি। ১৯৮৭ সালে থ্রিলার-এর রেকর্ড ভাঙা সাফল্যের পর এর কাছাকাছি যাওয়াও ছিল বিশাল কঠিন কাজ। মাত্র পাঁচ বছর পর ‘ব্যাড’ অ্যালবামটি দিয়ে সে কাজটাই করলেন মাইকেল জ্যাকসন।

ম্যান ইন দ্য মিরর, দা ওয়ে ইউ মেক মি ফিল এর মতো গান দিয়ে নিজের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিলেন কিং অব পপ। এর পাশাপাশি মাইকেল জ্যাকসনের সেরা পাঁচটি ভিডিও রয়েছে যেগুলো এই তারকাকে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে সর্বকালের সেরা একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবেও।

সেগুলোর উল্লেখযোগ্য একটি ১৯৯৫ সালে রিলিজ হওয়া বোন জ্যানেট জ্যাকসনের সাথে অংশ নেওয়া ‘চাইল্ডহোল্ড’ নামের গানের ভিডিও। নিজের ছোটবেলায় সহ্য করা অসংগতিগুলো নিয়েই এই গান।

তারপর আসে ‘বিট ইট’ শিরোনামের গানের ভিডিও। ১৯৮৩ সালে বাজারে আসা এই ভিডিওটি আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

গান ছাড়াও ‘এমজে’ ছিলেন চলচ্চিত্রেও একজন সফল তারকা। তার প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ‘দ্য উইজ’। মিউজিক্যাল এই মুভিতে এক কাকতাড়ুয়ার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। এর আট বছর পর ১৯৮৬ সালে অভিনয় করলেন ‘ক্যাপ্টেন ইও’র নাম ভূমিকায়। থ্রি-ডি প্রযুক্তিতে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি ছিল স্পেশাল ইফেক্টনির্ভর। ছিল ব্যবসাসফলও।

১৯৮৮ সালে বের হয় ‘মুনওয়াকার’। এটাকে চলচ্চিত্র না বলে মিউজিক ভিডিওর কালেকশনও বলা যেতে পারে। এর প্রায় নয় বছর পর ১৯৯৭ সালে মাইকেল অভিনয়ে ফেরেন হরর চরিত্রে। ছবির নামও সে রকম ‘ঘোস্ট’।

তবে বর্তমান প্রজন্ম মাইকেলকে অভিনেতা হিসেবে বেশি চিনেছে ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সাই-ফাই ছবি ‘মেন ইন ব্ল্যাক টু’ দিয়ে। টমি লি জোনস ও উইল স্মিথের সঙ্গে মাইকেল ছিলেন অতিথি চরিত্রে।

মাইকেলের শেষ চলচ্চিত্র ‘মাইকেল জ্যাকসনস দিস ইজ ইট’। মাত্র ৬০ মিলিয়ন ডলারে নির্মিত এই ছবিটি এর আয় করেছে প্রায় ৩৬০ মিলিয়ন ডলার। রেকর্ড করেছে মাইকেলের জীবনের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি হিসেবে।

জীবনে অর্জন করার মতো প্রায় সবই তিনি জয় করে নিয়েছিলেন। তাকে বলা হয় পপ সংগীতের কিং।

মাইকেল জ্যাকসন দু’বার ‘রক এন রোল হল অফ ফেম’-এ অন্তভূর্ক্ত হয়েছেন। সারা বিশ্বের সবচেয়ে বিক্রিত অ্যালবামের স্রষ্টাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। পাশাপাশি ১৩ বার গ্রামি অ্যাওয়ার্ড জেতার রেকর্ডও তার দখলে।

এসব অর্জন দিয়ে মাইকেলকে মাপা সম্ভব হবে না। তবে মাইকেলের কাছে সব কিছুর উর্দ্ধে ছিলো মানুষের ভালোবাসা। এ বিশ্বে আর কোন তারকা এতো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার গৌরব অর্জন করেননি।

কারণ তিনিই আধুনিক সঙ্গীত জগতের একমাত্র নক্ষত্র, যার নাম জানে পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষ। তাকে চেনে, তার প্রতি ভালোবাসা পোষণ করে।

দাম্পত্য জীবনে ভালোবেসে ঘর বেঁধেছিলেন বিশ্বের সব রকস্টারের স্বপ্ন নায়ক এলভিস প্রিসলির একমাত্র সন্তান লিসা মেরি প্রিসলিকে বিয়ে করে। সময় তখন বড় দু:সময়। চারপাশে নানা মিথ্যে অভিযোগ, মিডিয়ার চোখ রাঙানি।

বৈচিত্রময় জীবনের বিভিন্ন রকম বাজে অভিজ্ঞতার মুখোমুখী হয়ে পড়েন এই শিল্পী। তার মধ্যে শিশু নিগ্রহের অভিযোগের বছরগুলোতে মাইকেলের শরীর ও মন দুই’ই ভেঙ্গে পড়তে থাকে। তিনি এসময় ব্যাথানাশক ঔষধ এবং এমনকি ড্রাগস নেয়াও শুরু করেছিলেন। এর ভেতরে একটু শান্তির আশ্রয় খুঁজে নিতেই বিয়ে করেছিলেন মাইকেল।

কিন্তু অল্প দিনেই ভাঙন আসে এই সুখের সংসারে। ১৯৯৬ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। ৯৭’ সালে আবারো বিয়ের পিঁড়িতে বসেন পপ সম্রাট। পেশায় নার্স এই ভদ্রমহিলার নাম ডোবরা জেনি রো।

তারা দু’বছর সংসার করার পর ১৯৯৯ সালে আলাদা হয়ে যান এবং তালাকের সময় দুই সন্তানের প্রতিপালনের দায়িত্ব ডোবরা মাইকেলকে প্রদান করেন।

জ্যাকসনের তিন ছেলে-মেয়ে। পুত্র প্রিন্স মাইকেল জন্ম নেয় ১৯৯৭ সালে। মেয়ে ক্যাথরিনা ১৯৯৮ সালে। প্রিন্স মাইকেল টু নামে তার একটি পুত্র আছে যে ২০০২ সালে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু তার মায়ের ব্যাপারে কোন কিছু জানা যায় না।

জনপ্রিয়তার শুরু থেকেই এই মানুষটি লড়াই করে গেছেন বিশাল এক ক্ষমতার বিপক্ষে। যারা তাকে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করে বিশ্ববাসীর কাছে ছোট করার ঘৃনিত প্রয়াস চালিয়েছে। কিন্তু কথায় বলে সত্যের জয় অনিবার্য।

তেমনি জয় হয়েছে মাইকেলের, জয় হয়েছে তার কোটি কোটি ভক্তের ভালোবাসা আর বিশ্বাসের। তারকাদের তারকা জ্যাকসনকে হটাতে মার্কিন মুলুক শতবার নানা রকম ফাঁত পেতেছে।

মার্কিনের কাছে মাইকেল ছিলেন দারুন এক মাথাব্যাথা। কারণ এই তারকা ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ। আর এটাই সাদা চামড়ার মার্কিকিনিদের যন্ত্রণা দিয়েছে। নইলে কেন এক দশক ধরে শিশুকামিতা নিয়ে এত মাতামাতি চলবে? এবং কেনই বা বিশেষ করে মাইকেলের বিরুদ্ধে শিশুকামিতার মিথ্যা অভিযোগ?

পরে প্রমাণিত হয়েছে যে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ কেবল মিথ্যাই নয়, এসব অভিযোগের উদ্দেশ্য ছিল জ্যাকসনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া! এটা সম্ভব হয়েছে জ্যাকসনের শিশুসুলভ সারল্যের জন্য।

তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগকারী শেরিফ শেল্ডন জ্যাকসনকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য নিজের সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন। এমনকি কয়েকজন মা তাঁদের শিশুদের ব্যবহার করে জ্যাকসনের কাছ থেকে টাকা হাতানোর ফন্দি এঁটে অনেক দূর সফলও হয়েছিলেন।

পরে বিভিন্ন সময় এসব অভিযোগের অসারতা তাঁরা নিজেরাই স্বীকার করেন বা ধরা পড়েন। জ্যাকসনের প্রতি ক্ষুব্ধ আদালত পর্যন্ত রায় দিতে বাধ্য হন যে সবই ছিল সাজানো অভিযোগ। এমনকী সিএনএনে জ্যাকসনের মৃত্যুর সংবাদ প্রচার হয়েছিলো অত্যন্ত জঘন্যভাবে। যা মাইকেলের কোটি ভক্তের হৃদয়ে আঘাত দিয়েছিলো।

শিশুকামিতার অভিযোগে আদালতে জয়ী হয়ে এলেও মার্কিন মিডিয়ার চোখে জ্যাকসন এখনো এক শিশুকামী। মৃত্যুর পরও এই অপবাদ থেকে তাঁর রেহাই মেলেনি। অবশ্য বিশ্ববাসীর অজানা নয় পশ্চিমাদের মিডিয়ার সংবাদের সত্যতা কতটুকু।

কোনকালেই মার্কিন-ইংল্যান্ড কথার সচ্ছতা পৃথিবীকে দেখাতে পারেনি। তবে সব বিতর্ককে দুমড়ে-মুচড়ে জ্যাকসন ইসলামের ছায়াতলে নিজেকে বিলীন করে দিলেন। শান্তির সুশীতল ছায়ায় নতুন করে তার জীবন আবার শুরু করেছিলেন।

জানা যায়, ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে তার প্রযোজক বন্ধু ও গীতিকার ডেভিড ওয়ার্নসবি ও ফিলিপ বুবাল তাকে সহায়তা করেন। তারা তাকে বুঝাতে সক্ষম হন তারা ইসলাম গ্রহণ করে কিভাবে সুন্দর জীবন যাপন করছেন।

মুসলিম হবার পর তিনি মিকাঈল নাম গ্রহণ করেন।

মামলা, অন্যায় অভিযোগ, মানসিক অত্যচার কাটিয়ে ২০০৯ সালে সারা বিশ্বের নানা প্রান্তে কনসার্টের মাধ্যমে বীরদর্পে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন মাইকেল জ্যাকসন।

তার এ ঘোষনায় বিশ্বের নানা প্রান্তের ভক্তরা আকুল হয়ে পড়ে তার ব্রেক ডান্স দেখার জন্য। টিকিট ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ফুরিয়ে যাবার মাধ্যমে আবারো প্রমাণিত হয়, মাইকেল জ্যাকসন একজনই।

শেষ পর্যন্ত বহুকাঙ্খিত এই কনসার্টের আগেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পপ কিং মাইকেল জ্যাকসন ওই বছরের ২৬ জুন শুক্রবার মৃত্যুবরণ করলেন।

তার মৃত্যুতে শোকে ভাসলো সারা বিশ্বের সংগীতাঙ্গন। কোটি কোটি ভক্তদের প্রাণ কাঁদিয়ে মাটির শয্যায় চিরদিনের মতো জায়গা করে নিলেন মাইকেল জ্যাকসন।

বিখ্যাত এ শিল্পী একাধারে ছিলেন সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং বিশিষ্ট দানবীর।

তার শেষ এ গুণের কথাটি ছিল অবশ্যই মিডিয়াবর্জিত। কারণ তিনি চাইতেন না তার দানের কথা অন্য কারও মুখে থাকুক। আর চাইতেন না বলেই এ দানবীরের কথা রয়ে গেছে অগোচরে। তবে সত্য কখনোই চাপা থাকে না। যেমনটি ঘটেছে জ্যাকসনের বেলায়।

অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তার বিশেষ গুণেরই বহিঃপ্রকাশ। বহু গুণে গুণান্বিত এ মহান শিল্পীর বিদায়ে বিশ্ব হারাল এক দানবীরকেও। পাশাপাশি মাইকেল ছিলেন মানবতার অগ্নিপুরুষ। গানে গানে তিনি লড়াই করেছেন যুদ্ধ, ক্ষুধা, দারিদ্রতা, অশিক্ষা, বর্ণবৈষম্যর বিরুদ্ধে।

আর্ত-মানবতার কল্যাণেও নানা ধরনের কাজ করেছেন এই শিল্পী।

১৯৮৪ সালে ‘উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামের একটি গান তিনি লিখেছিলেন লিওনেল রিচির সঙ্গে। যেটি তারা গেয়েছিলেন ‘ইউএসএ ফর আফ্রিকা’ নামে আফ্রিকার অসহায় মানুষদের কল্যাণে আয়োজিত এক কনসার্টে।

যেখানে- বব ডিলান, ব্রুস সিপ্রংস্টিন, টিনা টার্নার, স্টিভ ওয়ান্ডার, কেইন রজার্সসহ আরো অনেক বিখ্যাত তারকা গায়কই গানটি গেয়ে কালো মানুষদের প্রতি ভালোবাসার কথা বলেছিলেন।

এই গানের বাইরেও আরো অনেক গান করেছেন মাইকেল যে গানগুলোতে মানবতার কথা উঠে এসেছে, উঠে এসেছে বঞ্চনার কথাও।

১৯৮৬ সালে তিনি নিগ্রো ছাত্রদের জন্য ১.৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ফান্ড গঠন করেন যা ‘মাইকেল জ্যাকসন ইউনাইটেড নিগ্রো কলেজ ফান্ড এনডয়েড স্কলারশিপ ফান্ড’ নামে পরিচিত।

১৯৯১ সালে মাইকেলের ‘হিল দ্যা ওয়ার্ল্ড’ গানটি রিলিজ হয়। অসাধারণ মানবতাবাদী একটি গান। ১৯৯২ সালে মাইকেল ‘হিল দ্যা ওয়ার্ল্ড’ নামের একটি চ্যারিটি সংস্থা চালু করেন। ২০০১ সালে এর অংশ হিসাবে চালু করেন ‘হিল দ্যা কিড’ চ্যারিটি।

এরকম আরেকটি গান ‘আর্থ সং’। এই গানের ভিডিও দেখে কান্না থামাতে পারেনি এমন মানুষের সংখ্যা অসংখ্য। ইউটিউবে ভিডিওর নিচে কমেন্টগুলো পড়লেই বুঝতে পারা যায়। গানটিতে মাইকেল পৃথিবীর প্রতি আবেগের চরম বহিপ্রকাশ ঘটিয়েছেন, তার কন্ঠ, চেহারা সব জায়গা থেকে সত্যিকার আবেগ ফুটে বেরিয়েছে গানটি গাইবার সময়।

১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সিনিওর মাইকেলকে শিশুদের জন্য অবদানের ফলে ‘পয়েন্ট অব লাইফ’ পুরস্কার প্রদান করেন। ১৯৯৪ সালে ১০০,০০০ শিশুর ভোটে তিনি ‘কেয়ারিং ফর কিডস’ পুরস্কার লাভ করেন।

এতো গেল মানবতার কথা, সংগীতের ইতিহাসে মাইকেলের বিশাল প্রভাবকে উল্লেখ না করলে অন্যায় করা হবে। মাইকেলের গানে অনুপ্রাণিত হয়ে আরো কত শিল্পীর জন্ম হয়েছে তা গুনে শেষ করা যাবেনা। বর্তমানের বিখ্যাত সব গায়কেরা মাইকেলকে তাদের অনুপ্রেরণা হিসাবে দেখেন। নাচের দক্ষতাও তিনি অদ্বিতীয়।

মাইকেলের প্রভাব দেখা যায় ফ্যাশনের জগতেও, তার জ্যাকেট, প্যান্ট, গ্লোভসের স্টাইল সবই হয়ে উঠে সাধারন থেকে বিখ্যাত মানুষদের ফ্যাশনের অংশ। মাইকেল ভালবাসতেন এ পৃথিবীকে, ভালবাসতেন মানুষকে।

তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট গভীর আবেগ দিয়ে অনুভব করতেন, তার এ আবেগ তিনি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন গানের মাধ্যমে।

পরিতাপের বিষয়, জীবনে কারও ভালোবাসা বা সদয় আচরণ পাননি সংগীতের এই রাজা। না তাঁর বাবা-মা, না মার্কিন মিডিয়া, না মার্কিন বিচারব্যবস্থা; কেউ তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরও অনেকে তাকে নিয়ে সমালোচনায় মেতেছেন!

যার হৃদয় মানুষ ও মানবতার প্রার্থনায় নিমগ্ন, ঈশ্বর যার হাতে তুলে দিয়েছেন ভালোবাসার মোহন বাঁশি তাকে অপদস্ত করে সে সাধ্য মানুষের কই! মাইকেল জ্যাকসন গানের জগতে এক বিস্ময়কর মানব।

তিনি মানবতার অগ্রদুত হয়েই তার ভক্তদের কাছে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। তার গান দিয়ে, গানে গানে প্রতিবাদ আর আন্দোলনের সাহসে। তিনি অমর, অবিনশ্বর। যুগে যুগে মানুষের কাছে হয়ে থাকবেন অনুপ্রেরণার মহাসমুদ্র।

পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের জন্মবার্ষিকীতে তার প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

৮ thoughts on “শুভ জন্মদিন ‘দ্য কিং অব পপ’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *